ইরানে যুদ্ধবিরতি যে কারণে কাজে আসবে না

· Prothom Alo

ইসলামাবাদে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ২০ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে ইরানের সঙ্গে চুক্তির বিষয়ে নিবিড় আলোচনার পর পাকিস্তান ছেড়েছেন। ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের অবসান ঘটাতে কোনো সুনির্দিষ্ট চুক্তিতে পৌঁছাতে ব্যর্থ হওয়ার পর তিনি আলোচনার ইতি টানেন। তবে কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানেই একজন ইরানি কর্মকর্তা জানালেন, আবার আলোচনা শুরু হওয়া এখনো সম্ভব।

তবে শান্তি আলোচনার ব্যর্থতায় ক্ষুব্ধ হয়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প রোববার ইরানের বিরুদ্ধে যে নৌ অবরোধের ঘোষণা দিয়েছেন, তা পরবর্তী সম্ভাব্য আলোচনায় কেমন প্রভাব ফেলবে সেটা এখনো অনিশ্চিত।

Visit biznow.biz for more information.

ইসলামি প্রজাতন্ত্রের সঙ্গে দর-কষাকষির প্রক্রিয়াটা সব সময়ই এমন। কয়েক বছর আগে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে এক ইরাকি শিয়া ব্যবসায়ীর সঙ্গে আমার কথা হয়েছিল। ওই ব্যবসায়ী কয়েক দশক ধরে ইরানের সঙ্গে জ্বালানি খাতে সফলভাবে ব্যবসা করছেন।

ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিনা শর্তে আত্মসমর্পণের দাবি কিংবা এক রাতে আস্ত সভ্যতা শেষ হয়ে যাওয়ার মতো হুমকির মাধ্যমে কোনো শান্তিচুক্তি সম্ভব নয়। ট্রাম্প হয়তো মনে করেন, এমন চরম অবস্থান তাঁকে ভবিষ্যতে আলোচনার টেবিলে বেশি সুযোগ দেবে। তবে আদতে এটি টেকসই চুক্তির সম্ভাবনা কমিয়ে দেয়।

আমি তাঁকে জিজ্ঞেস করেছিলাম যে ইরানিরা আসলে কতটা দুর্ধর্ষ মধ্যস্থতাকারী? একরাশ হতাশা মাখা হাসিতে তিনি বলেছিলেন, ইরানিদের কাছে কোনো চুক্তি সই করা মানে হচ্ছে আবার দর-কষাকষি শুরু করার প্রাথমিক ধাপ।

ভ্যান্স ও তাঁর দল এবার সেই চুক্তি স্বাক্ষরের পর্যায়ে পর্যন্ত পৌঁছাতে পারেনি। ২১ এপ্রিলের বর্তমান যুদ্ধবিরতি শেষ হওয়ার আগে যদি নতুন করে আলোচনা শুরু হয় এবং কোনো কাগজে সইও হয়, তবু সেটাকে চূড়ান্ত বা অপরিবর্তনীয় বলে ধরে নেওয়া যাবে না।

সিআইএ কর্মকর্তা হিসেবে ইরানিদের সঙ্গে কাজ করার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা থেকে আমি বলতে পারি যে বারবার আলোচনার পর আবার নতুন করে সব শুরু করাটা অত্যন্ত ক্লান্তিকর। সিআইএতে আমাদের মাঝে একটি কৌতুক প্রচলিত ছিল, আপনি যখন কোনো ইরানি ব্যক্তিকে বলেন টাকা নিয়ে আর কোনো কথা হবে না, তখন তিনি মনে করেন যে আসলে টাকা নিয়ে দর-কষাকষির মূল সময়টা এবারই শুরু হলো।

ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের একচ্ছত্র আধিপত্য হারানোর যুদ্ধ

ভ্যান্স যখন ইসলামাবাদে আলোচনা শেষ করে বললেন, আমরা বিস্তারিত আলাপ শেষ করেছি, তখন ইরানিরা সম্ভবত মনে করছে যে এবার মূল বিষয়ে আলোচনার সময় এসেছে। এখন দেখার বিষয় হলো উভয় পক্ষ একে অপরের এই পরোক্ষ সংকেতগুলো সঠিকভাবে বুঝতে পারে কি না। ইরানি মধ্যস্থতাকারীদের একটি প্রবণতা হলো, তারা শুধু সেটাই শুনতে পছন্দ করে, যা তারা শুনতে চায়।

অনেক সময় তারা ইচ্ছাকৃতভাবেই এটা করে, যাতে মূল ও কঠিন সমস্যাগুলো এড়িয়ে গিয়ে একে অপরের কথার মাঝপথে থাকতে পারে। সিআইএতে আমাদের সব সময় শেখানো হতো, যা বলতে চান তা স্পষ্ট করে বলবেন এবং যেটা বলবেন সেটা কার্যকর করবেন। ইরানিদের আস্থা অর্জনের এটিই ছিল একমাত্র পথ।

ইসলামাবাদে গত রোববারের আলোচনায় মার্কিন প্রতিনিধিরা হয়তো এমন স্পষ্টবাদিতা দেখিয়েছেন। তবে আলোচনার আগমুহূর্তে উভয় পক্ষের বক্তব্য ছিল ঠিক তার বিপরীত। উভয় পক্ষই অবাস্তব দাবি এবং ধ্বংসাত্মক হুমকি দিয়ে পরিস্থিতি জটিল করে তুলেছিল।

শুধু ইরান নয়, আমেরিকার বিরুদ্ধেও ইসরায়েলের যুদ্ধ এটি

ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিনা শর্তে আত্মসমর্পণের দাবি কিংবা এক রাতে আস্ত সভ্যতা শেষ হয়ে যাওয়ার মতো হুমকির মাধ্যমে কোনো শান্তিচুক্তি সম্ভব নয়। ট্রাম্প হয়তো মনে করেন, এমন চরম অবস্থান তাঁকে ভবিষ্যতে আলোচনার টেবিলে বেশি সুযোগ দেবে। তবে আদতে এটি টেকসই চুক্তির সম্ভাবনা কমিয়ে দেয়।

তেহরান প্রশাসনও কয়েক দশক ধরে একই রকম বিপজ্জনক উসকানি দিয়ে আসছে। নিয়মিত আমেরিকার নিন্দা করে তারা একদিকে যেমন বিশ্বজুড়ে অস্থিরতা উসকে দেয়, অন্যদিকে নিজ দেশের মানুষের ওপরেও কঠোর দমন-পীড়ন চালায়।

ইরানের এই সরকার ইদানীং ইন্টারনেটে মার্কিন প্রেসিডেন্টকে ব্যঙ্গ করে প্রচারণা চালাচ্ছে, যা ট্রাম্পের মতো ব্যক্তিত্বের সঙ্গে সমঝোতার পথে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

ইরান–যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধবিরতিতে কার লাভ, কার ক্ষতি

বিদায়লগ্নে ভ্যান্স জানিয়েছিলেন, ইরানিরা আমাদের শর্ত মানতে রাজি হয়নি। তাই তাদের টেবিলেই প্রস্তাব রাখা আছে এবং এখন তাদের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় থাকতে হবে।

এই কৌশল সফল হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। কারণ, ইরানিরা এটাকে সমঝোতার পথ হিসেবে না দেখে অসহযোগিতা হিসেবেই গণ্য করতে পারে। যদি শেষ পর্যন্ত কোনো চুক্তি হয়ও তবে সেটির মেয়াদ দীর্ঘ হওয়ার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ। ট্রাম্প প্রশাসনকে যদি সত্যিকার অর্থেই কার্যকর কোনো শান্তিচুক্তিতে পৌঁছাতে হয়, তবে তাদের স্পষ্ট এবং নমনীয় হতে হবে।

শেষ পর্যন্ত হয়তো দুই পক্ষই নিজ নিজ জায়গায় বিজয়ী দাবি করে মাঠ ছাড়বে। আর মার্কিন সৈন্য প্রত্যাহারের পর পারস্য উপসাগরের সাধারণ মানুষকে এক গভীর অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তার মাঝে ফেলে রাখা হবে।

  • মার্ক এ ফাউলার অবসরপ্রাপ্ত সিআইএ কর্মকর্তা ও ইরান বিশেষজ্ঞ

    ওয়াশিংটন পোস্ট থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত

Read full story at source