নেত্রকোনার হাওরে বোরো ধানে কৃষকের স্বস্তি, আছে শঙ্কাও

· Prothom Alo

নেত্রকোনার হাওরসহ নিম্নাঞ্চলে এখন মাঠে মাঠে দুলছে সোনালি ধানের শিষ। কাঙ্ক্ষিত ফলনের আশায় দিগন্তজোড়া বিস্তীর্ণ জমিতে বাতাসের সঙ্গে পাকা বোরো ধানের ঢেউ দেখে কৃষকের মুখে স্বস্তির হাসি। তবে সেই হাসির আড়ালে লুকিয়ে আছে কিছু শঙ্কাও। এবার জ্বালানি তেলের সংকটের পাশাপাশি কৃষকদের আশঙ্কা—হঠাৎ ভারী বৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল কিংবা প্রাকৃতিক দুর্যোগে ফসল ক্ষতির মুখে পড়তে পারে।

কোনো কোনো হাওরপারের মানুষের ফসল হারানোর করুণ গল্প আছে। এরই মধ্যে অতিবৃষ্টিতে কলমাকান্দার গুড়াডোবা, মেদাবিল; মদনের গোবিন্দশ্রী, উচিতপুর; মোহনগঞ্জের ডিঙাপোতা; খালিয়াজুরির কীর্তনখোলা, নন্দের পেটনা, লক্ষ্মীপুর, চুনাই, কাটকাইলেরকান্দা, বৈলং, লেপসাই, চৈতারাসহ বিভিন্ন হাওরের নিচু ধানখেতে জমে থাকা পানিতে প্রায় দুই হাজার হেক্টর জমির আধা পাকা বোরো ধান নষ্ট হয়েছে।

Visit chickenroadslot.lat for more information.

শুক্র ও শনিবার খালিয়াজুরি, মদন ও মোহনগঞ্জের বিভিন্ন হাওর ঘুরে দেখা গেছে, কিষান-কিষানিদের বিশাল কর্মযজ্ঞ চলছে। কোনো কোনো খেতে ধান আধা পাকা থাকলেও বেশির ভাগ খেতেই পাকা ধান বাতাসে দুলছে। এসব ধান কাটার ধুম পড়েছে। হাওরে জিরাতি (অস্থায়ী ঘর) তৈরি করে ধান কাটা হচ্ছে। একদিকে শ্রমিকের পাশাপাশি যন্ত্র দিয়ে ধান কাটা হচ্ছে। অন্যদিকে একদল শ্রমিক ধানের বোঝা মাথায় করে এনে সড়কের পাশে স্তূপ করে রাখছেন। কেউ যন্ত্রের সাহায্যে মাড়াই করা ধান স্থানীয় মহাজনদের কাছে বিক্রি করে দিচ্ছেন। এসব ধান ট্রাক, লরি, টমটম ও ইজিবাইক দিয়ে বিভিন্ন স্থানে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। কেউ আবার কাটা ধানের আঁটি আঙিনায় এনে মেশিন দিয়ে মাড়াই করছেন। জমির পাশে বা বাড়ির সামনে ধান সেদ্ধ করা ও শুকানোর জন্য জায়গাও তৈরি করছেন তাঁরা।

মদন উপজেলার কুলিয়াটি গ্রামের কৃষক আসাদুল্লাহ রিয়াদ (৩৩)। তাঁর উচিতপুর হাওরের জমিতে আটজন শ্রমিক ধান কাটছেন। রাজধানীর একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতকোত্তর করা এই যুবক প্রথম আলোকে বলেন, ‘চাকরির পেছনে না ঘুরে আমি চার বছর ধরে বাড়িতে এসে কৃষিকাজ করছি। খুব ভালো সময় কাটাচ্ছি। এবার ১১ একর জমিতে বোরো আবাদ করতে খরচ হয়েছে প্রায় তিন লাখ টাকা। ফলন ভালো হলেও পোষাবে না। কারণ, ডিজেলের অভাবে ধান কাটার যন্ত্র পাচ্ছি না। প্রত্যেক শ্রমিককে ৯০০ টাকা রোজ দিতে হয়। অনেক খরচ পড়ছে। স্থানীয়ভাবে ধান বিক্রি করছি মাত্র ৮৫০ টাকা মণ।’

হাওরে কৃষিশ্রমিকেরা ধান কাটছেন। শুক্রবার দুপুরে মদন উপজেলার উচিতপুর হাওরের উচিতপুর সেতু এলাকায়

খালিয়াজুরির জগন্নাথপুরের কৃষক ফিরোজ মিয়া জানান, তিনি নন্দের পেটনা হাওরে ১৩ একর জমি আবাদ করেছেন। এর মধ্যে দুই সপ্তাহ আগে ভারী বৃষ্টিতে তিন একর জমির ফসল তলিয়ে নষ্ট হয়েছে। বাকি খেতের ধান পেকেছে। কিন্তু শ্রমিকের অভাবে ধান কাটতে পারছেন না। জমিগুলোয় হাঁটুপানি জমায় সেখানে মেশিনে ধান কাটা যাচ্ছে না। এ ছাড়া ডিজেল সহজলভ্য না হওয়ায় ধান কাটার মেশিনও পাওয়া যাচ্ছে না। বাধ্য হয়ে দুই সন্তান নিয়ে নিজে ধান কাটছেন।

জগন্নাথপুর হাওরে গিয়ে দেখা গেছে, কোমরপানিতে নেমে ওই গ্রামের কৃষক রোমান মিয়া ধান কাটছেন। তিনি বলেন, ‘এক হাজার টাকা রোজ দিয়েও শ্রমিক পাওয়া যাচ্ছে না। চোখের সামনে ধান নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। কোনো উপায় না পেয়ে সকাল থেকে ধান কাটছি।’

ওই হাওরের একটি খেতে হারভেস্টার দিয়ে ধান কাটাচ্ছেন সেকুল কাজি নামের এক কৃষক। তিনি বলেন, ‘মদন থেকে অনেক বলেকয়ে একটি হারভেস্টার আনিয়েছি। কাঠাপ্রতি (১০ শতক) ৬০০ টাকা দিতে হচ্ছে।’

যন্ত্রটির চালক কাইয়ুম মিয়া বলেন, ‘ডিজেল পাওয়া যাইতাছে না। প্রতিদিন মেশিনে প্রায় ১০০ লিটার ডিজেল লাগে। খুচরা বাজারে ডিজেল নাই। তাই মেশিন চালাইতে পারতাছি না। শুনতাছি ডিজেলের কোনো সমস্যা না; কিন্তু আমরা হাওরে পাইতাছি না।’

হারভেস্টার (ধান কাটার যন্ত্র) দিয়ে ধান কাটা হচ্ছে। শুক্রবার বিকেলে খালিয়াজুরি উপজেলার জগন্নাথপুর হাওরে

খালিয়াজুরির পুরানহাটি গ্রামের বাসিন্দা তোফাজ্জল হোসেন পাঙ্গাসিয়া হাওর ও সেনের বিলে অন্তত ১৬ একর খেতে বোরো আবাদ করেছেন। গত মঙ্গলবার ব্রি–২৮ ও ব্রি–৮৮ জাতের ধান কাটা শুরু করেছেন। তিনি জানান, বীজ বপন থেকে শুরু করে এসব ধান ১৪৩ থেকে ১৪৫ দিনের মধ্যে কাটা যায়। তিনি বলেন, ‘ধানের ছড়ায় মাঠ ভইরা গেছে। সোনা রঙের মাঠভরা ধান দেখলে মনডা জুরাইয়া যায়; কিন্তু আকাশে মেঘ দেখলেই আতঙ্কে থাকি। ডিজেলের সংকটে সহজে হারভেস্টার পাওয়া যাইতেছে না। শ্রমিক দিয়া ধান কাটলে অনেক খরচ পড়ে। গত চার দিনে এক একর জমির ধান কাটা হইছে। মাঠেই ভিজা ধান প্রতি মণ ৮২০ টেহা দরে বেইচ্চা দিতাছি।’

স্থানীয় বাসিন্দা ও জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, এ বছর ১০টি উপজেলায় ১ লাখ ৮৫ হাজার ৫৪৭ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ করা হয়েছে। এর মধ্যে হাওরাঞ্চলে ৪১ হাজার ১২০ হেক্টর জমিতে আবাদ করা হয়েছে। হাওরপারের মানুষদের একমাত্র ফসলই হচ্ছে বোরো। এ ফসলের ওপরই নির্ভর করে কৃষকদের সন্তানদের লেখাপড়া, চিকিৎসাসহ সারা বছরের সংসার খরচ। ফসল রক্ষায় এ বছর ১৩৭ দশমিক ৫৭৯ কিলোমিটার বাঁধ নির্মাণ করা হয়। এ জন্য ২০২টি প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি (পিআইসি) গঠন করে ব্যয় ধরা হয় ৩১ কোটি টাকা। গত রোববার খেতের পাকা ধান কাটতে শুরু করেন কৃষকেরা।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. আমিনুল ইসলাম জানান, পরিবেশ অনুকূলে থাকলে আশা করা যায়, আগামী তিন সপ্তাহের মধ্যে শতভাগ ধান কাটা হয়ে যাবে। শ্রমিকের পাশাপাশি বিভিন্ন হাওরে ছয় শতাধিক কম্বাইন্ড হারভেস্টার দিয়ে ধান কাটার কাজ চলছে। হারভেস্টার চালাতে ডিজেল সহজলভ্য করার বিষয়টি নিয়ে জেলা প্রশাসনের সঙ্গে কথা হয়েছে। আশা করা যাচ্ছে, এ সংকট কেটে যাবে। প্রাকৃতিক কোনো রকম দুর্যোগ না হলে মে মাসের মাঝামাঝি সময়ে হাওরে আবাদ করা শতভাগ জমির ধান কাটা সম্ভব হবে।

মোহনগঞ্জ উপজেলার খুরশিমুল গ্রামের কৃষক আলয় সরকার ডিঙাপোতা হাওরে খেতের ধান শুক্রবার কাটতে শুরু করেছেন। শ্রমিক দিয়ে প্রতি ১০ শতক জায়গার ধান চুক্তিতে ১ হাজার ৪০০ টাকা করে কাটাচ্ছেন। তিনি বলেন, ‘খেতের সব ধান না পাকলেও আধা পাকা ধান বেশি টাকা খরচ করে কাটতে শুরু করেছি। এবার অতিরিক্ত বৃষ্টিতে হাওরে পানি আসতে পারে, তাই আতঙ্কে আছি। ফলন ভালো হলেও জমির সব ধান ঘরে তুলতে পারব কি না, বিশ্বাস নাই।’

মাড়াই করা ধান স্তূপ করে রাখা হয়েছে। শুক্রবার দুপুরে মদন উপজেলার গোবিন্দশ্রী এলাকায়

কৃষকেরা জানান, প্রায় প্রতিদিন রাতে হালকা ও মাঝারি বৃষ্টি হওয়ায় ধান কাটা নিয়ে তাঁরা চিন্তায় আছেন। ভারী বৃষ্টিতে আগাম বন্যা হলে ২০১৭ সালের মতো ফসল রক্ষার বাঁধ ভেঙে হাওরের সব ধান তলিয়ে যাবে।

তবে এখন বৃষ্টি বা বন্যার তেমন কোনো পূর্বাভাস নেই বলে জানান জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সাখাওয়াত হোসেন। তিনি বলেন, ‘বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, ২৪ এপ্রিল পর্যন্ত ভারী বৃষ্টির কোনো পূর্বাভাস নেই। কৃষকেরা যাতে নির্বিঘ্নে ফসল কেটে ঘরে তুলতে পারেন, সে জন্য আমরা ছুটি বাতিল করে সর্বক্ষণ মাঠে রয়েছি।’

এদিকে সরকারিভাবে এখনো ধান ক্রয় শুরু না হওয়ায় প্রান্তিক কৃষকদের স্থানীয় হাটবাজারে ও মহাজনদের কাছে কম দামে ধান বিক্রি করতে হচ্ছে। খালিয়াজুরির পুরানহাটি গ্রামের কৃষক শামসুর রহমান বলেন, ‘সরকার ধান কেনা শুরু না করায় আমরা স্থানীয় মহাজনদের কাছে ৮৪০ টাকা মণ বিক্রি করছি।’

নগর গ্রামের কৃষক দুলু সরকার বলেন, ‘হাওরে অহন কৃষকের কাছে ধান আছে। কিন্তু আর কয়েক দিন পর এই ধান ফড়িয়াদের হাতে যাইবোগা। কৃষকেরা মহাজনসহ বিভিন্নভাবে ঋণ নিয়া ফসল ফলায়। তারা মৌসুমের শুরুতেই ঋণ পরিশোধের জন্য ধান বিক্রি করতে বাধ্য হয়। আমরা সরকারিভাবে দ্রুত ধান কিননের দাবি জানাই।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক মো. মোয়েতাছেমুর রহমান জানান, সরকারিভাবে ধান সংগ্রহ অভিযান শুরু হওয়ার তারিখ এখনো নির্ধারণ হয়নি। হয়তো সরকার এ ব্যাপারে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেবে।

জেলা প্রশাসক খন্দকার মুশফিকুর রহমান বলেন, হাওরাঞ্চলে এখন পুরোদমে ধান কাটা চলছে। কৃষকেরা যাতে তাঁদের একমাত্র বোরো ফসল নির্বিঘ্নে গোলায় তুলতে পারেন, এ জন্য যা যা করা দরকার, সেটি করা হচ্ছে।

Read full story at source