শরণার্থী: মুক্তিযুদ্ধের উপেক্ষিত চরিত্র
· Prothom Alo

প্রায় ২৭ বছর আগে ১৯৯৯ সালের ২৬ মার্চ স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে প্রকাশিত প্রথম আলোর বিশেষ আয়োজনে নির্মলেন্দু গুণের এই নিবন্ধটি প্রথম ছাপা হয়েছিল। আমাদের বহু মূল্যবান লেখা শুধু মুদ্রণের পাতায় রয়ে গেছে; তেমনি একটি লেখা এই—‘শরণার্থী: মুক্তিযুদ্ধের উপেক্ষিত চরিত্র’।
Visit fish-roadgame.online for more information.
স্বাধীনতা দিবস ও মুক্তিযুদ্ধকে কেন্দ্র করে অনলাইনপূর্ব যুগে যত লেখা, সাক্ষাৎকার, স্মৃতিচারণ ও কবিতা ছাপা হয়েছিল, স্বাধীনতার পুরো মাসজুড়ে সেসব ধুলোঝরা পৃষ্ঠা আমরা প্রথমবারের মতো অনলাইনে তুলে আনছি।
‘শরণার্থী কাল’ শিরোনামে একসময় আমি একটি ধারাবাহিক লেখা লিখতে শুরু করেছিলাম। লেখাটির কয়েকটি কিস্তি দৈনিক সংবাদ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল। একপর্যায়ে সংবাদ থেকে আমার চাকরি চলে যাওয়ার কারণে লেখাটির প্রকাশ বন্ধ হয়ে যায়। এই লেখার বিষয়বস্তু ছিল আমার শরণার্থী জীবনের কিছু অম্লমধুর স্মৃতি। আমাদের মুক্তিযুদ্ধকে কেন্দ্র করে আমাদের লেখককুল অনেক গল্প, উপন্যাস, নাটক ও কবিতা রচনা করেছেন। ওই সব রচনার মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের নানা দিগন্ত প্রকাশিত হয়েছে; কিন্তু শরণার্থীদের নিয়ে খুব একটা লেখা হয়নি। অথচ বাংলাদেশ থেকে পাকিস্তানি সেনা এবং তাদের ‘দোসর’দের তাড়া খেয়ে সাতপুরুষের ভিটামাটির মায়া ত্যাগ করে ভারতের সীমান্তবর্তী রাজ্যগুলোতে আশ্রয় গ্রহণকারী শরণার্থীদের একটি বিরাট ভূমিকা ছিল আমাদের মুক্তিযুদ্ধে। ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা ও আসামের মেঘালয়ে বাংলাদেশ থেকে প্রাণ নিয়ে পালিয়ে যাওয়া মানুষের সংখ্যা প্রায় কোটি ছুঁই ছুঁই করেছিল। তাদের আশ্রয় দেওয়ার জন্য ভারতের বিভিন্ন সীমান্তবর্তী এলাকায় গড়ে উঠেছিল অনেকগুলো শরণার্থীশিবির। শরণার্থীশিবির ব্যাপারটা মানে কী—এটা কেমন হয়, সেখানে মানুষ কীভাবে থাকে, কীভাবে খায়, কীভাবে নিদ্রা যায়, কীভাবে তাদের প্রাত্যহিক প্রাকৃতিক কর্ম সম্পাদন করে—প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা না থাকলে তা বোঝানো কঠিন। আমি আমার বিপন্ন পরিবারকে নিয়ে মেঘালয় সীমান্তবর্তী দুটি শরণার্থীশিবিরে মাস দুয়েক কাটিয়েছি।
আমাদের মুক্তিযুদ্ধকে কেন্দ্র করে আমাদের লেখককুল অনেক গল্প, উপন্যাস, নাটক ও কবিতা রচনা করেছেন। ওই সব রচনার মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের নানা দিগন্ত প্রকাশিত হয়েছে; কিন্তু শরণার্থীদের নিয়ে খুব একটা লেখা হয়নি।
১৯৭১ সালে মার্কিন কবি অ্যালেন গিনসবার্গ পশ্চিমবঙ্গের বনগাঁ সীমান্তে অবস্থিত কয়েকটি শরণার্থীশিবির পরিদর্শন করে ‘সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড’ কবিতাটি রচনা করেছিলেন। ওই কবিতার সঙ্গে যাঁদের পরিচয় আছে, তাঁরা জানেন তৎকালীন শরণার্থীশিবিরগুলোতে লাখ লাখ মানুষ কী দুর্বিষহ কাল কাটিয়েছে। রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে, নানারকম অসুখবিসুখে ধুঁকে ধুঁকে কত শিশু-বৃদ্ধ, নর–নারী তাঁদের জীবন বিসর্জন দিয়েছেন। যাঁরা ১৯৭১ সালের শরণার্থীদের দুর্বিষহ জীবন সম্পর্কে ধারণা পেতে আগ্রহী, তাঁদের গিনসবার্গের কবিতাটি পাঠ করা প্রয়োজন। কবিতাটির একটি চমৎকার বাংলা ভাষান্তর করে গেছেন অকালপ্রয়াত কবি খান মোহাম্মদ ফারাবি। আমার লেখা গিনসবার্গের সঙ্গে বইতে ওই কবিতা পাওয়া যাবে।
১৯৭১ সালে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের প্রিয় সহযোগী বন্ধুরাষ্ট্র ভারত যে আমেরিকা ও চীনের ভ্রুকুটি উপেক্ষা করে, ঝুঁকি নিয়ে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান চালানোর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছিল, ওই সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করেছিল প্রবাসী সরকারের কূটনৈতিক তৎপরতা বা গণতন্ত্রের প্রতি তৎকালীন ভারতীয় শাসকদের অঙ্গীকার যতটা নয়, তার চেয়ে বেশি শরণার্থীর চাপ।
নির্মলেন্দু গুণআগে যে প্রায় এক কোটি শরণার্থীর কথা বলা হয়েছে, তার মধ্যে শতকরা ৮০ থেকে ৮৫ ভাগই ছিল সনাতন ধর্মাবলম্বী, যারা লিয়াকত-নেহরু চুক্তি অনুযায়ী ভারতের ন্যাচারাল সিটিজেনে পরিণত হওয়ার হুমকি সৃষ্টি করেছিল ভারত শাসকদের সামনে। ‘মুজিব-ইন্দিরা’ চুক্তি স্বাক্ষরের আগপর্যন্ত লিয়াকত-নেহরু চুক্তিটির কার্যকারিতাই বলবৎ ছিল। ফলে অল্প সময়ের মধ্যে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত না হলে বিধর্মীশূন্য পূর্ব পাকিস্তান বানানোর পাকিস্তানি অপচেষ্টা যেমন পুরোপুরি সফল হতো, তেমনি শরণার্থীশিবিরে আশ্রিত সনাতন ধমে৴র ৬০ থেকে ৭০ লাখ মানুষ দ্রুতই ভারতের নাগরিক হতে শুরু করত। শরণার্থীশিবিরগুলোতে আশ্রয় নেওয়া মুসলমানদের মধ্যে তখন পূর্ব পাকিস্তানে ফিরে যাওয়ার প্রবণতাই বৃদ্ধি পেত।
মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী ব্যক্তিদের মধ্যে ক্রমে একটি হতাশার ভাব যে চলে আসছিল, তা আমি আমার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা থেকেই সত্য বলে জানি। খন্দকার মোশতাকের নেতৃত্বে একদল আওয়ামী লীগার যে ভারতীয় দাদাদের ‘ধীরে চলো’ নীতিতে বীতশ্রদ্ধ হয়ে পাকিস্তানের সঙ্গে একটি লুজ কনফেডারেশন গঠন করার প্রয়াস চালিয়েছিলেন, তা ছিল ওই হতাশারই বহিঃপ্রকাশ। আওয়ামী লীগের এমএনএ ময়মনসিংহের সৈয়দ আবদুস সুলতান কলকাতার থিয়েটার রোডের প্রবাসী সরকারের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে বসেই একদিন বাংলাদেশের ছাত্রসমাজকে দায়ী করে বলেছিলেন, তাঁদের আজকের এই দুরবস্থার জন্য ছাত্ররাই দায়ী। তারাই নাকি শেখ সাহেবের ওপর ক্রমাগত চাপ সৃষ্টি করে তাঁকে স্বাধীনতার ঘোষণা দিতে বাধ্য করেছে। যত দূর মনে পড়ে, সময়টা ছিল নভেম্বর মাসের কোনো এক দুপুরবেলা। ভাবতে অবাক লাগে, ওই সৈয়দ আবদুস সুলতান অল্প দিনের ব্যবধানে ইংল্যান্ডে স্বাধীন বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূতের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ পদ অলংকৃত করেন। ডিসেম্বরের মধ্যে দেশ স্বাধীন হওয়ার আলামত দেখতে না পেলে তিনি কলকাতা থেকে ঢাকায় পালিয়ে চলে আসতেন বলেই আমার ধারণা। তাঁর সঙ্গে কথা বলে, তর্ক করে, এমন ধারণাই আমার সেদিন হয়েছিল। যত দিন যেত, সৈয়দ আবদুস সুলতানের সংখ্যা ততই বৃদ্ধি পেত।
১৯৭১ সালের প্রত্যেক শরণার্থীই ছিল একেকজন মুক্তিযোদ্ধা। তারা অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করেনি; কিন্তু বিশ্বজনমত গঠন করতে সহযোগিতা করেছে, ভারতকে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সম্মুখসমরে মুক্তিবাহিনীর সহযোগী হতে বাধ্য করেছে।
পূর্ব পাকিস্তানে অবরুদ্ধ পাকিস্তানি বাহিনীর ওপর থেকে সামরিক চাপ হ্রাস করার লক্ষ্য সামনে নিয়ে পাকিস্তানি সামরিক জান্তা ডিসেম্বরের ৩ তারিখে নির্বোধের মতো পশ্চিম সীমান্তে ভারতকে আক্রমণ করে যদি ভারতের ফাঁদে পা না দিত, তাহলে ১৬ ডিসেম্বর যে যুদ্ধের নিষ্পত্তি হয়েছিল, তার সূচনা ঘটানোটাও ভারতের জন্য এত সহজে হতো না।
বাংলাদেশের প্রায় এক কোটি শরণার্থীকে স্বদেশে ফেরত পাঠানো এবং ১৯৭০ সালের নির্বাচনে বিজয়ী আওয়ামী লীগকে বাংলাদেশের রাষ্ট্রক্ষমতা দখলে সহায়তা দেওয়াটা সমার্থক বিবেচিত হয়েছিল বলেই ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধের সহযোগী হিসেবে আমরা ভারতকে যুদ্ধের মাঠে পেয়েছিলাম—এই বাস্তব সত্যটি আমরা যেন উপলব্ধি করতে ভুলে না যাই।
আমি মনে করি, ১৯৭১ সালের প্রত্যেক শরণার্থীই ছিল একেকজন মুক্তিযোদ্ধা। তারা অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করেনি; কিন্তু বিশ্বজনমত গঠন করতে সহযোগিতা করেছে, ভারতকে পাকিস্তানি সামরিক জান্তা ও তাদের দোসরদের বিরুদ্ধে সম্মুখসমরে মুক্তিবাহিনীর সহযোগী হতে বাধ্য করেছে।