আর্জেন্টিনা কেন তার এই ইতিহাস অস্বীকার করতে চায়  

· Prothom Alo

গত মার্চের শেষের দিকে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে একটি ঐতিহাসিক প্রস্তাব গৃহীত হয়। ঘানার নেতৃত্বে এবং আফ্রিকান ইউনিয়ন ও ক্যারিবিয়ান কমিউনিটির (ক্যারিকম) সমর্থনে আনীত এই প্রস্তাবে আটলান্টিকপারের দাস ব্যবসা ও দাসপ্রথাকে মানব ইতিহাসের সবচেয়ে জঘন্যতম অপরাধ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। একই সঙ্গে ক্ষতিপূরণের জন্য সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নেওয়ারও আহ্বান জানানো হয়।

জাতিসংঘের ১২৩টি সদস্যদেশ এই প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দেয়। সাবেক ইউরোপীয় উপনিবেশবাদী দেশগুলোর বেশির ভাগই ভোট দেওয়া থেকে বিরত ছিল। আর বিপক্ষে ভোট দেয় মাত্র তিনটি দেশ—যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেইয়ের আর্জেন্টিনা।

Visit een-wit.pl for more information.

বিশ্বের বেশির ভাগ দেশ যখন দাসত্ব ও উপনিবেশবাদের বর্তমান প্রভাবগুলো মোকাবিলার প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করেছে, তখন গুটিকয় সরকার ওই ব্যবস্থার পক্ষেই অবস্থান নিয়েছে। আর্জেন্টিনার এই ভোট স্পষ্ট করে দিল, বর্তমান সরকার কোন পক্ষ বেছে নিয়েছে। তবে এই সিদ্ধান্তের পেছনে একটি দীর্ঘ ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা রয়েছে।

স্বাধীনতার পর থেকেই নির্দিষ্ট একটি জাতিগত বৈষম্যের ওপর ভিত্তি করে আর্জেন্টিনা রাষ্ট্র পরিচালিত হয়ে আসছে। দাসপ্রথার ক্ষতিপূরণ দিতে আর্জেন্টিনার এই অস্বীকৃতি সেই রাষ্ট্রীয় ঐতিহ্যেরই অংশ। জাতিসংঘের এই ভোটের মাধ্যমে উনিশ শতক থেকে চলে আসা আর্জেন্টিনার বর্ণবাদী শাসনব্যবস্থাটিই আন্তর্জাতিক মঞ্চে প্রকাশ পেয়েছে।

আর্জেন্টিনা রাষ্ট্রগঠনের শুরু থেকেই দেশটির এলিটরা জনসংখ্যা ও সংস্কৃতিকে ‘শ্বেতাঙ্গ’ করার একটি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নিয়েছিল। তাদের ধারণা ছিল, ইউরোপীয় অভিবাসীদের নিয়ে এলেই দেশে সভ্যতা ও প্রগতির বিকাশ ঘটবে। আর্জেন্টিনার ১৮৫৩ সালের সংবিধানের মূল রূপকার হুয়ান বাউতিস্তা আলবার্দি এই ধারণাকে সংক্ষেপে বলেছিলেন, ‘শাসন করা মানেই জনসংখ্যা বাড়ানো।’

এই যুক্তি সংবিধানের ২৫ নম্বর অনুচ্ছেদে যুক্ত করা হয়, যেখানে ইউরোপীয় অভিবাসনকে উৎসাহিত করতে রাষ্ট্রকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। এরপর বহুবার সংবিধান সংশোধন করা হলেও এই ধারা কখনো বাদ দেওয়া হয়নি। ১৯৪৯ সালের সামাজিক সংবিধান বা ১৯৯৪ সালের গণতান্ত্রিক সংস্কার—কোনোটিই ইউরোপকে শ্রেষ্ঠ ভাবার এই মানসিকতা বদলাতে পারেনি।

ইহুদিদের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় স্থানে আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেই। নিউইয়র্ক সিটির কুইন্সে।

এই প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর কারণেই লাতিন আমেরিকায় একটি আখ্যান ডালপালা মেলেছে, আর্জেন্টিনা একটি শ্বেতাঙ্গ ও ইউরোপীয় সমাজ। ‘আর্জেন্টাইনরা জাহাজ থেকে নেমেছে’ (অর্থাৎ তারা সবাই ইউরোপ থেকে এসেছে)—এই মিথ সেখানকার সরকারি নীতি, স্কুলের পাঠ্যবই এবং ইতিহাস চর্চায় প্রতিষ্ঠা করা হয়। আর আদিবাসী ও কৃষ্ণাঙ্গ জনগোষ্ঠীকে ঠেলে দেওয়া হয় এক পাশে। এর ফলে তৈরি হয় এক অদ্ভুত বর্ণবাদী অস্বীকৃতি।

আর্জেন্টিনা রাষ্ট্র এমন এক জাতীয় পরিচয় তৈরি করেছে, যা তার নিজের জনসংখ্যার একটি বড় অংশকে মুছে ফেলেছে। আর শ্বেতাঙ্গদের বানিয়েছে দেশের একমাত্র প্রতিনিধি। আজও যে দেশের বেশির ভাগ মানুষ মিশ্র বা কৃষ্ণাঙ্গ বর্ণের, প্রাতিষ্ঠানিকভাবে তাকে একটি সমজাতীয় ইউরোপীয় সমাজ হিসেবে বর্ণনা করা হয়।

আফ্রো-আর্জেন্টাইনদের ইতিহাস মুছে ফেলা এই প্রক্রিয়ার সবচেয়ে বড় উদাহরণ। উনিশ শতকের শুরুতে দেশটির জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশই ছিল কৃষ্ণাঙ্গ। দেশের অর্থনীতি, সমাজ, সংস্কৃতি ও সেনাবাহিনীতে তাদের বড় ভূমিকা ছিল। কিন্তু স্কুলের বই, আদমশুমারি ও মূলধারার ইতিহাসে এমনভাবে প্রচার করা হলো, যেন তারা প্রাকৃতিকভাবেই বিলুপ্ত হয়ে গেছে। এভাবে বঞ্চনার ইতিহাসকে সংখ্যার মারপ্যাঁচে আড়াল করা হলো।

বর্ণবাদ, ভিসা-রাজনীতি আর ভণ্ডামির বিশ্বকাপ

আদিবাসীদের ক্ষেত্রেও একই কাজ করা হয়েছে। জনসংখ্যা, এলাকা ও সংস্কৃতির দিক থেকে তাদের এত বড় অবদান থাকা সত্ত্বেও তাদের দেখানো হয়েছে সমাজচ্যুত সংখ্যালঘু হিসেবে। এভাবে আর্জেন্টিনা পদ্ধতিগতভাবে আদিবাসীদের ছোট করেছে এবং কৃষ্ণাঙ্গদের ইতিহাস থেকে মুছে ফেলেছে।

বর্তমান উদারপন্থী সরকার এই বৈষম্যকে আরও উসকে দিচ্ছে। ‘ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট এগেইনস্ট ডিসক্রিমিনেশন, জেনোফোবিয়া অ্যান্ড রেসিজম’ বন্ধ করার মাধ্যমে কৃষ্ণাঙ্গদের অধিকার আদায়ের একটি বড় মঞ্চ কেড়ে নেওয়া হয়েছে। এই কমিশন তৈরি হয়েছিল কৃষ্ণাঙ্গদের নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করার জন্য, যা আন্তর্জাতিকভাবেও প্রশংসিত হয়েছিল। ইন্টার-আমেরিকান কমিশন অন হিউম্যান রাইটস একে একটি বড় অগ্রগতি বলেছিল। কিন্তু বর্তমান সরকার এটি বন্ধ করে কৃষ্ণাঙ্গ অধিকারকর্মীদের কয়েক দশকের লড়াইয়ের অর্জনকে ধূলিসাৎ করে দিল।

ট্রাম্পের দুনিয়ায় বিশ্বকাপ ফুটবল যখন ভূরাজনীতির দাবার চাল

সাম্প্রতিক দশকগুলোতে পশ্চিমা সরকার, রাজপরিবার ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান প্রতীকীভাবে অতীতের অপরাধগুলো স্বীকার করতে শুরু করেছে। একে বলা যেতে পারে ‘ক্ষমা চাওয়ার নাটক’। তারা ইতিহাসের অন্যায়কে স্বীকার করে, নিন্দাও জানায়; কিন্তু যে ব্যবস্থা থেকে তারা সুবিধা নিয়েছে, সেই ব্যবস্থাকে বহাল রাখে। ক্ষতিপূরণের দাবি এই জায়গাতেই আঘাত করে। কারণ, ক্ষতিপূরণ শুধু কথার কথা নয়—এটি সম্পদ, ক্ষমতা ও নাগরিক অধিকারের সুষম বণ্টনের কথা বলে।

এই পরিস্থিতিতে হাভিয়ের মিলেই আর্জেন্টিনাকে ডোনাল্ড ট্রাম্প ও বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ব্লকে নিয়ে গেছেন। তাঁরা এই প্রতীকী ক্ষমাটুকুও বিশ্বাস করেন না। এই জোট শুধু কূটনৈতিক বন্ধুত্বের নয়, এটি আসলে পুরোনো বর্ণবাদী, ভূরাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্যকে টিকিয়ে রাখার এক যৌথ প্রয়াস।

এই নেতারা বারবার দাবি করেন যে ‘পশ্চিমা সভ্যতা’ হুমকির মুখে এবং একে রক্ষা করতে হবে। তাদের চোখে দাসপ্রথা বা উপনিবেশবাদের ক্ষতিপূরণ চাওয়ার অর্থ হলো পশ্চিমা নৈতিকতার ভিত্তিকে চ্যালেঞ্জ করা।

জাতিসংঘের মার্চের ভোট প্রমাণ করে, এই বর্ণবাদী মানসিকতা শুধু মিলেইয়ের একার নয়, এটি আর্জেন্টিনার দীর্ঘদিনের রাষ্ট্রীয় চরিত্র। বিশ্ব যখন দাসত্বের ইতিহাস কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করছে, আর্জেন্টিনা তখনো নিজেকে শ্বেতাঙ্গ প্রমাণের স্বপ্নে বিভোর। বাস্তবতার সঙ্গে যার কোনো মিল নেই, আর্জেন্টিনা রাষ্ট্র এখনো সেই কাল্পনিক ‘ইউরোপীয় আর্জেন্টিনা’র অহংকার নিয়ে বেঁচে আছে।

  • ফেদেরিকো পিটা আর্জেন্টিনার রাষ্ট্রবিজ্ঞানী।

    আল–জাজিরা থেকে নেওয়া। ইংরেজি থেকে অনূদিত।

Read full story at source