সংরক্ষিত আসনের নারীরা যে কারণে ‘অবলা’ থেকে যাবেন
· Prothom Alo

নারীর ক্ষমতায়ন নিয়ে আমাদের আছে সীমাহীন আকাঙ্ক্ষা ও আহাজারি। একই সঙ্গে আছে বিবমিষা। একেক গোষ্ঠীর নিয়ত একেক রকম। এর প্রকাশ দেখি তাদের ভাষণ, বিবৃতি, ঘোষণাপত্র আর কথাবার্তায়। ‘নারী’ নিয়ে নারীরা যত ভাবেন, পুরুষ মনে হয় তার চেয়ে বেশিই ভাবেন। নারী কীভাবে সাজবেন, চলবেন, বলবেন, ভাববেন—এ চিন্তায় অনেক পুরুষের রাতে ঘুম হয় না।
একটা বিষয় অনেক দিন ধরেই আলোচনায় আছে—সমাজের বিভিন্ন স্তরে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত হবে কীভাবে? একদল মনে করে, নারী নেতৃত্ব কাম্য নয়। যাঁরা এই বিশ্বাস নিয়ে আছেন, আমি তাঁদের কথা বলছি না। কারণ, বিশ্বাসের সঙ্গে তর্ক চলে না। যদিও যাঁরা কথায় ও লেখায় নারীর অংশগ্রহণের কথা জোরেশোরে বলেন, তাঁরা এটা আদৌ বিশ্বাস করেন কি না, এ নিয়ে সন্দেহ আছে। এ ক্ষেত্রে আমরা রাজনীতির বিষয় নিয়ে আলাপ করতে পারি।
Visit sport-tr.bet for more information.
আমাদের দেশের রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ কম। এর কিছু অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কারণ আছে। রাজনীতির মাঠে যে পরিবেশ, তা নারীবান্ধব নয়। অবশ্য রাজনীতির মাঠ তো সমাজের বাইরে নয়। আমাদের সমাজ নারীকে যে চোখে দেখতে অভ্যস্ত, রাজনীতির অঙ্গনও তার ব্যতিক্রম হবে না। কেউ কেউ তর্ক জুড়ে দিতে পারেন, দুই নারী তো ৪৫ বছর ধরে দেশের দুটি বৃহত্তম দলের নেতৃত্ব দিলেন, সরকারপ্রধান হিসেবে ৩৫ বছর দেশ পরিচালনা করলেন, তাহলে কী করে বলি যে দেশে নারী নেতৃত্ব গ্রহণযোগ্য হয়নি! এটা একটা যুক্তি বটে।
প্রশ্ন হলো, তাঁরা তো দুজন ব্যক্তি। একটা শূন্যতার মধ্যে পারিবারিক উত্তরাধিকারের সূত্রে তাঁরা রাজনীতিতে এসেছিলেন। তারপর তাঁরা নিজ গুণেই নেতা হয়েছিলেন। কিন্তু এটা তো একটা সাধারণ নিয়ম হতে পারে না!
তো রাষ্ট্র পরিচালনার শীর্ষ পর্যায়ে নারী নেতৃত্ব এত বছর টিকে থাকার পরও নারীর প্রতি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি কি ইতিবাচক হয়েছে? হয়তো কিছুটা হয়েছে, আবার অনেক ক্ষেত্রে উল্টোযাত্রাও দেখছি।
এ সত্ত্বেও আমাদের যে একটি সংবিধান আছে, সেখানে নারী-পুরুষের সমান অধিকার ও মর্যাদার কথা বলা আছে। একই সঙ্গে ধর্মীয় আইনের অনেক বিধানও চালু আছে। ফলে একটা ভজকট অবস্থা তৈরি হয়েছে। আমাদের সরকার নারীর ক্ষমতায়ন ও অংশগ্রহণ–সংক্রান্ত ‘সিডও’ সনদ গ্রহণ করেছে শর্ত সাপেক্ষে। সনদের কয়েকটি ধারা এখনো গ্রহণ করেনি। এ ব্যাপারে মূলধারার বড় রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে একটা অলিখিত সমঝোতা আছে। তারা সরকারে গিয়ে বিষয়টি উপেক্ষা করেছে।
মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার ‘রাষ্ট্র সংস্কারের’ লক্ষ্যে রীতিমতো কামান দেগেছিল। কয়েকটি কমিশন গঠন করেছিল। তার মধ্যে একটি ছিল নারীবিষয়ক কমিশন। এই কমিশন অনেক খেটেখুটে একটি প্রতিবেদনও জমা দিয়েছিল। এ নিয়ে বিষম হইচই হয়। শেষ পর্যন্ত কোনো রাজনৈতিক দল এই প্রতিবেদনের পক্ষে দাঁড়ানোর সৎসাহস দেখাতে পারেনি। ফলে আঁতুড়েই মারা যায় কমিশনের প্রতিবেদন। ইউনূস সরকার ছয়টি কমিশনের সমন্বয়ে যে একটি কমিটি করেছিল, তাতে নারীবিষয়ক কমিশনের জায়গা হয়নি। পুরোটাই ছিল এক নিদারুণ অপচয় ও হতাশা।
এ দেশে তো লোকেরা কথায় কথায় শাহবাগের মোড় অবরোধ করে দাবিদাওয়া জানায়। নারীর বিষয়টি নিয়ে কারও মাথাব্যথা দেখলাম না। কোনো নাগরিক সংগঠন এ নিয়ে তেমন উচ্চবাচ্য করেনি।
এবার আসা যাক আমাদের রাজনীতি ও সরকারব্যবস্থার দিকে। আমাদের দেশের আইনসভায় নারীর জন্য সংরক্ষিত আসন আছে। শুরু থেকেই এটা ছিল। ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে সংরক্ষিত নারী আসনের প্রার্থীরা নাগরিকদের ভোটে নির্বাচিত হয়ে আসতেন। আসনসংখ্যা ছিল ৭। ১৯৭০ সালের নির্বাচন হয়েছিল জেনারেল ইয়াহিয়া খানের জারি করা আইনি কাঠামোর (লিগ্যাল ফ্রেমওয়ার্ক অর্ডার) ভিত্তিতে। সেখানে জাতীয় পরিষদে নারীর জন্য ১৫টি আসন সংরক্ষিত রাখা হয়। এই ১৫ জনকে ভাগ করে নেবে সাধারণ নির্বাচনে জিতে আসা দলগুলো।
অনেকেই মনে করেন, আমাদের বাহাত্তরের সংবিধান বিশ্বসেরা। তাঁদের জ্ঞাতার্থে জানাই, ওই সংবিধানে নারীর জন্য ১৫টি আসন সংরক্ষিত রাখা হয়। নতুন দেশ। মানুষ গণতন্ত্রের জন্য এবং বৈষম্য দূর করতে পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে অনেক আন্দোলন করেছে। বাহাত্তরের সংবিধানে দেখলাম, সংরক্ষিত নারী আসনের জন্য ভোটের ব্যবস্থা রাখা হয়নি। ইয়াহিয়ার আইনি কাঠামোকেই অনুসরণ করা হয়েছে। যে দল সংখ্যাগরিষ্ঠ, তারা সব কটি নিয়ে নেবে। এ রকম একটি অগণতান্ত্রিক ও পশ্চাৎপদ ব্যবস্থা রেখে দেওয়া হলো সংবিধানে। এরপর বিভিন্ন সরকার এসে সংরক্ষিত নারী আসনের সংখ্যা বাড়িয়েছে। কিন্তু পুরোনো ‘নির্বাচন’ প্রক্রিয়াটিই অক্ষুণ্ন রেখেছে। তবে একটু পরিবর্তন হয়েছে। সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী দলগুলো তাদের আসনসংখ্যা অনুযায়ী নারীদের কোটা করে নেয়।
আচ্ছা, সংরক্ষিত আসনে সরাসরি নির্বাচন দিলে সমস্যা কোথায়? ১৯৫৪ সালে এ ব্যবস্থা থাকতে পারলে ২০২৬ সালে এসে এটা কেন থাকবে না? আমরা ধরে নিই, সংরক্ষিত আসনে নারীরা এ দেশের নাগরিকদের প্রতিনিধিত্ব করবেন। বাস্তবে তাঁরা প্রতিনিধিত্ব করেন সাধারণ নির্বাচনে জিতে আসা সদস্যদের, হাতে গোনা কয়েকজন ছাড়া সবাই পুরুষ। ফলে যেটি হয়েছে, সংরক্ষিত নারী আসনের নামে সংসদে চেয়ারের সংখ্যা বেড়েছে। এটা হচ্ছে সংসদের নিতান্তই একটা ‘এক্সটেনশন’। সংরক্ষিত আসনের নারীরা জনপ্রতিনিধি নন।
স্থানীয় সরকারের ক্ষেত্রে বিষয়টি উল্টো। ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশনে সংরক্ষিত নারী আসনে ভোট হয়। সেখানে নারী-পুরুষনির্বিশেষে সবাই তাঁদের ভোট দেন। তাঁদের জন্য থাকে আলাদা ব্যালট পেপার। তাহলে জাতীয় সংসদের বেলায় অন্য রকম ব্যবস্থা কেন? নাকি স্থানীয় পর্যায়ে নারীরা অনেক বেশি স্বাধীন, স্বাবলম্বী ও পরিপক্ব! আর জাতীয় পর্যায়ে নারীরা নবিশ ও অবলা! আমাদের দেশে তথাকথিত অনেক নারী নেতা এবং সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে মূল্যবান অবদান রাখা অনেক নারীকে দেখেছি, সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য হতে মুখিয়ে থাকেন।
এযাবৎ যত নারী সংরক্ষিত আসনে পুরুষনির্ভর রাজনৈতিক দলের বদান্যতায় সংসদে গেছেন, তাঁদের কয়জন কী অবদান রেখেছেন, সেটি প্রশ্নসাপেক্ষ। অনেক সদস্যকে দেখেছি, তাঁরা ঠিকমতো কথা বলতে পারেন না। এমনকি স্ক্রিপ্ট দেখেও কথা বলতে পারেন না। অথচ তাঁদের আমরা বেতন-ভাতা দিয়ে পুষি! প্রশ্ন উঠতে পারে, সাধারণ নির্বাচনে জিতে আসা সদস্যদের গুণমান কি সংরক্ষিত নারী আসনের সদস্যদের চেয়েও বেশি?
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে নারীর জন্য বরাদ্দকৃত ৫০টি আসন শিগগিরই ভাগাভাগি হবে। নির্বাচন কমিশন ইতিমধ্যে তফসিল ঘোষণা করেছে। গণমাধ্যমে দেখেছি, একটি বড় দল মনোনয়নপত্র বিক্রি করছে। মনোনয়ন পেতে অনেকেই হুমড়ি খেয়ে পড়েছেন। প্রথম দিনেই মনোনয়নপ্রত্যাশীর সংখ্যা হাজার ছাড়িয়ে গেছে। তাঁদের অনেকেই সাংবাদিকদের বলছেন, তাঁরা নাকি অনেক আন্দোলন-সংগ্রাম করেছেন, অতএব একটি আসন তাঁদের প্রাপ্য। তাঁদের অভিযোগ, অনেকেই উড়ে এসে জুড়ে বসতে চাইছেন। তাঁদের আহাজারি দেখে মনে হয়, একটি এমপির টিকিটেই মিলবে চিরস্থায়ী সুখ!
অথচ এই ডামাডোলে যে ভাবনাটি কেউ সামনে আনছেন না, তা হলো নাগরিকদের মুখোমুখি না হয়ে সরাসরি নির্বাচন এড়িয়ে দলীয় নেতার বদান্যতায় সংরক্ষিত নারী আসনে যাঁরা মনোনীত হবেন, তাঁরা রাজনীতির মাঠে থেকে যাবেন ‘অবলা’ হিসেবেই।
● মহিউদ্দিন আহমদ লেখক ও গবেষক
* মতামত লেখকের নিজস্ব