লড়াই করে বাঁচার সাহস জুগিয়েছেন আব্বাজি

· Prothom Alo

জন্মেছিলাম একটি প্রগতিশীল পরিবারে। মেয়েসন্তান হওয়ার কারণে সমাজের অনেকেই হয়তো ভেবেছিল, আমার জীবনও অন্য দশটা মেয়ের মতোই হবে—সংসার, সন্তান আর চার দেয়ালের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ। কিন্তু আব্বাজি অন্য রকম মানুষ ছিলেন। তিনি কখনো আমাকে মেয়ে বলে আলাদা চোখে দেখেননি; বরং বিশ্বাস করতেন, একজন মানুষ হিসেবে আমার সম্ভাবনাই সবচেয়ে বড় পরিচয়। জীবনের বড় সৌভাগ্য—আমি এমন বাস্তববাদী, মুক্তমনা, স্বাধীনচেতা বাবার সন্তান।

Visit rouesnews.click for more information.

ছোটবেলা থেকেই আব্বাজি পড়াশোনার ব্যাপারে ছিলেন অত্যন্ত কঠোর। তাঁর কাছে আদর ছিল…
আমি যখন সপ্তম শ্রেণিতে পড়তাম, তখনো তাঁর কোলে চড়তাম; কিন্তু সেই আদরের চেয়ে বড় ছিল শাসন। অঙ্কে খুবই কাঁচা ছিলাম। অঙ্কের খাতা নিয়ে বসতে ভয় লাগত। আব্বাজির ধমক আর মার খেয়েই অঙ্ক শিখেছি। কখনো বিরক্ত হইনি। কারণ, জানতাম, তাঁর কঠোরতার ভেতরে লুকিয়ে আছে আমার ভবিষ্যতের স্বপ্ন। ঘণ্টার পর ঘণ্টা তিনি আমাকে অঙ্ক বুঝিয়েছেন। বিজ্ঞানের মানুষ হওয়ায় বিজ্ঞানকেও তিনি বইয়ের পাতায় আটকে রাখেননি, হাতে-কলমে শিখিয়েছেন। ভোরবেলায় মর্নিং ওয়াকে গেলে পথেই বায়োলজি পড়িয়েছেন, প্রকৃতির ভেতর থেকে বিজ্ঞানের ব্যাখ্যা বুঝিয়েছেন। আমার জ্ঞানের ভিত তৈরি হয়েছিল তাঁর হাত ধরেই।

বাবার চলে যাওয়ার দিন

মেট্রিক পরীক্ষার আগে একদিন তিনি তিন শ টাকার স্টাম্পে লিখে নিয়েছিলেন—আমি যদি প্রথম বিভাগে এসএসসি পাস করি, তবে তিনি আমাকে কলেজে পড়াবেন। তখন সেটি আমার কাছে ছিল এক বিশাল চ্যালেঞ্জ। আমিও জেদ ধরে পড়াশোনা করেছি। কারণ, আমি জানতাম, আব্বাজির বিশ্বাসের মর্যাদা আমাকে রাখতেই হবে।

একদিন নানাভাই আমাদের বাড়িতে বেড়াতে এসেছিলেন। তখন আমি এইচএসসি পাস করে মেডিক্যালে অ্যাডমিশন দিই, কিন্তু চান্স পাইনি। তাই সে আমাকে আর পড়াবে না। আমি শুনলাম, আব্বাজি নানাভাইকে বলছেন, ‘আপনারা ধনী মানুষ, আমি হয়তো ওকে আর বেশি পড়াতে পারব না, ভালো ছেলে দেখে বিয়ে দিয়ে দেন।’
কথাটা আমার হৃদয়ে আগুন ধরিয়ে দিয়েছিল। রাগে-অভিমানে ঘরের বাঁশের হাতল নিয়ে আব্বাজির সামনে দাঁড়িয়ে বলেছিলাম, ‘আমি বিয়ে করার জন্য জন্মাইনি। আমি পড়ব, আমি নিজের পরিচয় তৈরি করবই।’

জীবনের সবচেয়ে বড় ধাক্কা এসেছিল যখন মেডিক্যালে ভর্তি হতে পারলাম না। মনে হয়েছিল, পৃথিবী থেমে গেছে। কিন্তু আব্বাজি আমাকে কোনো বাড়তি সহানুভূতি দেখাননি, একটি টাকাও দেননি। তখন কষ্ট পেয়েছিলাম। আজ বুঝি, তিনি আমাকে করুণা নয়, আত্মনির্ভরতা শিখিয়েছিলেন। সেই দিনই প্রতিজ্ঞা করেছিলাম—আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ব, প্রমাণ করব যে ব্যর্থতাই শেষ নয়।

আজ যখন আমার দুই মেয়েকে আমি নিজে পড়িয়ে ওদের আত্মবিশ্বাসী করেছি, পেছনের কারিগর আব্বাজি। এখন তাঁদের নিজেদের প্রচেষ্টায় উচ্চশিক্ষায় এগিয়ে যেতে দেখি, তখন বুঝতে পারি, আমার জীবনের প্রতিটি সংগ্রামে আব্বাজির শিক্ষার ছাপ রয়েছে। তাঁর কঠোর শাসন, অবিচল বিশ্বাস, বিজ্ঞানমনস্ক চিন্তা আর আমাকে হার না মানতে শেখানোর শিক্ষা ছাড়া আমি আজকের আমি হতে পারতাম না।

আমার জীবনের প্রথম শিক্ষক ছিলেন আব্বাজি। প্রথম সমালোচকও তিনি, প্রথম অনুপ্রেরণাও তিনি। পৃথিবী আমাকে অনেক কিছু দিয়েছে, কিন্তু লড়াই করে বাঁচার সাহসটি দিয়েছেন শুধু একজন মানুষ—আব্বাজি।

লেখক, প্রকাশক, সংগঠক ও সমাজকর্মী

Read full story at source