যুক্তরাষ্ট্র বলছে আলোচনা চলছে, ইরান বলছে ‘না’: কে আসলে সত্য বলছে

· Prothom Alo

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বেশ জোরালো গলায় বলছেন, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে মিলে প্রায় এক মাস আগে তিনি যে যুদ্ধ শুরু করেছিলেন, তা শেষ করতে ইরানের সঙ্গে ‘ফলপ্রসূ’ আলোচনা হয়েছে। কিন্তু ইরানের শীর্ষ কর্মকর্তারা বারবার তাঁর এ দাবি অস্বীকার করেছেন।

Visit bettingx.club for more information.

যুদ্ধের দামামা আর সব পক্ষের প্রচার-প্রচারণার ভিড়ে কার কথা বিশ্বাসযোগ্য, তা বোঝা কঠিন। তবে প্রতিটি পক্ষ আলোচনা এবং সম্ভাব্য যুদ্ধবিরতি থেকে কী পেতে পারে, তার একটি বিশ্লেষণ থেকে পরিস্থিতি সম্পর্কে কিছুটা স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যেতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজার খোলার ঠিক আগমুহূর্তে ট্রাম্প বলেছিলেন, নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ইরানি ‘শীর্ষ’ কর্মকর্তার সঙ্গে ‘খুব ভালো’ আলোচনার পর ‘ঐকমত্যের বড় কিছু জায়গা’ তৈরি হয়েছে। লক্ষণীয় বিষয় হলো, তিনি ইরানকে ইতিবাচক সাড়া দিতে যে পাঁচ দিনের সময়সীমা বেঁধে দিয়েছেন, তা চলতি সপ্তাহের শেয়ারবাজারের লেনদেন শেষ হওয়ার সময়ের সঙ্গে মিলে যায়।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি নেতানিয়াহুর সঙ্গে মিলে ট্রাম্প যে যুদ্ধ শুরু করেছিলেন, তার পরিণাম এবং ইরানের টিকে থাকার ক্ষমতা নিয়ে তিনি সম্ভবত ভুল হিসাব করেছিলেন।

অনেকে এই সময়ের বিষয়টিকে বাঁকা চোখে দেখছেন। বিশেষ করে গত দুই সপ্তাহে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতির কারণে তেলের বাজারে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, তাতে গত সপ্তাহে তেলের দাম ব্যারেলে ১২০ ডলারে উঠেছিল। ট্রাম্পের এই আলোচনার কথা বলার উদ্দেশ্য হতে পারে বাজারকে স্থিতিশীল করা।

একই সঙ্গে, ওয়াশিংটন যদি ইরানি ভূখণ্ডে কোনো ধরনের স্থল অভিযানের সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকে, তবে এই আলোচনার খবরটি মার্কিন সেনাদের সেখানে পৌঁছানোর জন্য বাড়তি কিছু সময়ও দিতে পারে।

(বাঁ থেকে) মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু

ট্রাম্পের উদ্দেশ্য নিয়ে যারা প্রশ্ন তুলছেন, তাঁদের মধ্যে রয়েছেন ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবফ—যাঁকে অনেকে ট্রাম্পের উল্লেখ করা সেই শীর্ষ কর্মকর্তা বলে মনে করছেন। গালিবফ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো আলোচনা হয়নি। আর্থিক ও তেলের বাজার নিয়ন্ত্রণ এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যে চোরাবালিতে আটকে গেছে, তা থেকে বাঁচতেই এই ভুয়া খবর ছড়ানো হচ্ছে।’

যুক্তরাষ্ট্রে এই যুদ্ধ আগে থেকেই অজনপ্রিয় ছিল। এখন সাধারণ মানুষ পেট্রলের দাম ও অর্থনীতির ওপর এর প্রভাব সরাসরি টের পাচ্ছে। সামনেই কংগ্রেস নির্বাচন, যেখানে ট্রাম্পের রিপাবলিকানদের ফল খারাপ হওয়ার বড় আশঙ্কা রয়েছে।

শেয়ারবাজার ও তেলের দামের এই প্রভাব কেবল যুক্তরাষ্ট্র বা ট্রাম্পের জন্যই নয়, ইরানের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। তবে এই যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্র ও বিশ্ব অর্থনীতিকে কতটা ক্ষতিগ্রস্ত করছে, তার ওপর নির্ভর করছে তেহরানের সুবিধা–অসুবিধা।

ইরান চায়, এই যুদ্ধের ফলে যুক্তরাষ্ট্র অর্থনৈতিক সমস্যার মুখে পড়ুক। এর ফলে ভবিষ্যতে ইসরায়েল বা যুক্তরাষ্ট্র তাদের ওপর হামলার আগে অন্তত দুবার ভাববে। ফলে বাজার শান্ত করতে আলোচনাকে গুরুত্ব দেওয়া যেমন যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ, তেমনি আলোচনাকে অস্বীকার করে বাজারকে অস্থির রাখা এবং ট্রাম্প প্রশাসনকে কোনো স্বস্তি না দেওয়াও ইরানের কৌশলের অংশ।

ইসরায়েলের তেল আবিবে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর ধ্বংসাবশেষের পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন এক উদ্ধারকর্মী। ২৪ মার্চ ২০২৬

যুক্তরাষ্ট্রের লাভ কী

আলোচনা নিয়ে দুই পক্ষই যার যার মতো বয়ান দিচ্ছে। তাদের প্রকাশ্য মন্তব্য থেকে আসলে বোঝার উপায় নেই, আড়ালে কোনো আলোচনা হচ্ছে কি না, হলেও তা কোন পর্যায়ে আছে। তবে এসব মন্তব্য এবং পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে বোঝা যাবে, আলোচনা এবং এই মুহূর্তে যুদ্ধ শেষ হলে কার কী লাভ হবে।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি নেতানিয়াহুর সঙ্গে মিলে ট্রাম্প যে যুদ্ধ শুরু করেছিলেন, তার পরিণাম এবং ইরানের টিকে থাকার ক্ষমতা নিয়ে তিনি সম্ভবত ভুল হিসাব করেছিলেন। গত সপ্তাহে তিনি নিজেই স্বীকার করেছেন, ‘তারা (ইরান) যে মধ্যপ্রাচ্যের অন্য দেশগুলোর ওপর এভাবে চড়াও হবে... তা কেউ ভাবেনি।’ এমনকি সেরা বিশেষজ্ঞরাও বিষয়টি বিশ্বাস করেননি বলে তিনি দাবি করেন।

শুরু থেকেই একটি পরিষ্কার যে ইরান তাদের পুরোনো কৌশল বদলেছে। এবার তারা সংযম প্রদর্শনে মোটেও আগ্রহী নয়। নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার স্বার্থে এখন যুদ্ধ দীর্ঘায়িত করে পুরো অঞ্চলে অস্থিরতা জিইয়ে রাখা তেহরানের জন্য লাভজনক হতে পারে।

যদিও মার্কিন গোয়েন্দা কর্মকর্তারা আগেই বারবার এমন সতর্কতা দিয়েছিলেন, কিন্তু ট্রাম্প তা উপেক্ষা করেছিলেন। এখন বাস্তবতা তাঁকে সেই পরিণাম সম্পর্কে সচেতন করেছে, যা তিনি আগে পাত্তা দেননি। তাঁর কিছু মিত্র ও সমর্থক যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার জন্য চাপ দিলেও, ট্রাম্প আগে দেখিয়েছেন, কঠিন পরিস্থিতি থেকে বের হতে তিনি আপস বা চুক্তি করতে পারেন। এ ক্ষেত্রেও তেমন কিছু হওয়া অবাস্তব নয়।

ইতিমধ্যেই তেলের দাম কমাতে ট্রাম্প তাঁর সরকারকে ইরানের কিছু তেলের ওপর সাময়িক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের নির্দেশ দিয়েছেন। ২০১৯ সালের পর এই প্রথম ইরান তাদের তেলের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা সরাতে সক্ষম হলো।

ইরান এটা ভালো করেই বোঝে, উপসাগরীয় অঞ্চল ও হরমুজ প্রণালিতে যুদ্ধ ছড়িয়ে দেওয়ার ফলেই এই ছাড় মিলেছে। কারণ, বিশ্বের মোট তেল ও তরল প্রাকৃতিক গ্যাসের পাঁচ ভাগের এক ভাগ এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ দিয়েই সরবরাহ করা হয়।

যুক্তরাষ্ট্রে এই যুদ্ধ আগে থেকেই অজনপ্রিয় ছিল। এখন সাধারণ মানুষ পেট্রলের দাম ও অর্থনীতির ওপর এর প্রভাব সরাসরি টের পাচ্ছে। সামনেই মধ্যবর্তী নির্বাচন, যেখানে ট্রাম্পের রিপাবলিকানদের ফল খারাপ হওয়ার বড় আশঙ্কা রয়েছে। ফলে ট্রাম্পের সামনে এখন দুটি পথ খোলা। হয়তো এই যুদ্ধ টেনে নিয়ে যাওয়া এবং তার বিশাল অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক মূল্য চোকানো, নয়তো সমালোচনা সহ্য করেও একে নিজের ভাষায় একটি ‘স্বল্পমেয়াদি অভিযান’ হিসেবে শেষ করে দেওয়া।

শীর্ষ নেতৃত্বকে হারানোর পর কারা এখন ইরান চালাচ্ছেন

ইরানের দৃষ্টিভঙ্গি

ট্রাম্প যা-ই চান না কেন, সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা এখন পুরোপুরি তাঁর হাতে নেই। এক বছরের কম সময়ের মধ্যে দ্বিতীয়বার হামলার শিকার হওয়া ইরান এখন কার্যকর সমাধান ছাড়া যুদ্ধ থামাতে খুব একটা আগ্রহী নয় বলে মনে হচ্ছে। তারা চায় এমন এক দেয়াল তুলে দিতে, যাতে ভবিষ্যতে কেউ তাদের ওপর হামলা করার সাহস না পায়।

মার্কিন স্থাপনায় আগে থেকে বার্তা দিয়ে হামলা বা ধাপে ধাপে উত্তেজনার পারদ চড়ানোর দিন এখন শেষ। শুরু থেকেই একটি বিষয় পরিষ্কার, ইরান তাদের পুরোনো কৌশল বদলেছে। এবার তারা সংযম প্রদর্শনে মোটেও আগ্রহী নয়। নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার স্বার্থে এখন যুদ্ধ দীর্ঘায়িত করে পুরো অঞ্চলে অস্থিরতা জিইয়ে রাখা তেহরানের জন্য লাভজনক হতে পারে।

গত সপ্তাহে তেহরানে তেল ডিপোতে বিমান হামলার পর রাতের আকাশ এমন লাল হয়ে উঠেছিল

ইরানের নীতিনির্ধারকদের মনে এমন বিশ্বাসও জন্মাতে পারে, ইসরায়েলের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার মজুত ফুরিয়ে আসছে। ফলে এখন আঘাত হানলে তা আরও কার্যকর হবে। বিশেষ করে ইরানের বর্তমান ক্ষমতায় থাকা নেতারা মনে করছেন, এখনই থেমে গিয়ে ইসরায়েলকে তাদের প্রতিরক্ষা মজুত আবার গড়ে তোলার সুযোগ দেওয়া মোটেও ঠিক হবে না।

ইরানি ড্রোন ঠেকাতে ওড়াতে হচ্ছে যুদ্ধবিমান, ব্যয় সামলাতে খুঁজতে হচ্ছে বিকল্প

তবে মুদ্রার উল্টো পিঠও আছে; ইরান নিজেও চরম ভুগছে। সরকারের তথ্যমতে, দেশজুড়ে দেড় হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছে। অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। দেশটির বিদ্যুৎ–ব্যবস্থা হতে পারে পরবর্তী লক্ষ্যবস্তু। পারস্য উপসাগরীয় প্রতিবেশীদের সঙ্গে সম্পর্কও তলানিতে ঠেকেছে। ইরানের উপর্যুপরি হামলার কারণে এই সংঘাত শেষে সম্পর্ক আগের জায়গায় ফেরা দুষ্কর।

ইরানের উদারপন্থীরা অবশ্য মনে করছেন, পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে। তাঁদের যুক্তি হলো, কিছু ক্ষেত্রে কার্যকর প্রতিরোধ নিশ্চিত করা গেছে এবং এখনই আলোচনার মোক্ষম সময়। যদি ভবিষ্যতে হামলা না করার নিশ্চয়তা বা হরমুজ প্রণালিতে বাড়তি কোনো কর্তৃত্ব পাওয়া যায়, তবে তেহরান হয়তো শেষ পর্যন্ত কোনো চুক্তিতে রাজি হওয়ার কথা ভাবতে পারে।

যুদ্ধ বন্ধে যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েলকে দেওয়া ইরানের শর্তগুলো কী

Read full story at source