উকিল মুন্সীর উদার একতারা
· Prothom Alo

এ বছরের মে মাসের ঘটনা। নেত্রকোনার হাসনপুর গ্রামে বাউলগানের একটি আয়োজন নিয়ে সেখানকার ইমাম ও ওলামা পরিষদ আপত্তি করে। অনুষ্ঠানটি বন্ধ করার জন্য তারা ফতেহপুর ইউনিয়ন পরিষদকে চিঠি দেয় এবং অনুষ্ঠানটি বন্ধ হয়ে যায়। এ ঘটনা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, গত শতাব্দীর ওই অঞ্চলের মরমি সাধক উকিল মুন্সীর কথা, যিনি একাধারে ইমামতি করতেন, আবার গানও করতেন। তাঁর কৃষ্ণভজন সেই অঞ্চলের হিন্দু–মুসলমান সবার আত্মক্ষুধা মিটিয়েছে।
বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত গোলাম এরশাদুর রহমানের ‘নেত্রকোনার বাউলগীতি’ বইয়ে উল্লেখ আছে, ১৯৫১ সালের ২৮ জানুয়ারি নেত্রকোনার বলি অনন্তপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মাঠে একটি বাউল গানের আসরের আয়োজন করা হয়। আসরের বিরোধিতা করে সেখানকার আলেমসমাজ বাউলবিরোধী লিফলেট প্রচার করে। সেদিন একটি মাহফিলেরও আয়োজন করেন তাঁরা। সেই মাহফিলে বক্তব্য দেন মওলানা আতহার আলী, মওলানা মনজুরুল হক, মওলানা আকবর আলী রেজভী। অন্য দিকে বাউলগানের আসরে গান পরিবেশন করেন উকিল মুন্সী, রশীদ উদ্দীন, উপেন্দ্র সরকার, মিরাজ আলীসহ আরও অনেকে। একসময় দেখা গেল, মাহফিল খালি পড়ে আছে, সব মানুষ বাউল গানের আসরে জমায়েত হয়েছে। এর পর থেকে নেত্রকোনায় এ ধরনের উল্লেখযোগ্য সাংস্কৃতিক সংঘর্ষ ঘটেনি। বাংলাদেশের অন্য অঞ্চলের তুলনায় নেত্রকোনা অঞ্চলটি অপেক্ষাকৃত অসাম্প্রদায়িক। শুধু অসম্প্রাদায়িকই নয়, বরং সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী।
Visit umafrika.club for more information.
উকিল মুন্সীর লেখা ‘আষাঢ় মাইস্যা ভাসা পানি’, ‘অপরাধী হইলেও আমি তর’, ‘আমার গায়ে যত দুঃখ সয়’, ‘এসো হে কাঙালের বন্ধু’, ‘ভিখারি দুয়ারে’, ‘কুলমান যৌবন দিলাম বিসর্জন’-এর মতো বিখ্যাত গানগুলো শুধু ভাটি বাংলার সম্পদই নয়, এগুলো এখন সমগ্র বাংলার বিরহভাবের সম্পদ। উকিল মুন্সী ইমামতির পাশাপাশি গান করতেন, কখনো বাদ্যযন্ত্র ব্যবহার করে, কখনো বাদ্যযন্ত্র ছাড়া, তিনি মাঝেমধ্যে পালাগানের আসরেও যোগ দিতেন।
উকিল মুন্সীর গানে হাওরের রূপ-প্রকৃতি ছাড়াও রাধাকৃষ্ণের চিরায়ত লৌকিক বিরহ এবং ইসলামের সুফি ভাবধারার এক পরম মেলবন্ধন ঘটেছে। কৃষ্ণকে নিয়ে লেখা তাঁর এসব গান সম্ভবত এ অঞ্চলের পূর্বের গীতিকবিদের ধারাবাহিকতারই ফসল। রাধারমন দত্ত, জালাল খাঁর মতো শিল্পীরা তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ। এই গীতিকবিদের রসের উৎস খুঁজতে গেলে আমরা পাব শ্রীকৃষ্ণের অবতার শ্রীচৈতন্যকে, যাঁর জন্ম এ অঞ্চলেই। তাঁর পিতৃভূমি ছিল সিলেটের গোলাপগঞ্জ। প্রাচীনকাল থেকেই নদীপথে বৃহত্তর ময়মনসিংহের নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ ও সুনামগঞ্জের হাওরগুলোর সঙ্গে সিলেটের নিবিড় যোগাযোগ ছিল। শ্রীচৈতন্যদেব স্বয়ং তাঁর সন্ন্যাসজীবনের আগে পূর্ববঙ্গে এসেছিলেন, পদ্মাপারসহ বিভিন্ন অঞ্চলে ধর্ম প্রচার করেছিলেন। তাঁর সহযোগী অদ্বৈত আচার্য ও শ্রীবাস পণ্ডিতের আদিনিবাসও সিলেট অঞ্চলে। তাঁদের কারণেই পুরো উত্তর-পূর্বাঞ্চলে বৈষ্ণব ভাবধারা খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।
সুফি দর্শনের ‘ফানা’ বা স্রষ্টার প্রেমে নিজের অস্তিত্ব বিলীন করা এবং বৈষ্ণব দর্শনের ‘রাধাভাব’ বা কৃষ্ণবিরহে রাধার তনু-মন অঙ্গার হওয়া—এই দুটি ভিন্ন ধারার মূল সুর যে এক, উকিল মুন্সী তাঁর গানে সেটিই অবলীলায় প্রমাণ করেছেন। উকিল মুন্সী অধিকাংশ গানেই এমন রাধার জবানিতে পরমেশ্বরের বিরহ ফুটিয়ে তুলেছেন, যেখানে লৌকিক প্রেম, সমাজ-নিন্দা এবং সবশেষে পরকালের মুক্তি ও স্রষ্টার করুণা ভিক্ষা—সব এক সুতায় গাঁথা পড়েছে।
সে সময় অনেক ইমাম ছিলেন, যাঁরা গজল গাইতেন, কিন্তু কৃষ্ণভজনের কথা চিন্তাও করতে পারতেন না। উকিল সেই জায়গাটি ভেঙেছেন—
‘আর নি আসিবে কৃষ্ণ কলঙ্কী রাই না মইলে
হায় গো দূতি কইও গো শ্যামবন্ধুর নাগাল পাইলে।’
এ গানের শেষাংশে এসে উকিল মুন্সী রাধার আঙিনা থেকে সরাসরি সুফি ভাবধারায় প্রবেশ করেছেন, যা এ অঞ্চলের অন্য গীতিকবিদের থেকে উকিলকে আলাদা করে। উকিল বলছেন—
‘উকিলে কয় বড় পাপী আমি হইলাম এই ভুবনে
দয়ানি করিবেন আল্লায় হাশরের দিনে।’
এখানে রাধার বিরহকে তিনি নিজের জীবনের পাপ ও অপূর্ণতার সমান্তরালে দাঁড় করিয়েছেন। সাধক নিজেকে এই ভুবনের ‘বড় পাপী’ হিসেবে স্বীকার করছেন। কৃষ্ণ-বিরহের সমান্তরালে তিনি এখানে শেষ পর্যন্ত স্রষ্টার কাছে আত্মসমর্পণ করছেন এবং আশা রাখছেন যে শেষ বিচারের দিনে তথা ‘হাশরের দিনে’ দয়াময় আল্লাহ যেন তাঁর প্রতি দয়াপরবশ হন। সুফি দর্শনের ‘ফানা’ বা স্রষ্টার প্রেমে নিজের অস্তিত্ব বিলীন করা এবং বৈষ্ণব দর্শনের ‘রাধাভাব’ বা কৃষ্ণবিরহে রাধার তনু-মন অঙ্গার হওয়া—এই দুটি ভিন্ন ধারার মূল সুর যে এক, উকিল মুন্সী তাঁর গানে সেটিই অবলীলায় প্রমাণ করেছেন।
উকিল মুন্সী অধিকাংশ গানেই এমন রাধার জবানিতে পরমেশ্বরের বিরহ ফুটিয়ে তুলেছেন, যেখানে লৌকিক প্রেম, সমাজ-নিন্দা এবং সবশেষে পরকালের মুক্তি ও স্রষ্টার করুণা ভিক্ষা—সব এক সুতায় গাঁথা পড়েছে। সুফিবাদ ও কৃষ্ণপ্রেমকে তিনি কখনোই যে আলাদা করে দেখেননি, তা নিচের আরেকটি গানের দুটি লাইন থেকেও আমরা বুঝতে পারি:
‘সখী গো, আমার অন্তিমকালে থাকিও নিকটে
প্রাণ থাকিতে লইয়া যাইও জাহ্নবীর ঘাটে।’
এই লাইনে ‘সখী’ কেবল রাধার সখী নন, বরং জীবনের শেষ লগ্নে পাশে থাকা পরম কোনো সহযাত্রী বা নিজের অন্তরঙ্গ সত্তা। সাধকের আর্তি-মৃত্যুর সেই কঠিন ক্ষণে কেউ যেন তাঁকে একা না ফেলে, বরং তাঁর নিকটেই থাকে।
‘জাহ্নবীর ঘাট’ বলতে মূলত গঙ্গা নদীর ঘাটকে বোঝানো হয়েছে, যা সনাতন ধর্মাবলম্বীদের কাছে পরম পবিত্র এবং যেখানে প্রাণত্যাগ করা মোক্ষ বা মুক্তির প্রতীক। একজন মুসলিম লোকসাধক হয়েও উকিল মুন্সী এখানে মুক্তির এক সর্বজনীন, লৌকিক ও ভৌগোলিক প্রতীক ব্যবহার করেছেন, যা এই অঞ্চলের মিশ্র সংস্কৃতির এক অনন্য রূপ।
‘কৃষ্ণ নাম দিও লিখিয়া গঙ্গা মৃত্তিকায়’—এই লাইনে লোকদর্শন স্পষ্ট। বৈষ্ণবমতে, কৃষ্ণ নামের মাহাত্ম্য অপরিসীম। মৃত্যুর সময়ে গঙ্গার পবিত্র মাটি বা তিলকমাটি দিয়ে শরীরে ঈশ্বরের নাম লিখে দেওয়ার এক প্রাচীন রীতি রয়েছে। সাধক চান, শেষ মুহূর্তে তাঁর নশ্বর দেহে যেন সেই পরম আরাধ্যের নাম খোদাই করা থাকে। এখানে ‘কৃষ্ণ’ নামটিকে তিনি কোনো সংকীর্ণ ধর্মীয় গণ্ডিতে না রেখে পরমাত্মা বা পরমেশ্বরের এক লৌকিক প্রতীক হিসেবে গ্রহণ করেছেন।
এ অঞ্চলের অন্য বাউলের মতো উকিলের গানেও নারীর কণ্ঠস্বর শোনা যায়। তিনি রাধাকে অনুভব করে লিখেছেন বলেই হয়তো নারীর দুঃখকে এভাবে চিত্রিত করেছেন। কিন্তু উকিলের ক্ষেত্রে বিষয়টি যেন বেশিই প্রকট। তার প্রমাণ তাঁর শক্তিশালী গান ‘আষাঢ় মাইস্যা ভাসা পানি’। নাই-নাইরির অপেক্ষাকে তিনি যেভাবে এনেছেন, নারীর সত্তায় বিলীন হওয়া ছাড়া এই গান রচনা প্রায় অসম্ভব। হয়তো-বা ব্যক্তিগত জীবনের প্রেমানুভূতিই তাঁকে এমন রাধাসুলভ করেছে।
রাধা-কৃষ্ণবিষয়ক উকিল মুন্সীর এ রকম অসংখ্য গান আছে। অন্যান্য বিচ্ছেদী গীতিকবিদের ক্ষেত্রে এ ধরনের গানের সাধারণত দুটো অর্থ দাঁড়ায়। একটি অর্থ রাধা-কৃষ্ণ সম্পর্কিত, অন্যটি ব্যক্তিগত বিরহ। উকিল মুন্সীর গানের ক্ষেত্রে এই দুটি অর্থের পাশাপাশি আরও দুটি অর্থ রয়েছে। তা হলো পীরভক্তি ও খোদাপ্রেম। একাধিক অর্থ তৈরি হওয়া মহৎ সৃষ্টিরই লক্ষণ। হয়তো উকিল মুন্সী সে জন্যই বেঁচে আছেন।
রাধা-কৃষ্ণের মধ্যে একজন ইমামের এভাবে মজতে পারার আরেকটা কারণ আছে। সেই কারণ শুধু যে ভূমিগত তা নয়, কারণটা উকিলের ছোটবেলা। শোনা যায়, ছোটবেলায় তিনি ঘাটুগান শুনতেন ও করতেন, যেখানে রাধা-কৃষ্ণের পূর্ণ উপস্থিতি রয়েছে। সেখান থেকেই হয়তো তাঁর মধ্যে সংগীতের প্রতি প্রেম ও রাধা-কৃষ্ণের বীজ রোপিত হয়। তবে তাঁর পরিবারের সদস্যদের মতে, তিনি ঘাটুগান শুনেছেন, কিন্তু ঘাটুগান করেননি।
এ অঞ্চলের অন্য বাউলের মতো উকিলের গানেও নারীর কণ্ঠস্বর শোনা যায়। তিনি রাধাকে অনুভব করে লিখেছেন বলেই হয়তো নারীর দুঃখকে এভাবে চিত্রিত করেছেন। কিন্তু উকিলের ক্ষেত্রে বিষয়টি যেন বেশিই প্রকট। তার প্রমাণ তাঁর শক্তিশালী গান ‘আষাঢ় মাইস্যা ভাসা পানি’। নাই-নাইরির অপেক্ষাকে তিনি যেভাবে এনেছেন, নারীর সত্তায় বিলীন হওয়া ছাড়া এই গান রচনা প্রায় অসম্ভব। হয়তো-বা ব্যক্তিগত জীবনের প্রেমানুভূতিই তাঁকে এমন রাধাসুলভ করেছে। তাঁর বাবার মৃত্যুর পর মা দ্বিতীয় বিয়ে করে বোয়ালী থেকে হাসনপুর চলে যান। সেখানকার এক নারীর সঙ্গে তাঁর প্রেম হয়। উকিল তাঁকে নিয়ে রচনা করেছেন তাঁর প্রথম জীবনের বিখ্যাত গান—
‘ধনু নদীর পশ্চিম পাড়ে, সোনার জালালপুর।
সেখানেতে বসত করে, উকিলের মনচোর।’
তাত্ত্বিক দিক থেকে বিচার করলে অনেকে বলতে পারেন, পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নারীদের এই বিরহ, কান্না বা নাই-নাইরির দীর্ঘ প্রতীক্ষাকে পুরুষের দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই চিত্রায়িত করা হয়েছে, যা নারীর একধরনের অভিব্যক্তির নিষ্ক্রিয়তা। কিন্তু উকিল মুন্সীর ক্ষেত্রে এই লৌকিক নিষ্ক্রিয়তাই আধ্যাত্মিক আত্মসমর্পণের এক সর্বোচ্চ রূপ ধারণ করে, যেখানে লিঙ্গভেদের ঊর্ধ্বে উঠে জীবাত্মা পরমাত্মার মিলন-আকাঙ্ক্ষী হয়ে ওঠে।
উকিলের গানের বাইরের দিকে তাকালে দেখা যায়, গ্রামীণ সমাজে একজন নারী যেভাবে ভাইয়ের জন্য অপেক্ষা করে, কাঁদে আর নিজেকে অসহায় ভাবে, তার গানের রাধা বা নাই-নাইরিকেও প্রথম দেখায় তেমনই মনে হয়। মনে হয়, নারী এখানে কেবলই অবলা ও নিষ্ক্রিয়।
কিন্তু গানের গভীরে তাকালে দেখা যাবে আরেক অর্থ। উকিল মুন্সী এখানে জাদু করেছেন অন্য জায়গায়। সুফি ও বাউল দর্শনে নিয়মই হলো ঈশ্বরের কাছে পৌঁছাতে গেলে মানুষকে সব প্রকার আমিত্ব ধুয়েমুছে একদম শূন্য বা ‘ফানা’ হয়ে যেতে হয়। নিজেকে বিলীন করার এই যে চরম আকুতি, তা বোঝানোর জন্য ‘অসহায় রাধা’ বা ‘বিরহী নারী’র চেয়ে উত্তম প্রতীক আর আর কিছুই হতে পারে না।
উকিল মুন্সী কেবল অতীতের ভাটি বাংলার একজন ইমাম বা গীতিকবি নন; তিনি বর্তমান সংকীর্ণ মনস্তত্ত্বের বিরুদ্ধে এক কালজয়ী জবাব। যখনই কোনো ফতোয়া বা লিফলেট দিয়ে বাউল গানের কণ্ঠরোধ করার চেষ্টা করা হয়, তখনই নেত্রকোনার ধনু নদের পারের এই সাধকের গান আমাদের মনে করিয়ে দেয়—বাঙালির আত্মিক মুক্তি কোনো নির্দিষ্ট উপাসনালয়ে বন্দী নয়, তা নদী, হাওর আর বিরহের সুরের মধ্যে একাকার হয়ে আছে।
উকিল মুন্সীর গান হিন্দু ও মুসলমান উভয়ের জন্যই ছিল আধ্যাত্মিক পথ্য। উকিলের ওপর আমার নির্মিত প্রমাণ্যচিত্রের সাক্ষাৎকারে উকিলের নাতি কুলকুল শাহ উকিলের কৃষ্ণভজন সম্পর্কে একটি ঘটনা তুলে ধরেন। তিনি উকিলের ওরস মাহফিল উপলক্ষে একবার মাজারের পার্শ্ববর্তী বেতাই নদের তীরে এক হিন্দুবাড়িতে যান দাওয়াত দেওয়ার জন্য। তখন তাঁরা তাঁকে উকিলের লেখা একটা কীর্তন শোনান এবং বলেন, এটা কলেরা বা ওলাবিবির সময়ে উকিল মুন্সী দিয়ে গেছেন। এখনো বিপদে-আপদে তাঁরা এই গান করেন।
উকিল মুন্সীর জীবনে তাঁর পীরের প্রভাব যথেষ্ট। পীরের প্রতি তাঁর অগাধ ভক্তি প্রকাশ পেয়েছে তাঁর অসংখ্য গানে। তিনি হবিগঞ্জের রিচির দরবার শরিফের মুরিদ ছিলেন, যা তাঁর বাড়ি থেকে দক্ষিণে। তাঁর বিখ্যাত ‘ও দক্ষিণ হাওয়া রে’ গানটিতে সেটি স্পষ্ট। এই গানে শুধুই পীরের প্রেম স্পষ্ট হয়নি, চরম আকারে মানবপ্রেমও ধরা দিয়েছে নতুন অর্থ নিয়ে—
‘ও দক্ষিণ হাওয়া রে—তোরে চোখে নাহি দেখা যায়
দ্বিগুণ জ্বালা বাড়ে বুকে লাগলে হাওয়া গায়।’
এক বর্ণনায় পাওয়া যায়, অসুস্থতার কারণে উকিল মুন্সী একবার ওরসে যেতে পারেননি। ফলে তাঁর পীর সে বছর ওরসে তাঁর গান শুনতে পারেননি। তাতে পীর সাহেব একটু অখুশি হন। উকিল মুন্সী সুস্থ হয়ে দরবারে যান, কিন্তু পীর উকিলের সঙ্গে কথা বলেন না। তিন দিন পর তিনি তাঁর বিখ্যাত গান ‘অপরাধী হইলেও আমি তর’ রচনা করেন।
উকিল মুন্সী কেবল অতীতের ভাটি বাংলার একজন ইমাম বা গীতিকবি নন; তিনি বর্তমান সংকীর্ণ মনস্তত্ত্বের বিরুদ্ধে এক কালজয়ী জবাব। যখনই কোনো ফতোয়া বা লিফলেট দিয়ে বাউল গানের কণ্ঠরোধ করার চেষ্টা করা হয়, তখনই নেত্রকোনার ধনু নদের পারের এই সাধকের গান আমাদের মনে করিয়ে দেয়—বাঙালির আত্মিক মুক্তি কোনো নির্দিষ্ট উপাসনালয়ে বন্দী নয়, তা নদী, হাওর আর বিরহের সুরের মধ্যে একাকার হয়ে আছে।
অনার্য মুর্শিদ: গবেষক ও চলচ্চিত্র নির্মাতা