মোদি ও নেতানিয়াহুয়ের এই ঐক্য কী বার্তা দেয়

· Prothom Alo

ইসরায়েলের বেন গুরিয়ন বিমানবন্দরে এয়ার ইন্ডিয়া ওয়ান থেকে নামতেই ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে উষ্ণ আলিঙ্গনে স্বাগত জানান ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। দৃশ্যটি দুই নেতার ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক সম্পর্কের প্রতীক হয়ে ওঠে। এই ঘনিষ্ঠতার অন্যতম স্থপতি মোদি নিজেই।

Visit asg-reflektory.pl for more information.

২০১৭ সালে তাঁর ইসরায়েল সফর ছিল কোনো ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর প্রথম সফর। সেটিই দুই দেশের সম্পর্কের নতুন অধ্যায় সূচিত করে। বুধবার ইনস্টাগ্রামে তিনি এবারের সফরকে ‘ঐতিহাসিক’ বলে উল্লেখ করেন। পরে ইসরায়েলি পার্লামেন্ট নেসেটে তাঁকে দাঁড়িয়ে অভিবাদন জানানো হয়। নেতানিয়াহু বলেন, এটি দুই নেতা, দুই দেশ ও দুই প্রাচীন জাতির প্রকৃত বন্ধুত্ব।

তবে এই বন্ধুত্ব কেবল চুক্তি বা অর্থনৈতিক স্বার্থে সীমাবদ্ধ নয়, বিমানবন্দরে মোদিকে স্বাগত জানাতে গিয়ে নেতানিয়াহুর স্ত্রী সারা নেতানিয়াহু গেরুয়া রঙের পোশাক পরেছিলেন; যা হিন্দুত্ব রাজনীতির প্রতীকী রং। নেতানিয়াহু নিজেও উল্লেখ করেন, তাঁর স্ত্রীর পোশাকের রঙ মোদির পকেট স্কয়ারের সঙ্গে মিলেছে। বিষয়টি ছিল চোখে পড়ার মতো এবং তা মোদির রাজনৈতিক আদর্শের প্রতি একধরনের স্বাচ্ছন্দ্য ও সমর্থনের ইঙ্গিত বহন করে।

বর্ণবৈষম্য ভারতের দীর্ঘদিনের বাস্তবতা। মোদি সরকারের সময় তা আরও প্রকট হয়েছে বলে সমালোচকেরা মনে করেন। সম্প্রতি দেশটির বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সমতা নিশ্চিত করার বিধিমালা জারি করে। সুপ্রিম কোর্টের চাপের পর দলিত শিক্ষার্থীদের হয়রানি ও বৈষম্য ঠেকাতে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়। তবে এই বিধিমালা স্থগিত হয়েছে।

নেতানিয়াহু ও মোদির আদর্শিক ঘনিষ্ঠতার ভিত্তি একটি অভিন্ন বিশ্বাসে দাঁড়িয়ে আছে। তাঁরা নিজেদের এমন এক সভ্যতাগত লড়াইয়ের প্রাচীর হিসেবে তুলে ধরেন, যা তাঁদের মতে ইসলাম ও ইসলামপন্থার বিরুদ্ধে অস্তিত্বের প্রশ্ন। নেতানিয়াহুর ইসরায়েল সব ইহুদির নিরাপদ আশ্রয় হওয়ার কথা। মোদির ভারত হিন্দুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার রাষ্ট্র হিসেবে উপস্থাপিত।

কিন্তু প্রশ্ন হলো আসলে কার নিরাপত্তা নিশ্চিত হচ্ছে ইসরায়েল ও ভারতে?

গাজায় চলমান গণহত্যা, পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিন ভূখণ্ড দখল ও সেখানে সেটেলারদের সহিংসতা দেখিয়ে দেয়, পবিত্র ভূমিতে ফিলিস্তিনিদের নিরাপত্তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। ইসরায়েলের মোট জনসংখ্যার প্রায় ১৯ শতাংশ ফিলিস্তিনি নাগরিক নানা ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক বৈষম্যের শিকার। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল তাদের ‘দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক’ হিসেবে বর্ণনা করেছে।

ভারত-ইসরায়েল ঘনিষ্ঠতা যে কারণে ‘ভালো বার্তা’ নয়

তবে শুধু ফিলিস্তিনিরাই নয়, সব ইহুদিও ইসরায়েলে সমান নিরাপদ নন। মিজরাহি ইহুদিদের বিরুদ্ধে বর্ণভিত্তিক বৈষম্য রাষ্ট্রগঠনের শুরু থেকেই নীতিগতভাবে প্রোথিত ছিল। রিভিশনিস্ট জায়নবাদের প্রতিষ্ঠাতা জেভ জাবোটিনস্কি একসময় বলেছিলেন, ইহুদিদের আগের সংস্কৃতির সঙ্গে কোনো সম্পর্ক থাকা উচিত নয় এবং মধ্যপ্রাচ্যীয় ঐতিহ্য থেকে তাদের বিচ্ছিন্ন করা প্রয়োজন। এই দৃষ্টিভঙ্গিই রাষ্ট্রীয় নীতিতে প্রভাব ফেলেছিল।

রাষ্ট্রীয় নথি প্রকাশের পর জানা গেছে, ইসরায়েল প্রতিষ্ঠার পর আরব ইহুদি পরিবারগুলোর হাজারো শিশু হাসপাতাল ও ক্লিনিক থেকে সরিয়ে ধনী ইহুদি পরিবারগুলোর কাছে দেওয়া হয়েছিল। এতে ইয়েমেনি পরিবারগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। হিসাব বলছে, ইসরায়েল রাষ্ট্রের বয়স ছয় বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই ইয়েমেনি পরিবারের চার বছরের নিচের প্রতি আট শিশুর একজন নিখোঁজ হয়ে গেছে।

বর্ণবৈষম্য অতীতের বিষয় নয়। ইথিওপীয় ইহুদিদের প্রতিদিনের জীবনে কাঠামোগত ও সামাজিক বর্ণবাদ স্পষ্ট। জনসংখ্যার মাত্র ২ শতাংশ হলেও তাঁদের অর্ধেকের বেশি দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করেন। তাঁদের বসতি এলাকায় অবকাঠামো–ঘাটতি স্থায়ী রূপ নিয়েছে। তরুণদের মধ্যে মাদকাসক্তি, সহিংসতা, স্কুল ত্যাগ, বিষণ্নতা ও আত্মহত্যার হার উদ্বেগজনকভাবে বেশি।

ইসরায়েল-ভারত যেভাবে পাকিস্তানের পারমাণবিক স্থাপনা ধ্বংস করতে চেয়েছিল

এক গবেষণায় অংশ নেওয়া এক ইথিওপীয় ইহুদি বলেন, ইউরোপে ইহুদিরা যেমন বঞ্চিত হয়েছিল, আজ ইসরায়েলে তাঁরা বঞ্চিত হচ্ছেন কৃষ্ণাঙ্গ হওয়ার কারণে। এই অভিজ্ঞতা দেখায়, ইসরায়েল সব ইহুদির জন্য সমান নিরাপদ আশ্রয় হয়ে ওঠেনি।

ভারতেও চিত্র ভিন্ন নয়। মুসলিম সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে কাঠামোগত ও সামাজিক বৈষম্য সুপ্রতিষ্ঠিত। সমালোচক ও বিরোধী কণ্ঠস্বর হুমকির মুখে থাকে; কিন্তু প্রশ্ন হলো, হিন্দু জাতীয়তাবাদী নেতৃত্বের অধীন সব হিন্দুই কি নিরাপদ?

বর্ণবৈষম্য ভারতের দীর্ঘদিনের বাস্তবতা। মোদি সরকারের সময় তা আরও প্রকট হয়েছে বলে সমালোচকেরা মনে করেন। সম্প্রতি দেশটির বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সমতা নিশ্চিত করার বিধিমালা জারি করে। সুপ্রিম কোর্টের চাপের পর দলিত শিক্ষার্থীদের হয়রানি ও বৈষম্য ঠেকাতে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়। তবে এই বিধিমালা স্থগিত হয়েছে।

দলিত শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যার মর্মান্তিক ইতিহাস এর পেছনে রয়েছে। ২০১৬ সালে হায়দরাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়ের দলিত গবেষক রোহিত ভেমুলার আত্মহত্যা দেশজুড়ে আলোড়ন তোলে। তিনি ক্যাম্পাসে বর্ণবৈষম্যের বিরুদ্ধে সক্রিয় ছিলেন। সেখানে তাঁর বৃত্তি স্থগিত করা হয় এবং আবাসন ছাড়তে বাধ্য করা হয়। মৃত্যুর আগে তিনি লেখেন, ‘জন্মই যেন তাঁর জন্য ছিল এক মারাত্মক দুর্ঘটনা।’

এক গবেষণায় দেখা গেছে, অধিকাংশ ভারতীয় তফসিলি জাতি ও উপজাতির বিরুদ্ধে ব্যাপক বৈষম্য দেখতে পান না; কিন্তু সরকারি তথ্য বলছে, জাতিসংক্রান্ত অভিযোগ বেড়েছে। পয়োনিষ্কাশন খাতে কর্মরত শ্রমিকদের ৭৭ শতাংশই দলিত সম্প্রদায়ের। এমনকি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তিতেও জাতিভিত্তিক শ্রেণিবিন্যাসের পুনরুৎপাদনের আশঙ্কা রয়েছে বলে গবেষণায় উঠে এসেছে।

ইসরায়েল ও ভারতে এই বঞ্চনার ইতিহাস তুলে ধরার উদ্দেশ্য কেবল অতীতের হিসাব চুকানো নয়। বরং দেখানো যে দুই নেতার রাজনীতিতে যে বহুমাত্রিক বৈষম্য ও শ্রেণিবিন্যাসের কাঠামো কাজ করছে, তা কেবল ফিলিস্তিনি বা মুসলিমদের লক্ষ্য করে সীমাবদ্ধ নয়।

তাঁদের রাজনৈতিক দর্শন এমন এক রাষ্ট্রকাঠামো তৈরি করে, যেখানে নির্দিষ্ট একধরনের পরিচয়কে কেন্দ্র করে ক্ষমতা সংগঠিত হয় এবং অন্যদের প্রান্তে ঠেলে দেওয়া হয়। এই বাস্তবতায় প্রশ্নটি আবারও ফিরে আসে। সত্যিই কি ইসরায়েল ও ভারতে সবাই নিরাপদ? ঘটনাপ্রবাহ বলছে, নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি যত জোরালো, বাস্তবের বৈষম্য ততই গভীর।

  • সোমদীপ সেন গবেষক, ইউনিভার্সিটি অব প্রিটোরিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকার

    আল–জাজিরা থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত

Read full story at source