‘রাক্ষস’: নিজের সঙ্গেই টক্কর সিয়াম

· Prothom Alo

রাত নয়টার শেষ শো ধরব। হাতে সময় কম। অটোরিকশায় উঠে তাড়া লাগাই—চেলোপাড়া যাব, মধুবন মাল্টিপ্লেক্স।

ভেবেছিলাম জেলা শহরের হল, হয়তো মফস্‌সলের আট-দশটা সিঙ্গেল স্ক্রিনের মতোই হবে পরিবেশ। কিন্তু ঢুকে চমকে গেলাম, পরিপাটি, আধুনিক হল। ১৯৭৪ সালে যাত্রা শুরু করা হলটি মাঝখানে বন্ধ ছিল। সংস্কার করে কিছুদিন আগে আবার চালু হয়েছে মধুবন।

Visit freshyourfeel.com for more information.

ঈদের পর প্রায় ২০ দিন কেটে গেছে। তা ছাড়া পরদিন ৯ এপ্রিল স্থানীয় আসনে সংসদ নির্বাচন। ফলে শেষ শোতে দর্শক উপস্থিতি যে খুব বেশি হবে না, সেটা ধরেই নিয়েছিলাম। তা ছাড়া এমনিতেই দেশের অনেক হলে দর্শক কমছে। তাই দর্শকসংখ্যা নয়, সিনেমা নিয়ে কথা বলি। ঈদের সিনেমা হিসেবে ‘রাক্ষস’ নিয়ে যতটা আলোচনা হওয়ার কথা ছিল, তুলনামূলকভাবে সেটা কমই হয়েছে। অন্য ছবিগুলো আলোচনায় এগিয়ে ছিল। কিন্তু বড় পর্দায় ছবিটি দেখতে দেখতে মনে হলো—কিছু কথা বলা উচিত। তবে সঙ্গে এটাও বলে নেওয়া ভালো—চুলচেরা কঠোর কোনো রিভিউ এটা না।

আজকাল একটা কথা প্রায়ই শোনা যায়, সিনেমার আসল নায়ক গল্প। তবে ‘রাক্ষস’ দেখতে দেখতে মনে হলো, নায়কই এখানে নায়ক, উল্টো কোথাও গিয়ে গল্পই খলনায়ক। গল্পের ভেতরে একটা অস্থিরতা আছে, একধরনের ছুটে চলা—যা দর্শককে ধরে রাখে, আবার প্রশ্নও তোলে। রান্নায় লবণ কম না বেশি, সেই দ্বিধার মতোই কোথাও একটা অসম্পূর্ণতা রয়ে যায়।

তবে বড় পর্দায় যাঁরা ‘নায়কের নায়কগিরি’ দেখতে ভালোবাসেন, তাঁদের জন্য এই সিনেমা নিঃসন্দেহে ‘জিপিএ-৫’। আর এই জিপিএ-৫-এর গোল্ডেন অংশটা একাই নিয়ে গেছেন সিয়াম। যতভাবে তাঁকে দেখানো যায়, তার প্রায় সবটাই দেখিয়েছেন পরিচালক মেহেদি হাসান। আর সিয়ামও নির্ভরযোগ্য ব্যাটসম্যানের মতো পুরো ইনিংস খেলেছেন—কোথাও ছন্দপতন নেই।

রাক্ষস–এ সিয়াম আহমেদ ও সুস্মিতা চ্যাটার্জি। ছবি: প্রযোজনা সংস্থার ফেসবুক থেকে

সিয়াম বনাম সিয়াম
বড় পর্দায় সিয়ামকে প্রথম দেখি ‘পোড়ামন ২’-এ। রোমান্টিক, খানিকটা সালমান শাহ হতে চাওয়া গ্রামের এক তরুণ, প্রেমে পড়ে যে সবকিছু ভুলে যেতে পারে, প্রেমিকার জন্য জীবন দিতেও যে প্রস্তুত—এমন চরিত্রে খুব সহজেই দর্শকের মন কেড়েছিলেন সিয়াম। এরপর মৃধা বনাম মৃধায় পেলাম সম্পূর্ণ ভিন্ন আরেক সিয়াম। বাবা-ছেলের সম্পর্ক, দ্বন্দ্ব, আবেগ—সব মিলিয়ে নিজের অভিনয়ের অন্য মাত্রা দেখিয়েছেন। তারপর গত বছরের জংলিতে তাঁর শরীরী ভাষা, অ্যাকশনে বোঝা গিয়েছিল, নিজেকে ভেঙে নতুন করে গড়তে চান সিয়াম।

বড় পর্দায় যাঁরা ‘নায়কের নায়কগিরি’ দেখতে ভালোবাসেন, তাঁদের জন্য এই সিনেমা নিঃসন্দেহে ‘জিপিএ-৫’। আর এই জিপিএ-৫-এর গোল্ডেন অংশটা একাই নিয়ে গেছেন সিয়াম। যতভাবে তাঁকে দেখানো যায়, তার প্রায় সবটাই দেখিয়েছেন পরিচালক মেহেদি হাসান। আর সিয়ামও নির্ভরযোগ্য ব্যাটসম্যানের মতো পুরো ইনিংস খেলেছেন—কোথাও ছন্দপতন নেই।

রাক্ষস-এ সেই পরিবর্তন আরও স্পষ্ট। একদিকে নির্মমতা, অন্যদিকে প্রেম—এই দুই বিপরীত সত্তাকে একসঙ্গে ধরে রাখা সহজ কম্ম না। কিন্তু সিয়াম সেটা করেছেন। যেখানে প্রেমিকার জন্য শুধু মরতে নয়, মারতেও তিনি সিদ্ধহস্ত। বলা যায়, সিয়াম যেন নিজের সঙ্গেই প্রতিযোগিতা করছেন। আগের সিয়ামকে ছাড়িয়ে যাওয়ার প্রতিযোগিতা! বলা যায়, এখন নিজের সঙ্গেই টক্কর দিচ্ছেন সিয়াম।

তবে এমনটা বলার পেছনে আরও কারণ আছে। সেই ইঙ্গিতটা ধরতে হলে ছবির শেষটা পর্যন্ত অপেক্ষা করতেই হবে। ‘রাক্ষস’ বললে যেমন ‘খোক্ষস’ আসে, তেমনি এই গল্পেও আছে আরেকটি স্তর, যা শেষেই খুলবে। তবে দর্শকের দেখার আনন্দ নষ্ট না করতে সে প্রসঙ্গে আর এগোচ্ছি না।

একদিকে নির্মমতা, অন্যদিকে প্রেম—এই দুই বিপরীত সত্তাকে একসঙ্গে ধরে রাখা সহজ কম্ম না। কিন্তু সিয়াম সেটা করেছেন। যেখানে প্রেমিকার জন্য শুধু মরতে নয়, মারতেও তিনি সিদ্ধহস্ত। বলা যায়, সিয়াম যেন নিজের সঙ্গেই প্রতিযোগিতা করছেন। আগের সিয়ামকে ছাড়িয়ে যাওয়ার প্রতিযোগিতা!

আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো এই ছবির গল্পের দুর্বলতা ও অযৌক্তিকতাকেও অনেকটাই আড়াল করতে পেরেছে সিয়ামের অভিনয়। দর্শককে ধরে রাখার ক্ষেত্রে তাঁর অবদানই সবচেয়ে বেশি। রাক্ষস পরিচালকের না, সিয়ামের ছবি—এটা বলাই যায়।

সহশিল্পীদের মধ্যে মঞ্চ থেকে আসা সোহেল মণ্ডল ভালো করেছেন। আবরার আতহারও সমানতালে উপস্থিত। ‘আধখানা ভালো ছেলে আধা মস্তান’, ‘মাইনকার চিপা’র মতো ব্যতিক্রমী কাজের এই নির্মাতা ‘বাজি’ সিরিজে নেতিবাচক চরিত্র করে অভিনেতা হিসেবেও নজর কেড়েছিলেন। ‘রাক্ষস’-এর পর তাঁকে নিয়েও নতুন ভাবনা তৈরি হবে।

রাক্ষস–এ সিয়াম আহমেদ ও সুস্মিতা চ্যাটার্জি। ছবি: প্রযোজনা সংস্থার ফেসবুক থেকে
ছবির আরেকটি দিকও উল্লেখযোগ্য। সহিংস অ্যাকশনের বিপরীতে গানগুলোর মেজাজ একেবারেই আলাদা। এখানে সিয়াম ও নায়িকার রসায়ন ভালোভাবে কাজ করেছে। গানগুলো কান আর চোখ—দুইকেই আরাম দিয়েছে। লোকেশন ও কোরিওগ্রাফিও নজর কেড়েছে।

নায়িকার জায়গায় কলকাতার সুস্মিতা চ্যাটার্জি সংযত অভিনয় করেছেন। ঢাকা-কলকাতার মিশেলে উচ্চারণের জায়গায় সচেতনতা ছিল। তবে শ্যাম ভট্টাচার্য প্রত্যাশা অনুযায়ী উজ্জ্বল হতে পারেননি। ‘বরবাদ’-এর তুলনায় এখানে তাঁর উপস্থিতি কিছুটা ফিকে। দাদির চরিত্রে সুজাতাও তেমন কিছু যোগ করতে পারেননি। চরিত্রটি আরও গভীর হতে পারত। আলীরাজ অবশ্য নিজের সক্ষমতার প্রমাণ দিয়েছেন।

আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো এই ছবির গল্পের দুর্বলতা ও অযৌক্তিকতাকেও অনেকটাই আড়াল করতে পেরেছে সিয়ামের অভিনয়। দর্শককে ধরে রাখার ক্ষেত্রে তাঁর অবদানই সবচেয়ে বেশি। রাক্ষস পরিচালকের না, সিয়ামের ছবি—এটা বলাই যায়।

‘অ্যানিমেল’ ভূত!

ফেসবুকে দেখলাম অনেকে তুলনা টানছেন—তামিল সিনেমা, ‘অ্যানিমেল’—এসব। আমিও সেই ধারণা নিয়েই মূলত বিনোদনের আশায় হলে ঢুকেছিলাম। এখন যদি কেউ জিজ্ঞেস করে—বিনোদন পেয়েছি কি না, দুই শব্দেই বলব—অবশ্যই পেয়েছি।
হ্যাঁ, প্রশ্ন আসবে, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক এমন হয় নাকি, নায়কের গায়ে গুলি লাগে না কেন, অমুক বাঁচল, তমুক মরল—এই হিসাব মেলে না কেন। হ্যাঁ, ছবিতে অযৌক্তিকতা আছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, ‘লার্জার দ্যান লাইফ’ ঘরানার মসলা ছবি দেখতে গিয়ে কবে থেকে আমরা যুক্তির খাতা খুলে বসি? মধুবনে আমি অন্তত সেই খাতা নিয়ে যাইনি। শিক্ষণীয় কিছু দেখার প্রত্যাশা নিয়েও যাইনি।

ছবির আরেকটি দিকও উল্লেখযোগ্য। সহিংস অ্যাকশনের বিপরীতে গানগুলোর মেজাজ একেবারেই আলাদা। এখানে সিয়াম ও নায়িকার রসায়ন ভালোভাবে কাজ করেছে। গানগুলো কান আর চোখ—দুইকেই আরাম দিয়েছে। লোকেশন ও কোরিওগ্রাফিও নজর কেড়েছে। হলের ভেতরেই বারবার শোনা গেল, ‘শুটিং কোথায় হয়েছে?’ নেপথ্যের সংগীতও ছবির আবহ তৈরিতে সাহায্য করেছে। কিছু জায়গায় অন্য ভাষার সিনেমার প্রভাব মনে করিয়ে দেয়, তবে সেটিকে নকল বলা যাবে না।
আলোচনায় থাকা অনেক সিনেমার ক্ষেত্রেও হলে দেখেছি মাঝেমধ্যে দর্শকের মনোযোগে ভাটা পড়ে। কিন্তু এখানে দেখলাম উল্টো—হলের ভেতরে নীরবতা, সবাই পর্দায় মগ্ন। মোবাইলে বা পপকর্নে নয়, সবারই চোখ পর্দায়।

‘রাক্ষস’–এর পোস্টারে সুস্মিতা ও সিয়াম। ছবি: ফেসবুক থেকে

ছবি শেষ হয়ে যখন বের হলাম, তখন রাত ১২টার বেশি। মালতীনগরের সাব্বির আহমেদ বললেন, ‘নায়কটা আসলে ভালো না খারাপ, এই প্রশ্নটা এখনো মাথায় ঘুরছে। গল্পে কিছু প্রশ্ন আছে, কিন্তু বিরক্ত হইনি। সিয়ামের জন্যই বসে বসে শেষ পর্যন্ত দেখেছি, খারাপ লাগেনি।’ আরেক দর্শক মৌমিতা শ্রাবন্তী বললেন, ‘বাংলাদেশেও যে “কেজিএফ”, “অ্যানিমেল”, “জেলার”-এর মতো অ্যাকশন সিনেমা করা সম্ভব, সিয়াম আহমেদ তা প্রমাণ করেছেন। দুর্দান্ত অভিনয় করেছেন তিনি।’ সরকারি আজিজুল হক কলেজের বাংলার এই শিক্ষার্থী কি একটু বাড়িয়ে বললেন!

সিঙ্গেল স্ক্রিনে ‘রাক্ষস’, আসছে ‘দম’
রাতের শেষ শোতে সংখ্যায় তুলনামূলক কম হলেও পর্দার সামনে স্থির বসে থাকা কিছু দর্শক দেখে মনে হয়েছিল, ইন্টারনেট, টরেন্ট,  কেব্‌ল সার্ভিসের এই যুগেও জেলা শহরে পকেটের পয়সা খরচ করে দেশের সিনেমা দেখার মতো দর্শক এখনো বেঁচে আছে। কিন্তু তাঁরা ছবিটা দেখবেন কই? হল কই?

অটোরিকশায় উঠে চালকের সঙ্গেও ‘রাক্ষস’ নিয়ে কথা হলো। তাঁরও ছবিটা ভালো লেগেছে, তবে শেষটা নিয়ে তাঁর প্রশ্ন আছে। কথাপ্রসঙ্গে জানালেন, তাঁর বয়সেই বগুড়া শহরে ১২টি সিনেমা হল দেখেছেন। আর এখন হল বলতে নওয়াববাড়ি সড়কের সোনিয়া আর চেলোপাড়ার মধুবন।

অথচ রাতের শেষ শোতে সংখ্যায় তুলনামূলক কম হলেও পর্দার সামনে স্থির বসে থাকা কিছু দর্শক দেখে মনে হয়েছিল, ইন্টারনেট, টরেন্ট,  কেব্‌ল সার্ভিসের এই যুগেও জেলা শহরে পকেটের পয়সা খরচ করে দেশের সিনেমা দেখার মতো দর্শক এখনো বেঁচে আছে। কিন্তু তাঁরা ছবিটা দেখবেন কই? হল কই? আর হল থাকলেও সেগুলোয় দেখানোর মতো ভালো মানের বাণিজ্যিক ছবি কোথায়?

দুই ঈদে ৮-১০টি ছবি দিয়ে কি একটা দেশের চলচ্চিত্রতৃষ্ণা মেটে?

Read full story at source