ইশ্‌, মা যদি দেখতেন!

· Prothom Alo

ক্যানসারে ভুগে মারা গেছেন মা। দুর্ঘটনায় হারিয়েছেন বোনকেও। প্রিয়জনদের হারানোর শোককেই শক্তিতে রূপান্তর করেছেন আহমেদ সাজিদান জারজিস। মা–বোনের নামে গড়ে তুলেছেন শিরিন সাজমিলা ফাউন্ডেশন। সম্প্রতি কৃত্রিম অঙ্গভিত্তিক একটি উদ্ভাবন তাঁকে এনে দিয়েছে বড় পুরস্কার।

Visit betsport.cv for more information.

মায়ের যখন ক্যানসার ধরা পড়ে, আহমেদ সাজিদান জারজিস তখন দশম শ্রেণির ছাত্র। সামনে মাধ্যমিক পরীক্ষা। ঢাকা মেডিকেল কলেজে বসেই পড়ালেখা করতেন। এরই মধ্যে ইউনাইটেড ওয়ার্ল্ড কলেজে (ইউডব্লিউসি) ভর্তির জন্য সাক্ষাৎকারের ডাক পড়ে। যেতে হবে মাকেও। অসুস্থতা নিয়েই ছেলের সঙ্গে ইউডব্লিউসির গুলশান অফিসে গিয়েছিলেন মা শিরিন এ চৌধুরী। কাগজপত্র দেখে, আলাপ শেষে কর্তৃপক্ষ বলেছিল, ‘আপনার ছেলে খুবই মেধাবী। কিন্তু ফুল ফান্ডেড স্কলারশিপ বোধ হয় আমরা দিতে পারব না।’ শুনে মা সেদিন বলেছিলেন, ‘আজ হোক বা কাল, আমার ছেলে বড় কিছু করবেই। ওকে না পেলে আপনাদেরই ক্ষতি।’

মায়ের আত্মবিশ্বাস যে বাড়াবাড়ি ছিল না, তা জারজিস প্রমাণ করেছেন। ২ মে ফাউলার গ্লোবাল সোশ্যাল ইনোভেশন চ্যালেঞ্জ ২০২৬-এ প্রথম হয়েছেন তিনি। সামাজিক ও পরিবেশগত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় তরুণ উদ্যোক্তাদের অনুপ্রাণিত করতে এই প্রতিযোগিতার আয়োজন করে যুক্তরাষ্ট্রের সান ডিয়াগো বিশ্ববিদ্যালয়। পুরস্কার হিসেবে জারজিস পেয়েছেন ২৫ হাজার মার্কিন ডলার। শুধু আফসোস একটাই, ছেলের অর্জন মায়ের আর দেখা হলো না।

এই নারী ডুবুরিরা কৃত্রিম অক্সিজেন ছাড়াই সমুদ্রতলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটিয়ে দেন

ইউডব্লিউসির চীন ও নেদারল্যান্ডস ক্যাম্পাস থেকে উচ্চমাধ্যমিক শেষে বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট ওলাফ কলেজে চতুর্থ বর্ষে পড়ছেন জারজিস। পাশাপাশি হার্ভার্ড মেডিক্যাল স্কুলের ডানা-ফারবার ক্যানসার ইনস্টিটিউটে ডেটা অ্যানালিস্ট হিসেবে কাজ করেন তিনি। সাশ্রয়ী মূল্যের কৃত্রিম অঙ্গভিত্তিক একটি ‘চলাচল সহায়ক ব্যবস্থা’ তৈরি করেছেন এই তরুণ, নাম দিয়েছেন ‘অ্যাপেক্স স্ট্রাইড’। এই উদ্ভাবনই তাঁকে পুরস্কার এনে দিয়েছে।

জারজিসের বেড়ে ওঠা চট্টগ্রামে। মা ছিলেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। বাবা সাবেক ব্যাংক কর্মকর্তা।

‘বাকি মায়েদের জন্য কাজ করবি’

জারজিসের যখন এসএসসি পরীক্ষা চলছে, মা তখন শয্যাশায়ী। বোন সাজমিলা জিশমাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি প্রস্তুতি নিয়ে ব্যস্ত। খুব কঠিন একটা সময় গেছে তখন। ‘ভোর পাঁচটায় উঠতাম। মাকে গোসল করিয়ে, খাইয়ে, তারপর পরীক্ষা দিতে যেতাম। আমাদের দেশে এসএসসি পরীক্ষা একটা উৎসবের মতো। অন্যদের দেখতাম মা-বাবারা সঙ্গে আসত। সাহস দিত। আর আমাকে উল্টো মাকে নিয়ে দুশ্চিন্তা করতে হতো।’ বলতে বলতে জারজিসের গলা ধরে আসে।

২০২২ সালে চিকিৎসার জন্য তাঁরা কলকাতা গিয়েছিলেন। সেখানেই রাস্তা পার হতে গিয়ে দুর্ঘটনার শিকার হন জারজিসের মা ও বোন। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান বোন সাজমিলা। মা-ও মারা যান দুর্ঘটনার ৪০ দিন পর।

মা-বোনকে হারিয়ে জারজিস ভীষণ ভেঙে পড়েছিলেন। তিনি বলেন, ‘অনেক চেষ্টা করেছিলাম আমার মাকে, বোনকে শেষ সময়ে একটু সাপোর্ট দিতে। কিন্তু অনেক কিছুই তো করতে পারিনি। সেই রিগ্রেট থেকেই ভাবতে শুরু করি, কীভাবে দুর্ঘটনার শিকার মানুষের জন্য কিছু একটা করা যায়…’

দেশের হাসপাতালগুলোয় ঘুরে ঘুরে দুর্ঘটনার শিকার মানুষের সঙ্গে কথা বলতে শুরু করেন চট্টগ্রামের এই তরুণ। একই কাজে ভারতের হাসপাতালগুলোয়ও ঘুরেছেন। পরে হার্ভার্ডের মতো বড় বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তারা গবেষণা শুরুর পরামর্শ দেয়। জারজিস জনস্বাস্থ্য নিয়ে গবেষণা শুরু করেন।

গবেষণা ও নকশা তৈরিতেই চলে যায় দুই বছর। এরপর আড়াই বছর ধরে অ্যাপেক্স স্ট্রাইডের নির্মাণকাজে যুক্ত আছেন। জারজিস বলেন, ‘শেষ দিকে তো মা কথা বলতে পারতেন না, শুধু চোখে চোখে কথা হতো। কিন্তু মনে আছে একবার বলেছিলেন, “তুই বাকি বোনদের জন্য, মায়েদের জন্য সারা দুনিয়ায় কাজ করবি। টাকাপয়সার দিকে কোনো দিন ঝুকবি না।” তাঁর কথা মনে রেখেছি।’

মায়ের কথা মনে রেখে সারা দুনিয়ার জন্য কাজ করার চেষ্টা করছেন জারজিস

‘অ্যাপেক্স স্ট্রাইড’ কী

জারজিস জানালেন, বাংলাদেশের মতো দেশগুলোয় কৃত্রিম অঙ্গপ্রত্যঙ্গ সাধারণত পশ্চিমা দেশ থেকে আমদানি করা হয়, যা অত্যন্ত ব্যয়বহুল। খরচ পড়ে যায় ৫-২০ লাখ টাকা। আমদানি করা এসব অঙ্গপ্রত্যঙ্গ এ দেশের আবহাওয়ার উপযোগী নয়। এ অঞ্চলে বাতাসে আর্দ্রতা বেশি। ফলে ঘাম হয়। কিন্তু আমদানি করা কৃত্রিম অঙ্গ ঘাম শোষণ করতে পারে না। এতে সংক্রমণের ঝুঁকি তৈরি হয়। এসব সমস্যা সমাধানের জন্যই কাজ করছেন তিনি।

রাফসানের উদ্ভাবন ‘অ্যাপেক্স স্ট্রাইড’ আর্দ্রতা, অসমতল রাস্তা এবং সীমিত চিকিৎসা–সুবিধার মধ্যেও কার্যকর হতে পারে। তাঁর দাবি, এটি ৮০ শতাংশ খরচ কমাবে। অধিকাংশ কৃত্রিম অঙ্গপ্রত্যঙ্গ এককালীন ব্যবহার করা যায়। তবে ‘অ্যাপেক্স স্ট্রাইড’ শরীরের বৃদ্ধির সঙ্গে মানিয়ে নিতে সক্ষম। ফলে বারবার পরিবর্তন করতে হবে না। খরচ বাঁচবে।

জারজিস বলেন, ‘একজন প্রতিবন্ধী মানুষও যে পাহাড়ে উঠতে পারেন, সেই ধারণাই আমাদের দেশে নেই। কিন্তু এই যন্ত্রের মাধ্যমে তাঁরা সেটা করতে পারবেন।’ তাঁর লক্ষ্য শুধু কৃত্রিম অঙ্গ তৈরি করা নয়, বরং একটি বিস্তৃত ও টেকসই স্বাস্থ্যসেবাকাঠামো গড়ে তোলা।

ফাউলার গ্লোবাল সোশ্যাল ইনোভেশন চ্যালেঞ্জ ২০২৬-এ অ্যাপেক্স স্ট্রাইডের কার্যক্রম বুঝিয়ে বলছেন জারজিস

শিরিন-সাজমিলা ফাউন্ডেশন

জারজিস ছোটবেলা থেকেই সৃজনশীল কাজে যুক্ত ছিলেন। তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ার সময়ও মায়ের ক্লাসে বসে লেকচার শুনতেন। ১৪ বছর বয়সে আন্তর্জাতিক কনফারেন্সে প্যানেল আলোচক হয়েছিলেন। চট্টগ্রামের বস্তির শিশুদের নিয়ে কাজ করতে কিশোর বয়সে প্রতিষ্ঠা করেন ‘ড্রিম ফাউন্ডেশন’। মা ও বোনের মৃত্যুর পর সেটির নাম দেন ‘শিরিন সাজমিলা ফাউন্ডেশন’। বর্তমানে এটি যুক্তরাষ্ট্রের একটি নিবন্ধিত এনজিও।

বাংলাদেশ, ভারত, মিসর, সুদান, কঙ্গোসহ দক্ষিণ এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকার বিভিন্ন অঞ্চলে এই ফাউন্ডেশন কাজ করেছে। এসব অঞ্চলে গত কয়েক বছরে শিরিন সাজমিলা ফাউন্ডেশন স্বাস্থ্যসেবা, প্রস্থেটিক (কৃত্রিম অঙ্গ) সহায়তা, মাতৃস্বাস্থ্য, শরণার্থী পুনর্বাসন, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা এবং মানবিক সহায়তামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করেছে।

গাজায় যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর এই সংগঠনের মাধ্যমে সেখানে ত্রাণ নিয়ে গিয়েছিলেন জারজিস। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে আহতদের চিকিৎসা সহায়তায় কাজ করেছে তাঁর সংগঠন। মাইলস্টোনে বিমান দুর্ঘটনায় আহত ব্যক্তিদের পাশেও দাঁড়িয়েছিল শিরিন সাজমিলা ফাউন্ডেশন।

আহমেদ সাজিদান জারজিস

বিশ্বমানের গবেষণাগার প্রতিষ্ঠা

দেশেই কৃত্রিম অঙ্গপ্রত্যঙ্গ নিয়ে কাজ করতে চান জারজিস। চট্টগ্রামে বিশ্বমানের গবেষণাগার প্রতিষ্ঠা করার ইচ্ছে আছে তাঁর। গবেষণার জন্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম কিনতে পড়াশোনার পাশাপাশি খাবার সরবরাহের কাজ করতেন তিনি। তিনি বলছিলেন, ‘আমি কোনো দিন বাইরে খাবার খেতে যাইনি। মাথায় ছিল, আমি ডলারে আয় করছি। এক-দুই বছর যদি সঞ্চয় করি, ১০-১৫ লাখ টাকা আমি এই কাজের জন্য জমাতে পারব।’

বিভিন্ন প্রতিযোগিতা থেকে প্রাপ্ত অর্থ বড় কিছু করার সাহস দিচ্ছে এই তরুণকে। ফাউলার গ্লোবাল সোশ্যাল ইনোভেশন চ্যালেঞ্জ ২০২৬-এর পুরস্কার তো আছেই, গত এপ্রিলে ওলি কাপ নামে আরেকটি প্রতিযোগিতায় জিতেছেন সাড়ে ৭ হাজার মার্কিন ডলার। পুরস্কারের এই অর্থ ব্যয় করবেন গবেষণাগারের কাজে। ইতিমধ্যে থ্রিডি প্রিন্টার কেনার চেষ্টা শুরু করেছেন। এটি লেজার প্রযুক্তি ব্যবহার করে কৃত্রিম অঙ্গ তৈরিতে সাহায্য করবে।

গবেষণার পাশাপাশি উৎপাদনও শুরু করতে চান জারজিস। তাঁর স্বপ্ন—বাংলাদেশকে কেন্দ্রে রেখে দক্ষিণ এশিয়া একসময় এই প্রযুক্তির হাব হিসেবে গড়ে উঠবে। এমআইটি, হার্ভার্ডের মতো বিশ্ববিদ্যালয় এই কাজের সঙ্গে যুক্ত হবে। এ ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত যোগাযোগকে কাজে লাগাতে শুরু করেছেন তিনি। তাঁর প্রত্যাশা, এই কাজে বিদেশি বিনিয়োগও পাওয়া যাবে। যাঁদের নানা শারীরিক প্রতিবন্ধকতা আছে, তাঁদেরই প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন কাজে নিয়োগ দিতে চান জারজিস। কারণ, তাঁরাই প্রয়োজনীয়তাটা সবচেয়ে ভালো বুঝবেন।

কানের লালগালিচা থেকে ভাইরাল জুটিকে চিনে নিন

Read full story at source