এখনই কি সোনা কেনা লাভজনক

· Prothom Alo

দেশের বাজার সোনার দাম বাড়তে বাড়তে প্রতি ভরি তিন লাখ টাকার কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিল। মধ্যপ্রাচ্যের চার সপ্তাহের যুদ্ধের ডামাডোলে সেই দাম কমে আড়াই লাখের নিচে নেমেছে। দাম আরও কমবে, তেমন ইঙ্গিত মিলছে। কারণ, বিশ্ববাজারে গত কয়েক দিনে সোনার দাম বেশ কমে গেছে। আরও কমবে, সেই পূর্বাভাসও রয়েছে।

Visit asg-reflektory.pl for more information.

দেশে গত বৃহস্পতিবার দুই দফায় সোনার দাম ভরিতে ১৫ হাজার ৩৩৮ টাকা কমায় জুয়েলার্স সমিতি। ওই দিন বিশ্ববাজারে প্রতি আউন্স (৩১.১০৩৪৭৬৮ গ্রাম) সোনার দাম ছিল ৪ হাজার ৭৩২ ডলার। পরদিন ৪ হাজার ৫০০ ডলারের নিচে নামলেও দেশে ঈদের ছুটির কারণে দাম সমন্বয় করেনি সমিতি।

আজ সোমবার বেলা একটার দিকে এই প্রতিবেদন লেখার সময় নিউইয়র্ক স্পট মার্কেটে প্রতি আউন্স সোনার দাম ২৭০ ডলার কমে ৪ হাজার ১৫২ ডলারে দাঁড়ায়, যা কিনা গত ১১ ডিসেম্বরের পর সর্বনিম্ন। তার মানে গত শুক্রবার থেকে এখন পর্যন্ত চার দিনে প্রতি আউন্স সোনার দাম কমেছে ৫৮০ ডলার। শুধু ডলারের বিনিময় হার দিয়ে হিসাব করলে প্রতি ভরি ২২ ক্যারেট সোনায় দাম কমার কথা ভরিপ্রতি ২৩-২৪ হাজার টাকা।

বিশ্ববাজারে সোনার দাম কমলেও বাংলাদেশ জুয়েলার্স সমিতি এখনো দাম কমাচ্ছে না, জানতে চাইলে জুয়েলার্স সমিতির সোনার দাম নির্ধারণ কমিটির চেয়ারম্যান দেওয়ান আমিনুল ইসলাম আজ দুপুরে প্রথম আলোকে বলেন, ‘ঈদের ছুটির কারণে আমরা সোনার দাম সমন্বয় করছি না। চলতি সপ্তাহের শেষ দিকে আমরা সমন্বয় করব। বিশ্ববাজারে সোনার দর নিম্নমুখী প্রবণতা থাকলে অবশ্যই দাম কমবে। কারণ, আমরা ব্যবসায়ী ও ক্রেতা উভয়ের স্বার্থই দেখি।’

বিশ্ববাজারে দাম কি আর কমবে
বিশ্ববাজারে সোনার দামে অনেক দিন ধরেই অস্থিরতা চলছে। সাধারণত অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতায় সোনার দাম বাড়ে। যদিও গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের বিরুদ্ধে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধের এই অনিশ্চয়তার সময়েও সোনার বাজারে ভিন্ন চিত্র দেখা যাচ্ছে। সোনার দাম না বেড়ে বরং প্রায় স্থির হয়ে আছে। তবে গত সপ্তাহের শেষ দিকে সোনার দাম পড়তে শুরু করে।

চলতি সপ্তাহে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ নিয়ে উত্তেজনা নতুন মাত্রা পেয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত শনিবার ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ দেওয়া এক পোস্টে লেখেন, ‘ইরান যদি ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে হরমুজ প্রণালি খুলে না দেয়, তবে যুক্তরাষ্ট্র তাদের বিভিন্ন বিদ্যুৎকেন্দ্রে হামলা চালিয়ে সেগুলো গুঁড়িয়ে দেবে। আর শুরু করা হবে সবচেয়ে বড়টি দিয়ে!’ তারপর পাল্টা হুমকি দিয়ে ইরান বলেছে, বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো নিশানা করা হলে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে যুক্ত সব জ্বালানি অবকাঠামোতে পাল্টা হামলা করবে ইরানি সামরিক বাহিনী।

রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে জ্বালানি স্থাপনায় হামলার হুমকি নিয়ে বিনিয়োগকারীরা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন। এশিয়ার শেয়ারবাজারে পতন হয়েছে। অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম প্রতি ব্যারেল ১১০ ডলারের ওপরে অবস্থান করছে।

তেলের দাম বাড়তি থাকায় মূল্যস্ফীতির চাপ তৈরি করছে। সাধারণত মূল্যস্ফীতি বাড়লে সোনা নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে চাহিদা বাড়ে। তবে সুদের হার বেশি থাকলে সুদবিহীন সম্পদ হিসেবে সোনার চাহিদা কমে। মার্কিন ফেডারেল রিজার্ভ চলতি বছর সুদের হার বাড়াতে পারে, এমন সম্ভাবনা অনেক বেশি জোরালো হওয়ায় সোনার দামে বড় পতন হয়েছে।

আন্তর্জাতিক অনলাইন ট্রেডিং ও ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠান কেসিএম ট্রেডের প্রধান বাজার বিশ্লেষক টিম ওয়াটারার রয়টার্সকে বলেন, ‘ইরানকে ঘিরে সংঘাত চতুর্থ সপ্তাহে গড়িয়েছে। তেলের দাম ১০০ ডলারের আশপাশে থাকায় বাজারে প্রত্যাশা বদলেছে। সুদের হার কমার বদলে এখন বাড়তে পারে, এমন আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এতে সোনার আকর্ষণ কমে গেছে। কারণ, এটি সুদবিহীন সম্পদ।’

টিম ওয়াটারার আরও বলেন, ‘এই ঝুঁকিপূর্ণ সময়ে সোনার উচ্চ তারল্য সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। শেয়ারবাজারে দরপতনের কারণে বিনিয়োগকারীরা অন্যান্য সম্পদের মার্জিন কল মেটাতে সোনার বিনিয়োগ বিক্রি করে দিচ্ছেন।’ মার্জিন কল এমন এক পরিস্থিতি, যখন বিনিয়োগকারী ধার করা টাকা দিয়ে শেয়ার বা অন্য সম্পদ কিনে ক্ষতিতে পড়ে, তখন ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠান সংশ্লিষ্ট বিনিয়োগকারীকে অতিরিক্ত অর্থ জমা দিতে বলে।

বিশ্বজুড়ে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর সোনা ক্রয় বৃদ্ধি ও বিনিয়োগকারীদের নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজ—সব মিলিয়ে সোনার দামে অনেক দিন ধরেই ঊর্ধ্বগতি দেখা যাচ্ছে। গত জানুয়ারিতে স্পট মার্কেটে প্রতি আউন্স সোনার দাম ৫ হাজার ৬০০ ডলারের কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিল।

গত জানুয়ারিতে লন্ডন বুলিয়ন মার্কেট অ্যাসোসিয়েশনের (এলএমবিএ) বার্ষিক পূর্বাভাস জরিপে বিশ্লেষকেরা বলছিলেন, চলতি বছর সোনার দাম সর্বোচ্চ প্রতি আউন্স ৭ হাজার ১৫০ ডলার পর্যন্ত উঠতে পারে। গড় দাম হতে পারে ৪ হাজার ৭৪২ ডলার।
গত সপ্তাহে আল-জাজিরার এক প্রতিবেদনে অর্থনীতিবিদ জেমস মিডওয়ে বলেছেন, সোনার দামে বড় পরিবর্তন ঘটতে হলে দুটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, ফেডারেল রিজার্ভ যদি স্পষ্টভাবে জানায় যে মূল্যস্ফীতির চাপ থাকা সত্ত্বেও সুদের হার কমানো হবে। দ্বিতীয়ত, যুদ্ধ কত দিন স্থায়ী হয়—এই ধারণায় পরিবর্তন এলে।

বিনিয়োগ করা কি লাভজনক
বৈশ্বিক বাজারে সোনার দাম কমলে বা বাড়লে দেশেও তার প্রভাব পড়ে। তবে বিশ্ববাজারে এখন দাম কমলেও দেশে পরিবর্তন হচ্ছে না। ঈদের ছুটির কারণ দেখিয়ে দাম সমন্বয় করছে না বাংলাদেশ জুয়েলার্স সমিতি। তবে চলতি সপ্তাহে বিশ্ববাজারে দাম কম বজায় থাকলে তাহলে দেশেও দাম কমবে। সেটি হলে সোনায় বিনিয়োগ লাভজনক হবে বলে জানালেন দুজন জুয়েলারি ব্যবসায়ী।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে জুয়েলারি ব্যবসায়ীরা জানালেন, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে ও ক্ষয়ক্ষতি বাড়তে থাকলে সোনা আবারও বিনিয়োগকারীদের কাছে আকর্ষণীয় হয়ে উঠতে পারে। সে ক্ষেত্রে দাম আবার প্রতি আউন্স ৫ হাজার ডলার ছাড়িয়ে যাবে। এমনকি বছর শেষে ৬ হাজার ডলারেও পৌঁছে যেতে পারে। তবে সোনার দাম হ্রাস-বৃদ্ধিতে একধরনের অনিশ্চয়তা থাকে। সেটি বিবেচনায় রাখতেই হবে।

দেশে গত বছরের জানুয়ারিতে ২২ ক্যারেটে এক ভরি সোনার দাম ছিল প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজার টাকা। চলতি বছরের শুরুতে সেই দাম বেড়ে হয় ২ লাখ ২২ হাজার। গত ২৯ জানুয়ারি দাম বেড়ে দাঁড়ায় ২ লাখ ৮৬ হাজার টাকা। আর এখন বিক্রি হচ্ছে প্রতি ভরি ২ লাখ ৪৬ হাজার ৯২৬ টাকা। তার মানে উত্থান-পতনের পরও এক বছর তিন মাসে আগে কেনা প্রতি ভরি সোনার অলংকারের সম্পদমূল্য ১ লাখ টাকা বেশি।

জানতে চাইলে জুয়েলার্স সমিতির সোনার দাম নির্ধারণ কমিটির চেয়ারম্যান দেওয়ান আমিনুল ইসলাম বলেন, যুদ্ধের কারণে বর্তমানে দাম যে পর্যায়ে নেমেছে, তাতে নিঃসন্দেহে বলা যায়, এখন সোনায় বিনিয়োগ করার উৎকৃষ্ট সময়। বিশ্বের সব মুদ্রার ওপর আস্থা নষ্ট হলেও বিনিময় মাধ্যম হিসেবে সোনা অপ্রতিদ্বন্দ্বী। সোনায় বিনিয়োগ নিরাপদ হিসেবেও প্রমাণিত। যুদ্ধের অস্থিরতা কেটে গেলেই সোনার দাম বাড়বে, এমন পূর্বাভাস দিচ্ছে বিশ্বের বিভিন্ন সংস্থা

Read full story at source