সমুদ্রপথে বিদেশযাত্রা নয়

· Prothom Alo

‘স্বপ্ন নাকি মৃত্যুযাত্রা? আমাদের করণীয়’ শিরোনামে গোলটেবিল বৈঠকের আয়োজন করে ব্র্যাক ও প্রথম আলো

সমুদ্রপথে বৈধভাবে বিদেশে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। বিভিন্ন সময় দেখা যায়, নৌকায় সমুদ্রপথে ইউরোপে যাওয়ার চেষ্টাকালে অনেকেই মারা যাচ্ছেন। মনে রাখতে হবে, দেশের ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিমানবন্দর ছাড়া বৈধভাবে প্রবাসে যাওয়ার সুযোগ নেই। এর পরও দালালদের খপ্পরে পড়ে সমুদ্রপথে ইউরোপে যাওয়ার জন্য অবৈধ পন্থা অবলম্বন করছেন অনেকে। ফলে মানব পাচারকারী দুর্বৃত্ত চক্রের ফাঁদে পা দিয়ে নির্যাতনের শিকার হতে হচ্ছে তাঁদের। এসব বিষয়ে সচেতন হওয়া ছাড়া উপায় নেই।

Visit betsport.cv for more information.

গতকাল শনিবার ইউরোপীয় ইউনিয়নের সহযোগিতায় প্রথম আলো ও ব্র্যাকের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এক গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা এ কথা বলেন। সকাল সাড়ে ১০টায় শুরু হয়ে বৈঠক চলে বেলা দেড়টা পর্যন্ত। সিলেট বিমানবন্দর এলাকার গ্র্যান্ড সিলেট হোটেল অ্যান্ড রিসোর্টে ‘স্বপ্ন, নাকি মৃত্যুযাত্রা? আমাদের করণীয়’ শিরোনামে এ গোলটেবিল বৈঠক হয়।

বৈঠকে প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী বলেন, মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি মালয়েশিয়া সফর করেন এবং সেখানে অভিবাসীদের প্রতারিত হওয়ার তিক্ত অভিজ্ঞতার বিষয়টি শোনেন। দেশে–বিদেশে একটি শক্তিশালী মাফিয়া সিন্ডিকেট বা চক্র গড়ে উঠেছে, যারা সাধারণ মানুষকে প্রতারণার জালে ফেলছে। বর্তমান সরকার এই সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি ঘোষণা করেছে।

আরিফুল হক চৌধুরী, প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রীদেশে–বিদেশে একটি শক্তিশালী মাফিয়া সিন্ডিকেট বা চক্র গড়ে উঠেছে, যারা সাধারণ মানুষকে প্রতারণার জালে ফেলছে। বর্তমান সরকার এই সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি ঘোষণা করেছেন।

আরিফুল হক চৌধুরী আরও বলেন, বিদেশের বাজারে দক্ষ কর্মী পাঠাতে সরকার প্রশিক্ষণের ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে। বিশেষ করে জাপানের শ্রমবাজারের জন্য এন৪ বা এন৫ স্ট্যান্ডার্ডের (জাপানি ভাষাদক্ষতা পরীক্ষা) ভাষা শিক্ষক আনার পরিকল্পনা করা হচ্ছে।

দালালদের দৌরাত্ম্য বন্ধ করতে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে বলে প্রবাসীকল্যাণমন্ত্রী জানান। তিনি বলেন, দালালদের নগদ টাকা দিয়ে প্রতারিত হওয়া থেকে বাঁচাতে সরকার একটি সিস্টেম তৈরির কাজ করছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে ‘প্রবাসী কার্ড’ প্রবর্তনের পরিকল্পনা রয়েছে, যাতে ক্যাশ লেনদেনের বদলে একটি নির্দিষ্ট সিস্টেমের মাধ্যমে প্রবাসীরা সহায়তা পেতে পারেন।

বৈঠকের শুরুতেই ধারণাপত্র উপস্থাপন করেন ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের সহযোগী পরিচালক শরিফুল ইসলাম হাসান। তিনি বলেন, দেশের নির্দিষ্ট কিছু অঞ্চল, যেমন মাদারীপুর, শরীয়তপুর, সিলেট, সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ ও কিশোরগঞ্জ থেকে সবচেয়ে বেশি মানুষ ঝুঁকি নিয়ে সাগর পাড়ি দিচ্ছেন। ব্র্যাক নিরাপদ অভিবাসন নিশ্চিত করতে তিনটি স্তরে কাজ করছে। গত আট বছরে ব্র্যাক প্রায় ৩৯ হাজার মানুষকে বিমানবন্দরে সহায়তা দিয়েছে এবং ইউরোপ থেকে ফেরত আসা ব্যক্তিদের ব্যবসা শুরুর জন্য আর্থিক ও মানসিক কাউন্সেলিংয়ের মাধ্যমে সহায়তা করেছে।

‘স্বপ্ন নাকি মৃত্যুযাত্রা? আমাদের করণীয়’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে অংশগ্রহণকারীরা

ভবিষ্যতে প্রবাসীদের যোগ্য জনশক্তি হিসেবে গড়ে তুলতে কারিগরি শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা, পাঠ্যপুস্তকে নিরাপদ অভিবাসন ও পাচার রোধের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব শরিফুল ইসলাম তাঁর বক্তব্যে দিয়েছেন।

সিলেটের বিভাগীয় কমিশনার খান মো. রেজা-উন-নবী তাঁর বক্তব্যে বলেন, অবৈধ পথে বিদেশে যাওয়া অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। লিবিয়ায় নিয়ে মানুষের ওপর অমানবিক নির্যাতন করে সেই ভিডিও স্বজনদের দেখিয়ে টাকা হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে। বিষয়গুলো নিয়ে জনসচেতনতা তৈরি করতে ইসলামিক ফাউন্ডেশন এবং ইমামদের সম্পৃক্ত করার প্রয়োজন রয়েছে।

বিদেশফেরতরা শোনালেন তিক্ততার গল্প

গোলটেবিল বৈঠকে বিদেশফেরত কয়েকজন নিজেদের অভিজ্ঞতার গল্প শোনালেন। এ ছাড়া সম্প্রতি লিবিয়া থেকে সাগরপথে গ্রিসে যাওয়ার সময় পথ হারিয়ে নৌকায় মারা যাওয়া অভিবাসনপ্রত্যাশী সুনামগঞ্জের দুজনের পরিবারের সদস্যরা কথা বলেছেন। তাঁরা নিজেদের অভিজ্ঞতা এবং দালালদের মাধ্যমে হয়রানির বিষয়গুলো তুলে ধরেন।

প্রায় ২৫টি দেশ ঘুরে ফ্রান্স থেকে দেশে ফেরা সুজন মিয়া বলেন, তিনি প্রথমে মধ্যপ্রাচ্যে গিয়েছিলেন। এরপর প্রায় ২৫টি দেশ ঘুরে অবৈধ পথে ফ্রান্সে পৌঁছেছিলেন; কিন্তু সেখানে বৈধ হওয়ার আগেই পুলিশের হাতে আটক হয়ে দেশে ফেরত আসতে হয়েছে। দেশে ফেরার পর ১৭ লাখ টাকা দিয়ে অস্ট্রেলিয়ার ভিসা করিয়েছিলেন; কিন্তু ওই ভিসায় তিনি এখন যেতে পারছেন না। তাঁর ধারণা ভিসাটি জাল।

১০ বছর যুক্তরাজ্যে অবস্থান করে ফেরা শাহরিয়ার জামান বলেন, তিনি দালালের মাধ্যমে যুক্তরাজ্যে পড়াশোনার জন্য গিয়েছিলেন। সেখানে প্রায় আট বছর ছিলেন। প্রথমে দালালেরা পড়াশোনার পাশাপাশি বৈধভাবে কাজ করার সুযোগ দেওয়ার কথা জানালেও সেখানে গিয়ে তেমন কিছু মেলেনি। অবৈধভাবে কাজ করতে হয়েছে। যেখানে অন্যরা ঘণ্টায় আট পাউন্ড পেতেন, সেখানে তাঁকে ঘণ্টায় এক পাউন্ডে কাজ করতে হয়েছে।

সিলেটের বিশ্বনাথ উপজেলার বাসিন্দা সৌদিফেরত রুকসানা বেগম বলেন, তিনি দালালের মাধ্যমে সৌদি আরবে গিয়েছিলেন। সেখানে তাঁকে স্থায়ীভাবে কোনো কাজ দেওয়া হয়নি। সৌদি আরবে অবস্থানকালে তাঁকে বিভিন্নভাবে নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে। প্রায় দুই বছর আগে তিনি দেশে ফিরেছেন। বর্তমানে ব্র্যাকের সহায়তায় দোকান পরিচালনা করছেন।

দালালদের শনাক্ত করার দাবি

সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের পরিচালক মো. হাফিজ আহমেদ বলেন, এই ভয়ংকর মৃত্যুযাত্রা থামাতে বিদেশে যাওয়ার ক্ষেত্রে যথাযথ প্রশিক্ষণ, নিবন্ধন এবং পরবর্তী তদারকির ধাপগুলো অনুসরণ করা প্রয়োজন।

সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে দায়িত্ব পালন করা ৭ এপিবিএনের সহকারী পুলিশ সুপার জনি লাল দেব বলেন, বিমানবন্দর–সংশ্লিষ্ট এলাকায় মানব পাচারকারী ও চোরাচালানিদের একটি সক্রিয় গোষ্ঠী রয়েছে, যারা সাধারণ যাত্রীদের নানা ধরনের প্রলোভন দেখিয়ে ভুল পথে পরিচালিত করার চেষ্টা করে। তাঁরা অপরাধী চক্রগুলোকে শনাক্ত করার কাজ করে যাচ্ছেন।

সিলেট জেলা প্রেসক্লাবের সভাপতি মুকতাবিস উন নূর বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে অনেক নারী শ্রমিক যৌন হয়রানি ও লালসার শিকার হচ্ছেন। যার ফলে বেশ কিছু দেশ ইতিমধ্যে মধ্যপ্রাচ্যে নারী শ্রমিক পাঠানো বন্ধ করে দিয়েছে। বাংলাদেশকেও এ বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা দরকার।

অবৈধ বিদেশযাত্রা ঠেকাতে দালালদের শনাক্ত করে শাস্তির আওতায় আনার প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করেন সিলেট প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন।

প্রথম আলোর সহকারী সম্পাদক ফিরোজ চৌধুরীর সঞ্চালনায় আরও বক্তব্য দেন সিলেট জেলা কর্মসংস্থান ও জনশক্তি কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক মো. নাজমুস সাকিব, সিলেট সরকারি কারিগরি প্রশিক্ষণকেন্দ্রের জ্যেষ্ঠ প্রশিক্ষক জাকির হোসেন, সিলেট বিভাগীয় পাসপোর্ট ও ভিসা কার্যালয়ের উপপরিচালক মো. সালাহ উদ্দিন, প্রবাসীকল্যাণ ব্যাংক সিলেটের ভারপ্রাপ্ত অঞ্চলপ্রধান মাহবুবুল মান্নান চৌধুরী, ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের জ্যেষ্ঠ ব্যবস্থাপক মো. সাজ্জাদ হোসেন, সমন্বয়ক মো. হারুন অর রশীদ, আলমগীর হোসেন। সূচনা বক্তব্য দেন প্রথম আলো সিলেটের নিজস্ব প্রতিবেদক সুমনকুমার দাশ।

Read full story at source