ইরান কেন হরমুজ প্রণালির ওপর পূর্ণ সার্বভৌমত্ব চাচ্ছে, শুধুই কি রাজস্ব আয় নাকি আরও কিছু

· Prothom Alo

ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের শুরু করা আগ্রাসনের অবসানে সম্প্রতি তেহরান তাদের দাবিদাওয়ার একটি তালিকা দিয়েছে। তালিকায় নতুনভাবে এমন একটি দাবি যোগ করা হয়েছে, যা আগে তেহরানের শর্তের মধ্যে ছিল না। আর দাবিটি হলো, হরমুজ প্রণালিতে ইরানের সার্বভৌমত্বের স্বীকৃতি।

Visit milkshakeslot.lat for more information.

বিশ্বের মোট তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) এক-পঞ্চমাংশ সাধারণত হরমুজ প্রণালির মধ্য দিয়ে পরিবহন করা হয়। ইরান এখন এটিকে সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে চাইছে।

ইরান গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথকে বছরে কয়েক শ কোটি ডলার আয়ের উৎসে পরিণত করতে চাইছে। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালিকে বৈশ্বিক অর্থনীতির ওপর চাপ সৃষ্টির একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রেও পরিণত করতে চাইছে তারা।

ইরানের হামলার কারণে এ গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ দিয়ে জাহাজ চলাচল প্রায় থমকে গেছে। এতে বৈশ্বিক জ্বালানিবাজারে তীব্র অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। পারস্য উপসাগরের বাইরের দেশগুলোও জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে জরুরি পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হয়েছে।

ইরান অনেক দিন ধরেই হুমকি দিয়ে আসছিল যে হামলা হলে তারা হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেবে। কিন্তু তারা যে সেই হুমকিকে এতটা কার্যকর করে ফেলতে পারবে এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যপ্রবাহকে বিশৃঙ্খলায় ফেলতে পারবে, তা অনেকে ভাবতে পারেননি।

এমন অবস্থায় তেহরানের আকাঙ্ক্ষা আরও বেড়ে গেছে। তাদের নতুন দাবিগুলো দেখে বোঝা যাচ্ছে যে ইরান হরমুজ প্রণালিতে তাদের প্রভাবকে আরও টেকসই করার চেষ্টা করছে।

ইরানের হামলার কারণে এ গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ দিয়ে জাহাজ চলাচল প্রায় থমকে গেছে। এতে বৈশ্বিক জ্বালানিবাজারে তীব্র অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। পারস্য উপসাগরের বাইরের দেশগুলোও জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে জরুরি পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হয়েছে।

ব্লুমবার্গ ইকোনমিকসের মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক প্রধান দিনা এসফানদিয়ারি বলেন, হরমুজ নিয়ে নিজেদের কৌশল যে এতটা সফল হবে, তা ইরানও কল্পনা করেনি। তুলনামূলক কম খরচে ও সহজ উপায়ে বৈশ্বিক অর্থনীতিকে চাপে রাখা সম্ভব হচ্ছে।

হরমুজ প্রণালিতে ইরানের ‘টোল বুথ’, জাহাজপ্রতি কত ফি নেওয়া হবে

দিনা বলেন, ‘এ যুদ্ধ থেকে একটি বড় শিক্ষা হলো, ইরান নতুন ধরনের প্রভাব বিস্তারের এই সক্ষমতা বুঝতে পেরেছে এবং ভবিষ্যতে সেটি আবার ব্যবহার করার সম্ভাবনা আছে। আর আমার মনে হয়, এই সক্ষমতাকে তাদের অর্থ আয়ের উৎসে পরিণত করার চেষ্টাও সে উপলব্ধিরই অংশ।’

ওয়াশিংটন এই ঝুঁকির বিষয়টি বুঝতে পারছে। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও গত শুক্রবার সতর্ক করে বলেছেন, যুদ্ধের পর হরমুজে ইরানের একটি টোল–ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা তাৎক্ষণিকভাবে অন্যতম চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।

ফ্রান্সে জি৭-ভুক্ত দেশগুলোর পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকের পর ইরানের টোল নেওয়া প্রসঙ্গে সাংবাদিকদের রুবিও বলেন, এটি কেবল অবৈধ নয়, এটি অগ্রহণযোগ্য, এটি বিশ্বের জন্য বিপজ্জনক। এটি মোকাবিলার জন্য বিশ্বের একটি পরিকল্পনা থাকা জরুরি।

ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে প্রথমবারের মতো দেওয়া বক্তব্যে মোজতবা খামেনি হরমুজ প্রণালির ক্রমবর্ধমান কৌশলগত গুরুত্বের কথা উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেছেন, এই জলপথ বন্ধ করে দেওয়ার মতো যে প্রভাব ও সক্ষমতা ইরানের আছে, তা ব্যবহার করে যেতে হবে।

এখন পর্যন্ত আন্তর্জাতিক প্রণালিতে চলাচলের জন্য সফলভাবে ফি আদায়ের কোনো উল্লেখযোগ্য নজির নেই। ঊনবিংশ শতাব্দীতে ডেনমার্ক ডেনিশ প্রণালি দিয়ে চলাচলের জন্য টোল ধার্য করেছিল। কিন্তু একাধিক দেশের প্রতিবাদের পর ১৮৫৭ সালে কোপেনহেগেন সনদের আওতায় এ টোল স্থায়ীভাবে বাতিল করা হয়েছিল।

এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বিভিন্ন দফায় আলোচনার সময় ইরান শুধু তাদের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক প্রযুক্তি ব্যবহার করার অধিকারের স্বীকৃতি দাবি করেছিল। তখন তারা হরমুজ প্রণালি নিয়ন্ত্রণের কোনো দাবি করেনি।

এবার ইরান তাদের এ প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে আয় করার ইঙ্গিত দিয়েছে। ইরানের আইনপ্রণেতারা এমন একটি বিল অনুমোদনের কথা বিবেচনা করছেন, যার আওতায় হরমুজ প্রণালি দিয়ে জ্বালানি ও পণ্য পরিবহনকারী দেশগুলোর কাছ থেকে টোল আদায় করা হবে।

এ ছাড়া ইরানের সর্বোচ্চ নেতার এক উপদেষ্টা যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর ‘হরমুজ প্রণালিতে নতুন নিয়ম প্রতিষ্ঠা’ নিয়ে কথা বলেছেন। এ নতুন ব্যবস্থার মাধ্যমে তেহরান শত্রুপক্ষের ওপর সামুদ্রিক নিয়ন্ত্রণ আরোপ করতে পারবে।

মার্কিন নেভাল ওয়ার কলেজের আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক আইনবিষয়ক অধ্যাপক জেমস ক্রাস্কা বলেন, হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলের জন্য টোল ধার্য করাটা আন্তর্জাতিক নিয়মের লঙ্ঘন। আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে কোনো উপকূলীয় রাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক প্রণালিতে টোল নেওয়ার অধিকার নেই।

হরমুজ প্রণালির কাছে একটি কার্গো জাহাজ। ১১ মার্চ, ২০২৬

ক্রাস্কা আরও বলেন, হরমুজ প্রণালি একটি আন্তর্জাতিক নৌপথ। সেখানে ইরান ও ওমানের আঞ্চলিক জলসীমা রয়েছে। এই জলসীমার মধ্যে ইরানি ও ওমানি আইন প্রযোজ্য। তবে এটি একটি আন্তর্জাতিক প্রণালি হওয়ায় এখানকার নৌপথ, আকাশসীমা ও জলপথ দিয়ে সব দেশের প্রভাবমুক্তভাবে চলাচলের অধিকার আছে।

জাতিসংঘের সমুদ্র আইনসংক্রান্ত সনদে (ইউএনসিএলওএস) এসব নিয়ম সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। যদিও ইরান বা যুক্তরাষ্ট্র এ দুই দেশের কেউই আনুষ্ঠানিকভাবে এ সনদ অনুমোদন করেনি। তবে ক্রাস্কা মনে করেন, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র এ সনদের অনুমোদনকারী না হলেও তাদের ওপর এর অনেকগুলো মূলনীতি প্রযোজ্য হবে। কারণ, সেগুলো ব্যাপকভাবে আন্তর্জাতিক আইন হিসেবে গ্রহণযোগ্য।

এখন পর্যন্ত আন্তর্জাতিক প্রণালিতে চলাচলের জন্য সফলভাবে ফি আদায়ের কোনো উল্লেখযোগ্য নজির নেই। ঊনবিংশ শতাব্দীতে ডেনমার্ক ডেনিশ প্রণালি দিয়ে চলাচলের জন্য টোল ধার্য করেছিল। কিন্তু একাধিক দেশের প্রতিবাদের পর ১৮৫৭ সালে কোপেনহেগেন সনদের আওতায় এই টোল স্থায়ীভাবে বাতিল করা হয়েছিল।

হুতিদের হামলায় ইরান যুদ্ধের নতুন মোড়, কয়েক সপ্তাহের স্থল অভিযানের প্রস্তুতি নিচ্ছে পেন্টাগন

সুয়েজ খালের সঙ্গে প্রতিযোগিতা

টোল আদায়ের ব্যবস্থা কেমন হতে পারে বা এটি কতটা লাভজনক হতে পারে, তা নিয়ে প্রতিনিয়ত বিশেষজ্ঞরা প্রশ্ন করছেন। ইরান এমন একটি টোল–ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে পারবে কি না, যা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত হবে। সিএনএনের হিসাব অনুযায়ী, তবে এটি সফল হলে আয় সূচকে এটি মিসরের সুয়েজ খালের আয়ের সমান বা তার কাছাকাছি হতে পারে।

সাধারণত দিনে প্রায় ২ কোটি ব্যারেল অপরিশোধিত তেল ও তেলজাত পণ্য হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচল করে। এটি প্রায় ১০টি অপরিশোধিত তেল পরিবহনকারী খুব বড় জাহাজের সমপরিমাণ। প্রতি ট্যাংকারের জন্য ২০ লাখ ডলার ফি ধরা হলে কেবল তেল থেকে দৈনিক আয় দাঁড়ায় প্রায় ২ কোটি ডলারে, অর্থাৎ মাসে প্রায় ৬০ কোটি ডলারে।

যদি এলএনজি পরিবহনও যোগ করা হয়, তাহলে আয় বাড়তে পারে মাসে ৮০ কোটি ডলারের বেশি, যা ২০২৪ সালে ইরানের মাসিক তেল রপ্তানির আয়ের ১৫ থেকে ২০ শতাংশের সমান।

মিসর সুয়েজ খাল থেকে মাসে ৭০ থেকে ৮০ কোটি ডলার আয় করে। এটি সরকার নিয়ন্ত্রিত একটি কৃত্রিম জলপথ। তবে গত বছর লোহিত সাগরে বাণিজ্যিক নৌচলাচল বিঘ্নিত হওয়ায় আয় হঠাৎ কমে গেছে।

হরমুজ প্রণালি থেকে অর্থনৈতিক লাভ তোলার পেছনে ইরানের অর্থনৈতিক চাপও কাজ করতে পারে। ব্লুমবার্গ ইকোনমিকসের দিনা এসফানদিয়ারি বলেন, তেহরান এই প্রণালি দিয়ে চলাচলের জন্য ফি নেওয়াকে নিষেধাজ্ঞার কারণে তৈরি হওয়া অর্থনৈতিক ঘাটতি পূরণের উপায় হিসেবে দেখছে।

দিনা এটিকে ইরানের জন্য তুলনামূলকভাবে ‘সহজ’ ও ‘কম খরচের’ পদ্ধতি হিসেবে উল্লেখ করেছেন। ইরান বিশ্বে সবচেয়ে বেশি নিষেধাজ্ঞার মুখে থাকা দেশগুলোর অন্যতম। নিষেধাজ্ঞার দিক থেকে রাশিয়ার পরপরই এর অবস্থান।

ইরান বারবার বলেছে, শর্তসাপেক্ষে হরমুজ প্রণালি খোলা রাখা হয়েছে। দেশটির কর্মকর্তারা বলেছেন, শত্রুভাবাপন্ন নয়, এমন দেশগুলো ইরানি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয়ের ভিত্তিতে এ পথ দিয়ে চলাচল করতে পারবে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়, ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় চিঠির মাধ্যমে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ ও আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থাকে এই অবস্থানের কথা জানিয়েছে।

হরমুজ প্রণালির ম্যাপের ইলাস্ট্রেশন

একই সময়ে কীভাবে নিয়ন্ত্রিত চলাচলব্যবস্থা বাস্তবে কার্যকর করা যায়, তা নিয়ে সম্ভবত পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাচ্ছে ইরান। জাহাজ শনাক্তকারী উপাত্ত বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, কিছু ট্যাংকার ইরান উপকূলের কাছে অবস্থিত একটি পথ ব্যবহার করছে।

বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কিছু জাহাজের পরিচালনাকারীরা নিরাপদ চলাচলের জন্য ইরানকে অর্থ পরিশোধ করতে পারে।

কোনো দেশ, আমদানিকারক বা জাহাজ পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান অবশ্য প্রকাশ্যে ফি দেওয়ার কথা স্বীকার করেনি। এ ধরনের বন্দোবস্ত করার বিষয়ে কোনো বিস্তারিত তথ্য জানা যায়নি।

তবে জাহাজ চলাচলবিষয়ক বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহকারী প্রতিষ্ঠান লয়েডস লিস্ট গত সোমবার বলেছে, ২০টির বেশি জাহাজ হরমুজ প্রণালি দিয়ে একটি নতুন করিডর ব্যবহার করেছে। লয়েডস লিস্ট কর্তৃপক্ষের ধারণা, এর মধ্যে কমপক্ষে দুটি জাহাজ অর্থ পরিশোধ করেছে। একটির ফি ছিল ২০ লাখ ডলারের কাছাকাছি।

ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ডও অনুমোদিত জাহাজের জন্য একটি নিবন্ধনব্যবস্থা তৈরি করেছে। আর কিছু দেশের সরকার তাদের ট্যাংকারের চলাচল নিশ্চিত করতে সরাসরি তেহরান কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করছে।

লয়েডস লিস্টের প্রধান সম্পাদক রিচার্ড মিড সিএনএনকে বলেন, ‘এটা ঘটছে এবং আমি মনে করি, যদি আলোচনায় কোনো অগ্রগতি না দেখা যায়, তবে এটা আরও ঘন ঘন ঘটবে। তবে আমরা বলতে পারি, এ মুহূর্তে জাহাজ চলাচল শিল্প কার্যত স্থবিরাবস্থায় আছে।’

Read full story at source