পরিবেশ রক্ষায় ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টার বিকল্প নেই
· Prothom Alo

রাজনৈতিক দলগুলো তাদের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি এবং প্রতিশ্রুতি পূরণের যোগ্যতা বিবেচনায় জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে ক্ষমতায় আসে। শুধু বাংলাদেশ নয়, পুরো বিশ্বেই রাজনীতির বিবেচনায় বাণিজ্য, মুনাফা ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন গুরুত্ব পেয়ে থাকে। কিন্তু যে পৃথিবীতে আমরা বসবাস করি, তার অস্তিত্ব রক্ষা ও ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে একটি টেকসই পরিবেশ তৈরি করা রাজনীতিতে অন্যান্য অনেক বিষয়ের চেয়ে কম গুরুত্ব পেয়ে আসছে।
Visit somethingsdifferent.biz for more information.
বিএনপি তার নির্বাচনী ইশতেহারে এর ব্যতিক্রম ঘটিয়ে পরিবেশ রক্ষাকে রাজনীতির কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে। নির্বাচনী প্রচারণায় উঠে এসেছিল খাল খনন, বৃক্ষরোপণ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলার মতো পরিবেশবিষয়ক মূল বিষয়গুলো। প্রচলিত নির্বাচনী প্রচারণার বাইরে এসে এ ধরনের পরিবেশ রক্ষাবিষয়ক প্রচারণা সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলে। ইতিবাচক প্রচারণার সুফল পরবর্তী সময়ে প্রতিফলিত হতে দেখা যায় নির্বাচনী ফলাফলে।
সরকার গঠনের পরও পরিবেশবিষয়ক রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের দিকে যেতে সময় নেয়নি তারেক রহমানের সরকার। আগামী ৫ বছরের মধ্যে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে কাজ শুরু হয়েছে একটি বিশেষ সেল গঠনের মাধ্যমে। বৃক্ষরোপণ সেল সারা দেশে বিভিন্ন এলাকায় স্থানীয় জাত নির্বাচন, বিদেশি গাছের পরিবর্তে দেশীয় ফলদ, ঔষধি ও বনজ গাছ রোপণের বিশদ পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে।
নদীতে জেগে ওঠা চর, রাস্তার পাশে, খালের দুই ধারের সঙ্গে সঙ্গে বৃক্ষরোপণের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে মেঘনা অববাহিকার নতুন দ্বীপগুলোতে। এসব দ্বীপে ম্যানগ্রোভ–জাতীয় গাছ লাগিয়ে একদিকে যেমন বনায়ন হবে, আরেক দিকে ঝড়–সাইক্লোনে প্রাকৃতিক বেষ্টনী হিসেবে কাজ করবে। এ ছাড়া কার্বন ট্রেডিংয়েও সাধারণ গাছের চেয়ে ম্যানগ্রোভ দেশের জন্য বেশি অর্থ নিয়ে আসতে পারে। আগামী এক বছরের মধ্যেই দুই কোটি ম্যানগ্রোভ–জাতীয় গাছ রোপণের লক্ষ্যে কাজ করছে সরকার।
সমুদ্রপৃষ্ঠ এক মিটার উঁচু হলেই বহু জেলা তলাবে; তার পরও বসে থাকবে বাংলাদেশ!বৃক্ষরোপণের পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রীর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প খাল খনন। ইতিমধ্যে তৃণমূল পর্যন্ত মৃতপ্রায় ও হারিয়ে যাওয়া খালগুলো চিহ্নিত করা হয়েছে এবং বেশ কিছু খাল খননের কার্যক্রম হাতে নেওয়া হয়েছে। পর্যায়ক্রমে অন্য খালগুলো খনন এবং নদী পুনরুদ্ধারের কার্যক্রমও চলমান থাকবে। খাল খননের মাধ্যমে বাংলাদেশের সেচব্যবস্থা, খাদ্য উৎপাদন ও যোগাযোগব্যবস্থায় বড় ধরনের ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে বলে আশা করা যায়।
জলবায়ু পরিবর্তন যে হচ্ছে এবং সামনের দিনে আরও প্রকটভাবে হবে, তা নিয়ে আর প্রশ্ন নেই। এখন প্রাসঙ্গিক প্রশ্ন হচ্ছে, এই পরিবর্তন মোকাবিলায় আমরা কী ধরনের ব্যবস্থা নিচ্ছি এবং যে প্রস্তুতি নিচ্ছি, তা যথেষ্ট কি না
পরিবেশ বিষয়ে বিএনপি সরকারের অবস্থান বৈশ্বিক পরিবেশ রক্ষার আহ্বানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এ বছরের বিশ্ব পরিবেশ দিবসের প্রতিপাদ্য, ‘প্রকৃতির দ্বারা অনুপ্রাণিত—জলবায়ুর জন্য, আগামীর জন্য’। অর্থাৎ আগামীর পৃথিবীকে রক্ষার জন্য, জলবায়ুকে রক্ষার জন্য আমাদের জরুরি ও আশু পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত। আর এ পদক্ষেপ হবে প্রাকৃতিক বাস্তুসংস্থানকে রক্ষা করে ও সঙ্গে নিয়ে।
এই পৃথিবীর অরণ্য, জলাভূমি, নদী ও সমুদ্রকে রক্ষা করে আমাদের কার্বন নিঃসরণ কমাতে হবে এবং জরুরি ‘ক্লাইমেট অ্যাকশন’ নিতে হবে। প্রকৃতিকে সঙ্গে নিয়ে এবং প্রকৃতির আদি সম্পদগুলোকে কাজে লাগিয়ে পরিবেশ রক্ষার এ আহ্বান বিএনপি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করে বলেই বৃক্ষরোপণ, বনায়ন, নদী-খাল-বিল খনন-পুনঃখনন এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মতো প্রকল্পগুলোকে গুরুত্ব দিচ্ছে।
ফসিল ফুয়েলের ব্যবহার যতটা সম্ভব কমিয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতে বেশ কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। চরাঞ্চল, সরকারি-বেসরকারি ভবনের ছাদ ও সারা দেশের বিভিন্ন খালি জায়গায় সোলার প্যানেল স্থাপনের কার্যক্রম শুরু হয়েছে।
তবে একটি কথা আমাদের মনে রাখা দরকার। পরিবেশ রক্ষা শুধু সরকারি পদক্ষেপ বা কঠোর আইনকানুন প্রণয়নের মাধ্যমে সফল হবে না। এর জন্য দরকার সরকারি-বেসরকারি খাতের যৌথ উদ্যোগ এবং সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ। পরিবেশকে রক্ষা করা এবং পরিবেশকে নিজের বলে ভাবতে শেখার এই শিক্ষা আমাদের ছোটবেলা থেকেই পাওয়া উচিত।
আমাদের আশপাশের পরিবেশ রক্ষা করতে না পারলে আমরা নিজেরাই এই দূষণের সরাসরি শিকার, তার উপলব্ধিটাও খুব জরুরি। বাণিজ্যিক, ব্যক্তিগত ও সামাজিক পর্যায়ে আমরা পরিবেশ রক্ষায় অবদান রাখতে পারি। জ্বালানি ও বিদ্যুৎ ব্যবহার এবং প্লাস্টিক–জাতীয় পণ্যের ব্যবহার যতটা সম্ভব কমাতে হবে। ইংরেজি তিনটি আর (রিডিউস, রিসাইকেল ও রিইউজ) নীতি অবলম্বন করলে আমরা পরিবেশ রক্ষায় ভালো ভূমিকা রাখতে পারি। সর্বোপরি গ্রিন পলিসি বা সবুজ নীতিকে সমর্থন জানিয়ে নাগরিক সমাজকে সোচ্চার হতে হবে, যেন সমাজে পরিবেশ রক্ষার বিষয়ে সচেতনতা তৈরি হয় এবং পরিবেশদূষণকারী প্রতিষ্ঠান ও সংস্থাগুলোকে জবাবদিহির আওতায় আনা যায়।
বাংলাদেশের মতো দেশ, যেখানে শিল্পায়ন অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য জরুরি, সেখানে পরিবেশ রক্ষাকে রাজনৈতিক বিবেচনায় সামনের কাতারে নিয়ে আসা অনেকের কাছে অগ্রহণযোগ্য মনে হতে পারে। কিন্তু বিএনপি সরকার এমন একটি বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন দেখাচ্ছে, যা টেকসই ভিত্তির ওপরে প্রতিষ্ঠিত, যা স্বল্পস্থায়ী অবকাঠামোগত উন্নয়নের চেয়ে দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করে। তাই অর্থনৈতিক উন্নয়নের পরিকল্পনায়ও পরিবেশ রক্ষাকে একটি গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
বিশ্ব পরিবেশ দিবস ২০২৬ জলবায়ু পরিবর্তন এবং তা মোকাবিলায় সবার সর্বাত্মক চেষ্টার আহ্বান করছে। প্রচণ্ড গরম ও তাপপ্রবাহ, মেরু অঞ্চলের হিমবাহ গলে যাওয়া, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি ও নানা দুর্যোগের মাধ্যমে পৃথিবী মানবসমাজকে একটি বার্তা পাঠাচ্ছে। আমাদের এই বার্তার ভয়াবহতা ও গুরুত্ব বুঝে উপযুক্ত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে।
জলবায়ু পরিবর্তন যে হচ্ছে এবং সামনের দিনে আরও প্রকটভাবে হবে, তা নিয়ে আর প্রশ্ন নেই। এখন প্রাসঙ্গিক প্রশ্ন হচ্ছে, এই পরিবর্তন মোকাবিলায় আমরা কী ধরনের ব্যবস্থা নিচ্ছি এবং যে প্রস্তুতি নিচ্ছি, তা যথেষ্ট কি না। ভবিষ্যতের প্রজন্ম ও পৃথিবী রক্ষায় আমাদের জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে একতাবদ্ধ পদক্ষেপের কোনো বিকল্প নেই।
ড. সাইমুম পারভেজ প্রধানমন্ত্রীর পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক বিশেষ সহকারী
* মতামত লেখকের নিজস্ব