ইরানে সাজানো যুদ্ধ: মার্কিন নেতারা যেভাবে মিথ্যা বলে যাচ্ছেন

· Prothom Alo

মিথ্যা বলা রাষ্ট্রপরিচালনার ক্ষেত্রে যেন একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাজনীতিবিদেরা নিজেদের টিকে থাকা কিংবা সাম্রাজ্য বিস্তারের স্বার্থে নানা ছলনার আশ্রয় নিয়েছেন। মনে করা হয়েছে, এটি উত্তেজনা প্রশমন করবে অথবা যুদ্ধের কিনারা থেকে সম্মানজনক প্রত্যাবর্তনের পথ করে দেবে।

Visit chickenroad-game.rodeo for more information.

তবে বর্তমানের এই অতিসংযুক্ত পৃথিবীতে একটি রাজনৈতিক মিথ্যার আয়ু অবিশ্বাস্যভাবে কমে এসেছে। যখন তথ্যকে তাৎক্ষণিকভাবে অস্ত্রে রূপান্তর করা সম্ভব, তখন মিথ্যা বনিয়াদের ওপর টেকসই কোনো কর্মসূচি গড়া যেকোনো নেতার পক্ষে অসম্ভব হয়ে পড়েছে।

ডোনাল্ড ট্রাম্প রাজনৈতিক এই প্রচলিত ধারার ঊর্ধ্বে এক বিস্ময়কর ব্যতিক্রম হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। বারবার তাঁর অসত্য দাবিগুলো ধরা পড়লেও তিনি পিছু হটেননি। এমনকি তথ্যগুলোর অন্তঃসারশূন্যতা প্রমাণিত হওয়ার পরও তিনি নিজস্ব ‘বিকল্প তথ্যের’ ওপর ভিত্তি করে নিজের নীতিতে অটল থাকছেন।

ইরান যুদ্ধ যেভাবে শেষ হতে পারে

এটি আন্তর্জাতিক কূটনীতির ক্ষেত্রে একটি কাঠামোগত সমস্যা তৈরি করেছে। যখন পররাষ্ট্রনীতির প্রধান রূপকারই বাস্তববিমুখ হন, তখন কূটনীতি উত্তেজনা কমানোর মৌলিক সক্ষমতা হারায়। ইরানের বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধের পরিপ্রেক্ষিতে এটি এক জটিল সংকটে রূপ নিয়েছে। কারণ, সাধারণ জনগণ এখনো জানে না, কেন এই লড়াই চলছে।

এদিকে পেশাদার কূটনীতিকেরা পড়েছেন চরম বিপাকে। তাঁরা রাষ্ট্রপ্রধানের বক্তব্য পরিবর্তন বা সরাসরি সংশোধন করতে পারছেন না। ফলে শীর্ষ মহলের সরবরাহ করা ভুল মানচিত্র নিয়ে তারা এক ভূরাজনৈতিক মাইনফিল্ডের মধ্য দিয়ে হাঁটতে বাধ্য হচ্ছেন।

এই ‘পোস্টট্রুথ’ বা ‘সত্যোত্তর’ কূটনীতির ভয়াবহ ফলাফল বর্তমানে ইরান যুদ্ধের অজুহাতের মধ্যেই সবচেয়ে স্পষ্ট।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, সামরিক পদক্ষেপ ছিল একটি ‘আসন্ন হুমকি’ এবং ত্বরান্বিত পরমাণু কর্মসূচির জবাব। অথচ মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো তা সমর্থন করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। কংগ্রেসের শুনানিতে গোয়েন্দা বিভাগের প্রধান তুলসী গ্যাবার্ড এই হুমকির দাবি এড়িয়ে গিয়ে বলেছেন, এমন সিদ্ধান্ত নেওয়ার এখতিয়ার কেবল প্রেসিডেন্টের।

ইতিহাসের এক বিদ্রূপ হয়ে আছে মার্কিনদের ইরাক যুদ্ধ। দেশটিকে ‘মুক্ত করার’ নামে একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রকে ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছিল সেই সব গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে, যা ভুল তো বটেই, এমনকি বানোয়াট ছিল। ইরাকের লাখ লাখ নাগরিক সেই ‘বিকল্প তথ্যের’ মাশুল দিয়েছেন নিজেদের জীবন দিয়ে। দেশটি এখন এক স্থায়ী ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে, যেখানে ভুল শিকার করলেও ক্ষমতার মসনদে থাকা কাউকেই শাস্তি দেওয়া হয়নি।

যখন ওমানে পর্দার অন্তরালে দুর্যোগ মোকাবিলার আলাপ চলছিল, তখন বিশ্বকে ‘মহাবিপর্যয়’ থেকে রক্ষার অজুহাত তুলে এই যুদ্ধ শুরু করা হয়। ট্রাম্পের তথাকথিত ‘ঐকমত্যের’ দাবিকে তেহরান যখন ‘ভুয়া খবর’ বলে উড়িয়ে দেয়, তখন এই চরম বিচ্ছিন্নতা সবার সামনে প্রকাশ হয়ে পড়ে।

রাজনীতির প্রচলিত নিয়মকে অগ্রাহ্য করার এই প্রবণতা অভ্যন্তরীণ নীতির ক্ষেত্রেও সমানভাবে দৃশ্যমান। আমূল পরিবেশগত নীতি পরিবর্তনের জন্য ট্রাম্প তথাকথিত ‘জ্বালানি আধিপত্যের’ একটি ভ্রম সৃষ্টি করেছেন। তিনি দাবি করেছেন, আমেরিকার তেল উৎপাদন খুব শিগগির তিন গুণ হবে, যা অবাস্তব এবং পারিসাংখ্যনিক ভ্রান্তি।

বাস্তবতা হলো, হরমুজ প্রণালির সংকট চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে যে বিশ্ববাজারের গতিপ্রকৃতি কোনো হোয়াইট হাউসের ফরমানে নয়; বরং বৈশ্বিক অস্থিরতা দিয়ে নির্ধারিত হয়। ২০২৫ সালের জাতিসংঘ অধিবেশনে জলবায়ু পরিবর্তনকে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ‘জালিয়াতি’ বলে অভিহিত করে ট্রাম্প বিজ্ঞানসম্মত মতামতকে কার্যত স্তব্ধ করে দিয়েছেন। যখন অর্থনীতি ‘বিকল্প তথ্যের’ খতিয়ানে পরিণত হয়, তখন ঘরের কূটনীতিই মুখ থুবড়ে পড়ে। সাধারণ জনগণকে শেষ পর্যন্ত প্রেসিডেন্টের কাল্পনিক বাস্তবতার চড়া দাম চোকাতে হয়।

ইরান যুদ্ধ, নাকি দাজ্জালতত্ত্বে মোড়া ‘আমেরিকান ক্রুসেড’!

ইতিহাসের এক বিদ্রূপ হয়ে আছে মার্কিনদের ইরাক যুদ্ধ। দেশটিকে ‘মুক্ত করার’ নামে একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রকে ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছিল সেই সব গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে, যা ভুল তো বটেই, এমনকি বানোয়াট ছিল। ইরাকের লাখ লাখ নাগরিক সেই ‘বিকল্প তথ্যের’ মাশুল দিয়েছেন নিজেদের জীবন দিয়ে। দেশটি এখন এক স্থায়ী ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে, যেখানে ভুল শিকার করলেও ক্ষমতার মসনদে থাকা কাউকেই শাস্তি দেওয়া হয়নি।

এই নির্লজ্জ কৌশলের আধুনিক সংস্করণ দেখা গেছে ২০১১ সালে লিবিয়ার হস্তক্ষেপে। বড় বড় সংবাদমাধ্যম ও রাজনীতিবিদ অপ্রমাণিত গণধর্ষণ ও বর্বরতার খবর প্রচার করে জাতিসংঘকে হস্তক্ষেপ করতে বাধ্য করেছিলেন। পরবর্তী সময়ে যুক্তরাজ্যের সংসদ এবং মানবাধিকার সংস্থাগুলোর তদন্তে উঠে এসেছে যে যুদ্ধের স্বার্থে বেসামরিক হুমকির বিষয়টি অত্যন্ত ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে দেখানো হয়েছিল। মূলত শাসন পরিবর্তনের গোপন উদ্দেশ্য বাস্তবায়নেই এই ‘বিকল্প তথ্য’ তৈলাক্ত উপকরণ হিসেবে কাজ করেছিল।

ইরাকের কাল্পনিক মারণাস্ত্র থেকে লিবিয়ার পরিকল্পিত নৃশংসতা পর্যন্ত দীর্ঘ এই প্রবঞ্চনার পাহাড় আন্তর্জাতিক সম্পর্ককে একটি চরম প্রান্তিক পর্যায়ে নিয়ে গেছে। এটি এখন আর স্রেফ রাজনীতির মোড়ক নয়; বরং সত্যের মূল্যের চিরস্থায়ী অবক্ষয়। যখন বিশ্বের শীর্ষ শক্তিগুলো তথ্যকে তাদের নিজস্ব সাবজেক্টিভ দৃষ্টিভঙ্গিতে উপস্থাপন করে, তখন সংলাপের প্রতিটি শব্দ তার যোগ্যতা হারায়।

সত্যোত্তর এই যুগের চূড়ান্ত পরিণতি কেবল আস্থার বিনাশ নয়; বরং ভুল তথ্যের জাঁতাকলে পড়ে অসংখ্য নিরপরাধ মানুষের জীবননাশ। গাজা যখন যুদ্ধের নিষ্ঠুর চাদরে ঢাকা এবং ইরান যখন পরিকল্পিতভাবে সাজানো হুমকির শিকারে পরিণত হচ্ছে, তখন বিশ্ববাসীর কাছে এক ভীতিকর বাস্তবতা উন্মোচিত হয়। যখন কোনো রাষ্ট্রপ্রধান মিথ্যা বলেন, তখন কেবল কূটনীতিরই মৃত্যু ঘটে না; বরং এর স্থলাভিষিক্ত হয় চিরস্থায়ী ও বাণিজ্যিক সহিংসতা।

মধ্যপ্রাচ্যের মানুষের কাছে সত্য কোনো তাত্ত্বিক আলোচনার বিষয় নয়; বরং এটি তাদের টিকে থাকার লড়াই। যত দিন পর্যন্ত বাস্তব তথ্যের ওপর ভিত্তি করে বৈশ্বিক সংলাপ প্রতিষ্ঠিত না হবে, তত দিন এই সংঘাতের ভাষাই হবে পৃথিবীর প্রধান ভাষা। এটিই এক অন্ধকার ভবিষ্যৎ, যেখানে চুক্তির কোনো দাম নেই এবং মানুষের জীবনে কেবল নিশ্চিত হয়ে থাকে একের পর এক সাজানো যুদ্ধ।

  • মোস্তফা ফিতুরি লিবীয় শিক্ষাবিদ এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের ‘ফ্রিডম অব দ্য প্রেস’ পুরস্কারে ভূষিত সাংবাদিক

মিডিল ইস্ট মনিটর থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত

Read full story at source