ডাকাতেরা যখন মুখ চেপে ধরেছিল, তখন মনে মনে শুধু বলছিলাম, ‘আল্লাহ আমাকে অসম্মানিত কইরো না’
· Prothom Alo
রাজধানীর একটি স্কুলে শিক্ষকতা করছেন ইফফাত জেবীন। সম্প্রতি দিনের বেলায় তাঁর বাসায় রোমহর্ষক ডাকাতির ঘটনা ঘটে। সেই ঘটনাই পড়ুন তাঁর বয়ানে।
এই দরজা দিয়েই ডাকাতেরা ঘরে ঢুকে পড়েদিনটা ছিল ১১ মে। অন্যান্য দিনের মতোই মেয়েকে নিয়ে সকাল সাড়ে সাতটার মধ্যেই স্কুলের উদ্দেশে বের হয়ে যাই। ১৪ বছর ধরে রাজধানীর একটি স্কুলে শিক্ষকতা করছি। ছেলে সবে কিন্ডারগার্টেনে পড়ে, তাই স্কুলে যাওয়ার ব্যাপারে ওকে খুব একটা আমরা চাপ দিই না। সেদিনও সে বাসাতেই ছিল।
Visit newsbetting.club for more information.
নিজস্ব ছয়তলা ভবনের দোতলায় আমরা থাকি। পাশাপাশি দুটি ফ্ল্যাট। একটিতে আমরা, আরেকটিতে আমার শাশুড়ি থাকেন। শ্বশুর মারা যাওয়ার পর একাই থাকেন তিনি। সকাল সাড়ে আটটার দিকে আমার বর কোর্টে (তিনি ব্যারিস্টার) যাওয়ার আগে মাকে ছেলের কাছে রেখে যান।
স্কুল থেকে ফিরতে ফিরতে ১২টা বেজে যায়। অনবরত কলবেল বাজানোরও পরও দরজা খুলছে না দেখে নবটা ঘুরাই। দেখি একটা দরজার লক খোলা কিন্তু ভেতর থেকে ছিটকিনি আটকানো। কিন্তু সাধারণত উল্টোটা হয়, ছিটকিনি খোলা থাকে আর লক দেওয়া থাকে। ভাবলাম নাতি-দাদি মিলে মনে হয় ঘুমাচ্ছে। এবার দরজা ধাক্কা দিয়ে ডাকতে থাকি, ‘মা দরজা খোলেন।’
তারপরও সাড়া না পেয়ে স্পাই হোল দিয়ে ভেতরে তাকিয়ে মনে হলো, ভেতর থেকে কেউ আমাকে দেখছে, আমাকে চোখ রাখতে দেখেই সরে গেল। তিনবার এ রকম হওয়ার পর একসময় দরজাটি অল্প একটু ফাঁক হলো। লাইট জ্বলছিল না বলে দিনের বেলাও ভেতরটা বেশ অন্ধকার। শুধু দেখলাম, একটা পা দরজার পেছনে সরে গেল।
আমার ছেলে অনেক সময় দরজা খুলে পেছনে লুকিয়ে থেকে বলে, ‘আমাকে খোঁজো।’ তাই মুচকি হেসে দরজার পেছনে তাকাতেই দেখি আমার চেয়েও উঁচু একটা মানুষের অবয়ব।
শুধু এক জোড়া চোখ আর চুল দেখতে পেলাম, বাকি মুখ ঢাকা। আমাকে সে মাথার ডানে প্রচণ্ড জোরে আঘাত করে। ডাইনিংরুমের ফ্লোরে পড়ে প্রচণ্ড ব্যথা পাই।
ছেলেটি তৎক্ষণাৎ দরজা বন্ধ করে ছিটকিনি লাগিয়ে দেয়। অন্ধকার ড্রয়িংরুম থেকে আরও একটা লোক এসে আমার ওপর বসে পড়ে প্রথমেই চোখজোড়া বেঁধে ফেলে। চোখ বাঁধা অবস্থায় বুঝতে পারলাম, প্রথম লোকটি আমাকে ডাইনিংরুমের ফ্লোরের সঙ্গে চেপে ধরে রেখেছে, এই ফাঁকে দ্বিতীয়জন আমার পা জোড়াও বেঁধে ফেলে। বাড়ি দিয়ে নিচে ফেলে দেওয়ার পর থেকেই আমি চিৎকার করতে থাকি। তখন আমার ওপর উঠে তারা আমাকে মারতে শুরু করে। আর আমার চিৎকার থামানোর জন্য একজন তার হাত আমার মুখের ভেতর কবজি পর্যন্ত ঢুকিয়ে দেয়। আমার হাতও বাঁধার চেষ্টা চলছিল। খুব দ্রুত মাথায় অনেক কিছু খেলে যাচ্ছিল, বাসার সব লাইট নেভানো থাকলেও কিছুটা দিনের আলো বাসায় ঢোকার কথা।
তার মানে, পুরো বাসায় পর্দা টেনে ঘর অন্ধকার করেছে। শাশুড়ি বা ছেলের কোনো সাড়াশব্দ যেহেতু পাচ্ছিলাম না, ধরেই নিলাম ঘুম থেকে ওঠার পর ছেলেকে নিয়ে তাঁর ফ্ল্যাটে গিয়েছেন শাশুড়ি।
মেইন রোডের ওপরই আমাদের বাড়ি। নিচে ও আশপাশে প্রচুর দোকানপাট। আশপাশের সব বিল্ডিংয়েই আমাদের আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুবান্ধবদের বাসা। লোকগুলো অনবরত আমার মুখে, হাতে, শরীরে আঘাত করতে থাকে। এর মধ্যে কোথা থেকে একটা কাপড় এনে মুখ দিয়ে একদম গলা পর্যন্ত ঢুকিয়ে দেয়। দম বন্ধ হয়ে আসাতে আমি গোঙাতে থাকি। ওই অবস্থায় আমার হাতগুলো যেন বাঁধতে না পারে, এ জন্য ডান হাত দিয়ে ওদের থামাতে আর বাঁ হাত দিয়ে মুখ থেকে হাত সরানোর চেষ্টা করতে থাকি। আমার গোঙানোর শব্দ যেন বাইরে চলে না যায়, সে জন্য তারা ছেঁচড়ে আমাকে ভেতরের ঘরে নিয়ে যায়। মাথার কাছে বসা লোকটা আমার চুল ধরে মাথাটা ফ্লোরে বাড়ি দিতে থাকে।
ধস্তাধস্তির একপর্যায়ে একজন বলে ওঠে, ‘এই রকম করিস না, মইরা যাইবো।’
আরেকজন বলে, ‘যাক মইরা।’
তৃতীয়জন বলে ওঠে, ‘না মারন যাইবো না।’
ওই মুহূর্তেই বাসার কলবেল বেজে ওঠে! বাজতেই থাকে। একটা লোক গিয়ে দরজা খোলে। আমার বাসার গৃহকর্মী। দরজা দিয়ে ঢোকা আলো ও ডাইনিংরুমের কিছুটা আলোতে হাফ প্যান্ট আর স্যান্ডো গেঞ্জি পরা অপরিচিত একটা ছেলেকে বাসায় দেখে যা বোঝার সে বুঝে যায়। সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে সে চিৎকার করতে থাকে, ‘আপনারা সবাই আসেন। বাড়িওয়ালার বাসায় কিছু একটা হইছে, তাড়াতাড়ি আসেন।’
আমার শাশুড়ির গলাও শুনতে পাই, তবে কোথা থেকে আসছিল বুঝতে পারছিলাম না। বলছিলেন, ‘ডাকাত! ডাকাত!’ তিনি তাঁর ভাগনে আর তিনতলার ভাড়াটিয়া মহিলার নাম ধরে ডাকতে থাকেন।
বুয়ার চিৎকারে ততক্ষণে বাসার নিচে মানুষ জড়ো হয়ে গেছে। অবস্থা বেগতিক দেখে আমাকে ফেলে ডাকাতেরা মূল দরজা দিয়ে বেরিয়ে যায়। কিন্তু একজন কী মনে করে আবার ফিরে আসে, ছিটকিনিটা লাগিয়ে আমার কাছে এসে জোরে থাপরাতে থাপরাতে বলে, ‘তুই কিছু দেখিস নাই, বল তুই কিছু দেখিস নাই।’ মনে হলো, লোকটি হাতে কিছু একটা তুলে নিল আর বলল, ‘তোকে নাইলে জবাই কইরা ফেলমু।’ তারপর লোকটা দরজা খুলে বেরিয়ে গেল।
পরে শুনেছি, নিচে জড়ো হওয়া লোকের সামনে দিয়েই ডাকাতেরা বের হয়ে যায়, কিন্তু ওপরে কী হয়েছে, তখনো কেউ বুঝতে পারেনি। লোকগুলোকে যারা বের হতে দেখেছে তারা বলল, ডাকাতদের কাঁধে নাকি ব্যাকপ্যাক ছিল।
আমিও এর মধ্যে মুখ ও চোখ থেকে কাপড় সরিয়ে ফেলতে সক্ষম হই। ভেতরের রুম থেকে কোনোমতে টলতে টলতে মূল দরজার সামনে এসে চিৎকার করতে থাকি, ‘কেউ আসেন, ডাকাত! ডাকাত!’ তখনো আমার ধারণা, ছেলে পাশের ফ্ল্যাটে শাশুড়ির কাছে আছে। তাই শাশুড়ির দরজায় গিয়ে ধাক্কাতে থাকি। আমার শাশুড়িমা তখন আমার ফ্ল্যাটের এক রুম থেকে দরজা খুলে বের হন। বললেন, ডাকাতেরা যখন আমাকে মারছিল, মা তখন গড়িয়ে গড়িয়ে বেডরুমে ঢুকে ছিটকিনি আটকে দেন।
শাশুড়ির কাছে তখন মূল ঘটনা জানতে পারি।
সকালে হঠাৎ বেলের আওয়াজে ওনার ঘুম ভাঙে। স্পাই হোল দিয়ে না দেখেই উনি দরজা খোলেন। খোলার পর তিনজন অপরিচিত ছেলে বলে, ‘টু-লেট ঝুলতেছে দেখলাম, বাসা দেখতে এসেছি।’ মা বাসা দেখাতে অনাগ্রহ প্রকাশ করলে দরজায় জোরে ধাক্কা মারে একজন। বাড়ি খেয়ে ডাইনিংরুমের মেঝেতে গিয়ে পড়েন মা। ছেলেগুলো ওনার হাত–পা বেঁধে ফেলে। আমার ছেলে তখন রুমে ঘুমাচ্ছিল, সেখানে গিয়ে ডাকাতেরা তাকে ঘুম থেকে তুলে পানি দিয়ে একটা মেডিসিন খাইয়ে বলে, ‘ঘুমিয়ে পড়ো, নইলে মেরে ফেলব।’
আমার ছেলে শুধু অনুরোধ করেছিল, যেন তার কম্পিউটারটা নিয়ে না যায়। তার পরেই বলেছিল, ‘মা-বাবাকে একটু ফোন দেন।’ লোকগুলো ‘আচ্ছা’ বলে লাইট নিভিয়ে ওর ঘর থেকে বের হয়ে আসে।
তারপর বাসাজুড়ে চলে তাণ্ডব। ওয়ার্ডরোব, আলমারি, টেবিলের ড্রয়ার, ব্যাগ, ফাইল—সবকিছু খুলে খুলে যত ক্যাশ টাকা ও জুয়েলারি পাওয়া গেছে, সব নিয়ে গেছে। এমনকি কাঁথা, বিছানার চাদরের ভেতরে করে বাচ্চাদের মাটির ব্যাংকগুলো পর্যন্ত ভেঙে ভেতরের টাকাপয়সা নিয়ে গেছে।
কিছুক্ষণ পর আমার ছেলের ঘুম ভেঙে যায়। কিন্তু ভয়ে সে আর ঘর থেকে বের হয়নি। আমি যখন তাকে ঘর থেকে বের করি, তখন সে ঠিকমতো দাঁড়াতে পারছিল না, টলছিল।
ততক্ষণে ফোন পেয়ে আমার স্বামী চলে এসেছে। রাস্তায় থাকতেই সে পুলিশে খবর দেয়। পুলিশ এসে বেশ কিছু তথ্য সংগ্রহ করে। আমাদের তিনজনকে খুব দ্রুত হাসপাতালে নিতে বলে তারা। পুলিশের ধারণা, আমার বাচ্চাকে পয়জন দেওয়া হয়েছে। ঘড়িতে তখন বাজে বেলা প্রায় দুইটা। মুগদা হাসপাতালে যাওয়ার পথে গাড়িতে প্রচুর বমি করল আমার ছেলে। তখনই মেয়ের স্কুল থেকে ভ্যানচালক জানাল, আজকে আমার মেয়ের ছুটি হয়ে গেছে, কোচিং হবে না। সঙ্গে সঙ্গে মনে হলো যেন একটা হার্টবিট মিস করলাম। কারণ, ডাকাতেরা যখন আমার মুখ চেপে ধরেছিল, তখন মন থেকে দুইটা দোয়াই করেছি, ‘আল্লাহ আমি তো জানি আমি মারা যাচ্ছি, তবে আমাকে অসম্মানিত কইরো না আর আমার মেয়ের যেন আজকে কোচিং ক্যানসেল না হয়।’ কারণ ও যদি এসে পড়ে তাহলে আমার মতোই ট্র্যাপে পড়ে যাবে। আর যতটুকু বুঝতে পারছিলাম, আমার মেয়েকে ওরা কোনো ছাড় দিত না।
যা–ই হোক, ভ্যানচালককে সোজা স্কুল থেকে বাসায় নিয়ে যেতে বললাম, বাসায় আত্মীয়স্বজনেরা আছে।
মুগদা হাসপাতালে গিয়ে বাচ্চা ফেনা ফেনা বমি করল, শিশু ওয়ার্ডে গিয়েও বমি করল। ইমার্জেন্সি, প্রাইমারি চিকিৎসক, শিশু ওয়ার্ড, নার্স স্টেশন, পেডিয়াট্রিক চিকিৎসক, আবার নার্স স্টেশন হয়ে ওয়ার্ডে ট্রিটমেন্ট পেতে পেতে প্রায় সাড়ে চারটার মতো বেজে গেল। ছেলেকে স্যালাইন দিয়ে ফ্লুইড বের করা হলো। ততক্ষণে ভাই–বোন মামারাসহ আত্মীয়স্বজনে হাসপাতাল ভরে গেছে।
বাসায় সিআইডি, ডিবিসহ ইনভেস্টিগেশন পুলিশের টিম চলে এসেছিল। প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে আমার শাশুড়ি বাসায় চলে এলেন, ছেলের সঙ্গে আমি হাসপাতালে রয়ে গেলাম। আমার মুখ প্রায় থেঁতলে ফেলেছিল, বিভিন্ন জায়গায় কেটে গেছে, হাত-পা শরীর বিভিন্ন জায়গা কাটা ছেঁড়া, ব্যথা। মুখের ভেতরের অংশগুলো এতটাই কেটেছিল যে ভেতরে ঘা হয়ে গিয়েছিল। দুই দিন পানিটাও গিলতে পারিনি। আট দিন পর সলিড খাবার খেতে পেরেছি।