মূক ও মুখোশ
· Prothom Alo

সেদিন আমি চিকেন টিক্কা-তন্দুরি কিনতে গেছিলাম, নাকি চিকেন ঝাল ফ্রাই আর পরোটা, তাতে কিছুই যায় আসে না। আসল কথা হলো, রেস্টুরেন্টে গিয়ে আমি কী শুনেছিলাম।
Visit saltysenoritaaz.com for more information.
ওহ, আমি কিছু শুনিনি, শুধুই দেখেছিলাম!
ওরা যখন নিজেদের মধ্যে কথা বলছিল, ওদের অলক্ষে, দশ-পনেরো ফিট দূরে বসে সবটাই শুনে ফেলেছিলাম আমি। ওরা ছিল চারজন। সবাই প্রায় সমবয়সী। বয়স ত্রিশের কোঠায়। ওদের মধ্যে একজন ছিল নেতাগোছের, সে-ই বেশি কথা বলছিল। সম্ভবত পরিকল্পনাটা ছিল তার, বাকিরা তাতে সায় দিয়ে গেছে, নতুন কিছু আইডিয়া যোগ করেছে।
ওদের ভয়ংকর পরিকল্পনাটা শোনার পর নিজেকে আর ধরে রাখতে পারিনি। যে খাবারের অর্ডার দিয়েছিলাম, সেটা চলে আসায় ক্যাশ-কাউন্টারে গিয়ে বিল দেওয়ার পরও রেস্টুরেন্ট থেকে বের না হয়ে ওয়েটিং এরিয়ায় বসে ছিলাম। একপর্যায়ে ওদের মধ্যে একজন আমার দিকে সন্দেহের দৃষ্টিতে তাকালে সঙ্গে সঙ্গে পকেট থেকে ফোন বের করে কাউকে কল করার অভিনয় করি আমি।
রেস্টুরেন্টটা কোর্ট-কাচারি এলাকায়, সব সময় ওখানে টহল পুলিশ থাকে; কিন্তু সেদিন বাইরে এসে দেখি, কোনো পুলিশ নেই। অগত্যা রাস্তার ডান দিকে সিএমএম কোর্টের প্রবেশমুখের সামনে পুলিশের একটা টহল দল দেখে সেদিকে এগিয়ে যাই। বুকপকেটের ওপর ‘নেওয়াজ’ লেখা এক অফিসারকে সবটা খুলে বলতেই ভদ্রলোক সন্দেহের দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকালেন। আমার হাতে খাবারের প্যাকেটটাও দেখে নিলেন চকিতে। রাতের এ সময় অনেকেই মদ্যপানের সঙ্গে খাওয়ার জন্য মাংস-পরোটা-তন্দুরি-নান কিনে বাসায় নিয়ে যায়। আমাকেও সে রকম কিছু ভেবেছিলেন বোধ হয়। আস্তে করে আমার মুখের কাছে নাক নিয়ে গন্ধ শোঁকারও চেষ্টা করেছিলেন ভদ্রলোক। বাধ্য হয়ে নিজের লেখক পরিচয়টা দিতে হয়েছিল তাঁকে, যেন আমাকে একটু আলাদা চোখে দেখেন। তাতে অবশ্য কাজও হলো।
একটা দীর্ঘশ্বাস বের হয়ে এল ভেতর থেকে। আমাদের মধ্যে প্রেমের একটা ভাবও তৈরি হয়ে গিয়েছিল, কিন্তু তারপরই অতি ধনী পরিবারের মেয়েটি উচ্চশিক্ষার্থে বিদেশে চলে যায়। এখানেই সমাপ্তি ঘটে আমার অবিকশিত প্রেম-পর্বের। ‘একটা পারসোনাল রিজনে শিখেছিলাম,’ অবশেষে তাকে বললাম। ‘আপনি এদের ইন্টারোগেট করলেই বুঝতে পারবেন, কত ভয়ংকর প্ল্যান করছে এরা।’
‘দেরি করবেন না, প্লিজ! ওরা তাহলে চলে যাবে।’ তাড়া দিয়ে বলেছিলাম লোকটাকে।
কয়েকজন কনস্টেবলসহ আমাকে নিয়ে সেই রেস্টুরেন্টে গেলেন নেওয়াজ সাহেব। ভাগ্য ভালো, ওই চারজন তখনো টেবিলে বসে নিজেদের মধ্যে কথা বলে যাচ্ছিল, তাদের টেবিলে ছিল আধখাওয়া চিকেন গ্রিল আর পরোটা। চারজন পুলিশ আর আমাকে দেখে ভড়কে গেল লোকগুলো।
পুলিশ তাদের জেরা করতে গেলে আমি জানালাম, ওরা বোবা, কথা বলতে পারে না।
‘কী!’ ভীষণ অবাক হলেন নেওয়াজ সাহেব। ‘তাইলে আপনি ক্যামনে ওগোর কথা শুনলেন?’
‘শুনিনি, দেখেছি...ওরা সাইন ল্যাঙ্গুয়েজে কথা বলছিল।’
‘আপনে সাইন ল্যাঙ্গুয়েজ বোঝেন?’ বিস্মিত পুলিশ। ‘কিন্তু আপনে তো বোবা না...এই সব ক্যামনে বোঝেন?’
‘শিখেছি।’
‘ক্যান?’
সত্যিটা হলো, অনেক বছর আগে, প্রথম দর্শনেই এক সুন্দরী মেয়ের প্রেমে পড়ে গেছিলাম আমি। পরিচয় পর্বে আবিষ্কার করি, মেয়েটা বোবা। কিন্তু এই সত্যিটা জানার পর ওই মেয়ের প্রতি আমার প্রেমের কোনো হেরফের হয়নি, বরং একধরনের মায়া জন্মে যায়। মেয়েটার সঙ্গে যাতে কথা বলতে পারি, ঘনিষ্ঠ হতে পারি, সে জন্য ওই মেয়ের কাছেই সাইন ল্যাঙ্গুয়েজ শিখতে শুরু করি।
একটা দীর্ঘশ্বাস বের হয়ে এল ভেতর থেকে। আমাদের মধ্যে প্রেমের একটা ভাবও তৈরি হয়ে গিয়েছিল, কিন্তু তারপরই অতি ধনী পরিবারের মেয়েটি উচ্চশিক্ষার্থে বিদেশে চলে যায়। এখানেই সমাপ্তি ঘটে আমার অবিকশিত প্রেম-পর্বের।
‘একটা পারসোনাল রিজনে শিখেছিলাম,’ অবশেষে তাকে বললাম। ‘আপনি এদের ইন্টারোগেট করলেই বুঝতে পারবেন, কত ভয়ংকর প্ল্যান করছে এরা।’
পুলিশ অফিসার আমার দিকে কটমট চোখে তাকালেন। খুবই শরমিন্দা হলাম আমি। মনে হলো, আমার গল্পে আমিই টুইস্ট খেয়ে বসে আছি! ‘আপনি কি বিডিএসএল শিখেছিলেন?’ ইনস্ট্রাক্টর ভদ্রলোক এবার আমাকে জেরা করল। ‘বিডিএসএল মানে?!’ ‘আমাদের স্কুলে শেখানো হয় বাংলাদেশি সাইন ল্যাঙ্গুয়েজ বিডিএসএল। আপনি কোনটা শিখছেন?’
‘আরে, ক্যামনে পুছতাছ করুম!’ বিরক্ত হলেন পুলিশ অফিসার। ‘এরা তো কানে শুনে না, কথাও কইতে পারে না।’
‘তাহলে সাইন ল্যাঙ্গুয়েজ বোঝে, এমন কাউকে ডাকুন।’
‘কী মুসিবত...আমি এহন কইত্থেকা এই সব লোক পামু!’ কণ্ঠে তাঁর বিরক্তি। ‘আপনে জানেন...কিন্তু আপনে তো অভিযোগকারী, আপনেরে দিয়া কাম হইব না।’
‘বিষয়টা খুবই গুরুতর,’ জোর দিয়ে বললাম তাকে। ‘একজনকে খুন করবে এরা, লাশটা কীভাবে গুম করা যায়, সেই প্ল্যান করছে।’
‘বুঝছি,’ নেওয়াজ সাহেব বললেন। ‘থানায় চলেন সবাই।’
থানায় গিয়েও সাইন ল্যাঙ্গুয়েজ বোঝে, এমন কাউকে খুঁজে পাওয়া গেল না। এদিকে চারজন বোবা সুযোগ পেলেই আমার দিকে হিংস্র দৃষ্টিতে তাকাতে লাগল। অবশেষে বোবাদের মধ্যে নেতাগোছের লোকটা নেওয়াজ সাহেবকে একটা ফোন নম্বর দিল, সেই নম্বরে ফোন করার পনেরো মিনিট পর থানায় হাজির হলো মাঝবয়সী এক লোক, নিজেকে মূক ও বধির স্কুলের ইনস্ট্রাক্টর হিসেবে পরিচয় দিল সে।
‘এরা আমার স্কুলের প্রাক্তন ছাত্র,’ চারজনকে দেখিয়ে বলল ইনস্ট্রাক্টর। ‘বর্তমান ছাত্রদের জন্য ওরা একটা মঞ্চনাটক করার পরিকল্পনা করছে...নাটকটা একটা লাশ নিয়ে...চারজন লোক লাশটা গুম করতে গিয়ে আরও কিছু খুন করে ফেলে, সেগুলো গুম করতে গিয়ে আরও বড় সমস্যায় পড়ে যায়।’
পুলিশ অফিসার আমার দিকে কটমট চোখে তাকালেন। খুবই শরমিন্দা হলাম আমি। মনে হলো, আমার গল্পে আমিই টুইস্ট খেয়ে বসে আছি!
‘আপনি কি বিডিএসএল শিখেছিলেন?’ ইনস্ট্রাক্টর ভদ্রলোক এবার আমাকে জেরা করল।
‘বিডিএসএল মানে?!’
‘আমাদের স্কুলে শেখানো হয় বাংলাদেশি সাইন ল্যাঙ্গুয়েজ বিডিএসএল। আপনি কোনটা শিখছেন?’
‘মনে হইতাছে খুনখারাবি নিয়া লিখতে লিখতে আপনের মাথাটাই গেছে,’ পুলিশের লোকটা ভর্ৎসনার সুরে বললেন আমাকে। ওই দিন চরম বিব্রত হয়েছিলাম, নিজেকে খুব হাস্যকর লাগছিল। ঠান্ডা খাবার নিয়ে থানা থেকে বাড়িতে ফিরে না খেয়েই শুয়ে পড়েছিলাম। কিন্তু এ ঘটনার মাসখানেক পর পত্রিকায় একটা খবর দেখে নড়েচড়ে বসলাম আমি
এবার আমি বোবা। আগেই বলেছি, ডোরিনের কাছ থেকে শিখেছি এটা, ও আমাকে এসব কিছুই বলেনি।
‘এই দেশে ২০০৯ সাল থেকে সরকার বিডিএসএলকে অফিশিয়াল ল্যাঙ্গুয়েজ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে।’ ইনস্ট্রাক্টর বলল। ‘আপনি মনে হয় আইপিএসএল শিখছেন।’
আমি লোকটার দিকে তাকিয়ে রইলাম। এ ব্যাপারে আমার কোনো ধারণাই নেই।
‘ইন্দো-পাকিস্তানি সাইন ল্যাঙ্গুয়েজ...ওইটার সঙ্গে বিডিএসএলের অনেক তফাত আছে।’ ভদ্রলোক এবার দীর্ঘশ্বাস ফেলে মাথা দোলাল। ‘এ কারণেই আপনি পুরাপুরি ধরতে পারেন নাই...হুদাই ভুল বুঝছেন।’
আমার ধারণা ছিল, সারা দুনিয়াতে একটা সাইন ল্যাঙ্গুয়েজই শ্রবণ আর বাক্প্রতিবন্ধীরা ব্যবহার করে থাকে।
‘মনে হইতাছে খুনখারাবি নিয়া লিখতে লিখতে আপনের মাথাটাই গেছে,’ পুলিশের লোকটা ভর্ৎসনার সুরে বললেন আমাকে।
ওই দিন চরম বিব্রত হয়েছিলাম, নিজেকে খুব হাস্যকর লাগছিল। ঠান্ডা খাবার নিয়ে থানা থেকে বাড়িতে ফিরে না খেয়েই শুয়ে পড়েছিলাম।
কিন্তু এ ঘটনার মাসখানেক পর পত্রিকায় একটা খবর দেখে নড়েচড়ে বসলাম আমি; ‘মূক ও বধির সমিতির তহবিল তছরুপের ঘটনার জেরে একজন খুন। দীর্ঘদিন নিখোঁজ থাকার পর নিহত ব্যক্তির লাশ উদ্ধার। সন্দেহভাজন একজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ, তবে ঘটনায় জড়িত বাকি চারজন এখনো পলাতক।’
পত্রিকায় ছবি দেখে ভিরমি খেলাম। সেই ইনস্ট্রাক্টর লোকটা!