কাঁচা-পাকা আমের রসায়ন

· Prothom Alo

পাঠকের লেখা

গাছে ঝুলে থাকা কাঁচা আম একসময় মিষ্টি, নরম ও সুগন্ধিতে ভরে ওঠে। কিন্তু এটা কোনো জাদু নয়। বিষয়টা পুরোপুরি রসায়নের কারিকুরি। আরও নির্দিষ্ট করে বললে উদ্ভিদের হরমোন নিঃসরণের খেলা। আমের জীবনযাত্রা শুরু হয় একদম কাঁচা অবস্থায়। তখন এটি থাকে শক্ত, টক ও সবুজ। এ সময় আমের কোষে প্রচুর পরিমাণে স্টার্চ বা শ্বেতসার, জৈব অ্যাসিড ও ক্লোরোফিল থাকে। জৈব অ্যাসিড আমাদের শরীরের জন্য উপকারী। অর্থাৎ আমরা এগুলো খেতে করতে পারি। কিন্তু সালফিউরিক অ্যাসিডের মতো অজৈব বা খনিজ অ্যাসিডগুলো আমরা সরাসরি খেতে পারি না। অবশ্য আমে অজৈব অ্যাসিড থাকে না। তাই ভয়ের কোনো কারণ নেই। 

Visit mchezo.co.za for more information.

চলুন, এবার জানা যাক আমের অদ্যোপান্ত।

আম কতটা স্বাস্থ্যকর
আমের জীবনযাত্রা শুরু হয় একদম কাঁচা অবস্থায়। তখন এটি থাকে শক্ত, টক ও সবুজ। এ সময় আমের কোষে প্রচুর পরিমাণে স্টার্চ বা শ্বেতসার, জৈব অ্যাসিড ও ক্লোরোফিল থাকে।

আম কেন টক

আমে সাধারণত প্রচুর পরিমাণে জৈব অ্যাসিড থাকে। আর সব অ্যাসিডই জলীয় দ্রবণে হাইড্রোজেন আয়ন (H⁺) উৎপন্ন করে। আমে প্রচুর পরিমাণে সাইট্রিক অ্যাসিড (C₆H₈O₇) এবং ম্যালিক অ্যাসিডও (C₄H₆O₅) থাকে। অ্যাসিড আমাদের জিহ্বার স্বাদ গ্রহণকারী কোষে টক স্বাদের সংকেত পাঠায়। তাই যে আমে যত বেশি অ্যাসিড থাকে, সেই আম তত বেশি টক হয়।

আম কীভাবে পাকে

উদ্ভিদের শরীরে বিভিন্ন ধরনের ফাইটো হরমোন বা উদ্ভিদ হরমোন থাকে। ইথিলিন নামে এক বিশেষ গ্যাসীয় হরমোন ফল পাকাতে সহায়তা করে। আম পাকার সময় হলে এই ইথিলিনই মূলত কাজ শুরু করে। ফলে একটি ইতিবাচক চক্রের সৃষ্টি হয়। অর্থাৎ, যত বেশি ইথিলিন তৈরি হয়, তা আরও তত বেশি ইথিলিন উৎপাদনকে উসকে দেয়। তাই আম খুব দ্রুত পাকতে থাকে।

আমে সাধারণত প্রচুর পরিমাণে জৈব অ্যাসিড থাকে

আম কেন মিষ্টি হয়

আম পাকলে আর টক থাকে না। কারণ, আম পাকলে এর ভেতরে রাসায়নিক পরিবর্তন ঘটে। সহজ কথায় জৈব অ্যাসিডগুলো ভাঙতে শুরু করে। ফলে এর ভেতরের এনজাইমগুলো সক্রিয় হয়ে ওঠে। অ্যাসিড ভাঙার বিক্রিয়াটা অনেকটা এমন হয়: অর্গানিক অ্যাসিড + অক্সিজেন ➔ কার্বন ডাই-অক্সাইড + পানি + শক্তি। এ ধরনের বিক্রিয়ার ফলে অ্যাসিড ভেঙে শর্করায় পরিণত হয়, বিশেষ করে গ্লুকোজ ও ফ্রুক্টোজ। ফলে অ্যাসিডের আধিক্য কমে যায় এবং মিষ্টতা বাড়ে। তাই টক স্বাদটা চাপা পড়ে যায়।

বাংলাদেশের জনপ্রিয় কিছু আম
ইথিলিন নামে এক বিশেষ গ্যাসীয় হরমোন ফল পাকাতে সহায়তা করে। আম পাকার সময় হলে এই ইথিলিনই মূলত কাজ শুরু করে। ফলে একটি ইতিবাচক চক্রের সৃষ্টি হয়।

আমের রংঢং 

কাঁচা অবস্থায় আমের রং সবুজ হয়, কারণ তখন এতে ক্লোরোফিল থাকে। রাসায়নিক বিক্রিয়ার ফলে আম পাকার সময় হলে ক্লোরোফিল ভেঙে নতুন রঞ্জক পদার্থ তৈরি হয়। ফলে আম কিছুটা হলুদ বর্ণ ধারণ করে।

আম নরম হয় কেন

পাকা আম নরম হয়, কারণ তখন কোষপ্রাচীরের গঠন বদলে যায়। পেকটিনেজ বা সেলুলেজের মতো কিছু এনজাইম তখন কাজ করে। এগুলো কোষপ্রাচীরের শক্ত ভিত্তি ভেঙে দেয়। ফলে কোষগুলো আলাদা হয়ে আসে এবং আম নরম হয়ে যায়।

কাঁচা অবস্থায় আমের রং সবুজ হয়, কারণ তখন এতে ক্লোরোফিল থাকে

সুগন্ধ আসে কোথা থেকে

পাকা আম মিষ্টি সুগন্ধযুক্ত হয়। পাকা আমের এই গন্ধ আসে মূলত উদ্বায়ী যৌগ থেকে। এই যৌগগুলোর মধ্যে আছে এস্টার, অ্যালকোহল কিংবা টারপিনের মতো রাসায়নিক উপাদান। এই যৌগগুলো মূলত আম পাকার একদম শেষ ধাপে তৈরি হয়। এগুলোই আমকে অন্যান্য ফলের মধ্য থেকে আলাদা করে চিনিয়ে দেয়।

কাঁচা আম কি গাছের জন্য ভালো

হ্যাঁ, আমরা যদি গাছের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখি, তবে কাঁচা ফল অপ্রয়োজনে তেমন একটা খাওয়া হয় না। ফলে পুরোপুরি বীজ ছড়ানোর উপযোগী না হওয়া পর্যন্ত ফল টক থাকে, যাতে মানুষ বা পশু-পাখি এটি পাকার আগেই খেয়ে না ফেলে।

আম কাঁচা অবস্থায় সবুজ কেন?
পাকা আম মিষ্টি সুগন্ধযুক্ত হয়। পাকা আমের এই গন্ধ আসে মূলত উদ্বায়ী যৌগ থেকে। এই যৌগগুলোর মধ্যে আছে এস্টার, অ্যালকোহল কিংবা টারপিনের মতো রাসায়নিক উপাদান।

কাঁচা আম খাওয়া ভালো, নাকি পাকা আম

কাঁচা আম ও পাকা আম উভয়ই আমাদের দেশের বেশ জনপ্রিয়। কিন্তু পুষ্টিগুণ ও শরীরের ওপর প্রভাবের দিক থেকে এদের ভূমিকা এক নয়। কোনটা ভালো হবে, তা অনেকটাই নির্ভর করে শরীরের অবস্থা, ঋতু এবং কতটা পরিমাণে খাওয়া হচ্ছে তার ওপর।

কাঁচা আম খাওয়ার প্রধান উপকারিতা হলো হজমে এর সহায়ক ভূমিকা। কাঁচা আমে থাকা জৈব অ্যাসিড ও কিছু প্রাকৃতিক এনজাইম পাকস্থলীতে হজমরস নিঃসরণে সাহায্য করে। গরমের সময় অতিরিক্ত ঘাম থেকে শরীরে যে লবণ ও পানির ঘাটতি হয়, কাঁচা আম তা কিছুটা পূরণ করতে পারে। এ কারণে আমাদের দেশে কাঁচা আম দিয়ে তৈরি শরবত বা ভর্তা বেশ জনপ্রিয়।

কাঁচা আমে থাকা জৈব অ্যাসিড ও কিছু প্রাকৃতিক এনজাইম পাকস্থলীতে হজমরস নিঃসরণে সাহায্য করে

পাশাপাশি এতে ভিটামিন সি তুলনামূলকভাবে বেশি থাকে, যা রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বাড়াতে সহায়ক। তবে কাঁচা আমের কিছু অপকারিতাও আছে। অতিরিক্ত কাঁচা আম খেলে পাকস্থলীতে অ্যাসিডের মাত্রা বেড়ে যেতে পারে। এতে বুকজ্বালা বা পেটব্যথা হওয়ার ঝুঁকি থাকে। যাঁদের গ্যাস্ট্রিক বা আলসারের সমস্যা আছে, তাঁদের জন্য কাঁচা আম ক্ষতিকর হতে পারে। আবার খুব বেশি লবণ বা মরিচ দিয়ে কাঁচা আম খাওয়া হলে তা হজমের সমস্যাকে আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।

আম গবেষণার পীঠস্থান
কাঁচা আম খাওয়ার প্রধান উপকারিতা হলো হজমে এর সহায়ক ভূমিকা। কাঁচা আমে থাকা জৈব অ্যাসিড ও কিছু প্রাকৃতিক এনজাইম পাকস্থলীতে হজমরস নিঃসরণে সাহায্য করে।

অন্যদিকে পাকা আমে প্রাকৃতিক চিনি থাকে। এতে ভিটামিন এ-এর উপাদান বিটা-ক্যারোটিন প্রচুর পরিমাণে থাকে। এটি চোখের স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু পাকা আমের অপকারিতাও একেবারে উপেক্ষা করার মতো নয়। এতে চিনি বেশি থাকায় ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের জন্য অতিরিক্ত পাকা আম খাওয়া ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। আবার খুব বেশি পাকা আম একসঙ্গে খেলে কারও কারও ক্ষেত্রে পেটভার বা অস্বস্তি ভাব দেখা দিতে পারে।

পাকা আমে প্রাকৃতিক চিনি থাকে

সব মিলিয়ে বলা যায়, কাঁচা আম বা পাকা আম—কোনোটাই সম্পূর্ণ ভালো বা সম্পূর্ণ খারাপ নয়। পরিমিত পরিমাণে এবং নিজের শরীরের প্রয়োজন বুঝে খেলে দুটোরই উপকার পাওয়া যায়।

আসলে প্রকৃতি কতটা বৈচিত্র্যময়, তা একটা সাধারণ আমের দিকে তাকালেই উপলব্ধি করা যায়।

সূত্র: ফ্রন্টিয়ারস ইন প্ল্যান্ট সায়েন্স ও সায়েন্টিফিক আমেরিকানলেখক: শিক্ষার্থী, নবম শ্রেণি, বর্ণমালা আদর্শ উচ্চবিদ্যালয় ও কলেজবিশ্বজুড়ে আমের মেলা

Read full story at source