পেট্রল উৎপাদন দেশেই, তাহলে সংকট কেন
· Prothom Alo

‘পেট্রল নেই’, ফিলিং স্টেশনে গিয়ে এমন অভিজ্ঞতার মুখে গত এক মাসে অনেকেই পড়েছেন। ইরান যুদ্ধ এই সংকট তৈরি করেছে বিশ্বজুড়েই। কিন্তু বাংলাদেশে পেট্রলের চাহিদা মেটে দেশেরই উৎপাদনে, এই তথ্যটি জানার পর এই প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই আসে, তাহলে সংকটের কারণ কী? সংকট আছে ডিজেল, অকটেনেরও। এই কৌতূহলও অনেকের, পেট্রল আসলে কী? অকটেনের সঙ্গে তার তফাতটাই বা কী?
Visit saltysenoritaaz.org for more information.
পেট্রল কী
পেট্রল একধরনের তরল জ্বালানি। অপরিশোধিত জ্বালানি (ক্রুড অয়েল) ও গ্যাসক্ষেত্র থেকে গ্যাসের উপজাত হিসেবে পাওয়া কনডেনসেট পরিশোধন করে পেট্রল উৎপাদন করা হয়।
পেট্রলে কী চলে
পেট্রলপাম্প মালিক ও তেল কোম্পানি সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, মূলত মোটরসাইকেলের জ্বালানি হিসেবে পেট্রল ব্যবহার করা হয়। এর বাইরে কিছু পুরোনো গাড়ি পেট্রলে চালানো হয়, কারণ এগুলোর ইঞ্জিন তৈরি করা হয় পেট্রলে চালানোর উপযোগী করে। বিশেষ করে ভারতীয় গাড়িতে এ ইঞ্জিন দেখা যায়। অটোরিকশা, টেম্পো বা লেগুনাও চলে পেট্রলে। এ ছাড়া পেট্রলচালিত কিছু যন্ত্রও আছে, যা ঘাস কাটা বা অন্য কাজে ব্যবহার করা হয়।
অকটেনের সঙ্গে কী তফাত
কার্যত পেট্রল ও অকটেনের মধ্যে রূপগত কোনো পার্থক্য নেই, পার্থক্যটি গুণগত। মানের বিচারে উচ্চ মানের পেট্রলকেই বলা হয় অকটেন।
জ্বালানি তেলে অকটেন রেটিং দেখে মূলত গুণগত মান বোঝা যায়। উচ্চ মানের মোটর গ্যাসোলিনে অকটেন রেটিং বেশি থাকে, সেটাই অকটেন নামে পরিচিত। অকটেন রেটিং ৯২ থেকে ৯৫ হলে তা অকটেন আর ৮০ থেকে ৮৭ এর মধ্যে হলে তাকে বলা হয় পেট্রল।
অকটেন কী, কোথা থেকে আসে, সংকট কতটাদেশে পেট্রলের চাহিদা কেমন
দেশে জ্বালানি তেল আমদানি, উৎপাদন ও সরবরাহের সরকারি সংস্থা বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) সূত্র বলছে, দেশে গত অর্থবছরে পেট্রল বিক্রি হয়েছে ৪ লাখ ৬২ হাজার টন। একই সময়ে অকটেন বিক্রি হয় ৪ লাখ ১৫ হাজার টন।
জ্বালানি তেলের মধ্যে সবচেয়ে বেশি চাহিদা ডিজেলের। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশে এই জ্বালানি তেলের চাহিদা ছিল ৪৩ লাখ ৫০ হাজার টন।
পেট্রল আসে কোথা থেকে
দেশে পেট্রলের চাহিদার পুরোটারই জোগান আসে দেশীয় উৎপাদন থেকে। গত অর্থবছলে পেট্রলের চাহিদার ১৬ শতাংশ আসে সরকারি শোধনাগার চট্টগ্রামের ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড (ইআরএল) থেকে। বাকি ৮৪ শতাংশ জোগান দেয় বেসরকারি শোধনাগারগুলো।
দেশে গত অর্থবছরে পেট্রল বিক্রি হয়েছে ৪ লাখ ৬২ হাজার টন। একই সময়ে অকটেন বিক্রি হয় ৪ লাখ ১৫ হাজার টন। জ্বালানি তেলের মধ্যে সবচেয়ে বেশি চাহিদা ডিজেলের। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশে এই জ্বালানি তেলের চাহিদা ছিল ৪৩ লাখ ৫০ হাজার টন।
তবে এখানে একটি কথা আছে। প্রতিবছর ১৫ লাখ টন অপরিশোধিত তেল আমদানি করে ইআরএল। সেখান থেকে পেট্রল, ডিজেল, ফার্নেসসহ বিভিন্ন জ্বালানি উৎপাদন করা হয়। আরব আমিরাত ও সৌদি আরব থেকে তা আমদানি করা হয়। যুদ্ধের কারণে বর্তমানে আমদানি বন্ধ। ফলে অপরিশোধিত তেল আমদানি কমে গেলে তার প্রভাব পেট্রল উৎপাদনেও পড়বে।
ইআরএল সূত্র জানায়, অপরিশোধিত জ্বালানির মজুত প্রায় শেষের দিকে। সৌদি আরব থেকে এক লাখ টন অপরিশোধিত জ্বালানি আসার কথা রয়েছে। এটি দ্রুত না এলে ইআরএলের উৎপাদন বন্ধ হয়ে যেতে পারে। সে ক্ষেত্রে ইআরএল থেকে কিছুদিন পেট্রল সরবরাহ বন্ধ থাকবে।
তবে পেট্রলের চাহিদার অধিকাংশ পূরণ করে বেসরকারি শোধনাগারগুলো। দেশের চারটি বেসরকারি শোধনাগার থেকে নিয়মিত পেট্রল কেনে বিপিসি। এগুলো হচ্ছে চট্টগ্রামের সুপার পেট্রোকেমিক্যাল লিমিটেড, পারটেক্স পেট্রো লিমিটেড, নরসিংদীর অ্যাকোয়া রিফাইনারি লিমিটেড এবং বাগেরহাটের পেট্রোম্যাক্স রিফাইনারি লিমিটেড। দেশের বিভিন্ন গ্যাসক্ষেত্রে গ্যাসের উপজাত হিসেবে পাওয়া ও আমদানি করা কনডেনসেট শোধন করে পেট্রল উৎপাদন করে তারা।
অকটেন মূলত পেট্রলেরই একটি রূপমজুত কত
বিপিসি সূত্র জানিয়েছে, গত ৩ এপ্রিল পর্যন্ত পেট্রলের মজুত ছিল ১২ হাজার ৭৫৬ টন। এই মজুত দিয়ে ৯ দিন চলার কথা। আর প্রতিদিন নতুন পেট্রল যুক্ত হয় মজুতের সঙ্গে। এপ্রিলে পেট্রলের চাহিদা ধরা হয়েছে ৪৪ হাজার টন। এর মধ্যে দেশীয় পরিশোধনাগার থেকে পাওয়া যাবে ৩৫ হাজার টন।
এ হিসাবে কিছুটা ঘাটতি থাকলেও এ মাসে চাহিদার দ্বিগুণ অকটেন আসছে। তাই কিছু অকটেন রূপান্তর করে পেট্রলের চাহিদা পূরণ করার কথা ভাবা হচ্ছে বলে বিপিসি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। ফলে চলতি বছরেও পেট্রল আমদানির কোনো পরিকল্পনা নেই বিপিসির।
মীর আহসান উদ্দীন, সদস্যসচিব, পেট্রলপাম্প মালিক সমিতিপর্যাপ্ত জ্বালানি তেল সরবরাহ করছে সরকার। কিন্তু পেট্রলপাম্পে আনার পর মানুষের অতিরিক্ত চাহিদার চাপ সামলানো যাচ্ছে না। লাইন কমছেই না।কনডেনসেট ও ন্যাপথা থেকে বেসরকারি খাতে সবচেয়ে বেশি পেট্রল ও অকটেন উৎপাদন করে টিকে গ্রুপের সুপার পেট্রোকেমিক্যাল। এ কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ মুস্তাফা হায়দার প্রথম আলোকে বলেন, এপ্রিল ও মে মাসের উৎপাদন ধরে রাখার মতো কাঁচামাল সরবরাহ নিশ্চিত করা আছে। তবে জুনের জন্য এখন কাঁচামাল পাওয়া যাচ্ছে না। তাই ওই সময়ের উৎপাদন নিয়ে কিছু বলা যাচ্ছে না।
তাহলে এখন সংকট কেন
পর্যাপ্ত মজুত থাকার পরও পেট্রল সংকটের জন্য ‘প্যানিক বায়িং’ বা আতঙ্কিত হয়ে কেনার হিড়িককেই দায়ী করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র মিলে ইরানে হামলা শুরুর পর বিশ্বের জ্বালানি বাজার অস্থির হয়ে ওঠে। তাতে শঙ্কিত হয়ে কেনা বেড়ে গেলে সরকার মার্চের শুরুতে ফিলিং স্টেশনে রেশনিংয়ের সিদ্ধান্ত নেয়। এরপর এখনো জ্বালানি তেলের জন্য লাইন আর ফুরোচ্ছে না, যদিও এখন আর রেশনিং হচ্ছে না।
দেশে মোটরসাইকেলের বেশির ভাগই চলে পেট্রলেবিপিসির হিসাব বলছে, গত ১ থেকে ৪ মার্চ পর্যন্ত পেট্রল বিক্রি হয়েছে ৯ হাজার ৩৮০ টন। অথচ গত বছর একই সময়ে বিক্রি হয়েছিল ৬ হাজার ৪৮০ টন। তাতে দেখা যাচ্ছে, চাহিদা আগের বছরের চেয়ে ৪৫ শতাংশ বেশি।
বাংলাদেশ পেট্রলপাম্প মালিক সমিতির একাংশের সদস্যসচিব মীর আহসান উদ্দীন প্রথম আলোকে বলেন, পর্যাপ্ত জ্বালানি তেল সরবরাহ করছে সরকার। কিন্তু পেট্রলপাম্পে আনার পর মানুষের অতিরিক্ত চাহিদার চাপ সামলানো যাচ্ছে না। লাইন কমছেই না।
সরবরাহ পর্যাপ্ত থাকার কথা বলা হলেও বিপিসির তথ্যে দেখা যায়, গত বছরের তুলনায় মার্চে পেট্রল সরবরাহ প্রায় ১৫ শতাংশ কমেছে। গত বছরের মার্চে দিনে গড়ে পেট্রল বিক্রি হয়েছে ১ হাজার ৪৯৬ টন। আর এবারের মার্চে দিনে গড়ে বিক্রি হয়েছে ১ হাজার ২৭১ টন।
পাশাপাশি পেট্রল মজুতের বিষয়টিও আসছে আলোচনায়। বিভিন্ন স্থানে প্রশাসনের অভিযানে মজুত করা পেট্রল উদ্ধারের ঘটনাও ঘটছে।