পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূলের সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে ডিম নিক্ষেপ, মারধর
· Prothom Alo

পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে এতদিন ‘যুবরাজ’ বলে চিহ্নিত তৃণমূল কংগ্রেসের জাতীয় সাধারণ সম্পাদক এবং সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভাতিজা অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে মারধর করা হয়েছে। আজ শনিবার দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলার সোনারপুরে হামলার শিকার হন লোকসভার সদস্য অভিষেক।
Visit tr-sport.bond for more information.
এ ঘটনার জন্য বিজেপির বিরুদ্ধে সরাসরি অভিযোগ করেছে তৃণমূল কংগ্রেস। দলটি বলেছে, পরিকল্পনামাফিক এই ঘটনা রাজ্যের শাসক দল ঘটিয়েছে। তৃণমূল কংগ্রেসের পক্ষ থেকে এ ঘটনার একটি ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে প্রচার করা হয়েছে, তাতে দেখা যাচ্ছে কিছু লোক অভিষেককে যথেচ্ছভাবে কিল–চড়, ঘুষি মারছে। এই ঘটনা ঘটার সময় কাছ থেকে ডিম ছুঁড়েও তৃণমূল নেতাকে মারা হয়।
এদিন দক্ষিণ ২৪ পরগনার সোনারপুরে নিহত দলীয় কর্মী সঞ্জু কর্মকারের পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে যাওয়ার পথে প্রবল বিক্ষোভের মুখে পড়েন তৃণমূলের শীর্ষস্থানীয় নেতা অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। সোনারপুরের একটু আগে নারীরা তাঁকে কালো পতাকা দেখান, আর সোনারপুরে ঢোকার পরে শুরু হয় ডিম বৃষ্টি। বহু মানুষ জড়ো হয়ে ‘চোর চোর’ স্লোগান দিতে শুরু করেন। ধারাবাহিকভাবে ডিম ছোড়ার ফলে অভিষেকের পোশাক বেশ খানিকটা হলুদ হয়ে যায়। তিনি গাড়ি থেকে নেমে একটি বাইকে চড়ে গন্তব্যে পৌঁছনোর চেষ্টা করেন। কিন্তু তাঁর বাইক ঘিরে ধরে বিক্ষোভ দেখাতে শুরু করেন বিক্ষোভকারীরা। তিনি মাথায় হেলমেট পরে নেন। সেটারই উপরেই ডিম বৃষ্টি চলতে থাকে। হেলমেট ও জামাকাপড় হলুদ হয়ে যায়। এক পর্যায়ে মারতে মারতে তাঁর জামাও ছিঁড়ে ফেলা হয়। এ সময় দলীয় নেতা–কর্মী এবং কিছু নিরাপত্তারক্ষী অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে কিছুটা সুরক্ষা দেওয়ার চেষ্টা করেন।
তৃণমূল কংগ্রেসের নেতা অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ওপর ডিম নিক্ষেপ করা হয়। আজ শনিবার ভারতের পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলার সোনারপুরেএরপরে সোনারপুরে নিহত তৃণমূল কর্মী সঞ্জু কর্মকারের পরিবারের সঙ্গে দেখা করেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। সেখানে তাঁকে ঘিরে ধরেন সাংবাদিকেরা। অভিষেক বলেন, ‘এই হলো ডাবল ইঞ্জিন (সরকারের) নমুনা। সবাই চেয়েছিল, ডাবল ইঞ্জিন হোক (ডাবল ইঞ্জিন অর্থাৎ কেন্দ্র ও রাজ্যে একই দলের সরকার) ওরা চায়, আমাদের মেরে ফেলতে। মারুক। আমার মৃতদেহ এখান থেকে বেরোবে।’
হামলার ভয়াবহতা তুলে ধরে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, ‘আমার মাথাটা বেঁচে গেল শুধু হেলমেট ছিল বলে। পুলিশ কোথাও নেই। সব ঘটনার ভিডিও রেকর্ড রইল। পুলিশকে খবর দেওয়া হোক। আমি এখান থেকে বেরিয়ে যেতেই পারি। কিন্তু এই পরিবারের উপর হামলা হবে আমি বেরিয়ে যাওয়ার পরে। আমি এখন এঁদের ছেড়ে যেতে পারব না। নিরাপত্তা বাহিনী পাঠিয়ে আগে এদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হোক।’ হামলায় অভিষেকের চশমা, ঘড়ি ইত্যাদি ভেঙে গেছে বলে স্থানীয় প্রচার মাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে।
‘অভিষেকের পুনর্জন্ম হলো’
এই হামলা রাজনৈতিক নেতা হিসেবে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পুনর্জন্ম ঘটাবে বলে মন্তব্য করেছেন তৃণমূল কংগ্রেসের বিধায়ক ও অন্যতম মুখপাত্র কুনাল ঘোষ। তিনি বলেছেন, ‘সম্পূর্ণ চক্রান্ত করে সংগঠিত এবং পরিকল্পিতভাবে এই হামলা চালানো হয়েছে। এই একইভাবে হামলা চালানো হয়েছিল ভারতের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধীর উপরে। অভিষেকের মতই তাঁরও নিরাপত্তা তুলে নেওয়া হয়েছিল এবং তার কী ফল হয়েছিল তা আমরা দেখেছি।
‘এই হামলার ফলে অভিষেক বন্দোপাধ্যায়ের পুনর্জন্ম ঘটল। এতদিন যাকে অভিহিত করা হতো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভাইপো বলে, আজ তাঁর উপরে আক্রমণ করে তাঁর নেতৃত্বকে প্রতিষ্ঠা করে দেওয়া হল। আজকে যে লড়াই হল…সেই স্নায়ুযুদ্ধকে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় অতিক্রম করে গেছেন এবং এর মধ্য দিয়ে তৃণমূল কংগ্রেসে একটা নতুন অধ্যায়ের সূচনা হলো।’
হামলার মধ্যেই দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলার সোনারপুরে নিহত দলীয় কর্মী সঞ্জু কর্মকারের বাড়িতে গিয়ে তার পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলেন তৃণমূল কংগ্রেস নেতা অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়হামলার নিন্দা জানিয়ে সামাজিক মাধ্যমে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছেন, শাসক ঘাতকে পরিণত হয়েছে।
অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ওপর হামলার ঘটনা নিয়ে ক্ষমতাসীন বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য বলেছেন, ‘এসবের মধ্যে বিজেপি নেই। এ ধরনের ঘটনা সুস্থ, স্বাভাবিক, গণতান্ত্রিক পরিবেশে হয় না। আজ বিজেপি ক্ষমতায় এসেছে বলেই তৃণমূলের নেতারা অক্ষত রয়েছেন। ওরা যে পরিমাণ অত্যাচার মানুষের ওপর করেছে, আমাদের জেলা সভাপতি, আমাদের দলের কর্মীদের ওপর করেছে, তারপর আমরা ছিলাম বলেই ওদের বিধায়ক-সাংসদরা এখনও এই অবস্থায় আছেন। অন্য কোনও দল থাকলে এতক্ষণ সাংবাদিকদের সামনে দাঁড়িয়ে বলার সুযোগ পেতেন না।’
আবার উত্তপ্ত হতে চলেছে পশ্চিমবঙ্গ
এই ঘটনার পরে সন্ধ্যায় অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে হুইলচেয়ারে বসিয়ে শহরের একটি বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে ভর্তি করানো হয়। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়সহ তৃণমূল কংগ্রেসের শীর্ষ নেতারা শনিবার রাতে হাসপাতালে তাঁকে দেখতে গেছেন। তৃণমূল কংগ্রেসের নেতা-নেত্রীদের বক্তব্য থেকে পরিষ্কার, শীর্ষস্থানীয় নেতার ওপরে এই হামলার ঘটনাটিকে সামনে রেখে আপাতত তাঁরা প্রতিবাদের রাজনীতি শুরু করবেন।
একই সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গে হকার উচ্ছেদ এবং বিভিন্ন সমাজকল্যাণমূলক প্রকল্পে নতুন করে নাম নথিভুক্তিকরণের বিষয়টি নিয়ে পথে নামবে তৃণমূল কংগ্রেস। গত দুই মাস ধরে সমাজকল্যাণমূলক প্রকল্পগুলোতে অর্থ সাহায্য পাচ্ছেন না নারীরা, এ নিয়ে ইতিমধ্যেই গরম হয়ে উঠেছে রাজ্য রাজনীতি। এরপরে তৃণমূল কংগ্রেস, যাদের এখনো ৪০ শতাংশ ভোট রাজ্যে রয়েছে, তারা পথে নামলে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি আবার নতুন করে উত্তপ্ত হয়ে উঠবে বলে মনে করছেন রাজ্য রাজনীতির পর্যবেক্ষকরা।