ঈদের একাল-সেকাল

· Prothom Alo

শৈশবে চাঁদ দেখার জন্য সবাই পুকুরপাড়ে, বিলের ধারে কিংবা বাড়ির ছাদে উঠে চাঁদ দেখতাম। বাঁশবাগানের ওপর কিংবা নারিকেল–সুপারিগাছের আড়ালে ‘ঐ চাঁন ওললে চাঁন ওললে’ বলে চিৎকার, মানে চাঁদ উঠেছে।

‘ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ।
তুই আপনাকে আজ বিলিয়ে দে শোন্ আসমানি তাগিদ।।
তোর সোনা–দানা বালাখানা সব রাহেলিল্লাহ্।
দে জাকাত মুর্দা মুসলিমের আজ ভাঙাইতে নিদ্।।
আজ পড়বি ঈদের নামাজ রে মন সেই সে ঈদগাহে।’

Visit rhodia.club for more information.

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম মরমি শিল্পী আব্বাসউদ্দীন আহমেদের অনুরোধে ১৯৩১ সালে আধঘণ্টার মধ্যেই গানটি রচনা করেছিলেন। ঈদের চাঁদ দেখার সঙ্গে সঙ্গে গানটি বেজে ওঠে চারদিকে। আকাশে–বাতাসে বয়ে যায় ঈদের আনন্দবার্তা। গানের সুরে যেন ঈদের চাঁদও খিলখিল করে হেসে ওঠে। নজরুলের বিখ্যাত গানটি শুনলে বোঝা যায় যে পরের দিন ঈদ।

শৈশবে চাঁদ দেখার জন্য সবাই পুকুরপাড়ে, বিলের ধারে কিংবা বাড়ির ছাদে উঠে চাঁদ দেখতাম। বাঁশবাগানের ওপর কিংবা নারিকেল–সুপারিগাছের আড়ালে ‘ঐ চাঁন ওললে চাঁন ওললে’ বলে চিৎকার, মানে চাঁদ উঠেছে। চিৎকার–চেঁচামেচিতে আনন্দ উৎসব করত সবাই। চট্টগ্রামের একটা লোক–আঞ্চলিক বচন গাইত, ‘আজি রোজা হালিয়া ঈদ তোম্মা কাঁদে ফিঁত ফিঁত’।

পনেরো বা বিশ রমজানে বাবা ঈদ বোনাস পেলে দরজিবাড়ি নিয়ে যেতেন। বছরে একটা নতুন কাপড়। দরজি যত্ন করে সেলাই দিতেন। জুতার দোকানে গিয়ে নতুন জুতা কিনে দিতেন। বেলি বা জাম্প কেডস কিনার জন্য বায়না ধরতাম। আমাদের মধ্যবিত্ত পরিবারে আয়ের উৎস বাবার চাকরি। বাবার পকেটের টাকা সব শেষ হয়ে যেত কেনাকাটায়। তবে তিনি নিজের জন্য নিতেন না। পরিবারের সদস্য এবং আত্মীয়স্বজনকে নতুন পোশাক কিনে দিয়ে বাবা আনন্দ পেতেন।

ঈদের আগে বাবা ন্যাকড়া দিয়ে পুরোনো জুতা কালি করতেন। পুরোনো কাপড় লন্ড্রিতে ওয়াশ করে সেটা ঈদের দিন পরিধান করতেন। বাবাকে বলতাম, ‘আপনি কিছুই নিলেন না?’ তিনি হাসিমুখে লন্ড্রি থেকে ওয়াশ করা জামাকাপড় দেখিয়ে বলতেন, ‘এই যে নতুন আছে তো!’ সত্যি, বাবারা এমনই হয়।

ঈদের দিন খুব ভোরে উঠে বাবার সঙ্গে পুকুরে গোসল করতে যেতাম। সুগন্ধিযুক্ত লাইফবয়/লাক্স সাবান দিয়ে পুকুরে দিগম্বর করে খুব যত্ন করে গোসল করিয়ে দিতেন। গোসল শেষে গামছাটা লজ্জাস্থানে জড়িয়ে নিতাম। খুব যত্ন করে শরীর মুছে দিতেন; বাসায় এলে মা আমার নতুন কাপড়চোপড় পরিধান করিয়ে দিতেন। আতর লাগিয়ে দিতেন পাঞ্জাবিতে। বাবার হাত ধরে মসজিদে যেতাম।

ঈদের নামাজ শেষে ঘরে ঘরে গিয়ে মুরব্বিদের কদমবুসি আর কোলাকুলির প্রতিযোগিতা চলত। ঈদ সালামি পেতাম নতুন এক টাকা, দুই টাকা বা পাঁচ টাকা, সর্বোচ্চ দশ থেকে বিশ টাকা। পাড়ার বন্ধুদের সঙ্গে এ বাড়ি–ও বাড়ি বেড়াতাম। দু–চারজন মিলে একটা রিকশায় গাদাগাদি করে বসতাম। একজন আরেকজনের কোলেও বসে পড়ত; কী হাসাহাসি–আনন্দ, কেউ কেউ নিচে রিকশার রড ধরে বসে পড়ত। রিকশা ভাড়াও দেওয়া হতো ভাগাভাগি করে। সবাই দল বেঁধে ঘুরে বেড়ানো। এখনকার দিনের মতো অত বেশি মজার মজার ভোজনরসদ ছিল না। বেশির ভাগ বাসায় রান্না হতো সেমাই, চুটকি, ফিরনি, হাতে তৈরি পিঠা।

ভরদুপুরে আত্মীয়ের বাড়িতে পাওয়া ঈদ সালামি ভাগাভাগি করে নিতাম। টুংটাং ঘণ্টা বাজিয়ে আইসক্রিমওয়ালা হাঁক দিত—‘ওই আইসক্রিম, আইসক্রিম!’ বস্তা আইসক্রিম, নারকেল–কলা মিশ্রিত আইসক্রিম, দুধ-মালাই আইসক্রিম, বন্ধুরা মিলে আইসক্রিম খেতাম। বাঁশের কঞ্চিওয়ালা এক আইসক্রিম কয়েকজনে মিলে চুষে চুষে খেতাম। কেউ কেউ কামড় দিয়ে পুরো আইসক্রিমের অর্ধেক সাবাড় করে দিত। বিকেলে ঘরে এসে দেখতাম কে কত টাকা পেয়েছে। মা বলতেন, ‘নতুন টাকাগুলো মাটির ব্যাংকে জমা রাখো।’ কিছু টাকা মাকেও দিতাম। তিনি শাড়ির আঁচলে গিট্টু মেরে রাখতেন।

আমাদের সেই সময়ের সোনালি ঈদ এখন অতীত! কালের বিবর্তনে হারিয়ে গেছে ঈদের চাঁদ দেখার আনন্দ। এখনকার ছেলেমেয়েরা তো চাঁদরাত থেকে টুসটাস ফটকা ফোটানো, আতশবাজি নিয়ে মেতেই থাকে। পরিবর্তন এসেছে ঈদের কেনাকাটায়ও। বাহারি আলোকসজ্জিত শপিং মল।

অর্থনৈতিকভাবে উন্নত হয়েছে দেশ। এখন ঈদ মানে হাজার হাজার, কেউ কেউ লাখ টাকার কেনাকাটা করে। বাহারি শপিং মল, জেন্টস পারলার, লেডিস পারলার, ঈদের পোশাক কিনতে অনেকে দেশের বাইরেও যায়। গ্রামের উচ্চ–মধ্যবিত্তরা শহরে বা রাজধানীতে গিয়ে কেনাকাটা করেন। এখনকার শিশু-কিশোর বা তরুণেরা আগেকার দিনের মতো একটা জামা কেনে না। দুইয়ের অধিক কেনে। ঈদ সালামির অঙ্কও বেড়ে ৫০, ১০০, ৫০০ থেকে ১০০০ টাকা হয়েছে।

জাতিধর্ম–নির্বিশেষে ঈদের আনন্দ সবার। আসুন সবাই মিলে কোলাকুলি করি, হাতে হাত ধরে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করি। নিষ্পেষিত মানুষ, সুবিধাবঞ্চিত শিশু, চাকরিচ্যুত সহকর্মী, অসচ্ছল আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুবান্ধবের প্রতি ভালোবাসার হাত বাড়িয়ে দিই। প্রিয়জনদের ঈদের নতুন পোশাকের সঙ্গে একটা করে বইও উপহার দেওয়া যেতে পারে।

উপদেষ্টা, পটিয়া বন্ধুসভা

Read full story at source