ছুটির পর অফিস: শরীর ফিরলেও মন কি ফিরেছে

· Prothom Alo

ঈদের ছুটি শেষে আবারও শুরু হয়ে গেছে পুরোদমে কর্মব্যস্ত জীবন। কয়েক দিন আগেও বাড়ির উঠানে আত্মীয়স্বজনের আড্ডা, রান্নাঘরে উৎসবের ব্যস্ততা, বন্ধুদের সঙ্গে রাতজাগা গল্প কিংবা গ্রামের নিস্তব্ধ বিকেল—সব মিলিয়ে জীবন যেন অন্য এক ছন্দে চলছিল। হঠাৎই সেই ছন্দ যেন থেমে গিয়েছে। আবার ভোরের অ্যালার্ম, যানজট, অফিসের সময়সীমা, মিটিং আর ই-মেইলের ভিড়ে ফিরতে হয়েছে। শরীর অফিসে ফিরলেও অনেকের মন এখনো রয়ে গেছে ছুটির দিনগুলোতে।

ঈদের ছুটির পর অফিসে এসে কাজে মন না বসার অভিজ্ঞতা নতুন কিছু নয়। এটি এতটাই সাধারণ যে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এ নিয়ে গবেষণাও হয়েছে। মনোবিজ্ঞানীরা একে অনেক সময় ‘পোস্ট-ভ্যাকেশন ব্লুজ’ বলে উল্লেখ করেন। অর্থাৎ দীর্ঘ বিরতি শেষে স্বাভাবিক কর্মজীবনে ফিরে আসার সময় একধরনের অনীহা, ক্লান্তি বা মানসিক শূন্যতা তৈরি হওয়া।

Visit biznow.biz for more information.

উৎসবের উচ্ছ্বাস থেকে বাস্তবতার মেঝেতে
ঈদ কেবল একটি ধর্মীয় উৎসব নয়; বাংলাদেশে এটি সামাজিক পুনর্মিলনেরও বড় উপলক্ষ। বছরের ব্যস্ত সময়সূচির ফাঁকে মানুষ এই ছুটিতে পরিবারকে সময় দেয়, নিজের মতো করে দিন কাটায়। অনেকে দীর্ঘ ভ্রমণে যান, কেউবা গ্রামের বাড়িতে কয়েকটি নিশ্চিন্ত দিন কাটান।

এ সময়ে মানুষের দৈনন্দিন রুটিন বদলে যায়। ঘুমানোর সময় পিছিয়ে যায়, সকালে দেরিতে ঘুম ভাঙে, কাজের চাপ থাকে না বললেই চলে। ফলে মস্তিষ্কও একটি আরামদায়ক ছন্দে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। ছুটি শেষে যখন আবার নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করার চাপ আসে, তখন সেই পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে কিছুটা সময় লাগে।

স্মৃতি কি আশীর্বাদ, নাকি বোঝা

কাজে মন বসে না কেন
বিশেষজ্ঞদের মতে, এর পেছনে কয়েকটি কারণ কাজ করে।
প্রথমত, দীর্ঘ ছুটির সময় মানুষ মানসিকভাবে চাপমুক্ত থাকে। কাজের লক্ষ্য, সময়সীমা কিংবা প্রতিযোগিতার চাপ থেকে সাময়িক মুক্তি পাওয়া মস্তিষ্ককে আরাম দেয়। ফলে হঠাৎ সেই চাপের পরিবেশে ফিরতে গেলে একধরনের প্রতিরোধ তৈরি হয়।

দ্বিতীয়ত, ছুটির সময় ঘুম ও খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন আসে। অনেকেই রাত জেগে আড্ডা দেন বা সিরিজ দেখেন। ফলে অফিসে ফিরে প্রথম কয়েক দিন শরীরের জৈবঘড়ি আগের অবস্থায় ফিরতে সময় নেয়।

তৃতীয়ত, ঈদের ছুটির সঙ্গে আবেগের একটি সম্পর্কও রয়েছে। পরিবারের সদস্যদের ছেড়ে আবার কর্মস্থলে ফিরে আসা অনেকের জন্য মানসিকভাবে কঠিন হতে পারে। বিশেষ করে যাঁরা পরিবারের কাছ থেকে দূরে থাকেন, তাঁদের মধ্যে এই অনুভূতি বেশি দেখা যায়।

অফিসে প্রথম দিন: উৎপাদনশীলতার চেয়ে মানিয়ে নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ
বিশেষজ্ঞরা বলেন, ঈদের ছুটি শেষে প্রথম দিনেই শতভাগ উৎপাদনশীল হওয়ার চেষ্টা না করাই ভালো। কয়েক দিনের বিরতির পর মস্তিষ্ককে আবার কর্মমুখী হতে সময় দিতে হয়। অনেক প্রতিষ্ঠান এখন বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে। কিছু প্রতিষ্ঠানে ছুটির পরের দিন তুলনামূলক হালকা কাজের সূচি রাখা হয়। কোথাও আবার টিম মিটিংয়ের মাধ্যমে ধীরে ধীরে কাজ শুরু করা হয়।

মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞদের মতে, কর্মীদের ওপর অযথা চাপ সৃষ্টি না করে যদি ধাপে ধাপে কাজে ফেরার সুযোগ দেওয়া যায়, তাহলে উৎপাদনশীলতা দ্রুত ফিরে আসে।

শুধু কর্মীর নয়, প্রতিষ্ঠানেরও বাস্তবতা
ঈদের পর অফিসে মন না বসা নিয়ে প্রায়ই হাস্যরস হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখা যায়, ‘শরীর অফিসে, মন এখনো গ্রামে’ ধরনের নানা মন্তব্য। কিন্তু এর পেছনে বাস্তব একটি মানবিক দিক রয়েছে।

একজন কর্মী কেবল একটি পদবি নয়; তিনি একই সঙ্গে পরিবারের সদস্য, বন্ধু, সন্তান কিংবা অভিভাবক। ঈদের মতো উৎসব সেই সম্পর্কগুলোকে নতুন করে জীবন্ত করে তোলে। তাই উৎসব শেষে কর্মজীবনে ফিরে এসে সাময়িক অনীহা তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়।

ধীরে ধীরে ফিরে আসে পুরোনো ছন্দ
এই অনীহা সাধারণত দীর্ঘস্থায়ী হয় না। অফিসে দু-তিন দিন কাটার পরই বেশির ভাগ মানুষ আবার আগের কর্মছন্দে ফিরে আসেন। জমে থাকা কাজ কমতে থাকে, নতুন লক্ষ্য সামনে আসে, ব্যস্ততা আবার জীবনের কেন্দ্র দখল করে নেয়।

তবু ঈদের পর অফিসের প্রথম কয়েকটি দিন যেন এক বিশেষ সময়। ডেস্কে বসে কাজ করতে করতে হঠাৎ মনে পড়ে যায় গ্রামের বাড়ির উঠান, মায়ের হাতের রান্না, কিংবা বন্ধুদের সঙ্গে শেষ রাতের আড্ডার কথা। মন কিছুটা পেছনে ফিরে তাকায়। কারণ, মানুষ কেবল কাজের জন্য বাঁচে না; সম্পর্ক, স্মৃতি আর উৎসবও তার জীবনের অংশ। তাই ঈদের ছুটি শেষে অফিসে এসে কাজে মন না বসা কখনো কখনো অলসতার লক্ষণ নয়, বরং মানুষের ভেতরে রয়ে যাওয়া উৎসবের উষ্ণতারই এক নীরব প্রকাশ।

Read full story at source