আপনার হজ কবুল হয়েছে কি না বুঝবেন যেভাবে
· Prothom Alo

কোনো মুমিন ব্যক্তি যখন তার সঞ্চয় ও শ্রম বিলিয়ে দিয়ে আল্লাহর সন্তুষ্টির আশায় বায়তুল্লাহর মুসাফির হন, তখন কবুল হজই তাঁর মূল লক্ষ্য হয়ে থাকে। মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘কবুল হজের প্রতিদান জান্নাত ছাড়া আর কিছুই নয়।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১৭৭৩)
কবুল হজকে হাদিসে বলা হয়েছে ‘হজে মাবরুর’। যদিও হজ কবুল হওয়া বা না হওয়া সম্পূর্ণভাবে আল্লাহ-তাআলার এখতিয়ারভুক্ত এবং বান্দা আল্লাহর প্রতি সুধারণা রেখে পূর্ণ বিশ্বাস ও দৃঢ়তার সঙ্গে হজ পালন করবে, তবে হজ যদি আল্লাহর দরবারে কবুল হয়, তবে বাহ্যিকভাবে জীবনে ইতিবাচক কিছু লক্ষণ প্রকাশ পায়:
Visit afrikasportnews.co.za for more information.
১. ইমান-আমলে দৃঢ়তা
হজ কবুল হওয়ার প্রধান আলামত হলো, হজের পর ইমান ও নেক আমলের প্রতি দৃঢ়তা বৃদ্ধি পাওয়া। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেন, ‘আর যারা আমার পথে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালায়, অবশ্যই আমি তাদেরকে আমার পথে পরিচালিত করব। নিশ্চয় আল্লাহ সৎকর্মপরায়ণদের সঙ্গে আছেন।’ (সুরা আনকাবুত, আয়াত: ৬৯)
২. আখিরাতমুখী মনোভাব
আরেকটা লক্ষণ হলো হাজির অন্তরে পার্থিব বিষয়ের প্রতি অনীহা এবং পরকালের প্রতি প্রবল আগ্রহ সৃষ্টি হওয়া। তাবেয়ি হাসান বসরি (রহ.)-কে ‘হজে মাবরুর’ কী জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেছিলেন, ‘হজ থেকে ফেরার পর দুনিয়ার প্রতি অনীহা তৈরি হওয়া এবং আখিরাতের প্রতি আগ্রহ বৃদ্ধি পাওয়া।’ (ইমাম নববি, শারহুন নাবাবি আলা সহিহ মুসলিম, ৯/১১৯, দারু ইহয়ায়িত তুরাসিল আরাবি, বৈরুত, ১৯৯৪)
রবের আঙিনায় দাসের সমর্পণ৩. পাপ পরিত্যাগ
হজপূর্ব জীবনের পাপ ও অন্যায় কাজ—যেমন সুদ, ঘুষ, মিথ্যা, গিবত—থেকে সম্পূর্ণ বিমুক্ত থাকা হজ কবুলের বড় প্রমাণ। পাশাপাশি হাজির অন্তরে এক অভূতপূর্ব কোমলতা ও নম্রতা সৃষ্টি হয়।
৪. বিনয়ী থাকা
বিশাল কোনো ইবাদত সম্পন্ন করার পরও নিজের মধ্যে আত্মতৃপ্তি না এনে আল্লাহর দরবারে তা কবুল হলো কি না, তা নিয়ে সর্বদা চিন্তিত ও বিনীত থাকা প্রকৃত মুমিনের বৈশিষ্ট্য।
৫. ভালো কাজে প্রতিযোগিতা কর
নামের আগে ‘হাজি’ পদবি ছড়িয়ে দেওয়ার মতো লোকদেখানো ভাব (রিয়া) ও অহংকার থেকে বেঁচে থাকা এবং ভালো কাজে প্রতিযোগিতা করা মকবুল হজের আলামত। (ইবনে হাজার আসকালানি, ফাতহুল বারি, ৩/৪৪৬, দারুল মারিফাহ, বৈরুত, ১৩৭৯ হি.)
৬. দান-সদকার আধিক্য
হজ থেকে ফেরার পর জামাতের সঙ্গে নামাজ পড়ার যত্নবোধ বাড়ে এবং বেশি বেশি দান-সদকা করার মানসিকতা তৈরি হয়। রাসুল (সা.)-কে হজের পুণ্য সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেছিলেন, ‘ক্ষুধার্তকে অন্ন দেওয়া এবং সালামের প্রসার ঘটানো।’ (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস: ১৪৪৮২)
কেন শক্তিশালী মুমিন আল্লাহর বেশি প্রিয়৭. আল্লাহর ওপর ভরসা রাখা
হাজির জীবনে আল্লাহর প্রতি তাওয়াক্কুল প্রবলভাবে প্রকাশ পায়। কোরআনে আল্লাহ বলেন, ‘আর যে ব্যক্তি আল্লাহর ওপর ভরসা করে, আল্লাহই তার জন্য যথেষ্ট।’ (সুরা তালাক, আয়াত: ৩)
এ ব্যাপারে রাসুল (সা.) পাখির রিজিকের উদাহরণ দিয়ে যথাযথভাবে আল্লাহর ওপর ভরসা করার গুরুত্ব বুঝিয়েছেন। (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২৩৪৪)
৮. আল্লাহর স্মরণ বৃদ্ধি পাওয়া
হজের আমল শেষ করার পর আল্লাহ-তাআলা জিকিরের নির্দেশ দিয়ে বলেন, ‘অতঃপর যখন তোমরা (হজের) যাবতীয় কাজ সম্পন্ন করে নেবে, তখন (মিনায়) এমনভাবে আল্লাহর স্মরণ (জিকির) করবে, যেমন তোমরা তোমাদের পিতৃপুরুষদের স্মরণ করতে অথবা তার চেয়েও বেশি গভীরভাবে।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ২০০)
৯. সত্য গ্রহণের মানসিকতা হজপরবর্তী জীবনে ইসলামের বিষয়ে সঠিক জ্ঞান আহরণের আগ্রহ বহুগুণ বৃদ্ধি পায় এবং নিজেকে আরও পরিশুদ্ধ করার এক ব্যাকুলতা তৈরি হয়।
১০. ইসলাম প্রতিষ্ঠার আগ্রহ
একজন হাজির লক্ষ্য শুধু ব্যক্তিগত ইবাদতে সীমাবদ্ধ থাকে না; তিনি পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনের সর্বস্তরে ইসলামের সুমহান বিধি-বিধান প্রতিষ্ঠার জন্য সচেষ্ট হন এবং সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধের প্রতীক হয়ে ওঠেন।
হজ একজন মানুষের আত্মিক পুনর্জন্ম। হজের আগের জীবন আর হজের পরের জীবনের মাঝে ইতিবাচক পরিবর্তন বজায় রাখাই হলো হজের প্রকৃত সার্থকতা।
ইলিয়াস মশহুদ: আলেম ও ধর্মীয় গবেষক