থ্রিলার–ভক্তরা এই সিনেমা মিস করবেন না

· Prothom Alo

নামটা শুনলে মনে হতে পারে এটি হয়তো হলিউডের কোনো লাইটওয়েট ক্রাইম থ্রিলার কিংবা নিছক কোনো কমেডি ক্যাপার। কিন্তু না, ‘ক্রাইম ১০১’ মোটেও হালকা মেজাজের কোনো সিনেমা নয়। ডন উইনস্লোর একই নামের বিখ্যাত উপন্যাস অবলম্বনে ব্রিটিশ নির্মাতা বার্ট লেটন লস অ্যাঞ্জেলেসের আন্ডারওয়ার্ল্ডকে কেন্দ্র করে নির্মাণ করেছেন এক ডার্ক ও নিও-নয়ার ক্রাইম থ্রিলার। ১৩ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিকভাবে মুক্তির দিনেই বাংলাদেশে মুক্তি পায় সিনেমাটি।  

Visit newsbetting.bond for more information.

একনজরে সিনেমা: ক্রাইম ১০১ ধরন: ডার্ক, নিও-নয়ার ক্রাইম থ্রিলার পরিচালক: বার্ট লেটন অভিনয়: ক্রিস হেমসওয়ার্থ, মার্ক রাফালো, হ্যালি বেরি, ব্যারি কেওগান দৈর্ঘ্য: ২ ঘণ্টা ২০ মিনিট

‘ক্রাইম ১০১’ নামটির মধ্যেই লুকিয়ে আছে এক দ্বৈত অর্থ। গল্পের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ক্যালিফোর্নিয়ার উপকূলীয় এলাকায় ঘটে যাওয়া অত্যন্ত নিখুঁত কিছু জুয়েলারি ডাকাতি। এই ডাকাতিগুলোতে কোনো ভুল নেই, নেই কোনো অপ্রয়োজনীয় সহিংসতা—সবকিছুই যেন বইয়ের নিয়ম মেনে নিখুঁতভাবে করা। এক অভিজ্ঞ পুলিশ ডিটেকটিভ বিশ্বাস করেন, বড় ক্রাইমগুলো সব সময় কিছু অলিখিত নিয়ম মেনে চলে। অপরাধ জগতের এই প্রাথমিক নিয়মগুলোকেই তিনি বলেন ‘ক্রাইম ১০১’। অন্যদিকে নামটি দিয়ে দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়ার বিখ্যাত ১০১ নম্বর ফ্রিওয়েকেও নির্দেশ করা হয়েছে, যা লস অ্যাঞ্জেলেসের বুক চিরে বেরিয়ে গেছে এবং সিনেমায় অ্যান্টাগনিস্টের চোরাচালানের প্রধান রুট হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।  

সিনেমার গল্পটি মূলত তিনটি ভিন্ন মেরুর চরিত্রকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়েছে। মার্ভেল সুপারহিরো ‘থর’-এর খোলস ছেড়ে ক্রিস হেমসওয়ার্থ এখানে অভিনয় করেছেন মাইক ডেভিস নামের এক পেশাদার ও ধূর্ত রত্ন চোরের ভূমিকায়। হেমসওয়ার্থ প্রমাণ করেছেন তিনি কতটা বহুমাত্রিক অভিনেতা। সুঠাম দেহের আড়ালে লুকিয়ে থাকা এক বিষণ্ণ, ট্রমাটাইজড ও সমাজবিচ্ছিন্ন মানুষের রূপটি তিনি নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। তাঁর অভিনীত মাইক চরিত্রটির চরম দারিদ্র্যে বড় হওয়ার মনস্তত্ত্বটি সিনেমাটিকে এক ভিন্ন মাত্রা দিয়েছে।

তার বিপরীতে রয়েছেন মার্ক রাফালো, যিনি অভিনয় করেছেন লু লুবসনিক নামের এক পুলিশ ডিটেকটিভের চরিত্রে। এই চরিত্রের জন্য প্রথমে পেড্রো প্যাসকেলকে ভাবা হয়েছিল। কিন্তু ‘দ্য ফ্যান্টাস্টিক ফোর: ফার্স্ট স্টেপস’-এর সময়সূচি নিয়ে দ্বন্দ্বের কারণে তিনি বাদ পড়লে ২০২৪ সালের মে মাসে মার্ক রাফালো এই প্রজেক্টে যুক্ত হন।

প্রিয়াঙ্কা কি এবার ‘ধোঁকা’ দিলেন

ব্যক্তিগত জীবন ও ভাঙতে বসা দাম্পত্য নিয়ে বিপর্যস্ত ডিটেকটিভ লু পেশাগত জায়গায় এই ‘ফ্রিওয়ে চোর’-কে ধরতে রীতিমতো খ্যাপাটে। তাঁর ধারণা, এসব ডাকাতি একজনই করছে, যে নিয়মগুলো হুবহু মেনে চলে। এলোমেলো পোশাক, মুখে খোঁচা খোঁচা দাড়ি আর ঠোঁটের কোণে অদ্ভুত হাসি নিয়ে রাফালোর অভিনয় কাল্ট ক্ল্যাসিক ‘কলম্বো’-র কথা মনে করিয়ে দেয়। সহকর্মীদের তাচ্ছিল্য গায়ে না মেখে, স্রেফ বুদ্ধি দিয়ে অপরাধীর অহংকার গুঁড়িয়ে দেওয়ার দৃশ্যে তিনি অনবদ্য।
গল্পের তৃতীয় গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রটি হলো শ্যারন কলভিন। অস্কারজয়ী হ্যালি বেরি অত্যন্ত সাবলীলভাবে এই ইনস্যুরেন্স ব্রোকারের চরিত্রটিতে অভিনয় করেছেন। কর্মক্ষেত্রে বয়সের বৈষম্য ও লিঙ্গবৈষম্যের শিকার শ্যারন তার করপোরেট বসের ওপর প্রতিশোধ নিতে মরিয়া হয়ে মাইকের

সঙ্গে এক অদ্ভুত চুক্তিতে জড়ায়। মাইক যখন অপরাধ জগৎ থেকে চিরতরে বেরিয়ে যেতে চায়, ঠিক তখনই গল্পে নতুন মোড় আসে।

‘ক্রাইম ১০১’ সিনেমার পোস্টার

মাইকের অহিংস নীতিতে বিরক্ত হয়ে তার আন্ডারওয়ার্ল্ডের বস ‘মানি’ (নিক নোল্টে) অরমন (ব্যারি কেওগান) নামের এক রগচটা ও সাইকোপ্যাথ তরুণকে বড় একটি চুরির দায়িত্ব দেয়। এই তরুণ বুদ্ধিমান অপরাধী ধীরে ধীরে অপরাধ জগতের গভীরে ঢুকে পড়ে। সে কি নিয়ম মেনে খেলবে, নাকি একটাই ভুলে সব শেষ করে দেবে—এই প্রশ্নই গল্পে দারুণ এক উত্তেজনার জন্ম দেয়। ব্যারি কেওগান এই সাইকোপ্যাথ চরিত্রে বরাবরের মতোই দুর্দান্ত। এ ছাড়া কোরি হকিন্স, জেনিফার জেসন লেই, মনিকা বারবারো, টেট ডোনোভানসহ একঝাঁক তারকা এই সিনেমার বিশাল ক্যানভাসকে আরও সমৃদ্ধ করেছেন।

১৪০ মিনিট দৈর্ঘ্যের এই সিনেমাটি কিছুটা ধীরলয়ে এগোলেও দর্শকদের বিরক্তির কারণ হয় না। কারিগরি দিক থেকে ‘ক্রাইম ১০১’ মানসম্মত। এর সিনেমাটোগ্রাফি লস অ্যাঞ্জেলেস শহরটিকে এক মায়াবী ও অন্ধকারাচ্ছন্ন রূপে পর্দায় তুলে ধরেছে। হলিউডের চেনা থ্রিলারের বাইরে গিয়ে নির্মাতা চমৎকার সামাজিক বার্তাও দিয়েছেন। লস অ্যাঞ্জেলেসের চাকচিক্যময় বিলাসবহুল জীবনের পাশাপাশি রাস্তার ধারের গৃহহীন মানুষের তাঁবুর দৃশ্যগুলো চরম শ্রেণিবৈষম্যের চিত্র তুলে ধরে। পাশাপাশি সিনেমাটিতে থাকা দুটি দুর্ধর্ষ কার চেজিংয়ের দৃশ্য দর্শকদের স্নানুর চাপ বাড়াতে বাধ্য।  

‘ক্রাইম ১০১’ সিনেমার দৃশ্য। আইএমডিবি

অনেকেই সিনেমাটিকে মাইকেল মানের ক্ল্যাসিক থ্রিলার ‘হিট’ কিংবা সত্তর দশকের ‘বুলিট’-এর সঙ্গে তুলনা করছেন। এমনকি রেডিট-এ একজন একে তাচ্ছিল্য করে ‘ডলার স্টোর হিট’ (সস্তায় পাওয়া হিট সিনেমার কপি) বলতেও ছাড়েননি! তবে ভিজ্যুয়াল এবং স্টোয়িক চরিত্রগুলোর মাঝে ‘হিট’-এর ছায়া স্পষ্ট হলেও ‘ক্রাইম ১০১’ সস্তা যে অনুকরণ নয়, সিনেমাপ্রেমীরা মনোযোগ দিয়ে দেখলে ঠিকই অনুধাবন করবেন। যাঁরা গভীর চরিত্রায়ণ, শক্তিশালী অভিনয় ও বুদ্ধিবৃত্তিক প্লটসমৃদ্ধ নিও-নয়ার ক্রাইম থ্রিলার ভালোবাসেন, ‘ক্রাইম ১০১’ তাদের জন্য নিঃসন্দেহে একটি দারুণ উপহার।

Read full story at source