পাশাপাশি দুই সেতুর একটির নাম ব্রাজিল, অন্যটি আর্জেন্টিনা, যেখানে আছে
· Prothom Alo

সময় ধীরে ধীরে এগোচ্ছে। দিনপঞ্জির পাতায় ঘনিয়ে আসছে সেই প্রতীক্ষিত মুহূর্ত। আর কিছুদিন পর শুরু হচ্ছে ফুটবলের সবচেয়ে বড় আসর বিশ্বকাপ। সময়ের হিসাবে আর মাত্র এক মাস বাকি। আগামী ১১ জুন শুরু হচ্ছে বিশ্বের অন্যতম বড় ক্রীড়াযজ্ঞ। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোয় বসছে এবারের ২৩তম আসর।
Visit freshyourfeel.org for more information.
পৃথিবীর নানা প্রান্তে যেমন ফুটবল উন্মাদনা জমে উঠছে, তেমনি এই উৎসবের সঙ্গে একাত্ম হতে যাচ্ছে বাংলাদেশও। ফুটবলের বিশ্বমঞ্চে হাজির হওয়ার সুযোগ হয়নি বাংলাদেশের। তারপরও বিশ্বকাপ নিয়ে এই দেশের মানুষের মধ্যে রয়েছে তুমুল উত্তেজনা, উন্মাদনা ও উচ্ছ্বাস। দেশজুড়ে ওড়ে প্রিয় দেশের পতাকা। বের হয় বড় বড় মিছিল। প্রিয় দলের জয়ে যেমন আনন্দের জোয়ার বয়ে যায়, তেমনি হারে মন ভাঙে লাখো সমর্থকের। সমর্থকদের এসব উন্মাদনা-উত্তেজনা এখন আর বিশ্ব মিডিয়ার নজর এড়ায় না। বাংলাদেশের ফুটবলপ্রেমীদের আনন্দ-বেদনার সব গল্প ছড়িয়ে পড়ে সমর্থকদের প্রিয় দেশগুলোতেও।
বিশ্বের মানচিত্রে ‘ব্রাজিল’ আর ‘আর্জেন্টিনার’ অবস্থান কাছাকাছি। প্রতিবেশী এই দুই দেশের মধ্যে তেমন দূরত্ব নেই। তেমনি খুব বেশি দূরত্ব নেই কাপ্তাই হ্রদের এই দুটি সেতুরও, শত মিটারের কম। তবু আবেগের দিক থেকে যেন দুই ভিন্ন জগৎ। এক সেতুজুড়ে হলুদ-সবুজের আধিপত্য, অন্যটিতে আকাশি-সাদা রঙের দাপট।
এবার আর চার বছর নয়, সাড়ে তিন বছরের মধ্যে শেষ হচ্ছে প্রতীক্ষার সময়। এর মধ্যে দেশের অন্যান্য অঞ্চলের মতো পাহাড়ি জনপদেও শুরু হচ্ছে বিশ্বকাপ ফুটবল নিয়ে উৎসবের প্রস্তুতি। মাঠের লড়াই থেকে বহু দূরে থেকেও আবেগ, উত্তেজনা আর সমর্থনের দিক থেকে কোনো অংশেই পিছিয়ে নেই এখানকার মানুষ। এর একটি প্রতীকী মঞ্চ হয়ে উঠেছে রাঙামাটির কাপ্তাই হ্রদের ওপর নির্মিত দুটি সেতু। রাঙামাটি সদরের আসামবস্তি এলাকায় পাশাপাশি অবস্থান সেতু দুটির। স্থানীয় মানুষের মুখে মুখে একটির নাম ‘ব্রাজিল সেতু’, অন্যটি ‘আর্জেন্টিনা সেতু’। বিশ্বের মানচিত্রে ‘ব্রাজিল’ আর ‘আর্জেন্টিনার’ অবস্থান কাছাকাছি। প্রতিবেশী এ দুই দেশের মধ্যে তেমন দূরত্ব নেই। তেমনি খুব বেশি দূরত্ব নেই কাপ্তাই হ্রদের এ দুটি সেতুরও, শত মিটারের কম। তবু আবেগের দিক থেকে যেন দুই ভিন্ন জগৎ। এক সেতুজুড়ে হলুদ-সবুজের আধিপত্য, অন্যটিতে আকাশি-সাদা রঙের দাপট।
বর্ষা মৌসুম এখনো শুরু হয়নি। বৃষ্টি নেই তেমন। তাই ধীরে ধীরে শুকিয়ে গেছে কাপ্তাই হ্রদ। এখন সেতু দুটির নিচে পানির প্রবাহ নেই। হ্রদের ভেতরে প্রাণ না থাকলেও তার ছাপ নেই সেতু এলাকায়। বিশ্বকাপ যতই ঘনিয়ে আসছে, ততই এ দুই সেতুকে ঘিরে বাড়ছে মানুষের আনাগোনা। পতাকা টাঙানো, রং করা, ব্যানার ঝোলানো—সব মিলিয়ে উৎসবের প্রস্তুতি চলছে পুরোদমে। সন্ধ্যা নামলেই দুই সেতুতে জমে উঠছে আড্ডা, আলোচনা, তর্ক আর ভবিষ্যদ্বাণী।
আসামবস্তি এলাকার বাসিন্দা মোহাম্মদ হেলাল। আর্জেন্টিনা আর মেসির অন্ধ এক সমর্থক। আকাশি-সাদার প্রতি অন্য রকম এক ভালোবাসা তাঁর। প্রিয় দলের খেলোয়াড়দের হাতে বিশ্বকাপ দেখার স্বপ্ন পূরণ হয়েছে। ২০২২ সালের বিশ্বকাপ জয়ের স্মৃতি এখনো তাঁর চোখে-মুখে ঝলমল করে। সাড়ে তিন বছর পেরিয়ে গেলেও বিশ্বজয়ের সে স্মৃতি এখনো উজ্জ্বল। এবারও একই দৃশ্যের জন্ম হবে বলে বিশ্বাস মোহাম্মদ হেলালের। আর্জেন্টিনার চ্যাম্পিয়ন হওয়া এবং মেসির হাতে বিশ্বকাপ দেখার মধ্যে যে অনুভূতির জন্ম হয়েছিল, এর কোনো ব্যাখ্যা নেই তাঁর কাছে। এমন একটা ছবির জন্য বছরের পর বছর ধরে অপেক্ষায় ছিলেন রাঙামাটির এই সন্তান।
প্রিয় দলের সাফল্যের পরেও মনে একটা আফসোস রয়ে গেছে হেলালের। গতবারের আসরের ফাইনাল ম্যাচ দেখানো হয়েছিল আর্জেন্টিনা সেতুর ওপর বড় পর্দায়। শত শত মানুষের সঙ্গে মিশে ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা ম্যাচটা এই সেতুতে বসে দেখার সৌভাগ্য হয়নি তাঁর। জীবিকার তাগিদে তখন পাশের জেলা চট্টগ্রামে ছিলেন। তবে এবার আর মিস হবে না। সেতুতে আর্জেন্টিনার পতাকার রং বিবর্ণ হওয়ায় কিছুটা হলেও মন খারাপ হেলালের। অবশ্য বিশ্বকাপ আসতে আসতে ঠিকই সব রঙিন হয়ে যাবে বলে আশাবাদ তাঁর।
আর্জেন্টিনা সেতু দিয়ে গাড়ি চলে খুব কম। মাঝে মাঝে দু-একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা চলাচল করে। তবে সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র ব্রাজিল সেতুতে। এই সেতু পার হয়ে যেতে হয়ে রাঙামাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়সহ কাপ্তাই উপজেলায়। এসব কারণে ব্রাজিল সেতু দিনভর ব্যস্ত থাকে। বিকেল হতেই দর্শনার্থীদের ভিড় বাড়তে থাকে। তুমুল আড্ডা-গল্প চলে রাত পর্যন্ত।
আর্জেন্টিনার সমর্থকদের দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান হলেও ব্রাজিলের বিশ্বজয়ের সময় শুধু দীর্ঘ হচ্ছে। ২০০২ সালের পর বিশ্ব আসরগুলোয় ঠিক ‘ব্রাজিল’ হয়ে উঠতে পারছে না দলটি। সাম্বা নৃত্যের সে ছন্দ কোথায় যেন হারিয়ে গেছে।
২০০২ সালের পর থেকে বিশ্বকাপ শিরোপা ছোঁয়া হয়নি ব্রাজিলের। একসময় যাদের জন্য বিশ্বকাপ জয় ছিল প্রায় নিয়মিত ঘটনা, সেই দলই এখন অপেক্ষার দীর্ঘ ছায়ায়। একেকটি বিশ্বকাপ শেষ হয়, সমর্থকদের মন খারাপের প্রতীক্ষার প্রহর শেষ হয় না; বরং আরও বেশি যন্ত্রণার হয়ে দাঁড়ায়। এর মধ্যে গতবার চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী দেশের বিশ্বকাপ জয় সে বেদনা বাড়িয়েছে বহুগুণ। তবু আশার প্রদীপ নিভে যায়নি। ব্রাজিল সমর্থকদের প্রত্যাশা, এবার তাঁদের স্বপ্ন পূরণ হতে যাচ্ছে। আবার উজ্জ্বল রঙিন হবে হলুদ-সবুজের পতাকার রং। তারই যেন ছাপ পাওয়া যায় ব্রাজিল সেতুতে দাঁড়ালে। ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়া সেতু নতুন করে রাঙানো হয়েছে। এখন অনেক বেশি উজ্জ্বল ও রঙিন। দূর থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়।
ঝকঝকে সেই রং যেন নতুন করে আশার সঞ্চার করেছে সমর্থকদের মনেও। ব্রাজিলের সমর্থক সুমন চাকমা বলেন, ‘অনেক দিন হলো আমরা কাপ পাই না। কিন্তু ব্রাজিল মানেই প্রত্যাশা। এবার ভালো কিছু হবেই।’
বিশ্ব আসর থেকে আট হাজার মাইল দূরের এক পাহাড়ি এলাকার এ দুই সেতু এখন শুধু যাতায়াতের পথ নয়; হয়ে উঠেছে আবেগ, উন্মাদনা আর ফুটবল ভালোবাসার প্রতীক। বিশ্বকাপ এলে যেন পুরো এলাকাই ভাগ হয়ে যায় দুই রঙে—হলুদ-সবুজ আর আকাশি-সাদা। সেতু দুটি হয়ে দাঁড়িয়েছে দুই প্রতিদ্বন্দ্বী দেশের প্রতিনিধিত্বকারী মঞ্চ, আর সেই মঞ্চে প্রতিদিনই চলছে আবেগের লড়াই।