ট্রাম্প যেভাবে ইরানের স্বার্থে কাজ করছেন!
· Prothom Alo

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যে যুদ্ধবিরতির খবর সামনে এসেছে, তা মূলত প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের একধরনের হতাশার প্রতিফলন। তিনি যে জটিল সংঘাতে নিজেই জড়িয়ে পড়েছিলেন, সেখান থেকে বেরিয়ে আসার পথ খুঁজছেন এখন। যুদ্ধের শুরুতে যেসব লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের কথা তিনি বলেছিলেন, সেগুলো এখন আর নেই বললেই চলে।
নতুন চুক্তিতে যা পাওয়া গেছে বলে জানা যাচ্ছে, তা হলো হরমুজ প্রণালি আবার চালু করার প্রতিশ্রুতি (যা যুদ্ধের আগেই চালু ছিল) এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু করার পরিকল্পনা, যা আগেও চলছিল।
Visit betsport.cv for more information.
কিন্তু এই সীমিত লক্ষ্যগুলোও অর্জন করা কঠিন হয়ে পড়তে পারে, যদি ইসরায়েল লেবাননে হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে তাদের অভিযান চালিয়ে যেতে থাকে।
ট্রাম্প ইতিমধ্যে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ওপর বিরক্ত। ২০১৮ সালে ইরানের সঙ্গে করা পারমাণবিক চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে বেরিয়ে আসার পরামর্শ দিয়েছিলেন নেতানিয়াহুই। সেই চুক্তিটি হয়েছিল প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার সময় এবং ট্রাম্পকে তখন নেতানিয়াহু বলেছিলেন, এর চেয়ে ভালো একটি চুক্তি তিনি করে দেখাবেন।
শুধু তা–ই নয়, নেতানিয়াহুই ট্রাম্পকে বর্তমান যুদ্ধে নামতে উৎসাহিত করেছিলেন। তাঁর ধারণা ছিল, বিশ্বের দুই শক্তিশালী বিমানবাহিনী খুব দ্রুত ইরানের সামরিক ও পারমাণবিক স্থাপনাগুলো ধ্বংস করে দেবে এবং সেই সঙ্গে বহুদিনের প্রতিপক্ষ সরকারকেও সরিয়ে দেবে। কিন্তু এখন পরিস্থিতি উল্টো। এই যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসতে চাইলে নেতানিয়াহুই হয়ে উঠেছেন ট্রাম্পের জন্য বড় বাধা।
আসলে ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর লক্ষ্য কখনোই পুরোপুরি এক ছিল না। ট্রাম্প হয়তো ইরানের ‘নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ’ শুনতে পছন্দ করতেন, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধে জড়ানোর ইচ্ছা তাঁর ছিল না। শেষ পর্যন্ত তিনি এমন একটি পারমাণবিক চুক্তি পেলেই সন্তুষ্ট থাকতেন, যা ওবামার চুক্তির চেয়ে ভালো বলে দেখানো যায়।
কিন্তু ইসরায়েলের জন্য বিষয়টি ভিন্ন। তাদের কাছে ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হুমকি এবং ইরাক, লেবানন, ফিলিস্তিন ও ইয়েমেনে থাকা মিত্র গোষ্ঠীগুলোর প্রতি ইরানের সমর্থন—এই দুটি বিষয় একেবারেই অগ্রহণযোগ্য। সমস্যা হলো, এই দুটি ক্ষেত্রে ইরান কোনো আপস করতে রাজি নয়। পারমাণবিক অস্ত্র না থাকলেও ক্ষেপণাস্ত্র ও আঞ্চলিক মিত্র গোষ্ঠীগুলোকে তারা নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য অপরিহার্য মনে করে।
শেষ পর্যন্ত যা-ই ঘটুক, ট্রাম্প ও নেতানিয়াহু ইতিহাসের বিচারের হাত থেকে রেহাই পাবেন না। ইরানকে ঘিরে তাঁদের এই যুদ্ধ কৌশলগতভাবে এক বড় ব্যর্থতা হিসেবে বিবেচিত হবে। দুই সামরিক পরাশক্তি মিলেও একটি দুর্বল, অর্থনৈতিকভাবে বিপর্যস্ত দেশের কাছে কার্যত পরাস্ত হয়েছে।
এ প্রেক্ষাপটে লেবানন হয়ে উঠেছে সবচেয়ে স্পর্শকাতর জায়গা। ইসরায়েল সেখানে ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহকে ধ্বংস করার চেষ্টা করছে। গত তিন বছর ধরে উত্তর ইসরায়েল হিজবুল্লাহর হামলার মুখে রয়েছে। তাই ইসরায়েল ঘোষণা দিয়েছে, যত দিন প্রয়োজন তারা দক্ষিণ লেবাননে অবস্থান করবে। যুক্তরাষ্ট্র কী বলছে, তা তারা বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে না। এমনকি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান যখন যুদ্ধবিরতির চূড়ান্ত পর্যায়ে, তখনই ইসরায়েল বৈরুতে বিমান হামলা চালায়।
এ হামলা পুরো চুক্তিকেই ভেস্তে দিতে পারত। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় স্পষ্ট করে বলেছে, লেবাননে ইসরায়েলের হামলা বন্ধ না হলে কোনো যুদ্ধবিরতি বা চূড়ান্ত চুক্তি সম্ভব নয়। যদি ইসরায়েল আক্রমণ চালিয়ে যায়, তাহলে ইরানও পাল্টা আঘাত হানবে। ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর কুদস ফোর্সের প্রধান সম্প্রতি বলেছেন, ‘লেবাননের প্রতিরোধকে সমর্থন করা আমাদের সবার দায়িত্ব এবং অঞ্চল থেকে ইসরায়েলকে সরিয়ে দেওয়া সম্ভব।’
তবে এমন কথায় নেতানিয়াহু পিছিয়ে যাবেন না। তিনি জানেন, ইরান এই যুদ্ধে কিছু কৌশলগত সুবিধা পেলেও তাদের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা সীমিত। ইসরায়েলের বিমানবাহিনী আবার বড় আকারে হামলা চালালে, বিশেষ করে বেসামরিক অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলা চালালে ইরানের অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়বে।
কিন্তু ইসরায়েলের জন্য বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়াতে পারেন ট্রাম্প নিজেই। ইরান নিয়ে এই জটিলতায় তাঁর জনপ্রিয়তা কমে গেছে, ব্যক্তিগত প্রদর্শনীমূলক আয়োজনগুলো থেকেও তিনি মনোযোগ হারিয়েছেন এবং দ্রুত কোনো ‘বিজয়’ দেখানোর সুযোগও পাচ্ছেন না। ফলে তিনি এই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে ইসরায়েলের স্বার্থ বিসর্জন দিতেও প্রস্তুত।
ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স যেমন বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের অনেক মিল থাকলেও কিছু ক্ষেত্রে তাদের স্বার্থ আলাদা। আর যুক্তরাষ্ট্রের মূল লক্ষ্য হলো—ইরান যেন পারমাণবিক অস্ত্র না পায়।
এই যুক্তিতে ট্রাম্প নিজেকে সফল চুক্তিকারক হিসেবে তুলে ধরতে পারেন। তবে এর জন্য ইসরায়েলকে তাঁর পথে চলতে হবে। তিনি এতটাই চাপ সৃষ্টি করছেন যে সাম্প্রতিক এক ফোনালাপে নেতানিয়াহুকে তিনি কঠোর ভাষায় তিরস্কারও করেছেন। এমনকি তিনি বলেছেন, তাঁর সহায়তা না থাকলে নেতানিয়াহু জেলেও থাকতে পারতেন। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে ট্রাম্প এখন ইরানের কর্মকর্তাদের প্রতিও নেতানিয়াহুর চেয়ে বেশি সম্মান দেখাচ্ছেন বলে মনে হয়।
এ অবস্থায় যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সম্পর্কের অবনতির চেয়ে বড় প্রমাণ আর কিছু হতে পারে না। ট্রাম্প স্পষ্ট করে দিচ্ছেন—চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত তিনিই নেবেন, নেতানিয়াহুর সেই সিদ্ধান্ত মেনে নেওয়া ছাড়া উপায় নেই, তা ইসরায়েলের নিরাপত্তার জন্য অনুকূল হোক বা না হোক। একসময়ের অভিন্ন মূল্যবোধের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা দুই দেশের সম্পর্ক এখন যেন পরিণত হয়েছে দুই নেতার স্বার্থসংশ্লিষ্ট সমঝোতায়, যেখানে একজন প্রভু আর অন্যজন অনুগত।
শেষ পর্যন্ত যা-ই ঘটুক, ট্রাম্প ও নেতানিয়াহু ইতিহাসের বিচারের হাত থেকে রেহাই পাবেন না। ইরানকে ঘিরে তাঁদের এই যুদ্ধ কৌশলগতভাবে এক বড় ব্যর্থতা হিসেবে বিবেচিত হবে। দুই সামরিক পরাশক্তি মিলেও একটি দুর্বল, অর্থনৈতিকভাবে বিপর্যস্ত দেশের কাছে কার্যত পরাস্ত হয়েছে।
বরং ইরানই এই যুদ্ধের পর মধ্যপ্রাচ্যের নতুন ভূরাজনীতিতে শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে। নতুন যুদ্ধবিরতিও সেই অবস্থানকে আরও মজবুত করেছে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট এখন লেবাননের রক্ষকের ভূমিকায়, আর তা পরোক্ষভাবে ইরানেরই স্বার্থ রক্ষা করছে।
শ্লোমো বেন-আমি ইসরায়েলের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী।
স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট ইংরেজি থেকে অনূদিত