ইরানকে নেতৃত্বশূন্য করার চেষ্টা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের
· Prothom Alo

ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে মিত্রদেশগুলোকে পাচ্ছেন না যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলও শুরু করা যাচ্ছে না। বাড়ছে তেল–গ্যাসের দাম। ইরানের পাল্টা হামলায় মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে হুমকিতে যুক্তরাষ্ট্রের স্থাপনা–নাগরিকেরা। যুদ্ধের তৃতীয় সপ্তাহে এসে এ পরিস্থিতিতে ইরানের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের হত্যা করতে আরও মরিয়া হয়ে উঠেছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল।
Visit solvita.blog for more information.
পরপর দুই রাতে ক্ষেপণাস্ত্র ও বোমা হামলা চালিয়ে ইরানের শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তাসহ অন্তত তিনজন নেতৃস্থানীয় কর্মকর্তাকে হত্যা করা হয়েছে। সর্বশেষ গতকাল বুধবার ইরানের গোয়েন্দাবিষয়ক মন্ত্রী ইসমাইল খতিবকে হত্যার কথা জানায় ইসরায়েল। পরে তেহরানের পক্ষ থেকেও তাঁর মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে।
শীর্ষস্থানীয় নেতাদের হত্যার জবাবে ইসরায়েল ও মধ্যপ্রাচ্যে বিভিন্ন মার্কিন অবস্থানে হামলা জোরদার করেছে ইরান। গতকাল ইসরায়েলে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় দেশটির দুই নাগরিক নিহত হয়েছেন। এ ছাড়া গত কয়েক দিনের মধ্যে বেনগুরিয়ন বিমানবন্দরে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রের ধ্বংসাবশেষ পড়ে তিনটি বেসামরিক উড়োজাহাজ মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। একটি উড়োহাজাজে আগুন ধরে যায় বলে বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ জানায়।
এদিকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের একটি বিমানঘাঁটিতে ইরানের হামলায় সেখানে থাকা অস্ট্রেলিয়ার কিছু স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আমিরাতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, গতকাল ইরান থেকে ১৩টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ২৭টি ড্রোন ছোড়া হয়েছে। কূটনীতিকপাড়া লক্ষ্য করে ছোড়া একাধিক ড্রোন ভূপাতিত করার দাবি করেছে সৌদি আরব। কুয়েত ও কাতার ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোন প্রতিহত করার কথা জানিয়েছে। হামলার সতর্কতামূলক সাইরেনের শব্দ শোনা গেছে বাহরাইনেও। ইরাকে মার্কিন দূতাবাসের কাছেও ইরানের ড্রোন আঘাত হেনেছে।
উপসাগরীয় দেশগুলোয় যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন স্থাপনায় ইরান ও এর সংশ্লিষ্ট গোষ্ঠীগুলোর একের পর এক হামলা ওয়াশিংটনের মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বিশ্বজুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের সব দূতাবাস ও কূটনৈতিক দপ্তরে নিরাপত্তা পরিস্থিতি পর্যালোচনা করার নির্দেশ দিয়েছে দেশটির পররাষ্ট্র দপ্তর।
ইরান দুর্বল হবে না: পররাষ্ট্রমন্ত্রী
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে হামলার শুরুর দিনেই দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে হত্যা করে। ওই দিনের হামলায় ইরানের ৪৮ জন নেতৃস্থানীয় বেসামরিক ও সামরিক কর্মকর্তা নিহত হন বলে পরবর্তী সময়ে দাবি করেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
গতকাল ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ আগের রাতে হামলা চালিয়ে ইরানের গোয়েন্দামন্ত্রী ইসমাইল খতিবকে হত্যার কথা জানান। কাৎজ আরও বলেন, তিনি এবং ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু সামরিক বাহিনীকে যেকোনো জ্যেষ্ঠ ইরানি কর্মকর্তাকে হত্যার অনুমতি দিয়েছেন।
ইরানের গোয়েন্দামন্ত্রীর সঙ্গে মন্ত্রণালয়ের আরও বেশ কয়েকজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাকে হত্যা করা হয়েছে বলে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী জানিয়েছে। এক বিবৃতিতে তারা বলেছে, ইসমাইল খতিবকে হত্যার মধ্য দিয়ে ইরানে এখন পর্যন্ত ‘কয়েক ডজন জ্যেষ্ঠ কমান্ডার’ নিহত হয়েছেন। ইসরায়েলি বাহিনী একে তাদের ‘ধারাবাহিক হত্যাকাণ্ডের’ অংশ হিসেবে বর্ণনা করেছে।
এর আগে গত সোমবার দিবাগত রাতে হামলায় নিহত হন ইরানের জাতীয় নিরাপত্তা পর্ষদের সেক্রেটারি আলী লারিজানি ও ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) অধীন আধা সামরিক বাহিনীর বাসিজের প্রধান গোলামরেজা সোলাইমানি। গতকাল তেহরানে দুজনের জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এতে বেসামরিক ও সামরিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের পাশাপাশি বিপুলসংখ্যক মানুষ অংশ নেন।
আলী লারিজানিআয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হওয়ার পর লারিজানিই যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে ইরানের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন বলে মনে করা হয়। বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়, পশ্চিমের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান থাকা সত্ত্বেও লারিজানিকে ইরানের অভ্যন্তরে প্রায়ই একজন ‘বাস্তববাদী’ হিসেবে অভিহিত করা হতো। তাঁর বিদায়ে পরমাণু কর্মসূচির মতো অমীমাংসিত ইস্যুগুলো এখন এমন এক অজানা উত্তরসূরির হাতে যাচ্ছে, যাঁর সামনে অত্যন্ত নাজুক পরিস্থিতি থাকছে।
তবে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেছেন, শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তাদের হত্যার কারণে ইরান সরকার দুর্বল হবে না। ইসলামি প্রজাতন্ত্রের রাজনৈতিক কাঠামো রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানের শক্তিশালী ভিত্তির ওপর দাঁড়ানো। কোনো ব্যক্তির থাকা বা না থাকা এই কাঠামোকে প্রভাবিত করে না।
শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তাদের হত্যার প্রতিশোধের অংশ হিসেবে মঙ্গলবার দিবাগত রাতে ইসরায়েলে বড় ধরনের হামলা চালিয়েছে ইরান ও দেশটির সমর্থক লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ। ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম হারেৎজ–এর প্রতিবেদনে বলা হয়, ইরান ও হিজবুল্লাহর ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্র, রকেট ও ড্রোন ইসরায়েলের ৩৪টি জায়গায় আঘাত হেনেছে। ইরানের ‘ক্লাস্টার ওয়ারহেড’ ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে মধ্য ইসরায়েলে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। সাময়িক বন্ধ হয়ে যায় রেল যোগাযোগ। একটি ক্ষেপণাস্ত্র রামাত গানের একটি বাড়িতে আঘাত হানলে এক দম্পতি নিহত হন। এ ছাড়া হামলার কারণে নানাভাবে আহত হয়ে ২৪ ঘণ্টায় ১৯২ জন হাসপাতালে চিকিৎসা নেন।
এদিকে গতকাল ইরানের উপকূলীয় সাউথ পার্স প্রাকৃতিক গ্যাসক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল হামলা চালিয়েছে বলে জানিয়েছে ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম। জবাবে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কাতারের জ্বালানি স্থাপনায় হামলা চালানোর হুমকি দিয়েছে তেহরান। অবশ্য ইরানি গ্যাসক্ষেত্রে হামলার নিন্দা জানিয়েছে কাতার।
বৈরুতে ব্যাপক হামলা
ইরানের পাশাপাশি লেবাননে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়ে যাচ্ছে ইসরায়েল। মঙ্গলবার দিবাগত রাতে লেবাননের রাজধানী বৈরুতে একটি ১৫ তলা ভবন গুঁড়িয়ে দিয়েছে ইসরায়েলি বাহিনী। রাতভর বৈরুতের দুটি জেলায় এ হামলায় ১০ জন নিহত হন। আহত হয়েছেন ২৭ জন। নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে হিজবুল্লাহ ঘনিষ্ঠ বেসরকারি আল-মানার টিভির রাজনৈতিক বিভাগের প্রধান মোহাম্মদ শারি ও তাঁর স্ত্রীও রয়েছেন।
ট্রাম্পের ওপর চাপ বাড়ছে
বৈশ্বিক জ্বালানির পাঁচ ভাগের এক ভাগ হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা হয়। যুদ্ধের কারণে ১৯ দিন বন্ধ থাকা বিশ্ববাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথ চালু করতে ন্যাটো ও আরব মিত্রদের সহযোগিতা চেয়েও সাড়া পাননি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এতে জ্বালানি তেলের দাম বাড়তে থাকায় দেশের ভেতর ও বাইরে চাপে পড়েছেন তিনি। হরমুজ প্রণালি সচলে সহায়তা না করে ন্যাটোর সদস্যরা ‘বোকামি’ করছে বলে মন্তব্য করেছেন ট্রাম্প।
স্থানীয় সময় গত মঙ্গলবার ওভাল অফিসে কথা বলার সময় মার্কিন প্রেসিডেন্ট জানান, বেশির ভাগ মিত্রদেশই তাঁকে এই যুদ্ধে জড়াতে অনিচ্ছার কথা জানিয়েছে। তিনি বলেন, ‘ন্যাটোর কাছ থেকে আমাদের কোনো সহায়তার প্রয়োজন নেই, কিন্তু তাদের সেখানে (হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তায়) থাকা উচিত ছিল।’
তবে যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সাবেক চেয়ারম্যান ও ন্যাটোর সাবেক স্থায়ী প্রতিনিধি লর্ড পিটার রিকেটস বিবিসিকে বলেছেন, ট্রাম্প ন্যাটোকে সম্পূর্ণ ভুল চোখে দেখছেন। তাঁর মতে, ন্যাটো একটি প্রতিরক্ষামূলক জোট হিসেবে গঠিত হয়েছিল। তিনি আরও বলেন, ‘(এটি) যুক্তরাষ্ট্রের বেছে নেওয়া একটি যুদ্ধ। এ বিষয়ে আমাদের সঙ্গে কোনো পরামর্শ করা হয়নি। ন্যাটোর চুক্তিতে কখনোই এমন কিছু ছিল না যে আমেরিকা নিজের ইচ্ছেমতো কোনো যুদ্ধে জড়ালে মিত্রদেরও তাকে অনুসরণ করতে হবে।’
ইসরায়েল–যুক্তরাষ্ট্র যৌথ হামলায় নিহত হয়েছেন আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিবিশ্লেষকেরা মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের অব্যাহত হামলার পরও হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখে যুদ্ধে নিজেদের প্রভাব বজায় রেখেছে ইরান। শেষ পর্যন্ত যুদ্ধ বন্ধে যেকোনো দর–কষাকষিতে হরমুজ প্রণালিকে ব্যবহার করতে পারে তেহরান।
ইরান যুদ্ধের বিরুদ্ধে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের প্রশাসনেও বিরোধিতা বাড়ছে। এ যুদ্ধের বিরোধিতায় পদত্যাগ করে দেশটির জাতীয় সন্ত্রাসবাদবিরোধী কেন্দ্রের পরিচালক জো কেন্ট বলেছেন, ‘ইরান আমাদের দেশের জন্য আসন্ন কোনো হুমকি ছিল না। এটা এখন স্পষ্ট যে ইসরায়েল এবং তাদের শক্তিশালী মার্কিন লবির চাপেই আমরা এ যুদ্ধ শুরু করেছি।’ তাঁর পদত্যাগ যুক্তরাষ্ট্রে এ যুদ্ধবিরোধী আলোচনা আরও জোরালো করেছে।
ইরান যুদ্ধ নিয়ে ট্রাম্পের সমালোচনা করেছেন তাঁর দীর্ঘদিনের সমর্থক মিস ক্যালিফোর্নিয়া কেরি প্রিজিন বোলার। সোমবার একটি টেলিভিশন অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, ‘আমি আমাদের প্রেসিডেন্টকে চিনতে পারছি না।’ ইসরায়েলের চাপে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরুর দিকে ইঙ্গিত করে কেরি প্রিজিন বলেন, ‘আমার মনে হয়, আমরা এখন একটি অধিকৃত জাতি। আমি মনে করি, কোনো একটি বিদেশি দেশ আমাদের সরকারকে দখল করে নিয়েছে।’