একজন মুসলিমের কাছে স্বাধীনতার অর্থ কী

· Prothom Alo

মানবসভ্যতার ইতিহাসে ‘স্বাধীনতা’ একটি চিরন্তন ও মহিমান্বিত শব্দ। তবে ইসলামের দৃষ্টিতে স্বাধীনতার সংজ্ঞা কেবল একটি নির্দিষ্ট ভূখণ্ডে শৃঙ্খলমুক্ত বসবাস নয়; বরং এর পরিধি আরও বিস্তৃত ও গভীর।

একজন মুসলিমের কাছে স্বাধীনতা হলো—সৃষ্টিকর্তা ছাড়া অন্য সকল অপশক্তির দাসত্ব থেকে মুক্তি এবং মানুষের ওপর মানুষের প্রভুত্বের অবসান ঘটানো। ২৬ মার্চ আমাদের মহান স্বাধীনতা দিবসে ইসলামের আলোকে এই স্বাধীনতার প্রকৃত স্বরূপ অনুধাবন করা জরুরি।

Visit mwafrika.life for more information.

সৃষ্টির দাসত্ব থেকে স্রষ্টার দাসত্বে মুক্তি

ইসলামি দর্শনে স্বাধীনতার মূল ভিত্তি হলো ‘তাওহিদ’ বা একত্ববাদ। একজন মুসলিম যখন ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ পাঠ করে, তখন সে কার্যত ঘোষণা দেয় যে—সে আল্লাহ ছাড়া আর কারো কাছে মাথা নত করবে না।

সাহাবি রিবয়ি ইবনে আমের (রা.) পারস্যের সেনাপতি রুস্তমের দরবারে স্বাধীনতার এই কালজয়ী সংজ্ঞা দিয়েছিলেন, “আল্লাহ আমাদের পাঠিয়েছেন মানুষকে মানুষের দাসত্ব থেকে বের করে আল্লাহর দাসত্বে ফিরিয়ে নিতে এবং দুনিয়ার সংকীর্ণতা থেকে আখেরাতের প্রশস্ততার দিকে নিয়ে যেতে।” (ইবনে কাসির, আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৭/৩৯-৪০, বৈরুত: দারুল কুতুব আল-ইলমিয়্যাহ, ১৯৮৬)

কেয়ামতের ময়দানে প্রতিটি নেয়ামত সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে। স্বাধীনতা দিবসে আমাদের আত্মোপলব্ধি প্রয়োজন—আমরা কি স্বাধীনতার এই নেয়ামতকে সঠিক পথে ব্যয় করছি? 
স্বাধীনতার ইসলামি দর্শন

ভূখণ্ড ও সার্বভৌমত্বের সুরক্ষা

ইসলামে পরাধীনতাকে অভিশাপ হিসেবে দেখা হয়েছে। নিজের দেশ, ভাষা এবং সংস্কৃতি রক্ষা করা ইমানের দাবি। মদিনায় মুক্তাঞ্চল প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে মহানবী (সা.) দেখিয়েছেন যে একটি স্বাধীন ভূখণ্ড ছাড়া ধর্মের পূর্ণাঙ্গ অনুশীলন সম্ভব নয়।

মদিনার স্বাধীনতা অক্ষুণ্ণ রাখতে তিনি যে কঠোর পরিশ্রম ও যুদ্ধ পরিচালনা করেছেন, তা প্রমাণ করে যে মাতৃভূমির সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা প্রতিটি মুসলিমের ধর্মীয় কর্তব্য। (ড. মুহাম্মদ হামিদুল্লাহ, মুসলিম কন্ডাক্ট অব স্টেট, পৃষ্ঠা: ১০৫-১১০, লাহোর: আশরাফ পাবলিকেশন্স, ১৯৬১)

আত্মিক ও চারিত্রিক স্বাধীনতা

ইসলামের দৃষ্টিতে প্রকৃত স্বাধীন ব্যক্তি সে-ই, যে নিজের কুপ্রবৃত্তি বা নফসের গোলামি থেকে মুক্ত। যে ব্যক্তি লোভ, হিংসা এবং অনৈতিক লালসার শৃঙ্খলে বন্দি, সে বাহ্যিকভাবে স্বাধীন হলেও মূলত পরাধীন।

মহানবী (সা.) বলেছেন, “প্রকৃত বীর সে নয় যে কুস্তিতে অন্যকে হারিয়ে দেয়; বরং প্রকৃত বীর সে-ই যে রাগের সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬১১৪)

একজন মুসলিমের কাছে স্বাধীনতার অর্থ হলো নিজের চরিত্রকে কলুষমুক্ত রেখে আল্লাহর বিধান পালনের যোগ্যতা অর্জন করা।

দ্বিতীয় খলিফা হজরত ওমর (রা.)তোমরা কবে থেকে মানুষকে দাসে পরিণত করলে, অথচ তাদের মায়েরা তাদের স্বাধীন হিসেবে জন্ম দিয়েছে?পরাধীনতা মানুষের মর্যাদা হারানোর নীরব শৃঙ্খল

ইনসাফ ও সামাজিক সাম্য প্রতিষ্ঠা

স্বাধীনতার একটি বড় অর্থ হলো সামাজিক ন্যায়বিচার। যেখানে জুলুম ও বৈষম্য থাকে, সেখানে স্বাধীনতা অর্থহীন। ইসলামে শাসিত ও শাসকের অধিকার সমান।

এক্ষেত্রে খলিফা ওমর (রা.)-এর সেই বিখ্যাত উক্তি স্মরণ করা যায়, যা স্বাধীনতার প্রকৃত নির্যাস বহন করে, “তোমরা কবে থেকে মানুষকে দাসে পরিণত করলে, অথচ তাদের মায়েরা তাদের স্বাধীন হিসেবে জন্ম দিয়েছে?” (ইবনুল জাওজি, সিরাতু উমার ইবনুল খাত্তাব, পৃষ্ঠা: ৯৮, কায়রো: মাকতাবাতুল খানজি, ১৯২৪)

ইসলামে রাষ্ট্রের স্বাধীনতার সার্থকতা মানে হলো নাগরিকের অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান এবং জান-মালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।

আমানত হিসেবে স্বাধীনতা

একজন মুসলিমের কাছে স্বাধীনতা একটি বড় ‘আমানত’। কেয়ামতের ময়দানে প্রতিটি নেয়ামত সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে। স্বাধীনতা দিবসে আমাদের আত্মোপলব্ধি প্রয়োজন—আমরা কি স্বাধীনতার এই নেয়ামতকে সঠিক পথে ব্যয় করছি? 

“আর যখন তোমাদের পালনকর্তা ঘোষণা করলেন যে, যদি তোমরা কৃতজ্ঞতা স্বীকার করো, তবে আমি তোমাদেরকে আরও দেব এবং যদি অকৃতজ্ঞ হও, তবে নিশ্চয়ই আমার শাস্তি হবে কঠোর।” (সুরা ইব্রাহিম, আয়াত: ০৭)

দেশের সম্পদ রক্ষা করা, দুর্নীতিমুক্ত সমাজ গঠন এবং অসহায়ের পাশে দাঁড়ানোই হলো স্বাধীনতার প্রকৃত শুকরিয়া।

পরিশেষে বলা যায়, একজন মুসলিমের কাছে স্বাধীনতার অর্থ হলো—আল্লাহর আনুগত্যের মাধ্যমে আত্মিক শান্তি অর্জন এবং দেশপ্রেমের মাধ্যমে জনকল্যাণে নিজেকে বিলিয়ে দেওয়া।

আমাদের স্বাধীনতা দিবস কেবল আনুষ্ঠানিকতার নয়, বরং আত্মশুদ্ধি ও দেশ গড়ার নতুন শপথ নেওয়ার দিন। আল্লাহ-তাআলা আমাদের প্রিয় মাতৃভূমিকে কবুল করুন এবং একে প্রকৃত শান্তির জনপদে পরিণত করুন।

মুক্তিযুদ্ধে ইসলামি মূল্যবোধের প্রভাব

Read full story at source