পার্থিব জীবনের সঙ্গে আধ্যাত্মিক জীবনের সমন্বয় যেভাবে করবেন
· Prothom Alo

পৃথিবীর অন্যান্য ধর্ম-দর্শন থেকে ইসলামের পার্থক্য হলো ইসলাম দেহ ও আত্মার স্বভাবজাত চাহিদা ও বৈশিষ্ট্যের মধ্যে সমন্বয় সাধন করেছে। ইসলাম কোনো মুসলমানকেই জাগতিক আকাঙ্ক্ষা, জৈবিক প্রয়োজন ও পার্থিব চাহিদা থেকে বারণ করে না। তবে ভারসাম্যপূর্ণ সমন্বয় ও মধ্যপন্থার কথা বলে।
Visit asg-reflektory.pl for more information.
আমরা কোরআনের অনেক আয়াতেই দেখতে পাই, জৈবিক ও আত্মিক, দুনিয়া ও আখেরাতের অগ্রাধিকার ও ইচ্ছা-আকাঙ্ক্ষার মধ্যে সমন্বয় করার কথা বলা হয়েছে।
কোরআনে বলা হয়েছে, ‘আল্লাহ তোমাকে যা দিয়েছেন, তা দিয়ে তুমি আখেরাতে (স্থায়ী সুখভোগের) আবাস অনুসন্ধান করো, আর দুনিয়ায় তোমার অংশের কথা ভুলে যেয়ো না, (মানুষের) কল্যাণ সাধন করো, যেমন আল্লাহ তোমার কল্যাণ করেছেন, পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টির কামনা করো না, নিশ্চয় আল্লাহ বিপর্যয় সৃষ্টিকারীদের ভালোবাসেন না।’ (সুরা কাসাস, আয়াত: ৭৭)
পরিমিতিবোধ বজায় রেখে, সব ধরনের বৈধ নান্দনিক চর্চা, পছন্দের বিষয় উপভোগ করার অনুমতি দিয়েছে ইসলাম। আল্লাহ বলেন, ‘হে আদম সন্তান! প্রতিটি নামাজের সময় সুন্দর পোশাক পরিচ্ছদ গ্রহণ করো, আর খাও এবং পান করো। তবে অপব্যয় ও অমিতাচার করবে না, নিশ্চয়ই আল্লাহ অপব্যয়কারীদের ভালোবাসেন না।’
আল্লাহ হালাল বিষয়কে নিষিদ্ধ করাকে সীমালঙ্ঘন বলে আখ্যা দিয়েছেন। এটা মূলত জৈবিক ও আত্মিক সমন্বয়ের পথ থেকে বিচ্যুতি ও সীমা লঙ্ঘন।
বলো, ‘যেসব সৌন্দর্য-শোভামণ্ডিত বস্তু ও পবিত্র জীবিকা তিনি তাঁর বান্দাদের জন্য সৃষ্টি করেছেন কে তা হারাম করল’? বলো, ‘সে সব হচ্ছে ইমানদারদের জন্য দুনিয়ার জীবনে, বিশেষভাবে কিয়ামতের দিনে। এভাবে আমি জ্ঞানী সম্প্রদায়ের জন্য নিদর্শনগুলো বিশদভাবে বিবৃত করি।’ (সুরা আরাফ, আয়াত: ৩১-৩২)
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ মুমিনদের শিখিয়ে দিয়েছেন, কীভাবে জাগতিক চাহিদা ও পরজাগতিক আকাঙ্ক্ষার মধ্যে সমন্বয় সাধনের প্রার্থনা করতে হবে। আল্লাহ পাক বলেন, ‘লোকেদের কেউ কেউ বলে থাকে, হে আমাদের প্রতিপালক, আমাদের এ দুনিয়াতেই প্রদান করো, বস্তুত সে আখিরাতে কিছুই পাবে না।’
লোকেদের মধ্যে কিছু লোক এমন আছে, যারা বলে থাকে, ‘হে আমাদের প্রতিপালক, আমাদের দুনিয়াতেও কল্যাণ দাও এবং আখিরাতেও কল্যাণ দাও এবং আমাদের জাহান্নামের আজাব হতে রক্ষা করো।’
সভ্যতা রক্ষা ও বিপর্যয় রোধে কোরআনের অনন্য দর্শন‘এরাই সেই লোক, যাদের কৃতকার্যে তাদের প্রাপ্য অংশ রয়েছে এবং আল্লাহ সত্বর হিসাব গ্রহণকারী।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ২০০-২০২)
আল্লাহ আরও বলেন, ‘হে ইমানদারগণ, পবিত্র বস্তুরাজি যা আল্লাহ তোমাদের জন্য হালাল করে দিয়েছেন সেগুলোকে হারাম করে নিয়ো না আর সীমালঙ্ঘন করো না, অবশ্যই আল্লাহ সীমালঙ্ঘনকারীদের ভালোবাসেন না।’
‘যেসব হালাল ও পবিত্র জীবিকা আল্লাহ তোমাদের দিয়েছেন সেগুলো ভক্ষণ করো, যে আল্লাহর প্রতি তোমরা ইমান এনেছ তাঁকে ভয় করো।’ (সুরা মায়েদা, আয়াত: ৮৭-৮৮)
এখানে বিশেষভাবে লক্ষণীয় হলো, আল্লাহ হালাল বিষয়কে নিষিদ্ধ করাকে সীমালঙ্ঘন বলে আখ্যা দিয়েছেন। এটা মূলত জৈবিক ও আত্মিক সমন্বয়ের পথ থেকে বিচ্যুতি ও সীমা লঙ্ঘন।
কোরআন, সুরা হাদিদ, আয়াত: ২৭আর বৈরাগ্যবাদের যে বিষয়টা, তা তারা নিজেরাই উদ্ভাবন করেছিল। আমি তাদের ওপর তা বাধ্যতামূলক করিনি। বস্তুত তারা আল্লাহর সন্তুষ্টি বিধানই করতে চেয়েছিল, কিন্তু তারা তা যথাযথ পালন করেনি।জাগতিক ও বস্তুগত উপাদান গ্রহণ ও ব্যবহার থেকে যেন মানুষ বিরত না হয়, এ জন্য আল্লাহ আরও সুস্পষ্টভাবে জগৎ ও পৃথিবীকে মানুষের জন্য অনুগত করে দেওয়ার কথাও ব্যক্ত করেছেন।
পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘তিনিই সেই সত্তা, যিনি পৃথিবীতে যা কিছু আছে তা তোমাদের জন্য সৃষ্টি করেছেন।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ২৯)
আরও বলা হয়েছে, ‘আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীতে যা কিছু আছে, তা সবই তিনি নিজের পক্ষ থেকে তোমাদের কাজে লাগিয়ে রেখেছেন। নিশ্চয়ই এর মধ্যে বহু নিদর্শন আছে সেসব লোকের জন্য, যারা চিন্তাভাবনা করে।’ (সুরা জাসিয়াহ, আয়াত: ১৩)
বস্তু ও জড়জগতের ওপর মানুষকে যে কতৃত্ব ও প্রভাব দান করা হয়েছে, সেটা তুলে ধরে এই দুটি আয়াত। পবিত্র কোরআনের এই বক্তব্য পরোক্ষভাবে একটা দার্শনিক অলৌকিকতা বলেও গণ্য করা যায়। কারণ, আধুনিক যুগের আগে এমন বক্তব্য কোথাও পাওয়া যায় না।
প্রাচীন ও মধ্যযুগে মহাবিশ্বকে রহস্যময় ও ভীতিজনক সত্তা হিসেবে বিবেচনা করা হতো। মহাবিশ্বকে মানুষ আপন কর্তৃত্বের অধীন না ভেবে নিজেদের মহাবিশ্বের অধীন ভাবত। সবকিছুকেই পবিত্র দেবতা বা দেবদূত ভেবে অর্চনা-উপাসনা করত।
বর্তমানে মানুষ নিজ প্রয়োজনে ও কর্তৃত্বের অধীনে বিশ্বজগৎকে বশীভূত করেছে। তাই নির্দ্বিধায় বলা যায়, এই অগ্রগতির সূচনার বহু আগেই ইসলাম এর তাত্ত্বিক ভিত্তি দাঁড় করে দিয়েছে।
প্রকৃতি রক্ষায় মহানবী (সা.)–এর যত্ন ও উদ্যোগএই কোরআনি দৃষ্টিভঙ্গির আলোকেই আল্লাহর নবী (সা.) বলেছেন, ইসলামে কোনো বৈরাগ্যবাদ নেই। (মুসান্নাফ, আবদুর রাজ্জাক, ১৫৮৬০)
কারণ, বৈরাগ্যবাদ আধ্যাত্মিক মানুষকে নিজ মুক্তি ও নির্বাণ নিয়ে ব্যস্ত থাকতে শেখায়। তারা মঠ, গির্জা, গুহা ও কুঠুরিতে নির্জনবাস গ্রহণ করে। জগৎ ও মহাবিশ্বের কথা ভুলে যায়। এর পরিণামে জগতের কর্তৃত্ব ও নেতৃত্ব চলে যায় এমন লোকদের হাতে, যাদের মৌলিক লক্ষ্য পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করা।
ইসলাম আগমনের আগে খ্রিষ্টানদের মধ্যে যে বৈরাগ্যবাদ প্রচলিত ছিল, তা সম্পর্কেও কোরআন মন্তব্য করেছে।
আল্লাহ বলেন, ‘আর বৈরাগ্যবাদের যে বিষয়টা, তা তারা নিজেরাই উদ্ভাবন করেছিল। আমি তাদের ওপর তা বাধ্যতামূলক করিনি। বস্তুত তারা (এর মাধ্যমে) আল্লাহর সন্তুষ্টি বিধানই করতে চেয়েছিল, কিন্তু তারা তা যথাযথভাবে পালন করেনি। তাদের মধ্যে যারা ইমান এনেছিল, তাদেরকে আমি তাদের প্রতিদান দিয়েছিলাম। আর তাদের বহুসংখ্যক হয়ে থাকল অবাধ্য।’ (সুরা হাদিদ, আয়াত: ২৭)
আল্লাহ মানুষকে বিচিত্র প্রবৃত্তি দিয়ে সৃষ্টি করেছেন যেন সে এগুলোর ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারে এবং সেগুলোকে উচ্চতর আদর্শের দিকে পরিচালিত করতে পারে।
আভিধানিক অর্থে রাহবানিয়াহ (বৈরাগ্যবাদ) হলো, আল্লাহকে ভয় করা ও তাঁর প্রতি অনুগত থাকা। এটা নিশ্চয় একটা কাঙ্ক্ষিত গুণ। কিন্তু কথিত সন্ন্যাসী ও ও বৈরাগীরা এর অপব্যবহার করেছে।
এর বিপরীতে, দুনিয়া ও আখেরাত, জাগতিক ও পারলৌকিক, জৈবিক ও আত্মিক সমন্বয় সাধনের যে পথ ইসলাম দেখিয়েছে, সেটাই মানবীয় স্বভাব ও ফিতরতের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ।
মানুষের প্রবৃত্তি-আকাঙ্ক্ষা ও প্রাকৃতিক শক্তিগুলোকে আল্লাহ নিরর্থক সৃষ্টি করেননি। আল্লাহ মানুষকে বিচিত্র প্রবৃত্তি দিয়ে সৃষ্টি করেছেন যেন সে এগুলোর ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারে এবং সেগুলোকে উচ্চতর আদর্শের দিকে পরিচালিত করতে পারে।
কঠোর কৃচ্ছ্রসাধনের আধ্যাত্মিকতা এবং লাগামহীন ভোগ-বিলাসের বস্তুবাদের মধ্যবর্তী এই ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থানটি মানব ও সমাজজীবনের জন্য অপরিহার্য। পৃথিবীতে বিদ্যমান শিক্ষা বা জীবন–দর্শনগুলোর মধ্যে ইসলাম ছাড়া আর কোথাও এই অনন্য ভারসাম্য, মধ্যপন্থা ও সমন্বয়ের দৃষ্টান্ত খুঁজে পাওয়া যায় না।
আবদুল্লাহিল বাকি : আলেম, লেখক ও সফটওয়্যার প্রোগ্রামার