সুনামগঞ্জে আকস্মিক বন্যার শঙ্কায় ধান কাটছেন হাওরের কৃষকেরা
· Prothom Alo

সুনামগঞ্জে আকস্মিক বন্যার পূর্বাভাসে হাওরাঞ্চলের কৃষকদের মধ্যে উদ্বেগ ও আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। অনিশ্চয়তার মধ্যেই তাঁরা দ্রুত ধান কাটার কাজে নেমেছেন। তবে গত দুই দিন হালকা থেকে মাঝারি বৃষ্টির পূর্বাভাস থাকলেও তা না হওয়ায় কৃষকেরা নির্বিঘ্নে মাঠে কাজ করতে পেরেছেন। আজ শনিবার সকালে জেলায় রোদ দেখা গেছে, আকাশও ছিল বেশ পরিষ্কার।
Visit tr-sport.bond for more information.
সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মামুন হাওলাদার সকালে প্রথম আলোকে বলেন, বৃষ্টি না হওয়াটা স্বস্তির হলেও ২৮ এপ্রিল থেকে ভারী বৃষ্টি শুরু হতে পারে। এ সময় নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে কোথাও কোথাও বিপৎসীমা অতিক্রম করে হাওরে ঢুকে পড়তে পারে, ফলে বন্যার আশঙ্কা আছে।
সুনামগঞ্জে অকালবন্যার শঙ্কায় দ্রুত হাওরের ধান কাটার পরামর্শ পাউবোর‘ইবার দেখি বিপদ আমরার পিছ ছাড়ে না’
কৃষকেরা জানান, হাওরের প্রায় অর্ধেক ধান এখনো পাকেনি। মৌসুমের শুরুতে বৃষ্টি কম হওয়ায় ধান পাকতে দেরি হচ্ছে। আবার অনেক এলাকায় জলাবদ্ধতার কারণে কম্বাইন হারভেস্টর দিয়ে ধান কাটতে সমস্যা হচ্ছে। পাশাপাশি শ্রমিকসংকটও আছে।
কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, জেলায় ১৩৭টি হাওরে এবার ২ লাখ ২৩ হাজার ৫১১ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছে। উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা প্রায় ১৪ লাখ টন। গতকাল শুক্রবার পর্যন্ত ৫৩ হাজার ৬৪০ হেক্টর জমির ধান কাটা হয়েছে। এখনো কাটা হয়নি ১ লাখ ৬৯ হাজার ৪৭১ হেক্টর। আজ কাটার উপযোগী পাকা ধান আছে ১৬ হাজার ৯৮৬ হেক্টর জমিতে।
কর্মকর্তারা বলছেন, দু-এক দিনের মধ্যে আরও প্রায় এক লাখ হেক্টর জমির ধান পেকে যাবে। জেলায় ৬০২টি কম্বাইন হারভেস্টর থাকলেও জলাবদ্ধতা ও শ্রমিকসংকটের কারণে অনেক কৃষক বিপাকে পড়েছেন।
সদর উপজেলার বাওন হাওরপাড়ের কৃষক আলী আকবর (৫২) বলেন, কখন কী হয়, এ চিন্তায় আছেন। নিচু জমির ধান জলাবদ্ধতায় নষ্ট হয়েছে, উঁচু জমির ধান কাটছেন। কিন্তু সব ধান এখনো পাকেনি।
আরেক কৃষক নূর হোসেন (৩৮) বলেন, ‘দুইটা দিন মেঘ (বৃষ্টি) হইছে না, এর লাগি ভালা লাগছে। ওখন কও বন্যা অইব। ইবার দেখি বিপদ আমরার পিছ ছাড়ে না।’
জেলায় ১৩৭টি হাওরে এবার ২ লাখ ২৩ হাজার ৫১১ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছে। উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা প্রায় ১৪ লাখ টন। গতকাল শুক্রবার পর্যন্ত ৫৩ হাজার ৬৪০ হেক্টর জমির ধান কাটা হয়েছে।
‘জমিতে পাকা ধান ফেলে রাখা যাবে না’
হাওরে এখন কৃষকেরা ধান কাটা ও মাড়াইয়ের কাজে কম্বাইন হারভেস্টরের ওপর অনেকাংশে নির্ভরশীল। অনেকেই মেশিন না পাওয়ায় ধান কাটছেন না। এখন এটি আর করা যাবে না বলে সতর্ক করেছেন জেলার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ ওমর ফারুক। তিনি বলেন, এখন আর কম্বাইন হারভেস্টরের জন্য অপেক্ষা করার সুযোগ নেই। ধান ৮০ শতাংশ পাকলেই কেটে ফেলতে হবে। প্রয়োজনে শ্রমিক দিয়ে দ্রুত ধান কাটা, মাড়াই ও শুকানোর কাজ শেষ করতে হবে।
হাওরে খলায় ধান রাখা এখন ঝুঁকিপূর্ণ বলে মনে করেন এই কর্মকর্তা। তাঁর মতে, মাড়াই করা ধান দ্রুত শুকিয়ে নিরাপদ স্থানে সংরক্ষণ করতে হবে। জলাবদ্ধতার কারণে অনেক স্থানে মেশিন ব্যবহার করা না গেলেও জমিতে পাকা ধান ফেলে রাখা যাবে না।
ওমর ফারুক প্রথম আলোকে বলেন, ‘আবহাওয়া সতর্কবাতাটি আমরা মাঠে পৌঁছে দিচ্ছি। একই সঙ্গে প্রশাসন, পাউবো থেকেও বলা হচ্ছে। ধান কাটায় কৃষকদের প্রয়োজনীয় সহযোগিতা ও পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।’
মোহাম্মদ ওমর ফারুক, জেলার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালকআবহাওয়া সতর্কবাতাটি আমরা মাঠে পৌঁছে দিচ্ছি। একই সঙ্গে প্রশাসন, পাউবো থেকেও বলা হচ্ছে। ধান কাটায় কৃষকদের প্রয়োজনীয় সহযোগিতা ও পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।পাউবোর জরুরি সতর্কতা
উজানে ভারী বৃষ্টির কারণে সুনামগঞ্জে আকস্মিক বন্যা দেখা দিতে পারে—এমন আশঙ্কায় পাউবো গতকাল জরুরি বিজ্ঞপ্তি জারি করেছে। সুনামগঞ্জ পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মামুন হাওলাদারের সই করা বিজ্ঞপ্তিতে চার দিনের মধ্যে পাকা ধান দ্রুত কাটার আহ্বান জানানো হয়।
এতে বলা হয়, আগামী কয়েক দিনে উত্তর-পূর্বাঞ্চল ও উজানে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি বৃষ্টি হতে পারে। ২৪-২৬ এপ্রিল হালকা থেকে মাঝারি, ২৭ এপ্রিল মাঝারি থেকে ভারী এবং ২৮-৩০ এপ্রিল ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস আছে। এতে সুরমা, কুশিয়ারা, ধনু, বৌলাই ও কংস নদের পানি বাড়তে পারে এবং ২৮ এপ্রিল থেকে কোথাও কোথাও বিপৎসীমা অতিক্রম করতে পারে।
আকস্মিক বন্যা পরিস্থিতির শঙ্কা, চার দিনের মধ্যে হাওরের ধান কাটার অনুরোধ পাউবোরপাউবো জানায়, এতে আকস্মিক বন্যা দেখা দিলে হাওরের বোরো ফসলের ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে। তাই যেসব জমির ধান ৮০ শতাংশ পেকেছে, সেগুলো দ্রুত কাটার জন্য কৃষকদের বিশেষভাবে অনুরোধ করা হয়েছে।
প্রকৌশলী মামুন হাওলাদার বলেন, সুনামগঞ্জে স্থানীয় বৃষ্টির চেয়ে উজানে ভারতের চেরাপুঞ্জি অঞ্চলের বৃষ্টিই বেশি ঝুঁকি তৈরি করে। সেখানে বৃষ্টি হলে ঢল নেমে দ্রুত পানি বাড়ে। তাই হাওরের পাকা ধান দ্রুত কাটার বিকল্প নেই।
‘কৃষিকাজ করি খালি বাঁইচ্যা থাকার লাগি, কোনো লাভ নাই’