‘এই ডালিই অ্যাকুন আমার ব্যাটা, ডালিই আমার মা-বাপ’
· Prothom Alo

দুপুরের রোদে খাঁ খাঁ করছে রাজশাহী নগরের খানসামার চক সড়ক। প্রচণ্ড গরমে ঘরের বাইরে দাঁড়ানোই দায়। এর মধ্যেই মাথায় সবজিভর্তি ডালি নিয়ে হাঁটছেন এক নারী। এক হাত দিয়ে পিঠের ওপরে একটা ব্যাগ ধরা। আরেক হাতে আরও কিছু জিনিসসহ ডালিটি ধরে আছেন।
ওই নারীর নাম আনোয়ারা খাতুন (৫৫); বাড়ি নাটোরের বাগাতিপাড়া উপজেলার সরাপপুর গ্রামে। প্রায় ৫০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে তিনি রাজশাহী শহরে সবজি বিক্রি করতে আসেন। স্বামী নেই, ছেলের সঙ্গেও সম্পর্ক নেই। কিন্তু ছেলের জন্য নেওয়া ঋণের কিস্তি এখনো তাঁকেই পরিশোধ করতে হয়। তাই মাথার ডালিটাই তাঁর জীবনের অবলম্বন।
Visit newsbetting.club for more information.
পরিবারের কথা উঠতেই আনোয়ারা বলেন, ‘পরিবারে সব আচিলি। অ্যাকুন কেউ নেই।’ মাথা থেকে ডালিটি নামিয়ে একটু থেমে যোগ করেন, ‘এই ডালিই অ্যাকুন আমার ব্যাটা, ডালিই আমার মা-বাপ।’
কথায় কথায় জানা যায়, ছোটবেলায় মাকে হারিয়েছেন আনোয়ারা। বাবা ইয়ার উদ্দিন এখন দৃষ্টিশক্তিহীন। একই গ্রামের নাজিমুদ্দিনের সঙ্গে আনোয়ারার বিয়ে হয়েছিল। তাঁদের এক ছেলে ও এক মেয়ে। মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন। ছেলে স্নাতক (বিএ) পাস করেছে।
ছেলের জন্মের মাত্র সাত দিন পরই স্বামী তাঁদের ছেড়ে চলে যান। আনোয়ারা বলেন, সন্তান জন্মের সময় তিনি বাবার বাড়িতে ছিলেন। ছেলে হওয়ার খবর শুনে তাঁর স্বামী একবার দেখতে এসেছিলেন। এরপর আর কখনো খোঁজ নেননি। পরে তিনি আরেকটি বিয়ে করেন এবং বর্তমানে রাজশাহী শহরের দড়িখরবোনা এলাকায় দ্বিতীয় পক্ষের পরিবারের সঙ্গে থাকেন। ছেলের বয়স যখন মাত্র এক মাস, তখন থেকেই আনোয়ারা মাথায় সবজির ডালি তুলে নেন। সেই ডালিই এখনো তাঁর সঙ্গী।
হরেক রকমের সবজি পাওয়া যায় তাঁর ডালায়আক্ষেপ করে আনোয়ারা খাতুন বলেন, বিয়ের পর ছেলেও গড়েছেন আলাদা সংসার। তবে চাকরির জন্য যে ঋণ নিয়েছিলেন ছেলে, সেই বোঝা এখনো টানতে হচ্ছে তাঁকে।
একসময় ভোরের ডিজেল ট্রেনে প্রতিদিন রাজশাহীতে এসে সবজি বিক্রি করে দুপুরে আবার বাড়ি ফিরতেন আনোয়ারা। ট্রেনটি বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর তাঁর যাতায়াতে ভোগান্তি বাড়ে। এখন সন্ধ্যায় নাটোরের লোকমানপুর স্টেশন থেকে মহানন্দা এক্সপ্রেসে রাজশাহীতে আসেন। স্টেশনের পাশে মাসিক ১ হাজার ৩০০ টাকা ভাড়ায় একটি ছোট কক্ষ নিয়েছেন। সেখানে রাত কাটিয়ে ভোরে রাজশাহী নগরের মাস্টারপাড়া পাইকারি বাজার থেকে সবজি কেনেন। এরপর কুমারপাড়া এলাকায় বসে বিক্রি করেন। সবজি অবশিষ্ট থাকলে মহল্লায় মহল্লায় ঘুরে ফেরি করেন। বিকেলে ট্রেনে বাড়ি ফেরেন। সপ্তাহে এক দিন বাড়িতে থাকেন।
বাড়িতে এখন আনোয়ারার একমাত্র সঙ্গী ছোট বোন আয়মালা। সাংসারিক বিষয়গুলো ভালোভাবে বুঝতে না পারায় তাঁর বিয়ে হয়নি।
স্বামীর বিরুদ্ধে খোরপোশের মামলা করেছিলেন কি না জানতে চাইলে আনোয়ারা বলেন, তাঁর বাবা খুব সহজ-সরল মানুষ ছিলেন। তিনি বলেছিলেন, মামলা করলে হয়তো কিছুদিন খরচ পাওয়া যাবে, কিন্তু পরে অশান্তি বাড়বে। তাই নিজের মতো করেই জীবন চালিয়ে যেতে বলেছেন।
এক ক্রেতাকে পণ্য মেপে দিচ্ছেন আনোয়ারাআনোয়ারা বলেন, ছেলেকে স্নাতক পর্যন্ত পড়াতে অনেক কষ্ট হয়েছে। লেখাপড়ার খরচের জন্য একবার স্বামীর কাছে সাহায্য চাইতে গিয়েছিলেন। তখন তিনি বলেছিলেন, নিজেই চলতে পারেন না, টাকা দেবেন কোথা থেকে? এরপর আর কখনো স্বামীর কাছে হাত পাতেননি।
তবে আনোয়ারা খাতুনের জীবনের দুঃখ-দুর্দশা সেখানেই থেমে থাকেনি। অনেক সংগ্রাম করে ছেলেকে বড় করেছেন। ভেবেছিলেন, একসময় হয়তো দুঃখ ঘুচবে। কিন্তু ছেলের বউ তাঁকে মেনে নিতে পারেননি। দুই বছর ধরে স্ত্রীর সঙ্গে ছেলে শ্বশুরবাড়িতে থাকেন। তাঁদের সংসারে একটি ছেলেসন্তান আছে, বয়স সাত-আট বছর। নাতিকে দেখতে ইচ্ছে হলেও সেখানে যেতে পারেন না বলে দাবি করেন আনোয়ারা।
আনোয়ারার ভাষ্য, তাঁর সবচেয়ে বড় কষ্টের জায়গাটি ছেলেকে ঘিরেই। ছেলের চাকরির আশায় একটি এনজিও থেকে এক লাখ টাকা ঋণ নিয়েছিলেন। গরুর বাছুর ও ভ্যানগাড়ি বিক্রি করে সেই টাকাও ছেলের হাতে তুলে দেন। কিন্তু দুই বছর ধরে ছেলে তাঁর কোনো খোঁজ নেয় না। একটি ফোনও করেনি। অথচ সেই ঋণের সাপ্তাহিক ৭২০ টাকার কিস্তি এখনো পরিশোধ করে যাচ্ছেন আনোয়ারা খাতুন। মাথায় সবজির ডালি তুলে রাজশাহীর অলিগলিতে ঘুরে বেড়ান শুধু সেই দায় মেটাতে।
আলাপের এই পর্যায়ে চোখ ভিজে ওঠে আনোয়ারা। কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘ব্যাটাটাক আর চোকের দেকাও দেকতে পাইনি।’