ভঙ্গুর অর্থনীতি স্থিতিশীল করতে সরকারকে দুই বছর সময় দিতে হবে: অর্থমন্ত্রী
· Prothom Alo

দেশের ভঙ্গুর অর্থনীতি পুরোপুরি স্থিতিশীল ও সমৃদ্ধির পথে ফিরিয়ে আনতে সরকারের অন্তত দুই বছর সময় লাগবে বলে জানিয়েছেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিকে বড় চ্যালেঞ্জ উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘সার্বিক যে পরিস্থিতি, তাতে আমাদের দুই বছর সময় দিতে হবে।’
Visit rouesnews.click for more information.
আজ রোববার রাজধানীর গুলশানের লেকশোর হোটেলে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) আয়োজিত বাজেট সংলাপ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এ কথা বলেন অর্থমন্ত্রী।
সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ আবদুর রহিম সাকি। সম্মানিত অতিথি ছিলেন জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য আখতার হোসেন।
বাজেটের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করেন বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) নির্বাহী চেয়ারম্যান হোসেন জিল্লুর রহমান, রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ইন্টিগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্টের (র্যাপিড) চেয়ারম্যান এম এ রাজ্জাক, বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের (বিসিআই) সভাপতি আনোয়ার-উল-আলম চৌধুরী, বিজিএমইএর জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি ইনামুল হক খান, গার্মেন্টস শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের সভাপতি মন্টু ঘোষ। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন।
অনুষ্ঠানে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘আমরা মনে করি, দুই বছরের মধ্যে অর্থনীতি ভঙ্গুর অবস্থা থেকে স্থিতিশীলতার দিকে যাবে। তৃতীয় বছর থেকে দেশের অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াবে এবং চতুর্থ ও পঞ্চম বছরে সমৃদ্ধির দিকে এগিয়ে যাবে।’
দেশের বর্তমান গ্যাস ও বিদ্যুৎ পরিস্থিতিকে প্রধান সমস্যা হিসেবে উল্লেখ করে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘আমি তো তিন মাসে এসব সমস্যা সমাধান করতে পারব না। টাকা দিয়েও এত দ্রুত এসব সমস্যার সমাধান হবে না। বিগত সরকার গ্যাস অনুসন্ধানের উদ্যোগ না নিলেও বর্তমান সরকার তা শুরু করেছে। তবে বাইরে থেকে গ্যাস এনে সংরক্ষণ করে সরবরাহ করতে অন্তত ১৮ মাস সময় লাগবে।’
২০৪১ সালের মধ্যে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের কথা পুনর্ব্যক্ত করে আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘গ্যাস, বিদ্যুৎ ও শক্তিশালী ইন্টারনেট ছাড়া দেশের উন্নয়ন সম্ভব নয়। আমরা এই তিন জায়গায় বিনিয়োগ করছি।’
প্রকল্প নজরদারিতে ‘ড্যাশবোর্ড’
অনুষ্ঠানে পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান হোসেন জিল্লুর রহমান সরকারের বাজেট বাস্তবায়নে তিন মাস মেয়াদি অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ কার্যক্রম চালুর পরামর্শ দেন।
এ প্রসঙ্গে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু বলেন, প্রকল্প বাস্তবায়নে ঐতিহাসিক স্থবিরতা ও দীর্ঘসূত্রতা দূর করতে আগামী জুলাই মাসের প্রথম সপ্তাহ থেকে বিশেষ ডিজিটাল ড্যাশবোর্ড চালু করা হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, ‘ত্রৈমাসিক পর্যালোচনা নয়, আমরা একটা ড্যাশবোর্ড করছি। ড্যাশবোর্ডের মাধ্যমে প্রতিটা প্রকল্প দৈনিক ভিত্তিতে তদারক করা হবে।’
সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন বাজেটে বিভিন্ন খাতে বড় অঙ্কের থোক বরাদ্দ নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘পরিচালন ব্যয়ের জন্য থোক বরাদ্দ আমরা রাখিনি। যেটা আছে, তার সব উন্নয়নকাজের জন্য।’
আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘বাজেটে আমরা নিয়মকানুন সহজ করার যেসব সিদ্ধান্ত নিয়েছি, সেগুলো যেন সবাই ঠিকভাবে মেনে চলে, সে জন্য টাস্কফোর্স গঠন করা হচ্ছে। পাশাপাশি একটা ওয়েবসাইট তৈরি করা হচ্ছে। দেশের কোনো নাগরিক বা ব্যবসায়ী যদি মনে করেন, এই নিয়মকানুন ভঙ্গের বা সঠিক প্রয়োগ না হওয়ার কারণে তারা কোনোভাবে বাধা বা হয়রানির শিকার হচ্ছেন, তারা এই ওয়েবসাইটে জানাতে পারবেন। এই পুরো বিষয় তদারকি করার দায়িত্ব থাকবে সেই টাস্কফোর্সের। আশা করা যায়, এর মাধ্যমে পরিস্থিতির পরিবর্তন হবে।’
অর্থমন্ত্রী আরও বলেন, সরকার শিল্পের কাঁচামাল আমদানির ক্ষেত্রে শুল্ক-কর অনেক কমিয়ে দিয়েছে। রপ্তানি খাতে পণ্যের বৈচিত্র্য আনতে সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়েছে। ফলে এখন শুধু তৈরি পোশাক খাতই নয়, বরং যেকোনো খাতের যেকোনো ব্যবসায়ী পণ্য রপ্তানি করতে চাইলে বন্ড (শুল্কমুক্ত কাঁচামাল আমদানি) সুবিধা পাবেন। ব্যবসায়ীরা চাইলে সরাসরি বন্ড সুবিধা নিতে পারেন। আবার বন্ড সুবিধা নিতে না চাইলে ব্যাংক গ্যারান্টি দিয়ে সম্পূর্ণ শুল্ক-করমুক্ত কাঁচামাল আমদানি করে পণ্য তৈরি ও রপ্তানি করতে পারবেন। এমনকি কাঁচামাল আনার জন্য ঋণপত্র বা এলসি খোলাও এখন আর বাধ্যতামূলক রাখা হয়নি।
পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ আবদুর রহিম সাকি বলেন, উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর বাজেট ও নির্দিষ্ট সময়সীমা কেন ধরে রাখা যাচ্ছে না, সেসব সুনির্দিষ্ট সমস্যা ও সেগুলোর সমাধান নিয়ে বর্তমানে কাজ চলছে। আগামী এক থেকে দুই মাসের মধ্যে এ বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ রূপরেখা বা কর্মপরিকল্পনা তৈরি করা হবে।
ঘোষিত নতুন বাজেটকে দেশের বর্তমান ভঙ্গুর অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে ‘অবাস্তব’ ও ‘ঘাটতি ও ঋণনির্ভর’ বলে উল্লেখ করেন এনসিপির সংসদ সদস্য আখতার হোসেন। এ ছাড়া বাজেট বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, বিভিন্ন খাতে যে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, তার একটি স্বচ্ছ হিসাব যেন সময়ানুযায়ী সংসদ ও জাতির সামনে উপস্থাপন করা হয়।
সরকারের সামনে তিন সংকট
পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, সাধারণ মানুষের কাছে ঋণ এখন বিনিয়োগের মাধ্যম নয়, বরং টিকে থাকা বা বেঁচে থাকার হাতিয়ার হয়ে দাঁড়িয়েছে। নিম্ন আয়ের পরিবারগুলো খাদ্য বা ভোগ কমিয়ে দিচ্ছে, চিকিৎসাসেবা নেওয়া পিছিয়ে দিচ্ছে, একসঙ্গে একাধিক চাকরি বা কাজ করছে। ফলে তাদের মধ্যে মানসিক স্বাস্থ্যজনিত সমস্যার মতো নতুন বাস্তবতা তৈরি হচ্ছে।
হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, সরকারের অর্থনৈতিক পরিকল্পনায় তিনটি বড় সংকট দেখা যাচ্ছে। এক. কর্মসংস্থানের সংকট। দুই. বিনিয়োগের সংকট। তিন. শিক্ষার গুণগত মানের সংকট।
র্যাপিড চেয়ারম্যান এম এ রাজ্জাক বলেন, ‘র্যাপিড প্রাক্কলন করে দেখেছে যে দেশের মোট জনসংখ্যার মাত্র ১ শতাংশ মানুষ বর্তমানে দেশের মোট সম্পদের প্রায় ৫০ শতাংশের ধারক। অর্থাৎ আমরা বৈষম্যমূলক সমাজ তৈরি করেছি, যার সংশোধন আবশ্যিক। সে জন্য যথাযথভাবে পরিকল্পিত “সম্পদ কর” ব্যবস্থা অত্যন্ত প্রয়োজন।’
সম্পদ বণ্টন বিবেচনার জন্য বর্তমান যে সারচার্জ ব্যবস্থা রয়েছে, সম্পদ কর আরোপের ক্ষেত্রে তা সঠিক পদ্ধতি বলে মনে করেন না এম এ রাজ্জাক। এই ক্রমবর্ধমান অসমতা মোকাবিলায় উত্তরাধিকার কর চালু করা উচিত। অন্যথায়, এসব সমস্যার সমাধান হবে না।
জ্বালানিসংকট শিল্পের জন্য বড় সমস্যা
বিসিআই সভাপতি আনোয়ার-উল-আলম চৌধুরী বলেন, জ্বালানিসংকটের কারণে বিদ্যমান শিল্প টিকে থাকতে পারছে না। এটা বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ব্যাংকের সুদের হার চড়া, সেটিও আরেক মাথাব্যথা। এমন বাস্তবতায় প্রবৃদ্ধি গুরুত্বপূর্ণ নয়, বরং বিদ্যমান শিল্পগুলো টিকিয়ে রাখাই মূল বিষয়। সে জন্য জ্বালানি হলো সবচেয়ে বড় মাথাব্যথা। কিন্তু এ নিয়ে বাস্তব কর্মপরিকল্পনা দেখা যাচ্ছে না।
আনোয়ার-উল-আলম চৌধুরী বলেন, ‘এখনো মব সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসা যাচ্ছে না। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির বিষয়ে আমরা এখনো নিজেদের নিরাপদ মনে করছি না। অথচ আমরা দেখতে পাচ্ছি, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী খুবই আত্মতুষ্ট।’
এই বাজেটে শ্রমিকদের জীবনের পরিবর্তন হয়নি বলে মন্তব্য করেন গার্মেন্টস শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের সভাপতি মন্টু ঘোষ। তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে শ্রমিকদের রেশন দেওয়ার দাবি দাবি করা হচ্ছে। কারণ হিসেবে তিনি বলেন, তাঁদের যে বেতন, তাতে বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে চলা সম্ভব নয়। কিন্তু বাজেটে এ বিষয়ে কিছু বলা হয়নি।