ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সিটি মালাক্কা ভ্রমণ, সবাই নাচে-গায়, আমি দর্শক: পর্ব ১

· Prothom Alo

প্রবাসে কিংবা দেশে এই প্রথম ঈদের দিন দূরে কোথাও ভ্রমণে গেলাম। সাধারণত পাবলিক হলিডের সময়ে ট্যুরিজম প্লেস এড়িয়ে চলি। ওই সময় অনেক মানুষের ভিড় থাকে এটা একমাত্র কারণ নয়। আসলে বহু মানুষ আছেন, যাঁরা সারা বছরই চাকরি-কাজে ব্যস্ত থাকেন, কোনো উৎসব পার্বণের ছুটি ছাড়া সাধারণত তাঁদের বেড়ানোর সুযোগ হয় না। কুয়ালালামপুর শহরের পেট্রোনাস টু ইন টাওয়ার, বুকিত বিনতাং, প্যাভেলিয়ন, টাইমস স্কয়ার, কোতারায়া, মসজিদ জামেক, সেন্ট্রাল মার্কেট, চায়নাটাউন, মারদেকা স্কয়ার, টিআরএক্স টাওয়ার, লালাপোর্ট, তামান তাসিক টিটিওয়াংসা–সহ অন্যান্য পর্যটন এলাকায় ছুটির দিনে খুব বেশি প্রয়োজন না হলে যায় না। খুব বেশি প্রয়োজনটা হচ্ছে, কাউকে বেড়াতে নিয়ে যাওয়া বা কারও জন্য যাওয়া। এবার ঈদে ব্যাপারটা ভিন্ন রকম হয়ে গেল।

Visit moryak.biz for more information.

গাড়িতে গান চালু করে দিলেন, হোন্ডা গাড়ির গানের ভলিউমের নিয়ন্ত্রণ গাড়ির স্টিয়ারিংয়েই আছে। গানের ভলিউম বাড়াচ্ছেন, আর মাঝে মাঝে ড্রাইভিং সিট থেকেই লাফিয়ে ওঠেন গানের তালে তালে। স্টিয়ারিং থেকে দুই হাত উঠিয়ে হইহুল্লোড় করছেন। আমি তো দেখে অবাক।

রমজানের মধ্যেই সহকর্মী মালয়েশিয়াপ্রবাসী সাংবাদিকেরা সিদ্ধান্ত নিলেন ঈদে দূরে কোথাও ভ্রমণে যাবেন। প্রবাসী সাংবাদিকতা মানে ফুলটাইম সাংবাদিকতা নয়। এখানে সাংবাদিকতার সঙ্গে জড়িত সবাই কোনো না কোনো চাকরি করেন। কেউ কেউ ছোটখাটো ব্যবসা করেন। পাশাপাশি প্রবাসীদের নানা খবরাখবর দেশের মিডিয়ায় প্রকাশের জন্য চেষ্টা করেন। নানা সীমাবদ্ধতার কারণে অনেক সময় প্রবাসীদের কাঙ্ক্ষিত প্রতিবেদন হয়তো আমরা করতে পারি না। আমাদের মেনে চলতে হয় সংশ্লিষ্ট দেশের আইন, মেপে মেপে করতে হয় নিউজ। তাই প্রধানত বিদেশি কর্মীদের জন্য মালয়েশিয়া সরকারের গৃহীত আইন ও নিয়মের হালনাগাদ তথ্য প্রচার, বাংলাদেশ দূতাবাস কর্তৃক প্রবাসীদের জন্য নেওয়া নানা উদ্যোগের খবর প্রবাসীদের পৌঁছে দেওয়া, শত ব্যস্ততার মাঝেও প্রবাসীরা যে বিভিন্ন অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন তা প্রচার করে আয়োজনকে সফল করতে ভূমিকা রাখাসহ প্রবাসীদের নানা সুখ-দুঃখের খবরাখবর প্রচারের সর্বোচ্চ চেষ্টা করেন প্রবাসী সাংবাদিকেরা।

সবকিছু মিলে প্রবাসী সংবাদকর্মীরা সারা বছর মোটামুটি ব্যস্ত সময় কাটান। ব্যস্ত জীবনে একটু বিরতি দিয়ে দূরে কোথাও ঘুরে আসার পরিকল্পনা আমাদের। সবাই মিলে ঈদ-আনন্দভ্রমণের মাধ্যমে এবার ভিন্নভাবে ঈদ উদ্‌যাপন করবেন। যেমন ভাবনা তেমন কাজ, ঈদের সপ্তাহখানেক আগেই আমাদের সাঈদ হক ভাই হেরিটেজ সিটি মালাক্কার রিভারক্রুজের পাশে ৯০৬ লিভারভিউ হোটেলে আমাদের জন্য বেশ কয়েকটি রুম পেমেন্টসহ বুকিং দিয়ে দিলেন। বাংলাদেশ কমিউনিটি প্রেসক্লাব মালয়েশিয়ার সদস্যরা আগেও কয়েকবার ভ্রমণে গিয়েছিলেন। আগের কোনো ভ্রমণে আমার যাওয়া হয়নি। এবার যাব বলে আগেই তালিকায় নাম দিয়েছিলাম। হোটেল বুকিং হয়ে যাওয়াতে আগের মতো যাব-যাব করে না যাওয়ার সুযোগ ছিল না আর! মানে ফাঁকি দেওয়া যায়নি। ফাঁকি না দিয়ে ভালোই হয়েছে, এটা ভ্রমণে গিয়ে বুঝতে পেরেছি।

মালাক্কার এই রিভারক্রুজ যখন আমি প্রথম দেখেছিলাম ২০২২ সালে, তখন এতটাই মুগ্ধ হয়েছিলাম; মনে মনে বলেছি, এখানে এত বছর কেন আসিনি! তখন বারবার ভেবেছি, মালাক্কা শহরের ভেতরে প্রবাহিত হওয়া মালাক্কা নদীকে এত নান্দনিকভাবে সাজিয়েছে মালাক্কার স্থানীয় সরকার বা পর্যটন সংস্থা; দেশের পুরোনো শহরটি হয়ে উঠেছে পর্যটক আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু।

২১ মার্চ যথারীতি আমরা কুয়ালালামপুরের হাংতুয়ায় মসজিদ আল বুখারিতে আরও অসংখ্য বাংলাদেশি প্রবাসীর সঙ্গে ঈদের নামাজ আদায় করলাম। নামাজ শেষে মসজিদ প্রাঙ্গণে প্রবাসী বাংলাদেশিদের সঙ্গে ঈদের কোলাকুলি ও শুভেচ্ছা বিনিময়ে মেতে উঠলাম। পাশাপাশি প্রবাসীদের ঈদ–ভাবনা নিয়ে ছোট ছোট সাক্ষাৎকার নিলাম। নানা পেশার প্রবাসীরা পরিবার ও আত্মীয়স্বজনহীন প্রবাসে ঈদ উদ্‌যাপনের অনুভূতি প্রকাশ করলেন। প্রবাসীদের সঙ্গে আমরাও মসজিদের খোলা প্রাঙ্গণে দলে দলে ছবি তোলায় ব্যস্ত সময় পার করেছি কিছুটা। পরে আমরা ছবি তোলার জন্য গেলাম দাতারান মারদেকায়। সেখানে নানা ঢঙের ছবি তুলে ফিরে এলাম বাসায়। বাসায় আগেই রান্না করা ছিল। অন্য বন্ধুরা সবাই তাঁদের বাসায় গেলেন। ওহ হ্যাঁ, এর আগে কুয়ালালামপুরে বাংলা মার্কেটখ্যাত কোতারায়ায় গেলেন আমাদের কয়েকজন, সেখানে দূর–দূরান্ত থেকে আসা প্রবাসীদের ঈদের অনুভূতি জানা হলো।

আমাদের বাসায় ছোট ভাই নাছির তার পরিবারসহ এল। আগে থেকে দাওয়াত করা আশপাশে থাকেন এমন আরও অনেকেই এলেন। সবাইকে নিয়ে খাওয়াদাওয়ার পর্ব শেষ করলাম। বেলা ১টার পরে বের হলাম আমাদের প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি মোস্তফা ইমরান রাজু ভাইয়ের বাসার উদ্দেশে। সেখানে আমাদের ভ্রমণ দলের সদস্য একে একে সবাই এলেন। চরটি প্রাইভেট কারে আমরা মালাক্কা যাব। প্রথম গাড়িতে বের হলাম আমরা, সাঈদ হক ভাইয়ের গাড়ি করে। সামনে আমি, পেছনে সময় নিউজের মালয়েশিয়া প্রতিনিধি মোহাম্মদ আবদুল কাদের ভাই ও শওকত হোসেন জনি। কুয়ালালামপুর থেকে বের হওয়ার আগে আমরা গেলাম আমপাং এলাকায় বাংলাদেশি ব্যবসায়ী অহিদুর রহমান অহিদ ভাইয়ের বাসায়। সেখানে এলাহি আয়োজন। বাসার সামনে শামিয়ানা টাঙিয়ে নানা রকম খাবার সাজানো, প্রবাসী বাংলাদেশিরা ইচ্ছেমতো নানা খাবার নিয়ে চেয়ার–টেবিলে বসে খাচ্ছেন। আমরাও মজাদার কিছু খাবার খেয়ে অহিদ ভাইয়ের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে ফাইনালি রওনা দিলাম মালাক্কার দিকে।

আমাদের গাড়ির চালকের আসনে আছেন সাঈদ ভাই। তিনি আন্তর্জাতিক ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয় মালয়েশিয়ার প্রাক্তন ছাত্র, সম্পৃক্ত আছেন ওআইসি টুডের সঙ্গে। একেবারে তরুণ ও হ্যান্ডসাম। তবে এত দিন তাঁকে দেখেছি সাদাসিধে টাইপের ভদ্র ছেলে হিসেবে। আজ ভ্রমণে যাচ্ছেন, তাই ভিন্ন রূপে ধরা দিচ্ছেন ভ্রমণ যাত্রার শুরু থেকে। গাড়িতে গান চালু করে দিলেন, হোন্ডা গাড়ির গানের ভলিউমের নিয়ন্ত্রণ গাড়ির স্টিয়ারিংয়েই আছে। গানের ভলিউম বাড়াচ্ছেন, আর মাঝে মাঝে ড্রাইভিং সিট থেকেই লাফিয়ে ওঠেন গানের তালে তালে। স্টিয়ারিং থেকে দুই হাত উঠিয়ে হইহুল্লোড় করছেন। আমি তো দেখে অবাক। আরেকজন সময় টিভির আবদুল কাদের ভাই গাড়ির ভেতরে সমান তালে হইচই ফেলে দিলেন গানের সুরে-সুরে, তালে-তালে! আরেক সহযাত্রী শওকত হোসেন জনি তালিটালি দিয়ে সাড়া দিচ্ছেন সিনিয়রদের আনন্দ উল্লাসে। গান একটা শেষ হলেই সাঈদ ভাই অথবা আবদুল কাদের ভাইয়ের অনুরোধ অনুসারে নতুন গান চালু করাই আমার কাজ। পাশাপাশি টুকটাক হাততালি দিয়ে তাঁদের উল্লাসের সঙ্গে সহমত জানিয়ে যাচ্ছি।

ঈদ–আনন্দভ্রমণের আনন্দ চলমান, তবে এর মধ্যে সামান্য বিরক্তিকর ঘটনা ঘটে যাচ্ছে, যার নিয়ন্ত্রণ আমাদের হাতে একদমই নেই, তা হচ্ছে ট্রাফিক জ্যাম। মালয়েশিয়ায় ঈদের আগে মালয়েশিয়ানদের বাড়ি ফেরা ও ঈদের ছুটি শেষে কুয়ালালামপুরে ফেরার পথে সাধারণত মহাসড়কে কঠিন জ্যাম থাকে জানি। কিন্তু ঈদের দিন তেমন জ্যাম থাকার কথা নয়। মহাসড়কে আজ ভিন্ন রূপ, ঈদের দিনেও জ্যাম। জ্যামে গাড়ি চালানো একটু কষ্টের ও বিরক্তিকর। নাচ, গান, হইহুল্লোড়ের কারণে বিরক্তিকর ভাবটা তেমন চেপে বসতে পারছে না। গানের তালে তালে স্বাভাবিক গতির চেয়ে একটু ধীরে হলেও আমরা এগিয়ে চলছি মালাক্কার দিকে। মহাসড়কে গাড়ির জ্যাম না থাকলে কুয়ালালামপুর থেকে মালাক্কা যেতে সময় লাগে দুই আড়াই ঘণ্টা। যদিও কুয়ালালামপুরের চারদিকে সেলাঙ্গর প্রদেশ। কুয়ালালামপুর থেকে দূরে কোথাও যেতে হলে আগে সেলাঙ্গর প্রদেশ পেরিয়ে যেতেই হবে। মালাক্কার পথে সেলাঙ্গর প্রদেশের এলাকাগুলো পেরিয়ে প্রথমেই পাড়ি দিতে হয় নেগেরি সিমবিলান প্রদেশ। মহাসড়কে নেগেরি সিমবিলান শেষে মালাক্কার প্রবেশপথেই আছে মালাক্কায় স্বাগত জানিয়ে গেট। গেটের আগে পেট্রলপাম্পে দাঁড়িয়ে গাড়ি থেকে বের হয়ে ওয়াশরুমের কাজ সেরে একটুখানি গায়ে হাওয়া লাগালাম। এর অল্পক্ষণের মধ্যেই আমরা পৌঁছে গেলাম মালাক্কায়। হোটেলে গিয়ে উঠলাম সবাই।

মালাক্কা রিভারক্রুজের পাশেই আমাদের হোটেল। বলা যায় মালাক্কার প্রাণকেন্দ্রে। বিশেষ করে মালাক্কার মূল হেরিটেজ এলাকায় আমরা আছি। হোটেলের একেবারে পাশেই মসজিদ কামপুং হুলু। তিন শ বছর আগে নির্মিত মসজিদ কামপুং হুলু হচ্ছে মালাক্কা প্রদেশের সবচেয়ে পুরোনো মসজিদ। শুধু মালাক্কার নয়, পুরো মালয়েশিয়ারই পুরোনো মসজিদগুলোর একটি। মালাক্কায় পৌঁছে হোটেল লবিতে ব্যাগ রেখে সবার আগে মসজিদ কামপুং হুলুতে গিয়ে মাগরিবের নামাজ আদায় করলাম জামাতে। আগেও এই মসজিদে দুইবার নামাজ পড়েছিলাম। ছোট আয়তনের মসজিদটিতে নামাজ পড়তে ও ঘুরে দেখতে ভালোই লাগে। চারপাশে ঐতিহ্যের ছাপ বিদ্যমান। ১৭২০ থেকে ১৭২৮ সালের মধ্যে এটি নির্মাণ করা হয়। পরে ১৮৯২ সালে এটি সংস্কার করা হয়।

পরে আমরা হোটেলে গিয়ে ফ্রেশ হলাম। রাত নয়টার দিকে বের হলাম রিভারক্রুজে বোট নিয়ে মালাক্কা শহর ঘুরে দেখব ভেবে। এর আগে দুবার মালাক্কা এলেও রিভারক্রুজে ওঠা হয়নি। নদীর পাশে ওয়াকওয়ে ধরে হেঁটে হেঁটে মালাক্কা নদীকে ঘিরে গড়ে ওঠা পর্যটন শিল্পের সৌন্দর্য উপভোগ করেছি। লাল–নীল রঙিন আলোয় আলোকিত লিভারসাইটের রেস্তোরাঁয় বসে খাবার খেয়েছি আগে। ছবি তুলে স্মৃতি ধরে রেখেছিলাম। এবার সাংবাদিক বন্ধুদের সঙ্গে আরও উপভোগ্য হবে রাতের লিভারসাইট ভ্রমণ। মালাক্কার এই রিভারক্রুজ যখন আমি প্রথম দেখেছিলাম ২০২২ সালে, তখন এতটাই মুগ্ধ হয়েছিলাম মনে মনে বলেছি, এখানে এত বছর কেন আসিনি! তখন বারবার ভেবেছি, মালাক্কা শহরের ভেতরে প্রবাহিত হওয়া মালাক্কা নদীকে এত নান্দনিকভাবে সাজিয়েছে মালাক্কার স্থানীয় সরকার বা পর্যটন সংস্থা, দেশের পুরোনো শহরটি হয়ে উঠেছে পর্যটক আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু। আরেক এলাকায় পর্তুগিজ ও ডাচ শাসনামলের নানা স্মৃতিকে বানিয়ে রেখেছে পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে। সেখানে সারা বছর দেশি-বিদেশি পর্যটনদের ভিড় থাকে। সমৃদ্ধ থেকে সমৃদ্ধতর হচ্ছে মালয়েশিয়ার পর্যটনশিল্প। অথচ আমাদের চট্টগ্রাম শহরজুড়ে বয়ে গেছে ৩০টির বেশি খাল বা শাখা নদী। খালগুলো কর্ণফুলীর শাখা-প্রশাখা। গত ১০ বছরে হাজার হাজার কোটি টাকা খরচ করেও (জলাবদ্ধতা প্রকল্পের আওতায়) কাজ শেষ করতে পারেনি। এই প্রকল্পটি যথাযথভাবে শেষ করতে পারলে চট্টগ্রাম শহর হতো পৃথিবীর অন্যতম সুন্দর শহর। পাঁচ–ছয় বছর আগে চট্টগ্রাম নাগরিক ফোরাম আয়োজিত জলাবদ্ধতা নিয়ে একটি অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলাম, সেখনে প্রকল্প পরিচালক (সেনা কর্মকর্তা) বিস্তারিত জানিয়েছিলেন চট্টগ্রাম শহরে বয়ে যাওয়া অসংখ্য খাল তথা কর্ণফুলী নদীর শাখা–প্রশাখাগুলো নিয়ে। খুব চমৎকার একটা প্রকল্প। কিন্তু এখনো কাজ বাকি বহুদূর। চলবে...

লেখক: মালয়েশিয়াপ্রবাসী

দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]

Read full story at source