বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরামর্শকে গুরুত্ব দিন

· Prothom Alo

জনস্বাস্থ্যে শিশুদের নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিতে সাফল্য ছিল বাংলাদেশের বড় অর্জন। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতা সেই অর্জনকে বড় প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। দেশের ৫৬টি জেলায় হাম ছড়িয়ে পড়া এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) দেওয়া তথ্যানুযায়ী আক্রান্তদের মধ্যে ৬৯ শতাংশই দুই বছরের কম বয়সী শিশু হওয়া একটি অশনিসংকেত। যখন ২০২৬ সালের মধ্যে দেশ থেকে হাম ও রুবেলা নির্মূলের লক্ষ্যমাত্রা ছিল, তখন সংক্রমণের হার প্রতি ১০ লাখে ১ শতাংশের নিচে থেকে লাফিয়ে ১৬ দশমিক ৮ শতাংশে পৌঁছানো কেবল উদ্বেগের নয়, বরং চরম প্রশাসনিক ও নীতিগত ব্যর্থতারই ইঙ্গিত দেয়।

Visit newsbetting.bond for more information.

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে, হামে আক্রান্ত শিশুদের ৬৯ শতাংশের বয়স দুই বছরের নিচে এবং ৩৪ শতাংশের বয়স ৯ মাসের কম। সংস্থাটির প্রাথমিক মূল্যায়ন অনুযায়ী, হামের এ সংক্রমণের মূল কারণ হলো রোগ প্রতিরোধক্ষমতার ঘাটতি। বিশেষ করে দুই বছরের কম বয়সী শিশুরা, যারা গত দুই বছরে বিভিন্ন কারণে হামের টিকার এক বা একাধিক ডোজ পায়নি, তারাই সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হচ্ছে। তা ছাড়া অন্য অনেক দেশের মতো বাংলাদেশও করোনা মহামারির সময় টিকাদানে উচ্চ হার বজায় রাখতে চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হয়, যা শূন্য ডোজ এবং আংশিক টিকাপ্রাপ্ত শিশুদের সংখ্যা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রেখেছে।

প্রশ্ন জাগে, কেন এই পরিস্থিতি তৈরি হলো? সরকারের স্বাস্থ্যমন্ত্রী নিজেই স্বীকার করেছেন যে এটি গত কয়েক বছরের নীতি–ঘাটতি, বিলম্বিত সিদ্ধান্ত এবং দুর্বল বাস্তবায়নের ফল। পূর্ববর্তী ও অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কালের নীতিগত অদক্ষতা ও হেলাফেলার যে অভিযোগ জনস্বাস্থ্যবিশেষজ্ঞরা তুলেছেন, তা এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। বিশেষ করে যখন জানা যায় যে হামে মৃত্যুর সংখ্যা ৫০ ছাড়িয়েছে, তখন একে আর কেবল ‘প্রাদুর্ভাব’ বলে হালকা করে দেখার অবকাশ থাকে না।

হামের মতো ছোঁয়াচে রোগের ক্ষেত্রে তথ্যের ভূমিকা টিকার মতোই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু বর্তমানে আমরা দেখছি তথ্যের ভয়াবহ ঘাটতি এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপপ্রচারের সয়লাব। তথ্যের স্বচ্ছতা না থাকলে ‘টার্গেটেড ইন্টারভেনশন’ বা নির্দিষ্ট এলাকায় ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয় না। অন্যদিকে হাসপাতালগুলোতে হামের জন্য আলাদা ওয়ার্ডের অভাব এবং অক্সিজেনের নিশ্চয়তা না থাকা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।

আগামীকাল রোববার থেকে সরকার যে জরুরি টিকাদান (ইমার্জেন্সি ভ্যাকসিনেশন) কার্যক্রম শুরু করতে যাচ্ছে, তা অবশ্যই ইতিবাচক। কিন্তু ৬ মাস থেকে ১০ বছর বয়সী শিশুদের এই বিশাল কর্মযজ্ঞ সফল করতে হলে কেবল টিকা দেওয়াই যথেষ্ট নয়। এর জন্য প্রয়োজন—ক. মাঠপর্যায়ে জনবলসংকট দূর করা: ঠিক মানুষকে ঠিক জায়গায় বসিয়ে কাজের গতি বাড়ানো। খ. কমিউনিটি সম্পৃক্ততা: টিকার ব্যাপারে মানুষের মনের দ্বিধা ও অপপ্রচার দূর করতে ব্যাপক জনসচেতনতা তৈরি করা। গ. জবাবদিহি নিশ্চিত করা: কেন সময়মতো টিকা সংগ্রহ করা হলো না বা কেন ক্যাম্পেইন বিলম্বিত হলো, তার তদন্ত করে দায়ী ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনা জরুরি।

হামে একটি শিশুর মৃত্যুও আমাদের জন্য অপূরণীয় ক্ষতি। আমরা চাই না আমলাতান্ত্রিক জটিলতা বা নীতিগত ভুলের কারণে আর কোনো মায়ের কোল খালি হোক। সরকারের উচিত বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরামর্শ অনুযায়ী দ্রুত উচ্চমানের টিকাদান ক্যাম্পেইন সম্পন্ন করা এবং ভিটামিন-এ সাপ্লিমেন্টসহ সঠিক রোগী ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা। মনে রাখতে হবে, সঠিক তথ্য ও সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্তই পারে বড় প্রাদুর্ভাব থেকে আমাদের শিশুদের রক্ষা করতে।

Read full story at source