সাতক্ষীরার ‘১৬৭ বছরের’ পুরোনো তেঁতুলিয়া জামে মসজিদ

· Prothom Alo

গাছপালার সবুজ ফাঁক গলে দূর থেকে চোখে পড়ে সারি সারি সাদা গম্বুজ আর উঁচু মিনারগুলো। হঠাৎ মনে হয়, এখানে যেন থেমে আছে সময়। সেই সময়ের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে প্রায় দেড় শতাব্দী পুরোনো তেঁতুলিয়া জামে মসজিদ।

সাতক্ষীরার তালা উপজেলা সদর থেকে তিন কিলোমিটার উত্তরে তেঁতুলিয়া গ্রামে এই মসজিদের অবস্থান। এটি প্রতিষ্ঠা করেন তেঁতুলিয়া পরগনার তৎকালীন জমিদার ছালামাতুল্লাহ খান। মসজিদের গায়ে খোদাই করা ইংরেজি ও বাংলা হরফে লেখা, ১৮৫৮-৫৯ সালে শেষ হয় স্থাপনাটির নির্মাণকাজ। সেই হিসাবে ১৬৭ বছরের বেশি সময় ধরে মসজিদ ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

Visit chinesewhispers.club for more information.

মসজিদ চত্বরে খোদাই করা ওই লেখায় আরও জানা যায়, ১৮৪০-৪১ প্রতিষ্ঠিত কলকাতার মাহবানী বেগম মসজিদ ও ১৮৪২ সালে প্রতিষ্ঠিত কলকাতার ধর্মতলায় টিপু সুলতান মসজিদের সঙ্গে তেঁতুলিয়া জামে মসজিদের সাদৃশ লক্ষ করা যায়।

লেখক মিজানুর রহমানের ‘সাতক্ষীরা পুরাকীর্তি’ গ্রন্থে বলা হয়েছে, জমিদারি কাজের সূত্রে প্রায়ই কলকাতায় ছালামাতুল্লাহ খান যেতেন। সেখানে জাকারিয়া স্ট্রিটের সিন্দুরে অবস্থিত পট্টি মসজিদের নান্দনিক স্থাপত্য তাঁকে গভীরভাবে মুগ্ধ করে। সেই মুগ্ধতা থেকে নিজের জমিদারিতে একটি অনন্য মসজিদ নির্মাণের পরিকল্পনা করেন। পরে দিল্লি থেকে নির্মাতাকে এনে গড়ে তোলা হয় ‘তেঁতুলিয়া জামে মসজিদ’।

মসজিদটিতে ছড়িয়ে আছে অনন্য স্থাপত্যকলা। চার কোনায় চারটি সুউচ্চ মিনার, আকাশের দিকে প্রসারিত। ছোট–বড় মিলিয়ে মোট ২০টি মিনার পুরো স্থাপনাকে দিয়েছে রাজসিক আভা। ছাদের ওপর দুই সারিতে আছে ছয়টি বড় গম্বুজ, এর চারপাশে ছোট গম্বুজগুলো স্থাপনাটিকে অলংকারের মতো ঘিরে রেখেছে।

মসজিদটিতে আছে খিলানযুক্ত সাতটি দরজা। প্রতিটি দরজার উচ্চতা প্রায় আট ফুট এবং প্রস্থ সাড়ে চার ফুট। দরজার খিলান অর্ধগোলাকার হলেও সেগুলো বসানো হয়েছে চারকোনা ফ্রেমের ওপর। ভেতরে ঢুকলে দেখা যায়, দুটি বড় গোলাকার স্তম্ভ, যেগুলো গম্বুজের ভার বহন করছে।

সময়ের সঙ্গে এই মসজিদকে ঘিরে নানা ইতিহাসও তৈরি হয়েছে

দেয়ালের টেরাকোটার কারুকাজে ফুটে উঠেছে লতাপাতা, চাঁদ ও তারার নকশা। বিকেলের আলো পড়লে এসব কারুকাজ আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। স্থানীয় মানুষের মধ্যে প্রচলিত আছে—মসজিদটির মেঝে ও দেয়াল পালিশ করতে সুরকি–বালুর সঙ্গে বিপুল পরিমাণ ডিমের সাদা অংশ মেশানো হয়েছিল। এ কারণে এত বছর পরও মেঝের মসৃণতা অনেক দর্শনার্থীর দৃষ্টি কাড়ে।

খুলনা–পাইকগাছা সড়কের পাশে অবস্থিত মসজিদটি দুটি অংশে বিভক্ত। পশ্চিম পাশে আছে ছাদযুক্ত মূল নামাজঘর, যার দৈর্ঘ্য ৪৭ ফুট ও প্রস্থ ৩০ ফুট। পূর্ব পাশে আছে ছাদবিহীন একটি চত্বর, যার দৈর্ঘ্য ৩৭ ফুট ও প্রস্থ ৩০ ফুট। বর্তমানে স্থানীয় কমিটি সেখানে টিনের ছাউনি দিয়েছে। মসজিদের ভেতরে প্রায় ১৫০ জন এবং বাইরে প্রায় ২০০ জন মুসল্লি একসঙ্গে নামাজ আদায় করতে পারেন।

১৯৮৭ সালে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের অর্থায়নে মসজিদ ও চত্বরের মেঝে সংস্কার করা হয়েছিল বলে জানান খতিব মো. আবদুর রব। তিনি বলেন, সেই সংস্কারের পর মেঝের অবস্থা আগের মতো নেই। স্থানীয়ভাবে মসজিদটি রক্ষণাবেক্ষণ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দা কাজী মহিবুল ইসলাম বলেন, দূরদূরান্ত থেকে মানুষ এই ঐতিহাসিক মসজিদ দেখতে আসেন। কিন্তু আগের টেরাকোটার নান্দনিক সৌন্দর্যের অনেকটাই এখন সাধারণ রঙের প্রলেপে ঢাকা পড়েছে।

মসজিদ কমিটির আহ্বায়ক কাজী শামীমুল ইসলাম বলেন, প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ একসময় কিছু সংস্কার করলেও এখন আর তেমন উদ্যোগ দেখা যায় না। দ্রুত সরকারি উদ্যোগে যথাযথ সংরক্ষণ না করা হলে ঐতিহাসিক এই স্থাপনা ক্ষতির মুখে পড়তে পারে।

Read full story at source