কুষ্টিয়ায় পীরকে হত্যার ঘটনায় সিপিবি-ছাত্র ইউনিয়ন, রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলন, আসক ও সুজনের কড়া প্রতিক্রিয়া, বিচার দাবি

· Prothom Alo

কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে পুরোনো একটি ভিডিও সামনে এনে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে শামীম রেজা ওরফে জাহাঙ্গীর নামের এক পীরকে পিটিয়ে ও কুপিয়ে হত্যার ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের বিচার দাবি করে বিবৃতি দিয়েছে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) ও ছাত্র ইউনিয়ন। মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) এবং নাগরিক সংগঠন সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) পীরকে হত্যায় জড়িত ব্যক্তিদের শাস্তি দাবি করেছে।

Visit asg-reflektory.pl for more information.

সিপিবি বলছে, এই বর্বরোচিত হামলা ও নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনা প্রমাণ করেছে, বর্তমান সরকার ভিন্নমতাবলম্বী মানুষের জীবনের নিরাপত্তা দিতে সম্পূর্ণভাবে ব্যর্থ। ছাত্র ইউনিয়ন মনে করছে, সরকার মব সন্ত্রাসকে প্রশ্রয় দিচ্ছে। আর রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের আশা, সরকার অবিলম্বে পদক্ষেপ নিয়ে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় নিজেদের সদিচ্ছার প্রমাণ দেবে।

আজ রোববার গণমাধ্যমে পাঠানো পৃথক পৃথক বিবৃতিতে এ দাবি জানিয়েছে সিপিবি, ছাত্র ইউনিয়ন এবং আসক ও সুজন। গতকাল শনিবার দুপুরে কুষ্টিয়ায় পীর শামীম রেজাকে পিটিয়ে হত্যার পর বিভিন্ন দল ও সংগঠন অপরাধীদের বিচার দাবি করে বিবৃতি দিয়েছে। সেই ধারাবাহিকতায় আজ সিপিবি-ছাত্র ইউনিয়ন ও আসক-সুজন বিবৃতি পাঠিয়েছে।

দেশে আইনের শাসন অনুপস্থিত: সিপিবি

কুষ্টিয়ায় ‘পীর’ হত্যার ঘটনার প্রতিবাদ ও বিচারের দাবি জানিয়ে আজ সিপিবির সভাপতি কাজী সাজ্জাদ জহির চন্দন ও সাধারণ সম্পাদক আবদুল্লাহ ক্বাফী রতন বিবৃতি দিয়েছেন। এতে বলা হয়েছে, এই বর্বরোচিত হামলা ও নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনা প্রমাণ করেছে, সরকার ভিন্নমতাবলম্বী মানুষের জীবনের নিরাপত্তা দিতে সম্পূর্ণভাবে ব্যর্থ।

সিপিবির বিবৃতিতে বলা হয়, দেশে আইনের শাসন অনুপস্থিত। তারই সুযোগ নিয়ে এক শ্রেণির অসাধু ব্যক্তি দীর্ঘদিন ধরে ভিন্নমতের কণ্ঠ রোধ করা এবং উগ্র ডানপন্থী মতাদর্শ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করে আসছে। তারা একের পর এক হত্যাকাণ্ডসহ এ ধরনের দুষ্কর্ম করে যাচ্ছে, মাজার ভাঙছে, মন্দির ভাঙছে, বাউলের আখড়ায় অগ্নিসংযোগ করছে, বাউলদের শারীরিকভাবে নির্যাতন করছে। শাসকগোষ্ঠী ও ধর্মাশ্রয়ী দলগুলো এই অসাধু ব্যক্তিদের রাজনৈতিকভাবে প্রতিপালন করছে। ফলে এসব ঘটনার কোনো বিচার তো হয়ই না, বরং অনেক সময় ভুক্তভোগীকেই উল্টো জেল-জুলুম ভোগ করতে হচ্ছে।

কুষ্টিয়ার ঘটনায় হত্যাকাণ্ডের উসকানি সৃষ্টিকারী গোষ্ঠী, ইন্ধনদাতাসহ দায়ী ব্যক্তিদের অবিলম্বে আইনের আওতায় আনা এবং দ্রুত বিচারের দাবি জানিয়েছে সিপিবি। পাশাপাশি সব মাজার, দরবারসহ ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ ধর্মীয় ও আধ্যাত্মবাদী কেন্দ্রগুলোর নিরাপত্তা জোরদার করার দাবি জানিয়েছে দলটি।

সরকার যেন কুম্ভকর্ণের মতো ঘুমিয়ে আছে: ছাত্র ইউনিয়ন

কুষ্টিয়ায় পীর শামীম রেজাকে হত্যায় জড়িত ব্যক্তিদের দ্রুত আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছেন ছাত্র ইউনিয়নের একাংশের কেন্দ্রীয় সভাপতি মাহির শাহরিয়ার রেজা ও সাধারণ সম্পাদক বাহাউদ্দিন শুভ। তাঁদের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সংসদে দাঁড়িয়ে মব আর চলবে না—এ কথা বলার পর থেকে মব সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে সরকারের উদাসীনতা লক্ষ করা যাচ্ছে। বিএনপি সরকার যেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ের মব সন্ত্রাসের পুনরাবৃত্তিকে প্রশয় দিচ্ছে।

কুষ্টিয়ায় পীরকে হত্যার ঘটনায় পুলিশ নির্বিকার থেকেছে অভিযোগ করে ছাত্র ইউনিয়ন বলেছে, দীর্ঘদিন থেকেই সরকারকে মব সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানানো হলেও সরকার যেন কুম্ভকর্ণের মতো ঘুমিয়ে আছে। সরকার এমন ঘুমিয়ে থাকলে জনগণ সরকারের ঘুম ভাঙানোর দায়িত্ব নিতে বাধ্য হবে, যা সরকারের জন্য মোটেও সুখকর হবে না। সারা দেশে মব সন্ত্রাস বন্ধে সরকারের অবস্থান জনগণের সামনে পরিষ্কার করতে হবে।

কুষ্টিয়ায় হত্যাকাণ্ডে জড়িত ব্যক্তিদের দ্রুত আটক করে বিচারের মুখোমুখি করার দাবি জানিয়েছে ছাত্র ইউনিয়ন।

রাষ্ট্র সংস্কারের পাঁচ দাবি

পীর শামীম রেজাকে হত্যার বিচার দাবির পাশাপাশি ‘মব’ সন্ত্রাসের সংস্কৃতি বন্ধে পাঁচটি দাবি জানিয়েছে হাসনাত কাইয়ূম নেতৃত্বাধীন রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলন। দলটির প্রথম দাবি, কুষ্টিয়ার হত্যাকাণ্ড, হামলার ঘটনাসহ গত দেড় বছরে ঘটা প্রতিটি হামলা তদন্তে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন বিচার বিভাগীয় কমিশন গঠন ও প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের বিচার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে সম্পন্ন করা।

রাষ্ট্র সংস্কারের অন্য দাবিগুলো হলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিদ্বেষ ছড়িয়ে মব সংগঠিতকারীদের চিহ্নিত করতে বিশেষ গোয়েন্দা সেল গঠন, কোনো এলাকায় হামলা হলে সংশ্লিষ্ট থানার কর্মকর্তাদের অবহেলার জন্য সরাসরি জবাবদিহির আওতায় আনা, ক্ষতিগ্রস্ত ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর আর্থিক ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করা এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের অপকর্ম রুখতে সরকারের পক্ষ থেকে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক উদ্যোগ নেওয়া।

প্রশাসনিক জবাবদিহি ও কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন: আসক

কুষ্টিয়ায় হত্যাকাণ্ডে জড়িত ব্যক্তিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করে আসকের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, কোনো অভিযোগ বা মতবিরোধের ক্ষেত্রে আইনি প্রক্রিয়ার বাইরে গিয়ে সংঘবদ্ধ জনতার নামে এ ধরনের কর্মকাণ্ড কার্যত সংবিধানের সরাসরি লঙ্ঘন এবং আইনের শাসনের পরিপন্থী। এমন নৃশংস হামলা ও হত্যাকাণ্ড রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে।...আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা ছাড়া একটি গণতান্ত্রিক সমাজে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। কোনোভাবেই ‘মবের’ নামে বা জনতার হাতে আইন তুলে নেওয়ার সংস্কৃতি মেনে নেওয়া যায় না, বরং এ ধরনের প্রবণতা সমাজে ভয়, অস্থিরতা ও বিচারহীনতার সংস্কৃতিকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়।

‘পীরের’ নৃশংস হত্যাকাণ্ডে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত সবাইকে নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্তের মাধ্যমে দ্রুত শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়ে আসক বলেছে, জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা হোক, যাতে ভবিষ্যতে কেউ এ ধরনের সহিংসতায় উৎসাহিত না হয়। ভবিষ্যতে এ ধরনের মব সহিংসতা প্রতিরোধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধি, দ্রুত প্রতিক্রিয়া নিশ্চিত করা এবং তৎপরতা জোরদার করা অপরিহার্য। ধর্মীয় সংবেদনশীলতাকে পুঁজি করে যাতে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী আইন নিজের হাতে তুলে নিতে না পারে, সে লক্ষ্যে প্রশাসনিক জবাবদিহি ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।

সরকারের কথা-কাজে মিল দেখতে চায় সুজন

পীর শামীম রেজার হত্যাকারীদের অবিলম্বে গ্রেপ্তার করে যথাযথ শাস্তি নিশ্চিত করার দাবি জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছেন সুজনের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি বিচারপতি এম এ মতিন এবং সম্পাদক ও প্রধান নির্বাহী বদিউল আলম মজুমদার। বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘আমরা বিএনপির নেতৃত্বে গঠিত সরকারকে মনে করিয়ে দিতে চাই, দায়িত্ব নেওয়ার পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ ঘোষণা দিয়েছিলেন, মব কালচার শেষ। দাবি আদায়ের নামে মব কালচার সহ্য করা হবে না। আমরা সরকারের কথা ও কাজে মিল দেখতে চাই।’

সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগসহ পুলিশ-প্রশাসনকে কুষ্টিয়ায় ‘পীর’ হত্যার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত ও বিচার করা এবং ভবিষ্যতে মব সন্ত্রাস প্রতিরোধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে সুজন।

নির্বাচিত সরকারও মব সন্ত্রাস নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ: গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্ট

কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে পীরকে কুপিয়ে হত্যা এবং রাজধানীর শাহবাগে ট্রান্সজেন্ডার ব্যক্তিদের ওপর হামলার প্রতিবাদ জানিয়ে গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্টের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর অন্তর্বতী সরকারের সময় থেকে যে ভয়াবহ মব সন্ত্রাস শুরু হয়েছে, বর্তমান নির্বাচিত সরকারও তা থামাতে ব্যর্থ হচ্ছে। অন্তর্বর্তী সরকার মবকে প্রশ্রয় দিলেও বিএনপি সরকার বন্ধ করবে বলে দেশবাসীর প্রত্যাশা ছিল। কিন্তু সে আশার গুড়ে বালি।

Read full story at source