তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা কেমন হবে, তা নির্ভর করবে আরও দুটি বিষয়ের ওপর: বদিউল আলম মজুমদার

· Prothom Alo

তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থাকে শেষ পর্যন্ত কীভাবে দেখা যাবে, তা আরও দুটি বিষয়ের ওপর নির্ভর করবে বলে মনে করেন সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) প্রধান নির্বাহী বদিউল আলম মজুমদার। রাজধানীর মতিঝিলে অবস্থিত চেম্বার ভবনে (ড. কামাল হোসেন অ্যান্ড অ্যাসোসিয়েটস) আজ মঙ্গলবার দুপুরে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ কথা বলেন তিনি।

বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ‘ত্রয়োদশ সংশোধনী অনুযায়ী সর্বশেষ প্রধান বিচারপতি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হবেন—এটা রিভাইভ (পুনরুজ্জীবিত) হয়েছে ত্রয়োদশ সংশোধনী মামলার রায়ে। তবে শেষ পর্যন্ত তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা কীভাবে আমরা দেখব, তা নির্ভর করবে আরও দুটি বিষয়ের ওপরে। একটা হলো পঞ্চদশ সংশোধনী মামলায় কী রায় হয়, কী পর্যবেক্ষণ দেন। একই সঙ্গে জুলাই সনদ যেটি স্বাক্ষরিত হয়েছে এবং যেটি গণভোটে পাস হয়েছে ৪৮টি বিষয়, তার ওপরে। এটা কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ।…এটা আলটিমেটলি গণভোটের মাধ্যমে যে সংবিধান সংস্কার পরিষদ হওয়ার কথা তার মাধ্যমে এবং পঞ্চদশ সংশোধনী নিয়ে কী পর্যবেক্ষণ আসে তার ওপর নির্ভর করবে।’

Visit fish-roadgame.com for more information.

ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার বিধান সংবিধানে যুক্ত হয়। এ নিয়ে রিটের পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্টের রায়ের পর ২০১১ সালের ১০ মে আপিল বিভাগ রায় দেন। তৎকালীন প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হকের নেতৃত্বাধীন সাত সদস্যের আপিল বিভাগ সংখ্যাগরিষ্ঠ মতামতের ভিত্তিতে (৪: ৩) ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিল করে রায় দেন। এই রায়কে কেন্দ্র করে বদিউল আলম মজুমদারসহ পাঁচ বিশিষ্ট ব্যক্তি, বিএনপিসহ অন্যরা পৃথক পুনর্বিবেচনার আবেদন এবং পরে পৃথক আপিল করে।

এসব আবেদনের ওপর গত বছরের ২০ নভেম্বর রায় দেন আপিল বিভাগ। সর্বসম্মতিতে দেওয়া এই রায়ে আগের রায়টি (২০১১ সালের রায়) সম্পূর্ণরূপে বাতিল করা হয়।

পাশাপাশি তত্ত্বাবধায়ক সরকার সম্পর্কিত বিধানাবলি এ রায়ের মাধ্যমে পুনরুজ্জীবিত করা হয়। উল্লিখিত নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারসংক্রান্ত বিধানাবলি কেবল ভবিষ্যৎ প্রয়োগযোগ্যতার ভিত্তিতে কার্যকর হবে বলে রায়ে উল্লেখ করা হয়। ৭৪ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায়টি ১২ মার্চ সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়।

এ প্রেক্ষাপটে ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকার–সংক্রান্ত আপিল বিভাগের রায়, সংবিধান সংস্কার ও সংস্কার পরিষদ’ বিষয়ে ওই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। বদিউল আলম মজুমদারসহ পাঁচ বিশিষ্ট ব্যক্তির জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ড. শরীফ ভুঁইয়া ও আইনজীবী কারিশমা জাহান সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন।

আপিল বিভাগের সর্বশেষ রায় ঐতিহাসিক উল্লেখ করে জ্যেষ্ঠ আইনজীবী শরীফ ভূঁইয়া বলেন, ‘রায়ে আমরা খুবই সন্তুষ্ট। এটা দেশের জন্য ঐতিহাসিক। কারণ, এই ব্যবস্থাটা (তত্ত্বাবধায়ক) আমাদের গণতন্ত্রের জন্য অপরিহার্য। সুপ্রিম কোর্টের যে ভুল (২০১১ সালের রায়ে ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিল) ছিল সেটা সংশোধন করা হয়েছে। কাজেই জাতির যে দুঃখবোধ সুপ্রিম কোর্টের ব্যাপারে থাকতে পারে, সেটা তাঁরা সংশোধন করেছেন।’

এক প্রশ্নের জবাবে আইনজীবী শরীফ ভূঁইয়া বলেন, ব্যবস্থায় যদি কোনো সমস্যা থেকে থাকে, সেই সমস্যর সমাধান দেওয়া সংসদের বা নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কাজ, আদালতের কাজ নয়।…এখন যেহেতু জুলাই সনদ হয়েছে, ওখানে কিন্তু তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থাকে একটু ঢেলে সাজানোর কথা আছে। কাজেই জুলাই সনদের বিষয়গুলো যদি বাস্তবায়িত হয়, তাহলে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থাটা একটা ভিন্ন রূপ পাবে এবং আদালতও রায়ে এটার জন্য সুযোগ খোলা রেখেছেন। তবে এই ব্যবস্থাকে আরও ঢেলে যদি সাজাতে হয়, জনগণের কল্যাণে ও গণতন্ত্রের প্রয়োজনে সেটা সংসদ করতে পারে। সেটা করতে সংসদের কোনো বাধা নেই।

চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হবে সংসদে

সরকারি দল সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেয়নি, এ নিয়ে তর্কবিতর্ক চলছে, ফলে জুলাই সনদের আলোকে তত্ত্ববাধায়ক সরকারব্যবস্থা—এমন প্রশ্নের জবাবে বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ‘এটা দেখার বিষয়। সবাইকে অপেক্ষা করতে হবে। আশা করি, আমাদের রাজনীতিবিদেরা অতীত থেকে শিক্ষা গ্রহণ করবেন। অতীতের ভুলগুলোর পুনরাবৃত্তি হবে না।’

জুলাই জাতীয় সনদে উল্লিখিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা–সংক্রান্ত প্রস্তাবের ১৬(৩) অংশটুকু পড়ে শোনান বদিউল আলম মজুমদার। সংকট থেকেই গেল কি না—এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘যে অংশটুকু পড়েছি তাতে নোট অব ডিসেন্ট নেই। আশা করি যে আমাদের রাজনীতিবিদেরা প্রজ্ঞার পরিচয় দেবেন এবং সাহসিকতার পরিচয় দেবেন, অতীত থেকে শিক্ষা গ্রহণ করবেন। যে বিষয়টা জনরায়ের মাধ্যমে চূড়ান্ত হয়ে গিয়েছে সেটা নিয়ে আমরা বিতণ্ডা না করি, সেটা নিয়ে আরও জটিলতা সৃষ্টি না করি। এটা আমাদের কারও জন্যই কল্যাণ বয়ে আনবে না।’

বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ‘এটা (তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা) কীভাবে আসবে, তার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হবে সংসদে। আশা করি, সংবিধান সংস্কার পরিষদে। এই সিদ্ধান্তের ব্যাপারে জনগণ তাদের রায় (গণভোটে) দিয়েছে। আশা করি, এখানে (জুলাই জাতীয় সনদ) যে পদ্ধতিটা বিস্তৃতভাবে বলা আছে, সেই পদ্ধতিতে এটা চূড়ান্ত হবে। সেটাই আমাদের আকাঙ্ক্ষা।’

ঐকমত্য কমিশনে বিএনপি গণভোটের রায় মানার কথাই বলেছিল

সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন নিয়ে টানাপোড়েন, এ ক্ষেত্রে সমাধান ও আপনার পরামর্শ কী—এমন প্রশ্নে বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ‘সমাধান হলো জনগণ সকল ক্ষমতার মালিক। জনগণ যখন তাদের রায় দেয়, তখন সেটাই শেষ কথা হওয়া উচিত। গণভোটে ৪৮টি বিষয় জনগণের সামনে উপস্থাপন করা হয়েছে। জনগণ “হ্যাঁ”–এর পক্ষে রায় দিয়েছে। অতএব জনগণ যখন সিদ্ধান্ত নেয়, সেটাই শেষ কথা। আশা করি, সংশ্লিষ্ট সকলেই এটাই মেনে নিয়ে যেভাবে জনগণ রায় দিয়েছে, সেভাবেই সংবিধান সংশোধন করবে।’

গণভোটের ফলাফলের ভবিষ্যতে আসলে কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে—এ প্রশ্নে বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ‘এখন আমাদের এটা দেখার বিষয়। আমরা আশা করি যে তারা জনগণের রায়ের প্রতি, যখন ঐকমত্য কমিশনে ছিলাম বিএনপির পক্ষ থেকে যাঁরা সেখানে প্রতিনিধিত্ব করেছেন, তাঁরা যে বক্তব্য দিয়েছেন তাঁরা কিন্তু গণভোটের রায় মানার কথাই বলেছিলেন সেখানে। আশা করি জনগণের রায় মেনে নিয়ে দরকার হলে আলাপ–আলোচনা করে সরকারি দল, বিরোধী দল আলাপ–আলোচনা করে জনগণের রায়কে সমুন্নত রাখবে—এটাই সমাধান।’

Read full story at source