কাসুন্দিতে সংসারে হাসি

· Prothom Alo

বেড়া উপজেলার মৈত্রবাঁধা, চরপাড়াসহ আরও কয়েকটি পাড়ামহল্লায় তৈরি হয় কাসুন্দি। তৈরি ও বিক্রির সঙ্গে জড়িত প্রায় সবাই নারী।

Visit fishroad-app.com for more information.

ভোরের আলো ঠিকমতো ফোটার আগেই পাবনার বেড়া পৌর এলাকার মৈত্রবাঁধা মহল্লা জেগে ওঠে। চারপাশে ভেসে আসে ঢেঁকির ঠকঠক শব্দ। কোথাও হাঁড়িতে পানি ফুটছে, কোথাও নারীরা বসে মসলা মিশাচ্ছেন। রোদ উঠতেই উঠানজুড়ে শুকাতে দেওয়া হয় নানা মসলা। পুরো এলাকা যেন একসঙ্গে কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ে।

তবে এমন দৃশ্য শুধু শেখপাড়া মহল্লাতেই নয়, বেড়া উপজেলার মৈত্রবাঁধা, চরপাড়াসহ কয়েকটি পাড়ামহল্লাতেও দেখা যায়। আর এই পুরো আয়োজনের সঙ্গে জড়িত প্রায় সবাই নারী। তাঁদের হাত ধরেই তৈরি হয় বাঙালির পরিচিত ও জনপ্রিয় খাবার কাসুন্দি। আর এই কাসুন্দি শুধু একটি খাবার নয়, বরং অনেক নারীর জীবিকা ও বেঁচে থাকার ভরসা। যদিও এ কাজের সময় মাত্র দুই থেকে তিন মাস।

সম্প্রতি শেখপাড়া, মৈত্রবাঁধাসহ কয়েকটি গ্রাম ঘুরে দেখা যায়, সকাল থেকেই বাড়িগুলোতে ভিড় বাড়ে। কলস, ডেকচি নিয়ে পাইকারি ক্রেতারা আসেন কাসুন্দি কিনতে। বেশির ভাগই নারী। তাঁরা কাসুন্দি কিনে আশপাশের গ্রাম, বাজার, এমনকি দূরের এলাকাতেও বিক্রি করতে যান। কেউ হেঁটে, কেউ ভ্যানে, কেউ বাসে। দিন শেষে তাঁরা ফিরে আসেন হাতে কিছু টাকা নিয়ে।

পাইকারি দরে কাসুন্দি কিনে বিভিন্ন এলাকার বাড়িতে ও বাজারে ফেরি করে বিক্রি করেন শেখপাড়া মহল্লার নাদিরা বেগম (৫৫)। তিনি বলেন, ‘প্রতিদিন ভোরে মৈত্রবাঁধার একটি বাড়ি থেকে পাইকারি দরে কাসুন্দি কিনে বের হই। সারা দিন দূরদূরান্তের বিভিন্ন এলাকায় ফেরি করে কাসুন্দি বেচি। এতে দিনে চার-পাঁচ শ টাকা লাভ থাকলে তা-ই আমাগরে জন্য অনেক।’

দুই মাসের আয়ে বারো মাস

বৈশাখ ও জ্যৈষ্ঠ মাসজুড়েই চলে কাসুন্দির মৌসুম। বছরের এই মাত্র দুই মাস ঘিরেই বেড়া উপজেলার বিভিন্ন গ্রামের তিন শতাধিক নারীর সংসারে আসে বাড়তি আয়। এই সময়ে নারীরা মূলত দুভাবে কাসুন্দির সঙ্গে জড়িত থাকেন।

একদল নারী বাড়ির সদস্য কিংবা কয়েকজন প্রতিবেশী মিলে দল গঠন করে কাসুন্দি তৈরি করেন। উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে এভাবে অন্তত ২৫ বাড়িতে চলে কাসুন্দি তৈরির কাজ। তৈরি করা কাসুন্দি তাঁরা পাইকারি দরে বিক্রি করে দেন খুচরা বিক্রেতাদের কাছে। আর এই খুচরা বিক্রেতাদের বেশির ভাগই নারী। তাঁরা কলস বা ডেকচিভর্তি কাসুন্দি কিনে উপজেলার বিভিন্ন গ্রাম, হাটবাজার এমনকি আশপাশের উপজেলার প্রত্যন্ত এলাকাগুলোতে ঘুরে ঘুরে বিক্রি করেন।

তবে পুরো প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকে কাসুন্দি তৈরির সঙ্গে জড়িত নারীদের। কারণ, এই কাজ শুধু পরিশ্রমের নয়, দক্ষতারও। মসলার পরিমাণ, রোদে শুকানো, গুঁড়া করা থেকে শুরু করে মিশ্রণ তৈরির প্রতিটি ধাপে দরকার অভিজ্ঞতা।

কাসুন্দি তৈরির সঙ্গে জড়িত নারীরা জানান, মৌসুমে একেকজনের ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত আয় হয়। এই টাকা দিয়েই তাঁরা বছরের বাকি সময়ের অনেক খরচ সামলান। কেউ সন্তানের পড়াশোনার খরচ দেন, কেউ ঘর মেরামত করেন, কেউ ঋণ শোধ করেন। আবার অনেকে কিছু টাকা সঞ্চয়ও করেন।

শেখপাড়া মহল্লার রোকেয়া খাতুন (৩৫) বলেন, ‘এই দুই মাসের জন্য সারা বছর অপেক্ষায় থাকি। এই সময়ে আমাগরে খুব পরিশ্রম হলিউ এই কাজটায় আমরা আনন্দ পাই। আর এই সময়ে আমরা যে আয় করি, তাতে আমাগরে পুরো বছরের খরচ চইল্যা যায়।’ পাশে বসা আনু খাতুন (৫৫) বলেন, ‘এই কাজটা সারা বছর করব্যার পারলি ভালো হতো, কিন্তু এই সময়টুকুই আমাগরে ভরসা।’

ঐতিহ্য থেকে ব্যবসা

একসময় বেড়ার বিভিন্ন গ্রামে কাসুন্দি শুধু নিজের বাড়ির জন্য বানানো হতো। প্রায় ৩০ বছর আগে মৈত্রবাঁধা মহল্লার গঙ্গা রানী নামের এক নারী প্রথম কাসুন্দি বিক্রি শুরু করেন। তাঁর বানানো কাসুন্দির স্বাদের সুনাম ছড়িয়ে পড়ে আশপাশের গ্রামে। তাঁর কাছ থেকেই শেখেন গ্রামের অন্য নারীরা। ধীরে ধীরে বিষয়টা বড় হয়। এখন অন্তত ২৫টি বাড়িতে কাসুন্দি বাণিজ্যিকভাবে তৈরি হয়। আর প্রায় তিন শ নারী এর সঙ্গে যুক্ত—কেউ বানান, কেউ বিক্রি করেন।

যেভাবে তৈরি হয় কাসুন্দি

কাসুন্দি বানাতে লাগে রাই শর্ষে, জিরা, হলুদ, শুকনা মরিচ, ধনে, তেজপাতাসহ নানা মসলা। প্রথমে এসব মসলা ভালো করে রোদে শুকানো হয়। এরপর ঢেঁকিতে বা মেশিনে আলাদা আলাদা গুঁড়া করা হয়। এরপর ফুটানো গরম পানির সঙ্গে রাই শর্ষের গুঁড়া মেশানো হয়। পরে তাতে লবণ আর অন্য মসলাগুলো পরিমাণমতো দিয়ে ভালোভাবে মিশিয়ে নেওয়া হয়। এভাবেই তৈরি হয় কাসুন্দি।

স্বাবলম্বী হচ্ছেন নারীরা

কাসুন্দি তৈরির পুরো কাজটাই সামলান নারীরা। নিজেরাই কাসুন্দি তৈরি করেন, বিক্রি করেন এবং টাকার হিসাব রাখেন। ফলে এই কাজ শুধু তাঁদের বাড়তি আয়ের সুযোগই তৈরি করেনি, অনেক নারীকে করেছে আত্মবিশ্বাসী ও স্বাবলম্বী।

মৈত্রবাঁধা মহিলা সমবায় সমিতির সাধারণ সম্পাদক শিখা রাহা বলেন, ‘কাসুন্দি তৈরি ও বিক্রির সঙ্গে জড়িত বেশির ভাগ নারীই দরিদ্র।এই মৌসুমের আয়ের জন্য তাঁরা সারা বছর অপেক্ষা করেন।কারণ, এ আয় তাঁদের সংসারে অনেকটা স্বস্তি এনে দেয়।’

Read full story at source