ব্যাটারি কীভাবে কাজ করে
· Prothom Alo

হাতের স্মার্টফোন থেকে শুরু করে ঘড়ি, টর্চলাইট, ল্যাপটপ, ট্যাব, আইপিএস—সবকিছুই ব্যাটারির ওপর নির্ভরশীল। আজকের এই আধুনিক বিশ্বে ব্যাটারি ছাড়া চলার কথা আমরা কল্পনাও করতে পারি না। কেমন হতো, যদি ব্যাটারি আবিষ্কার না হতো?
Visit een-wit.pl for more information.
চিন্তা করে দেখুন, ব্যাটারি না থাকলে বিদ্যুৎ ব্যবহার করে, এমন প্রতিটি জিনিসই সরাসরি প্লাগে লাগানো না থাকলে কাজই করত না। টর্চলাইট, হিয়ারিং এইড, মোবাইল ফোন—সবকিছুই তখন দেয়ালের সকেটের সঙ্গে ঝুলে থাকত। ফলে এগুলো ব্যবহার করা হতো ঝামেলাপূর্ণ ও অস্বস্তিকর। গাড়ি চালু করতেও শুধু চাবি ঘোরানোই যথেষ্ট হতো না, বরং অনেক কষ্ট করে হাতে ক্র্যাঙ্ক ঘুরিয়ে ইঞ্জিন চালু করতে হতো। চারদিকে তারের জট লেগে থাকত। সেগুলো যেমন বিপজ্জনক, তেমনি দেখতেও অগোছালো লাগত।
ব্যাটারির ধরন নানা রকম হলেও এর কাজ করার মূল কৌশল কিন্তু একই। যখন কোনো যন্ত্র ব্যাটারির সঙ্গে সংযুক্ত হয়, তখন একটি রাসায়নিক বিক্রিয়া শুরু হয়, যা থেকে বৈদ্যুতিক শক্তি উৎপন্ন হয়। এই প্রক্রিয়াকেই বলা হয় ইলেকট্রোকেমিক্যাল বা তড়িৎ রাসায়নিক বিক্রিয়া।
১৭৯৯ সালে ইতালির পদার্থবিজ্ঞানী কাউন্ট আলেসান্দ্রো ভোল্টা প্রথম এই ধারণাটি আবিষ্কার করেন। তিনি ধাতব পাত এবং লবণ পানিতে ভেজানো কাগজ বা কার্ডবোর্ড দিয়ে একটি সহজ ব্যাটারি তৈরি করেছিলেন। এরপর থেকে বিজ্ঞানীরা ভোল্টার সেই প্রাথমিক নকশাকে আরও উন্নত করে নানা উপাদান দিয়ে বিভিন্ন আকার ও ধরনের ব্যাটারি তৈরি করেছেন।
অ্যাপ বন্ধ করে রাখলে কি ব্যাটারি বাঁচেযখন কোনো যন্ত্র ব্যাটারির সঙ্গে সংযুক্ত হয়, তখন একটি রাসায়নিক বিক্রিয়া শুরু হয়, যা থেকে বৈদ্যুতিক শক্তি উৎপন্ন হয়। এই প্রক্রিয়াকেই বলা হয় ইলেকট্রোকেমিক্যাল বা তড়িৎ রাসায়নিক বিক্রিয়া।
আজকের পৃথিবীতে ব্যাটারি যেন আমাদের চারপাশেই ছড়িয়ে আছে। হাতঘড়ি মাসের পর মাস চালাতে সাহায্য করে ব্যাটারি। আবার বিদ্যুৎ চলে গেলেও অ্যালার্ম ঘড়ি ও টেলিফোন সচল রাখে এই ব্যাটারিই। স্মোক ডিটেক্টর, ইলেকট্রিক রেজর, পাওয়ার ড্রিল, এমপিথ্রি প্লেয়ার বা থার্মোস্ট্যাট—এগুলোর সবই ব্যাটারির ওপর নির্ভরশীল। তালিকাটা যেন শেষই হতে চায় না! এমনকি আপনি যদি এই লেখাটি ল্যাপটপ বা স্মার্টফোনে পড়ে থাকেন, তাহলে এই মুহূর্তে আপনি হয়তো ব্যাটারির শক্তিই ব্যবহার করছেন।
এত বেশি ব্যবহার হওয়ায় আমরা প্রায়ই ব্যাটারিকে খুব সাধারণ জিনিস হিসেবে ধরে নিই। আসলে এর পেছনের বিজ্ঞানটা বেশ চমকপ্রদ। এই লেখায় আমরা ব্যাটারির ইতিহাস, এর ভেতরের মৌলিক অংশগুলো এবং যে রাসায়নিক বিক্রিয়া ও প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ব্যাটারি কাজ করে, সেসব বিষয় বোঝার চেষ্টা করব। চলুন, অসংখ্য জট পাকানো তারের ঝামেলা ভুলে গিয়ে এই লেখার মাধ্যমে ব্যাটারির জগৎটা একটু কাছ থেকে দেখে নেওয়া যাক।
ব্যাটারি ফ্রিজে রাখলে কি বেশি দিন চার্জ থাকেস্মোক ডিটেক্টর, ইলেকট্রিক রেজর, পাওয়ার ড্রিল, এমপিথ্রি প্লেয়ার বা থার্মোস্ট্যাট—এগুলোর সবই ব্যাটারির ওপর নির্ভরশীল। তালিকাটা যেন শেষই হতে চায় না!
ব্যাটারির ইতিহাস
ব্যাটারির ইতিহাস আসলে বেশ পুরোনো। ১৯৩৮ সালে প্রত্নতত্ত্ববিদ উইলহেলম কনিগ বর্তমান বাগদাদ শহরের কাছাকাছি খুজুত রাবু এলাকায় খননকাজ করতে গিয়ে কিছু অদ্ভুত মাটির পাত্র খুঁজে পান। প্রায় ৫ ইঞ্চি লম্বা এই পাত্রগুলোর ভেতরে ছিল তামা দিয়ে মোড়ানো একটি লোহার দণ্ড। এগুলোর সময়কাল ধরা হয় খ্রিষ্টপূর্ব প্রায় ২০০ সালের দিকে। পরীক্ষায় দেখা যায়, এগুলোতে একসময় ভিনেগারের মতো কোনো অ্যাসিডিক তরল ভরা ছিল। এ থেকেই কনিগ ধারণা করেন, এগুলো হয়তো ব্যাটারি ছিল। পরে গবেষকেরা এই পাত্রগুলোর অনুকরণে প্রতিরূপ তৈরি করে দেখেছেন, এগুলো সত্যিই বিদ্যুৎ উৎপন্ন করতে পারে।
এর অনেক পরে, ১৭৯৯ সালে ইতালীয় পদার্থবিজ্ঞানী আলেসান্দ্রো ভোল্টা প্রথম কার্যকর ব্যাটারি তৈরি করেন। তিনি জিংক, লবণ পানিতে ভেজানো কাগজ বা কাপড় এবং রুপার স্তর একটির ওপর আরেকটি সাজিয়ে একটি কাঠামো তৈরি করেন। একে বলে ভোল্টাইক পাইল। এটি ছিল সেই সময় আবিষ্কৃত প্রথম যন্ত্র, যা থেকে ধারাবাহিক ও স্থায়ী বিদ্যুৎপ্রবাহ পাওয়া যেত।
অবশ্য এর কিছু সীমাবদ্ধতাও ছিল। রুপার স্তরগুলো বেশি উঁচু করে সাজানো যেত না, কারণ ওজনের চাপে ভেজা কাগজ বা কাপড় থেকে লবণ পানি বের হয়ে যেত। এ ছাড়া ধাতব পাতগুলো দ্রুত ক্ষয়ে যেত। ফলে ব্যাটারির স্থায়িত্ব কমে যেত। তবুও ভোল্টার এই অসাধারণ অবদানের জন্যই আজ বৈদ্যুতিক বিভবের একককে ভোল্ট বলা হয়।
ফোনের ব্যাটারি চার্জিংয়ে খরচ কতইতালীয় পদার্থবিজ্ঞানী আলেসান্দ্রো ভোল্টা জিংক, লবণ পানিতে ভেজানো কাগজ বা কাপড় এবং রুপার স্তর একটির ওপর আরেকটি সাজিয়ে একটি কাঠামো তৈরি করেন। একে বলে ভোল্টাইক পাইল।
এরপর ব্যাটারি প্রযুক্তিতে বড় অগ্রগতি হয় ১৮৩৬ সালে। ইংরেজ রসায়নবিদ জন ফ্রেডরিক ড্যানিয়েল উদ্ভাবন করেন ড্যানিয়েল সেল। এই ব্যাটারিতে একটি কাচের জারের তলায় একটি তামার পাত রাখা হতো এবং তার ওপর অর্ধেক পর্যন্ত কপার সালফেট দ্রবণ ঢালা হতো। এরপর জারের ভেতরে একটি দস্তার পাত ঝুলিয়ে দেওয়া হতো এবং তার চারপাশে যোগ করা হতো জিংক সালফেট দ্রবণ। যেহেতু কপার সালফেট জিংক সালফেটের চেয়ে বেশি ঘন, তাই জিংকের দ্রবণটি ওপরে ভেসে থাকত এবং জিংকের পাতটিকে ঘিরে রাখত। এই ব্যবস্থায় জিংকের পাতের সঙ্গে যুক্ত তারটি ছিল নেগেটিভ টার্মিনাল, আর কপারের পাতের সঙ্গে যুক্ত তারটি ছিল পজিটিভ টার্মিনাল।
স্বাভাবিকভাবেই এমন তরল জিনিস টর্চলাইটের মতো বহনযোগ্য যন্ত্রে ব্যবহার করা সুবিধাজনক ছিল না। তবে স্থির অবস্থায় ব্যবহারের জন্য এটি বেশ কার্যকর ছিল। একসময় ডোরবেল এবং টেলিফোন চালাতে ড্যানিয়েল সেল বেশ জনপ্রিয় ছিল।
চলুন, এবার ব্যাটারির ভেতরের বিভিন্ন অংশ ও কীভাবে এগুলো একসঙ্গে কাজ করে, সেটা জানা যাক।
মোবাইলের ব্যাটারি ফুলে ওঠে কেন, কতটা বিপজ্জনকAA সেল সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত ব্যাটারি। রিমোট, দেয়ালঘড়ি, খেলনা, ওয়্যারলেস মাউস ইত্যাদিতে এটি ব্যবহার হয়। এর আকার মাঝারি। আবার AAA সেল AA-এর চেয়ে চিকন ও ছোট।
ব্যাটারির গঠন
যেকোনো ব্যাটারির দিকে তাকালেই প্রথমে যে জিনিসটি চোখে পড়ে, তা হলো এর দুটি টার্মিনাল। একটি থাকে (+) চিহ্নিত, অন্যটি (-) চিহ্নিত। সাধারণ টর্চলাইটের ব্যাটারি, যেমন AA, C বা D সেলে এই টার্মিনাল দুটি ব্যাটারির দুই প্রান্তে থাকে। কিন্তু ৯-ভোল্ট বা গাড়ির ব্যাটারির ক্ষেত্রে টার্মিনালগুলো সাধারণত একসঙ্গে ওপরের দিকে বসানো থাকে।
এখন প্রশ্ন হলো, এই AA, C বা D সেল আসলে কী? AA, C এবং D সেল হলো ব্যাটারির বিভিন্ন স্ট্যান্ডার্ড আকার। এগুলো মূলত ব্যাটারির দৈর্ঘ্য, ব্যাস এবং শক্তি ধারণক্ষমতার পার্থক্য বোঝায়। সাধারণত এর সবগুলোই ১.৫ ভোল্টের হয়, কিন্তু আকার বড় হলে ব্যাটারির ক্ষমতা ও স্থায়িত্বও বেশি হয়।
AA সেল সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত ব্যাটারি। রিমোট, দেয়ালঘড়ি, খেলনা, ওয়্যারলেস মাউস ইত্যাদিতে এটি ব্যবহার হয়। এর আকার মাঝারি। আবার AAA সেল AA-এর চেয়ে চিকন ও ছোট; টিভির রিমোট, ছোট টর্চ, ট্রিমার ইত্যাদিতে ব্যবহৃত হয়। অন্যদিকে C সেল AA-এর চেয়ে বড় ও বেশি শক্তিশালী। বড় খেলনা, কিছু টর্চলাইট বা অডিও ডিভাইসে এই ব্যাটারি ব্যবহার হয়। আর সব শেষে D সেল হলো সবচেয়ে বড় সাধারণ ড্রাই সেলগুলোর একটি। এটি বড় টর্চলাইট, রেডিও বা বেশি শক্তি দরকার হয়, এমন যন্ত্রে ব্যবহৃত হয়।
স্মার্টফোনে পারমাণবিক ব্যাটারিAA, C এবং D সেল হলো ব্যাটারির বিভিন্ন স্ট্যান্ডার্ড আকার। এগুলো মূলত ব্যাটারির দৈর্ঘ্য, ব্যাস এবং শক্তি ধারণক্ষমতার পার্থক্য বোঝায়।
ব্যাটারির মূল গঠনে ফিরে আসা যাক। যদি পজিটিভ ও নেগেটিভ—এই দুই টার্মিনালের মধ্যে সরাসরি একটি তার সংযোগ করা হয়, তাহলে ইলেকট্রন খুব দ্রুত নেগেটিভ দিক থেকে পজিটিভ দিকে প্রবাহিত হতে শুরু করবে। এতে ব্যাটারি খুব দ্রুত শেষ হয়ে যাবে। আর বড় ব্যাটারির ক্ষেত্রে এই ব্যাপারটি বিপজ্জনকও হতে পারে। তাই ব্যাটারির শক্তিকে সঠিকভাবে ব্যবহার করতে হলে এটিকে একটি লোডের সঙ্গে যুক্ত করতে হয়। এই লোড হতে পারে একটি বাল্ব, মোটর কিংবা রেডিওর মতো কোনো ইলেকট্রনিক সার্কিট।
একটি ব্যাটারির ভেতরের অংশ সাধারণত ধাতু বা প্লাস্টিকের একটি আবরণের মধ্যে থাকে। এই আবরণের ভেতরে থাকে একটি ক্যাথোড, যা পজিটিভ টার্মিনালের সঙ্গে যুক্ত এবং একটি অ্যানোড, যা নেগেটিভ টার্মিনালের সঙ্গে যুক্ত। এই দুই অংশকে একসঙ্গে বলা হয় ইলেকট্রোড বা তড়িৎদ্বার।
এই ইলেকট্রোডেই ব্যাটারির মূল রাসায়নিক বিক্রিয়াগুলো ঘটে। ক্যাথোড ও অ্যানোডের মাঝখানে থাকে একটি সেপারেটর। এই সেপারেটর অ্যানোড ও ক্যাথোডকে পরস্পর সরাসরি স্পর্শ করা থেকে বিরত রাখে। কিন্তু এই সেপারেটর বৈদ্যুতিক চার্জ চলাচল করতে দেয়। আর যে মাধ্যমে এই চার্জ এক ইলেকট্রোড থেকে অন্যটিতে যেতে পারে, সেটিকে বলা হয় ইলেকট্রোলাইট বা তড়িৎবিশ্লেষ্য। সব শেষে একটি কালেক্টর থাকে, যা এই চার্জকে ব্যাটারির বাইরে নিয়ে গিয়ে লোডের মাধ্যমে প্রবাহিত হতে সাহায্য করে।
ব্যাটারির কার্যক্ষমতা ধীরে ধীরে কমে যায় কেনএকটি ব্যাটারির ভেতরের অংশ সাধারণত ধাতু বা প্লাস্টিকের একটি আবরণের মধ্যে থাকে। এই আবরণের ভেতরে থাকে একটি ক্যাথোড, যা পজিটিভ টার্মিনালের সঙ্গে যুক্ত।
ব্যাটারিতে সংঘটিত রাসায়নিক বিক্রিয়া
একটি ব্যাটারি যখন টর্চলাইট, রিমোট কন্ট্রোল বা অন্য কোনো তারবিহীন ডিভাইসে লাগানো হয়, তখন এর ভেতরে অনেক সূক্ষ্ম ও গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়া শুরু হয়ে যায়। বিভিন্ন ধরনের ব্যাটারিতে এই প্রক্রিয়ার কিছুটা পার্থক্য থাকলেও মূল ধারণা প্রায় একই।
যখন একটি লোড দুটি টার্মিনালের মধ্যে সার্কিট বা বর্তনী সম্পূর্ণ করে, তখন ব্যাটারির ভেতরে অ্যানোড, ক্যাথোড এবং ইলেকট্রোলাইটের মধ্যে একাধিক ইলেকট্রোকেমিক্যাল বিক্রিয়া শুরু হয়। এই প্রক্রিয়ায় ব্যাটারি বিদ্যুৎ উৎপন্ন করে।
অ্যানোডের মধ্যে ঘটে একটি জারণ বিক্রিয়া। এই বিক্রিয়ার মাধ্যমে অ্যানোড ইলেকট্রন ত্যাগ করে বা ছেড়ে দেয় এবং ইলেকট্রোলাইটের সঙ্গে বিক্রিয়া করে নতুন যৌগ তৈরি করে। অন্যদিকে ক্যাথোডে ঘটে একটি বিজারণ বিক্রিয়া। এখানে ক্যাথোড অ্যানোড থেকে আসা মুক্ত ইলেকট্রন গ্রহণ করে এবং নতুন যৌগ তৈরি করে।
বিষয়টি আরও সহজভাবে বললে, অ্যানোড ইলেকট্রন ছেড়ে দেয়, আর ক্যাথোড সেই ইলেকট্রন গ্রহণ করে। এই ইলেকট্রনের প্রবাহই আসলে বিদ্যুৎ। যতক্ষণ পর্যন্ত অ্যানোড বা ক্যাথোডে প্রয়োজনীয় উপাদান শেষ না হয়, ততক্ষণ পর্যন্ত ব্যাটারি বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে থাকে।
বিষয়টা আরও সহজভাবে বোঝার জন্য একটা উদাহরণ দেওয়া যাক। ব্যাটারিতে সংঘটিত রাসায়নিক বিক্রিয়াকে আপনি লেগো সেট দিয়ে ছোট একটা ঘর বানানোর সঙ্গে তুলনা করতে পারেন। যতক্ষণ পর্যন্ত আপনার কাছে লেগোর টুকরো আছে, ততক্ষণ আপনি ঘর বানাতে পারবেন। কিন্তু সব টুকরো ব্যবহার হয়ে গেলে আর কিছু বানানো যাবে না। তখন আপনার সামনে দুটি পথ খোলা থাকবে। এক. পুরোনো ঘরটা ভেঙে আবার সেই লেগো দিয়ে নতুন কিছু বানানো, যা অনেকটা রিচার্জেবল ব্যাটারির মতো কাজ করে। দুই. নতুন লেগো কিনে আনা, যা অনেকটা নতুন ব্যাটারি ব্যবহার করার মতো কাজ করে।
মোবাইল চার্জ করতে শেষ দিকে বেশি সময় লাগে কেনঅ্যানোডের মধ্যে ঘটে একটি জারণ বিক্রিয়া। এই বিক্রিয়ার মাধ্যমে অ্যানোড ইলেকট্রন ত্যাগ করে বা ছেড়ে দেয় এবং ইলেকট্রোলাইটের সঙ্গে বিক্রিয়া করে নতুন যৌগ তৈরি করে।
আধুনিক ব্যাটারিগুলো বিভিন্ন ধরনের রাসায়নিক উপাদান ব্যবহার করে তাদের শক্তি উৎপাদনের বিক্রিয়া চালায়। চলুন, কয়েকটি জনপ্রিয় রাসায়নিক উপাদান সংবলিত ব্যাটারি দেখে নেওয়া যাক:
১. জিংক-কার্বন ব্যাটারি: এ ধরনের ব্যাটারি সাধারণত কম দামের AAA, AA, C এবং D সাইজের ড্রাই সেল ব্যাটারিতে দেখা যায়। এখানে অ্যানোড হিসেবে থাকে জিংক, ক্যাথোড হিসেবে থাকে ম্যাঙ্গানিজ ডাই-অক্সাইড। আর ইলেকট্রোলাইট হিসেবে অ্যামোনিয়াম ক্লোরাইড বা জিংক ক্লোরাইড ব্যবহৃত হয়।
২. অ্যালকালাইন ব্যাটারি: এটিও AA, C এবং D সাইজের ব্যাটারিতে খুব সাধারণ রাসায়নিক। এখানে ক্যাথোড তৈরি হয় ম্যাঙ্গানিজ ডাই-অক্সাইডের মিশ্রণ দিয়ে, আর অ্যানোডে থাকে জিংক পাউডার। এতে পটাশিয়াম হাইড্রোক্সাইডের ক্ষারীয় ইলেকট্রোলাইট ব্যবহার করা হয় বলে একে অ্যালকালাইন ব্যাটারি বলা হয়।
৩. লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারি: এ ধরনের ব্যাটারি উচ্চ পারফরম্যান্স ডিভাইসে ব্যবহৃত হয়। যেমন মোবাইল ফোন, ডিজিটাল ক্যামেরা, এমনকি বৈদ্যুতিক গাড়িতেও। এখানে বিভিন্ন উপাদান ব্যবহার করা হলেও সাধারণভাবে ক্যাথোড হিসেবে লিথিয়াম কোবাল্ট অক্সাইড এবং অ্যানোড হিসেবে কার্বন ব্যবহৃত হয়।
৪. লেড-অ্যাসিড ব্যাটারি: এটি সাধারণত গাড়ির ব্যাটারিতে ব্যবহৃত হয়। এখানে ক্যাথোড হিসেবে থাকে লেড ডাই-অক্সাইড এবং অ্যানোড হিসেবে থাকে ধাতব লেড। আর ইলেকট্রোলাইট হিসেবে ব্যবহৃত হয় সালফিউরিক অ্যাসিডের দ্রবণ।
নিউক্লিয়ার বর্জ্য থেকে ব্যাটারি তৈরি করলেন বিজ্ঞানীরাঅ্যালকালাইন ব্যাটারিও AA, C এবং D সাইজের ব্যাটারিতে খুব সাধারণ রাসায়নিক। এখানে ক্যাথোড তৈরি হয় ম্যাঙ্গানিজ ডাই-অক্সাইডের মিশ্রণ দিয়ে, আর অ্যানোডে থাকে জিংক পাউডার।
রিচার্জেবল ব্যাটারি কীভাবে কাজ করে
ল্যাপটপ, মোবাইল ফোন, এমপিথ্রি প্লেয়ার এবং কর্ডলেস পাওয়ার টুলের মতো পোর্টেবল ডিভাইসের ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে রিচার্জেবল ব্যাটারির প্রয়োজনও অনেক বেড়ে গেছে। এ ধরনের ব্যাটারির ইতিহাস বেশ পুরোনো। ১৮৫৯ সালে ফরাসি পদার্থবিজ্ঞানী গাসতোন প্লান্টে প্রথম লেড-অ্যাসিড সেল আবিষ্কার করেন। এতে লেড অ্যানোড, লেড ডাই-অক্সাইড ক্যাথোড এবং সালফিউরিক অ্যাসিড ইলেকট্রোলাইট হিসেবে ব্যবহৃত হতো। এই ব্যাটারিই পরবর্তীকালে আধুনিক গাড়ির ব্যাটারির ভিত্তি তৈরি করে।
নন-রিচার্জেবল ব্যাটারি এবং রিচার্জেবল ব্যাটারি দুটিই একইভাবে বিদ্যুৎ উৎপন্ন করে। অর্থাৎ অ্যানোড, ক্যাথোড এবং ইলেকট্রোলাইটের মধ্যে ঘটা ইলেকট্রোকেমিক্যাল বিক্রিয়ার মাধ্যমে। কিন্তু পার্থক্য হলো, রিচার্জেবল ব্যাটারিতে এই বিক্রিয়াটি উল্টো দিকে চালানো সম্ভব।
এই ব্যাপারটি আসলে কীভাবে কাজ করে? যখন বাইরের কোনো উৎস থেকে বৈদ্যুতিক শক্তি সরবরাহ করা হয়, তখন ডিসচার্জ অবস্থায় যে ইলেকট্রনপ্রবাহ নেগেটিভ থেকে পজিটিভ দিকে যায়, সেটি উল্টো হয়ে যায়। ফলে ব্যাটারির ভেতরের রাসায়নিক অবস্থা আবার আগের মতো হয়ে যায় এবং ব্যাটারি পুনরায় চার্জ ধরে রাখতে সক্ষম হয়। বর্তমানে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত রিচার্জেবল ব্যাটারি হলো লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারি। এ ছাড়া আগে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হতো নিকেল-মেটাল হাইড্রাইড এবং নিকেল-ক্যাডমিয়াম ব্যাটারি।
রিচার্জেবল ব্যাটারির জগতে সব ব্যাটারি আবার এক রকম নয়। প্রতিটির নিজস্ব সুবিধা ও সীমাবদ্ধতা আছে। আগের প্রজন্মের নিকেল-ক্যাডমিয়াম ব্যাটারি ছিল সবচেয়ে বহুল ব্যবহৃত সেকেন্ডারি সেলগুলোর একটি। কিন্তু এতে একটি বড় সমস্যা ছিল মেমোরি ইফেক্ট। মানে, ব্যাটারি যদি প্রতিবার সম্পূর্ণ খালি না করে চার্জ দেওয়া হতো, তাহলে ধীরে ধীরে এর ধারণক্ষমতা কমে যেত। এই সমস্যার কারণে নিকেল-ক্যাডমিয়াম ব্যাটারির ব্যবহার ধীরে ধীরে কমে যায়।
নিউক্লিয়ার ব্যাটারি: চার্জ ছাড়াই চলবে অর্ধশতাব্দী!নন-রিচার্জেবল ব্যাটারি এবং রিচার্জেবল ব্যাটারি দুটিই একইভাবে বিদ্যুৎ উৎপন্ন করে। অর্থাৎ অ্যানোড, ক্যাথোড এবং ইলেকট্রোলাইটের মধ্যে ঘটা ইলেকট্রোকেমিক্যাল বিক্রিয়ার মাধ্যমে।
পরে এর জায়গা নেয় নিকেল-মেটাল হাইড্রাইড ব্যাটারি। এগুলো তুলনামূলকভাবে বেশি চার্জ ধরে রাখতে পারে এবং মেমোরি ইফেক্টের প্রভাবও অনেক কম। তবে এদের একটি দুর্বল দিক হলো, দীর্ঘ সময় রেখে দিলে চার্জ ধরে রাখার ক্ষমতা কমে যায়।
সবচেয়ে আধুনিক এবং জনপ্রিয় প্রযুক্তি হলো লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারি। এগুলো আরও দীর্ঘস্থায়ী, উচ্চ ভোল্টেজে কাজ করতে পারে এবং আকারে অনেক ছোট ও হালকা হয়। তাই আজকের প্রায় সব উন্নত পোর্টেবল ডিভাইস; যেমন স্মার্টফোন, ল্যাপটপ, ক্যামেরায় এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে। তবে এগুলো সাধারণত AA, AAA, C বা D সাইজে পাওয়া যায় না এবং দামও তুলনামূলকভাবে বেশি।
চার্জিংয়ের ক্ষেত্রেও পার্থক্য আছে। নিকেল-ক্যাডমিয়াম এবং নিকেল মেটাল-হাইড্রাইড ব্যাটারি চার্জ করার সময় সতর্ক থাকতে হয়। কারণ, অতিরিক্ত চার্জ দিলে এই ব্যাটারিগুলোর ক্ষমতা কমে যেতে পারে। এ জন্য অনেক চার্জার চার্জ শেষ হলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বন্ধ হয়ে যায়। এসব ব্যাটারিকে মাঝেমধ্যে সম্পূর্ণ ডিসচার্জ করে আবার চার্জ দিতে হয়।
অন্যদিকে লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারিতে রয়েছে উন্নত চার্জিং সিস্টেম, যা ওভারচার্জিং থেকে নিজেই সুরক্ষা দেয়। তবে সব ব্যাটারিই একসময় শেষ হয়ে যায়। শত শত চার্জ সাইকেল পার করার পর এগুলো আর কার্যকর থাকে না। তখন এগুলোকে অবশ্যই পুনর্ব্যবহারযোগ্য কেন্দ্রে ফেলে দেওয়া উচিত।
লেখক: শিক্ষার্থী, কৃষিবিজ্ঞান বিভাগ, এগ্রিকালচারাল সায়েন্স অনুষদ, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি সূত্র: হাউ স্টাফ ওয়ার্কস এবং আমেরিকান কেমিক্যাল সোসাইটিবিশ্বের প্রথম রিচার্জেবল ইউরেনিয়াম ব্যাটারি উদ্ভাবন করল জাপান