নজরুলের গান গেয়ে ভাইরাল লাইলী বেগম কে, কী করেন

· Prothom Alo

ভবঘুরে সহজাত শিল্পী লাইলী বেগমের বয়স এখন ৬৫। ফরিদপুর শহরের অলিগলি আর ধুলামাখা পথেই কাটে তাঁর জীবন। শহরতলির হারুকান্দি এলাকায় ছোট্ট একটি ঘর থাকলেও সেখানে স্থায়ীভাবে থাকেন না তিনি। ‘যেখানে রাত, সেখানেই কাত’—এভাবেই চলে তাঁর দিনরাত।

গানের প্রতি প্রবল টান লাইলী বেগমকে নিয়ে যায় বিভিন্ন সাংস্কৃতিক আয়োজন, মেলা কিংবা আধ্যাত্মিক গানের আসরে, তা শিল্পকলা একাডেমির মঞ্চ হোক কিংবা গ্রামের কোনো বাউল আসর—দাওয়াত থাকুক বা না থাকুক, হাজির হয়ে যান তিনি। তাঁর একটাই চেষ্টা, যদি কোথাও একটু গান গাওয়া যায়! গান গাওয়াতেই তাঁর আনন্দ।

Visit tr-sport.bond for more information.

তবে সব জায়গায় লাইলী বেগমের সেই ইচ্ছা পূরণ হয় না। কোথাও অপমানিত হন, কোথাও আবার সম্মান দিয়ে মঞ্চে তোলা হয় তাঁকে। এভাবেই চলছে তাঁর সংগীতচর্চা।

কাঁধে একটি থলে আর শরীরে জীর্ণ পোশাক পরে দিনরাত পথেপ্রান্তরে ঘুরে বেড়ান লাইলী বেগম। মুঠোফোন ব্যবহার করেন না। তাই তাঁর খোঁজ পাওয়া সহজ নয়।

ফরিদপুর শহরে তিনি বেশি পরিচিত ‘লাইলী খালা’ নামে। কেউ কেউ ডাকেন ‘লাইলী পাগলি’, আবার অনেকে বলেন ‘মাটির শিল্পী’। সংসারবিবাগি এই শিল্পীর টান মূলত আধ্যাত্মিক গানের প্রতি। লোকগান, কাওয়ালি, লালনগীতি, নজরুলসংগীত—সবই গেয়ে থাকেন তিনি। পাশাপাশি ওয়াজ মাহফিল, নামকীর্তন কিংবা মেলার আসরেও দেখা মেলে তাঁর।

২৪ মে ফরিদপুরে নজরুলজয়ন্তীর এক অনুষ্ঠানে লাইলী বেগম গেয়েছিলেন নজরুল ইসলামের গান ‘নয়ন ভরা জল গো তোমার আঁচল ভরা ফুল’। তাঁর কণ্ঠে গানটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। রাতারাতি আলোচনায় চলে আসেন ভবঘুরে এই শিল্পী।

শৈশবেই মা-বাবাকে হারান লাইলী বেগম। এমনকি তাঁরা কারা ছিলেন, সেটিও জানেন না তিনি। পরে ফরিদপুর শহরের গোয়ালচামট এলাকার এক নারীর কাছে তিনি বড় হন। পালিত মা তাঁকে হারমোনিয়াম কিনে দিয়েছিলেন, গানও শিখিয়েছিলেন। বিভিন্ন সামাজিক ও আধ্যাত্মিক গানের আসরেও সঙ্গে করে নিয়ে যেতেন।

লাইলী বেগমের বয়স এখন ৬৫

লাইলী বেগম ছিলেন হারুকান্দি এলাকার মৃত শেখ ইসলামের প্রথম স্ত্রী। ২০১৫ সালে ক্যানসারে মারা যান তাঁর স্বামী। তাঁদের দুই ছেলে ও দুই মেয়ের মধ্যে মেয়েদের বিয়ে হয়েছে। বড় ছেলে নূর মোহাম্মদ রংমিস্ত্রি আর ছোট ছেলে টুটুল শেখ মাংস ব্যবসায়ী।

পরিবার ও স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ১৩ থেকে ১৫ বছর আগেই স্বামীর বাড়ি ছেড়ে দেন লাইলী বেগম। এরপর আর স্থায়ীভাবে বাড়িতে থাকেননি। কখনো মাজারে, কখনো পল্লিকবি জসীমউদ্‌দীনের বাড়িতে, আবার কখনো কোনো গানের আসরে দেখা মেলে তাঁর। হারুকান্দিতে তাঁর বাড়িতে দুটি জরাজীর্ণ ঝুপড়ি আছে। সেখানে তাঁর দুই ছেলে থাকেন।

লাইলী বেগম বলেন, ছোটবেলায় মায়ের হাত ধরেই গান শেখা। খুব অল্প বয়সে বিয়ে হলেও বিয়ের পরও গান ছাড়েননি। তবে স্বামীর কিছু বাধা ছিল। পরে অনুমতি ছাড়া স্বামী দ্বিতীয় বিয়ে করলে অভিমান করে সংসার ছেড়ে বেরিয়ে যান তিনি। সেই থেকে বেছে নেন ভবঘুরে জীবন।

লাইলী বেগমের ভাষায়, ‘আমাদের কেউ মূল্যায়ন করে না, আমাদের পরিস্থিতি খুবই খারাপ। আমি মূল্য কারও কাছে পেতে চাই না, পাওয়া লাগবেও না; আল্লাহ যদি মূল্য দেয় কিংবা আমার গুরু কৃপাবল হয়।’ তিনি বলেন, ‘গানই আমার জীবন। গান ছাড়া আমি বাঁচতে পারি না; কারণ, গানই মানুষের আত্মার খোরাক। গান গাইলে নিজেরও ভালো লাগে, অন্যেরও ভালোবাসা পাওয়া যায়।’

লাইলী বেগমের ভাষায়, ‘আমি মানুষ দেখি। দুনিয়াতে কত রকমের মানুষ, কারও সঙ্গে কারও মিল নাই। মানুষ দেখতে আমার ভাল্লাগে।’

ফরিদপুরের প্রবীণ সংস্কৃতিকর্মী আলতাফ হোসেন বলেন, ‘প্রায় ২০ বছর ধরে লাইলী বেগমকে দেখছি। তিনি খুবই ভালো মনের মানুষ। শহরের বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে বেড়ান, গান করেন, কিন্তু কারও কোনো ক্ষতি করেন না।’

ফরিদপুর সাহিত্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মফিজ ইমাম বলেন, শিল্প-সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত মানুষেরা লাইলী বেগমকে ভালোভাবেই চেনেন। তাঁর স্থায়ী ঠিকানা নেই বললেই চলে। তাঁর মানবিকতার একটি উদাহরণ তুলে ধরে তিনি বলেন, কোনো অনুষ্ঠানে গান গাওয়ার পর রিকশাভাড়া বাবদ তাঁকে ৩০০ টাকা দেওয়া হয়েছিল। তখন তিনি ১০০ টাকা ফিরিয়ে দিয়ে বলেন, ‘অত লাগবে না, যাগো পেটে খিদে, তাগো বেশি দেন।’

Read full story at source