কৃষকের হাতের নাগালে দুই হাজার ছোট হিমাগার বানাবে সরকার
· Prothom Alo

জেলা বা উপজেলা পর্যায়ে বড় হিমাগার করলে তা কৃষকের খেত থেকে ২৫ থেকে ৩০ মাইল দূরে পড়ে। এতে কৃষকের তেমন উপকার হয় না। তাই বর্তমান সরকার আগামী এক থেকে দুই বছরের মধ্যে দেশে দুই হাজার ছোট হিমাগার তৈরির পরিকল্পনা নিয়েছে।
এই ছোট হিমাগারগুলো কৃষকের ঘরের কাছে বা মাঠের পাশেই তৈরি হবে।
Visit rouesnews.click for more information.
আজ সোমবার রাজধানীর বনানীতে এক অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এই তথ্য জানান মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ এবং কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ।
কৃষি খাত নিয়ে বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন ‘বাংলাদেশের কৃষি-খাদ্য ব্যবস্থায় প্রবৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থানের জন্য কৃষি খাতে সরকারি ব্যয়ের পুনর্বিন্যাস’ প্রকাশ উপলক্ষে এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানের যৌথ আয়োজক হিসেবে ছিল সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং (সানেম)।
মন্ত্রী আরও জানান, ক্ষুদ্র হিমাগারগুলো চালানোর জন্য ২০ জন কৃষকের সমন্বয়ে একটি করে কমিটি গঠন করা হবে। এই হিমাগারগুলো সম্পূর্ণ সৌরবিদ্যুৎ (সোলার পাওয়ার) দিয়ে চলবে।
সরকারের পক্ষ থেকে এই প্রজেক্টের পাইলটিং (পরীক্ষামূলক কাজ) এর মধ্যে শেষ হয়েছে বলেও জানান মন্ত্রী। এই পরীক্ষায় ভালো ফলও এসেছে বলেন তিনি।
সরকার মনে করে, দুই হাজার ক্ষুদ্র হিমাগার তৈরি হলে দেশের প্রায় ৪০ হাজার কৃষক সরাসরি উপকৃত হবেন। কৃষকের কোনো পরিবহন খরচ লাগবে না এবং ফসলের কোনো অপচয় হবে না।
দেশের ৭৫ ভাগ মানুষের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে কৃষিকে শক্তিশালী করার ওপর তাগিদ দেন কৃষিমন্ত্রী। তিনি বলেন, জমির স্বল্পতার কারণে চাল বা গম আমদানি করতে হলেও অন্যান্য কৃষিপণ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনে বাস্তবমুখী পদক্ষেপ নিচ্ছে সরকার। আগামী এক থেকে দেড় বছরের মধ্যে পেঁয়াজ এবং তিন বছরের মধ্যে আদা ও পেঁয়াজ বীজে দেশ স্বয়ংসম্পূর্ণ হবে।
কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে উৎপাদন ও চাহিদার তথ্য মেলানোর চেষ্টা চলছে বলেও জানান মন্ত্রী।
দেশের মাটির অম্লতা আদর্শ মাত্রায় আনার কাজ চলছে বলেও জানান মন্ত্রী। এটি সফল হলে সারের ব্যবহার ২৭ থেকে ৩০ শতাংশ কমবে এবং সরকারের বিপুল অর্থ সাশ্রয় হবে বলেন তিনি । এ ছাড়া ডিজেল ও বিদ্যুতের ঘাটতি মেটাতে গভীর ও অগভীর নলকূপগুলোকে সৌরবিদ্যুতে রূপান্তর করা হচ্ছে, যা সেচ মৌসুম শেষে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ করবে।
মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ বলেন, বিশ্বব্যাংকসহ অংশীজনদের সহযোগিতায় এসব বাস্তবমুখী পরিকল্পনা বাস্তবায়নের মাধ্যমে দেশের কৃষি খাতের আমূল পরিবর্তন সম্ভব হবে।
অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বিশ্বব্যাংকের জ্যেষ্ঠ মনসুর আহমেদ এবং গবেষণা বিশ্লেষক জোনায়েদ সোহল। বাংলাদেশের কৃষি খাতে অতীত সাফল্য এলেও এখন তা বড় সংকটে পড়েছে উল্লেখ করে তারা বলেন, সারের অতিরিক্ত ব্যবহারে মাটির গুণাগুণ নষ্ট হচ্ছে এবং ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নামছে।
২০১০ সালের পর থেকে এই খাতের উৎপাদনশীলতা ও প্রবৃদ্ধির গতি শ্লথ হয়ে গেছে জানিয়ে তাঁরা বলেন, বর্তমানে কৃষি বাজেটের সিংহভাগ ও প্রায় আড়াই বিলিয়ন ডলারের সার ভর্তুকি মূলত একটিমাত্র ফসল বা চালের পেছনে ব্যয় হচ্ছে। অথচ মানুষের খাদ্যতালিকায় এখন ফলমূল, শাকসবজি ও মাছ-মাংসের চাহিদা বাড়ছে।
বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়, বর্তমান ব্যয় নীতি কৃষির বহুমুখীকরণ ও রপ্তানি বাড়াতে পারছে না। তাই ভর্তুকি না কমিয়ে তা আরও কার্যকর ও স্মার্ট উপায়ে পুনর্বিন্যাস করা জরুরি। গবেষণা, সেচ ও নতুন প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ বাড়িয়ে জলবায়ু ঝুঁকিতে থাকা উপকূলীয় অঞ্চলকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। তবেই কৃষিতে টেকসই প্রবৃদ্ধি ও নতুন কর্মসংস্থান নিশ্চিত হবে।
অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন বাংলাদেশ ও ভুটানের জন্য বিশ্বব্যাংক নিযুক্ত ডিভিশন ডিরেক্টর জ্যঁ পেম। তিনি বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতিতে কৃষি খাতের অবদান অপরিসীম হলেও সম্প্রতি এর উৎপাদনশীলতা থমকে গেছে। মোট কৃষি বাজেটের ৮০ শতাংশই চলে যাচ্ছে সারের ভর্তুকিতে, যা ধনী কৃষকদের পকেটে চলে যাচ্ছে। ফলে গবেষণা ও সেচ অবকাঠামোর মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলো অর্থায়নের অভাবে ভুগছে।
বিশ্বব্যাংকের মতে, বাংলাদেশের কৃষি এখন বহুমুখী সংকটে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় ঢালাও ভর্তুকি থেকে বেরিয়ে এসে স্মার্ট ও সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা প্রয়োজন বলেন তিনি।
অনুষ্ঠানে একটি প্যানেল আলোচনার আয়োজন করা হয়। আলোচনার সঞ্চালনা করেন বিশ্বব্যাংকের রিজিওনাল প্র্যাকটিস ডিরেক্টর দিনা উমালি-ডেইনিঞ্জার। আলোচক হিসেবে ছিলেন সানেমের নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান। খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) বাংলাদেশের কান্ট্রি রিপ্রেজেন্টেটিভ জিয়াওকুন শি, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের (বিআইডিএস) রিসার্চ ডিরেক্টর মোহাম্মদ ইউনুস এবং প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের ডিরেক্টর উজমা চৌধুরী।
দেশের অর্থনীতি বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের খাদ্যাভ্যাস চাল থেকে ফলমূল, মাছ ও প্রক্রিয়াজাত খাবারের দিকে ঝুঁকছে বলে উল্লেখ করেন আলোচকেরা। তাঁরা মত দেন, এই বাস্তবতায় স্বল্প মেয়াদে কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা এবং দীর্ঘ মেয়াদে কৃষির বহুমুখীকরণ জরুরি।
অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন সানেমের কমিউনিকেশন অ্যাসোসিয়েট ফাহমিদা ফারজানা।