ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের একচ্ছত্র আধিপত্য হারানোর যুদ্ধ

· Prothom Alo

ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের চলমান যুদ্ধে দুই সপ্তাহের কথিত যুদ্ধবিরতি চলছে। গত শুক্র ও শনিবার পাকিস্তানের ইসলামাবাদে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিরা একটি স্থায়ী যুদ্ধবিরতির জন্য আলোচনায় বসেন। সমঝোতা ছাড়াই দুই পক্ষের বৈঠক শেষ হলেও ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র আলোচনা চালিয়ে যাবে বলে জানিয়েছে তেহরান।

Visit sportnewz.click for more information.

এই যুদ্ধে যে ধরনের কৌশল ব্যবহার করা হয়েছে, তাতে লাভ-ক্ষতি নিরূপণ করতে হয়তো সময় লাগবে। তাই যতটুকু সম্ভব আমার মতো করে যুদ্ধের জয়–পরাজয় বিশ্লেষণের চেষ্টা করব।

যুদ্ধে কেউ জেতেনি, হেরেছেন নেতানিয়াহু

কেন এই যুদ্ধ? এ বিষয় আমি প্রথম আলোয় প্রকাশিত আমার আগের প্রবন্ধ ‘যুক্তরাষ্ট্র কি ইসরায়েলের “প্রমিজড ল্যান্ড” বাস্তবায়ন করতে চাইছে’ শিরোনামের নিবন্ধে বিস্তারিত লিখেছিলাম। এই যুদ্ধ মূলত ইসরায়েলের; কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে যুদ্ধবাজ ইসরায়েলি নেতা বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু টেনে আনতে সক্ষম হয়েছেন। গত জানুয়ারি মাসে যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলার নেতা নিকোলা মাদুরোকে তুলে এনে সেখানে নিজেদের অনুগত সরকার বসিয়েছে।

এই ঘটনা থেকে ট্রাম্প ভেবে নিয়েছিলেন ইরানে আক্রমণ চালালে দিন সাতেকের মধ্যে ৪৫ বছরের ইসলামি প্রজাতন্ত্রের (অনেকের মতে মোল্লাতন্ত্রের) অবসান হবে। তিনি ভেবে নিয়েছিলেন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি এবং সামরিক শীর্ষ নেতাদের হত্যা করলেই রাস্তায় ইরানিরা নেমে আসবে এবং অভ্যুত্থান ঘটিয়ে শাসনব্যবস্থার অবসান ঘটাবে। কিন্তু তেমন কিছুই ঘটেনি। যুক্তরাষ্ট্র ইরানে অভ্যুত্থান ঘটাতে ইরাকি ও ইরানি কুর্দিদের কাছে অস্ত্র সরবরাহ করেছিল। কিন্তু ইরানি কুর্দিরা ভালো করেই জানে যে প্রায় ১০ কোটি মানুষের দেশে তারা অভ্যুত্থানের চেষ্টা করলে সেটা হবে আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত। কাজেই ৪০ দিনের যুদ্ধে ইরানের অভ্যন্তরে কোনো ধরনের অভ্যুত্থান এমনকি সরকারের বিরুদ্ধে কোনো আন্দোলনও হয়নি।

ইসলামাবাদে দুই পক্ষের যে আলোচনা হয়েছে, সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধির উপস্থিতি ইরানের অন্যতম দাবি ছিল।

এই যুদ্ধে ইসরায়েলের উদ্দেশ্য হলো ইরানকে দুর্বল করা। ইরানে অনুগত শাসকেরা ফিরে এলে তাদের বৃহত্তর ইসরায়েলের স্বপ্ন বাস্তবায়ন সম্ভব। ইতিমধ্যে উত্তর দিকে দক্ষিণ লেবাননের লিতানি নদী পর্যন্ত দখল করে ইসরায়েল নিজেদের সীমান্ত বিস্তৃত করার পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে। দ্বিতীয় ধাপে দখলকৃত পশ্চিম তীরকে ইসরায়েল তার সীমানায় অন্তর্ভুক্ত করবে। কাজেই ইসরায়েলের চাওয়া যুক্তরাষ্ট্রের মতো ইরানের পারমাণবিক অস্ত্রের প্রসার রোধ করা নয়; বরং বৃহত্তর ইসরায়েলের স্বপ্ন। এ জন্য যুদ্ধবিরতির মধ্যেও ইসরায়েল লেবাননে হামলা চালিয়ে যাচ্ছে।

এত দিনে যেসব পাঠক যুদ্ধের গতিপ্রকৃতি সম্পর্কে খোঁজখবর রেখেছেন, তাঁরা অবগত আছেন যে প্রথমে যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে ১৫ দফা শর্ত দিয়ে যুদ্ধ বন্ধ করতে বলেছিল। মূল শর্ত ছিল ইরানের সর্বাত্মক আত্মসমর্পণ, যা ইরান প্রত্যাখ্যান করে।

ইরান যেভাবে হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিয়েছে, তাতে যুক্তরাষ্ট্র ক্ষুব্ধ হলেও সামরিকভাবে তেমন কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারেনি। হরমুজ প্রণালিতে যুক্তরাষ্ট্র কয়েকবার সেনা মোতায়েনের চেষ্টাও করেছিল, কিন্তু তা সফল হয়নি। এমনকি যুদ্ধবিরতির আগে ইরানের ইসফাহান অঞ্চলে একটি বিশেষ অভিযানও মারাত্মকভাবে ব্যর্থ হয়। ওই অভিযানে ইরানের দাবি ও প্রদত্ত প্রমাণ অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের দুটি সি-১৩০ বিমান এবং দুটি ব্ল্যাকহক হেলিকপ্টার ধ্বংস হয়; তবে সেনা হতাহতের কোনো নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।

এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের বি-২ বোমারু, এফ-৩৫ এবং এফ-১৫ যুদ্ধবিমান হারানোর ঘটনাও ঘটে। এই ক্ষয়ক্ষতি ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং পেন্টাগনকে যথেষ্ট উদ্বেগে ফেলেছিল। এটি ছিল ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ডোনাল্ড ট্রাম্পের সমরনীতির একটি নিদারুণ পরাজয়। কেন এমন পরাজয়? এর একটা সংক্ষিপ্ত বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।

এক. পেন্টাগন এ ধরনের একবিংশ শতাব্দীর যুদ্ধের প্রস্তুতি ইরানের কাছ থেকে আশা করেনি। যুক্তরাষ্ট্রের সমরকৌশল এখনো অনেকাংশে বিংশ শতাব্দীতেই রয়ে গেছে।

দুই. যুক্তরাষ্ট্রে এই যুদ্ধের উদ্দেশ্য মোটেও সুস্পষ্ট ছিল না। এতগুলো সপ্তাহ পার হওয়ার পরও উদ্দেশ্যটি পরিষ্কার হয়নি। প্রাথমিক লক্ষ্য ছিল ‘রেজিম চেঞ্জ’ বা শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন; কিন্তু তা ব্যর্থ হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র দিকনির্দেশনা হারিয়ে ফেলে। ফলে তারা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অবস্থান নির্ণয় করতে পারেনি। এর ফলে তারা যুদ্ধের মূল কেন্দ্র, অর্থাৎ ‘সেন্টার অব গ্র্যাভিটি’, বুঝতেই ব্যর্থ হয়। যখন তারা তা বুঝতে পারে, তত দিনে যুক্তরাষ্ট্রের ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে গেছে।

অন্যদিকে ইরান শুরু থেকেই খারগ দ্বীপ ও হরমুজ প্রণালিকে ‘সেন্টার অব গ্র্যাভিটি’ হিসেবে চিহ্নিত করেছিল। যদিও আগে এই প্রণালিকে আন্তর্জাতিক জলরাশি হিসেবে বিবেচনা করা হতো, এখন ইরানের ১০ দফা দাবির পরিপ্রেক্ষিতে সেই অবস্থান আর বহাল নেই। ইরানের দাবি, হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ পারাপার করতে হলে ইরানকে শুল্ক দিতে হবে এবং এর একটি অংশ ওমান পাবে। ইসলামাবাদের আলোচনায় ইরানের ১০ দফার মধ্যে এই দাবিটি একটি মুখ্য দাবি হয়ে উঠেছিল।

তিন. ইসলামাবাদে দুই পক্ষের যে আলোচনা হয়েছে, সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধির উপস্থিতি ইরানের অন্যতম দাবি ছিল। যুক্তরাষ্ট্র দৃশ্যত সেই দাবি মেনে নিয়ে তাদের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ক্ষমতাধর ব্যক্তি, ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সকে পাঠিয়েছে। ইরানের প্রস্তাবে আরও বেশ কিছু বিষয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে, যেমন—উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি প্রত্যাহার, ক্ষতিপূরণসহ ইরানের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং বাজেয়াপ্ত ইরানি সম্পদ ও বিপুল অঙ্কের অর্থ ফেরত দেওয়া। এসব দাবি আংশিকভাবে মেনে নেওয়ার অর্থ হলো যুক্তরাষ্ট্রের কার্যত নতি স্বীকার করা। পরিস্থিতি এমন যে এর বিকল্পও যুক্তরাষ্ট্রের সামনে নেই।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল এই যুদ্ধের জন্য অবশ্যই দায়ী। এই যুদ্ধের কারণে বিশ্ববাজারে তেলের দাম শুধু বাড়েইনি; বরং উপসাগরীয় তেল উৎপাদক দেশগুলোর রাজস্ব আয়েও বড় ধরনের ধস নেমেছে। এ যুদ্ধে অর্থনৈতিক ক্ষতির পাশাপাশি বিশ্বে নতুন শক্তিবলয়ের সৃষ্টি হচ্ছে। ধারণা করা হচ্ছে, ইরান অঞ্চলটির সবচেয়ে শক্তিধর রাষ্ট্রে পরিণত হবে।

এই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ইউরোপীয় মিত্রদের সমর্থন হারিয়েছে। মিত্রদের কেউই সামরিকভাবে তাদের পাশে দাঁড়ায়নি। মনে করা হচ্ছে যে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন ন্যাটোর সামরিক জোটের মৃত্যুঘণ্টা বেজে উঠেছে। যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরেও সামরিক বাহিনীর মধ্যে কিছুটা অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। সেনাবাহিনীর চিফ অব স্টাফসহ প্রায় ১৩ জন কর্মকর্তাকে বরখাস্ত করার কারণে এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।

পরিশেষে বলা যায়, ডোনাল্ড ট্রাম্প এখন দিশাহারা অবস্থায় রয়েছেন। তিনি ইরানের চার হাজার বছরের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি সম্পর্কে না জেনেই ‘সভ্যতা ধ্বংস’ করার মতো মন্তব্য করেছেন। খ্রিষ্টপূর্ব ৩৩৪–৩৩০ পর্যন্ত আক্রমণ চালিয়ে আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট ইরানকে ধ্বংস করতে পারেননি।

এই যুদ্ধ ডোনাল্ড ট্রাম্পকে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগের মুখে ফেলতে পারে। কারণ, মিনাবে স্কুলে হামলায় ১৬৮ শিশু হত্যার অভিযোগের প্রমাণ ইরান ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত আলোচনায় সঙ্গে নিয়ে যায়। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ট্রাম্পের কারণে তাঁর রিপাবলিকান পার্টির পরাজয়ের আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—এই যুদ্ধ একদিকে যেমন ইরানকে শক্তিশালী করেছে, অন্যদিকে ইসরায়েলের প্ররোচনায় যুদ্ধে জড়িয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে পরাজয়ের স্বাদ নিতে হয়েছে। ফলে এই যুদ্ধে সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বব্যাপী একচ্ছত্র আধিপত্যের।

  • ড. এম সাখাওয়াত হোসেন সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা, সাবেক নির্বাচন কমিশনার ও অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তা

  • মতামত লেখকের নিজস্ব

Read full story at source