লিনো

· Prothom Alo

১৩ নভেম্বর

আজকের তারিখটা অশুভ। কিন্তু আমার জন্য বোধ হয় শুভ। কারণ, সকালে উঠতেই নতুন একটা কাজ হাতে পেয়েছি। একটা কুরিয়ার এসেছে, টবসহ চারাগাছ। এর ট্যাক্সোনোমি বের করে দিতে হবে। এটা ঠিক আমার পেশা নয়, নেশা। সময়টা কেটে যায়। কিছু টাকা আসে এ থেকে। অবশ্য টাকার জন্য যে এ কাজ করি, তা-ও নয়। ওই যে বললাম, পেশা নয় নেশা। যা পেনশন পাই, তা দিয়ে আমি একলা মানুষ, ভালোভাবেই চলে যায়। তা ছাড়া আমার মেয়ে এখন নরওয়ের অসলো বিশ্ববিদ্যালয়ে নৃবিজ্ঞানের প্রভাষক। আমি নিষেধ করা সত্ত্বেও সে মাসে মাসে টাকা পাঠায়। যাহোক, উদ্ভিদের মরফলজিক্যাল ট্যাক্সোনমি বের করতে আমার কখনোই ঘণ্টাখানেকের বেশি সময় লাগে না, তা-ও যদি বেশ দুষ্প্রাপ্য জাতের উদ্ভিদ হয়, তবেই। কিন্তু আজ সারা দিন চেষ্টা করেও চারাটা যে কিসের তা উদ্ধার করতে পারলাম না। যদিও আজকাল জিনোম সিকোয়েন্সিং এবং জিনোমিক লাইব্রেরির বরাতে ট্যাক্সোনমি নির্ণয় করার কাজটি অনেক সহজ আর যান্ত্রিক হয়ে গেছে। তবু যখন এমন কোনো জীব পাওয়া যায়, যেটা এত দুষ্প্রাপ্য যে তার জিনোম কিংবা বিবর্তনগতভাবে তার কাছাকাছি কোনো জীবের জিনোম লাইব্রেরি ডেটাবেইজে পাওয়া যায় না, তখন মরফলজিই ভরসা! সারা পৃথিবীতে গুটিকয় মরফলজিক্যাল ট্যাক্সোনমিস্ট এখনো এর চর্চা করেন। আমি তাঁদের একজন। আমরাই বোধ হয় এখন দুর্লভ প্রজাতিতে পরিণত হয়েছি! যাহোক, আশা করছি কাল নাগাদ সমস্যার সমাধান করে ফেলব। আর কিছু না–হোক, অনেক দিন পর মস্তিষ্কের একটা ভালো ব্যায়াম হলো। এখন বেশ ক্লান্ত লাগছে।

Visit catcrossgame.com for more information.

১৪ নভেম্বর

একটা অদ্ভুত ব্যাপার লক্ষ্য করলাম আজ। গাছটিতে একটা ফুল ফুটেছে। দেখে তো এটাকে চারাগাছই মনে হচ্ছে। কিন্তু চারাগাছে রাতারাতি ফুল ফোটার ব্যাপারটা ঠিক মেলানো যাচ্ছে না! গতকাল তো একটা কুঁড়ি পর্যন্ত দেখিনি। আর আজ ফুল, তা–ও সম্পূর্ণ প্রস্ফুটিত! এসবের চেয়েও যে জিনিসটা বরং বেশি আশ্চর্যের সেটা হলো, ফুলের রং। ফুলের আসলে কোনো রং-ই নেই। রং নেই বলতে সাদা নয়, স্বচ্ছ। স্বচ্ছ ফুল দেখা তো দূরে থাক, ভার্সিটিতে এত দিন বোটানি পড়ালাম, গবেষণা করলাম, গবেষণা সুপারভাইজ করলাম, কোনো দিন শুনিনি পর্যন্ত। ইন্টারনেট ঘেঁটে লাভ হলো না। ফুলটার এপাশ থেকে ওপাশে পরিষ্কার দেখা যায়। যেন কাচের ফুল। এটা যদি নতুন কোনো প্রজাতি হয়, তাহলে মারাত্মক ব্যাপার হবে। কিছুদিন আরও পর্যবেক্ষণ করে দেখি। তারপর অন্য অধ্যাপকদের সঙ্গে আলাপ করা যেতে পারে। আচ্ছা, ফুলটা ছিঁড়ে কোনো ল্যাবে পাঠালে কেমন হয়? না, থাক। আরেকটু অপেক্ষা করি। আজ রাতের ঘুমটা গেল বোধ হয়। কাল থেকে রীতিমতো পরীক্ষা-নিরীক্ষায় লেগে পড়তে হবে।

নীরব ঘাতক
ইন্টারনেট ঘেঁটে লাভ হলো না। ফুলটার এপাশ থেকে ওপাশে পরিষ্কার দেখা যায়। যেন কাচের ফুল। এটা যদি নতুন কোনো প্রজাতি হয়, তাহলে মারাত্মক ব্যাপার হবে।

১৯ নভেম্বর

গাছটাকে নিয়ে পরীক্ষার কাজে ব্যস্ত থাকায় এই কয়দিন ডায়েরি নিয়ে বসা হয়নি। যা বুঝলাম, তাতে আমার সন্দেহ হচ্ছে আদৌ কিছু বুঝতে পেরেছি কি না! শুধু মরফলজি দিয়ে এর সমাধান করা যাবে বলে মনে হচ্ছে না। তাই ফিজিওলজি–সংক্রান্ত কিছু পরীক্ষা করেছি। বিশেষ করে ট্রপিজম নিয়ে কিছু অদ্ভুত ফল পেলাম। গাছটার ফটোট্রপিজম নেই। আলোর দিকে যায় না। খুবই সূক্ষ্ম যন্ত্র দিয়ে মেপেছি, তা–ও কিছু পাইনি। এ আবার কেমন গাছ? পাতা তো সবুজই দেখা যায়। হাইড্রো, কেমো আর থিগমো ট্রপিজমও নেই। রহস্যজনক। বড়ই রহস্যজনক। জিওট্রপিজম আছে কি না দেখা দরকার। যত দূর মনে হয়, গাছটা যেন থাকার দরকার তাই মাটিতে গেঁথে আছে। কেমন একটা দায়সারা ভাব! গাছটার কি সালোকসংশ্লেষণ করার ক্ষমতা আছে? যদি থাকে, তাহলে ফটোট্রপিজম নেই কেন? আর যদি না থাকে, তাহলে এটি প্রয়োজনীয় শক্তি পায় কোথা থেকে? পোকামাকড় খায় নাকি? ভেনাস ফ্লাইট্র্যাপের মতো? কিন্তু তাহলে পোকা ধরে কী দিয়ে? পোকা খেলেও তো শুধু এ দিয়ে পুষ্টি পূর্ণ হওয়ার কথা নয়।

২০ নভেম্বর

জিওট্রপিজমের পরীক্ষাটা আর করতে হলো না। সকালে উঠে দেখি, গাছটা টব ছেড়ে রেলিংয়ে উঠে এসেছে। একটা আঁকশি পাকিয়ে ধরে রেখেছে সেই রেলিংটা, যার ওপাশে সারি সারি টবে চারাগাছ রাখা। এটা আবার কী ধরনের ট্রপিজম? লাউগাছ যে মাচা বেয়ে ওঠে, সেটাকে বলে থিগমোট্রপিজম, কিন্তু লাউগাছের গোড়াটা তো মাটিতেই গাঁথা থাকে। এই গাছ তো দেখি মাটির মায়া পুরোপুরি ত্যাগ করে লাফ দিয়ে রেলিংয়ে চড়ে বসেছে। চোর-টোর নয় তো? কিন্তু চোর কেন একটা গাছ টব থেকে উপড়ে ফেলে পাশেই রেলিংয়ে পেঁচিয়ে রাখবে? নাকি চোখের ভুল? স্বপ্ন? নাকি বাস্তব?

পেশেন্ট জিরো
জিওট্রপিজমের পরীক্ষাটা আর করতে হলো না। সকালে উঠে দেখি, গাছটা টব ছেড়ে রেলিংয়ে উঠে এসেছে। একটা আঁকশি পাকিয়ে ধরে রেখেছে সেই রেলিংটা, যার ওপাশে সারি সারি টবে চারাগাছ রাখা।

জিওট্রপিজম যে একেবারেই নেই তা বোঝা গেল, কিন্তু তার বদলে যা হলো তার ব্যাখ্যা কী? হঠাৎ মনে হলো, গাছটা নড়ছে। না, বাতাসে নয়। নিজে নিজেই। রেলিং পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে বাঁ থেকে ডানে সরছে গাছটা। হতবুদ্ধি হয়ে তাকিয়ে রইলাম গাছটার দিকে। রেলিংয়ের এক প্রান্ত দেয়ালে লাগানো। গাছটা সেই প্রান্তে পৌঁছে গেল। তারপর যা করল, তা আমি নিজের চোখে না দেখলে কখনোই বিশ্বাস করতাম না। দুটো ডাল এগিয়ে গেল। রেলিংয়ের সংলগ্ন দেয়ালের সুইচ বোর্ডে একটা প্লাগ-পয়েন্টের দুই ছিদ্রপথে ঢুকে গেল ডাল দুটো। আরেকটা ডাল এগিয়ে গেল। সেটা অন করে দিল প্লাগ-পয়েন্টের সুইচ। বুঝলাম গাছটা তার প্রয়োজনীয় শক্তি কোত্থেকে পায়। এই আচরণকে কী বলা যায়? ইলেকট্রোট্রপিজম?

আমার গায়ের লোম দাঁড়িয়ে গেছে। দৌড়ে যে পালাব, তার শক্তিও দুই পায়ে অবশিষ্ট নেই। কিছুক্ষণ ‘রিচার্জ’ করে গাছটা রেলিং বেয়ে চুপচাপ তার টবে গিয়ে বসল। যেন অত্যন্ত স্বাভাবিক ঘটনা, এমন ভঙ্গিতে আমার দিকে ‘তাকিয়ে’ রইল গাছটা। গাছের কি চোখ আছে যে তাকাবে? কিন্তু আমার মনে হলো, গাছটা বুঝি একদৃষ্টে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। ঠিক করলাম, এখনই এটা নিয়ে কাউকে কিছু বলতে যাব না, আগে চিকিৎসকের কাছে যাব। আমার ইনসমনিয়া আছে। গত কদিনে সমস্যাটা বেড়েছে। ঘুম একেবারেই হচ্ছে না। এই পুরো ঘটনা যে আমার মস্তিষ্কের কারসাজি নয়, সেটা আগে নিশ্চিত হতে হবে।

কীটনাশক
হতবুদ্ধি হয়ে তাকিয়ে রইলাম গাছটার দিকে। রেলিংয়ের এক প্রান্ত দেয়ালে লাগানো। গাছটা সেই প্রান্তে পৌঁছে গেল। তারপর যা করল, তা আমি নিজের চোখে না দেখলে কখনোই বিশ্বাস করতাম না।

২১ নভেম্বর

দুটি বিষয় আজ জানা গেল। এক, গাছটার বিদ্যুৎ খাওয়ার ব্যাপারটা আসলেই ঘটছে। আজও ওটা একই কাজ করেছে। আমি প্রস্তুত ছিলাম। ভিডিও করেছি। এবং দুই, গাছটা স্পর্শ করলে শক লাগে না, এমনকি যখন সেটা বিদ্যুতের লাইনে যুক্ত থাকে, তখনো নয়। মনে হচ্ছে খুব শিগগিরই আমি বিখ্যাত হয়ে যাব। তবে এখনই গাছটা সম্পর্কে কাউকে জানাব না। পাবলিশ করার আগে আরও কিছু ডেটা সংগ্রহ করতে হবে। আজ আমার মেয়ে ফোন করেছিল। তাকেও বলিনি।

২২ নভেম্বর

আজ ঠিক করলাম, গাছটার কোনো বুদ্ধিমত্তা আছে কি না, পরীক্ষা করব। এর আগে গাছটা যে আচরণ করেছে, তা আপাতদৃষ্টিতে বুদ্ধিদীপ্ত মনে হলেও আসলে তেমন বুদ্ধিমান সে না-ও হতে পারে। যেমন মৌমাছির দিকনির্দেশক বিশেষ নাচ কিংবা বাবুই পাখির বাসা অথবা মাকড়সার জাল থেকে শুরু করে পিঁপড়ার কলোনি—এগুলো থেকে ওই প্রাণীদের প্রকৃত অর্থে বুদ্ধিমান বলা চলে না। তারা স্রেফ প্রবৃত্তির বশে ওই রকম করে। এ সবই প্রাকৃতিক নির্বাচনের অন্ধ উদ্দেশ্যহীন প্রক্রিয়ায় উদ্ভূত আপাত বুদ্ধিমত্তার নিদর্শন। তাই গাছটার বুদ্ধি পরীক্ষার দরকার আছে। সঙ্গে নিয়েছি একটা সাধারণ পাজল, যেটা দিয়ে শিম্পাঞ্জির বুদ্ধি পরীক্ষা করা হয়। পাভলভীয় কন্ডিশনিংয়ের নিয়মে বেশ সাদামাটা এই পরীক্ষায় গাছটা যদি পাজলটা সমাধান করতে পারে, তাহলে প্রতিটা সঠিক ধাপের জন্য একটু করে বিদ্যুৎ খেতে দেব। এই হলো আমার পরিকল্পনা।

ডেটা মহামারি
গাছটা স্পর্শ করলে শক লাগে না, এমনকি যখন সেটা বিদ্যুতের লাইনে যুক্ত থাকে, তখনো নয়। মনে হচ্ছে খুব শিগগিরই আমি বিখ্যাত হয়ে যাব। তবে এখনই গাছটা সম্পর্কে কাউকে জানাব না।

কিন্তু গাছটা তার ডালপালা দিয়ে পাজলটা কিছু নাড়াচাড়া করে রেখে দিল। হয় পারছে না, নয়তো আগ্রহ নেই। তাই বলা যায়, আমার পরীক্ষা আপাতত ভেস্তে গেল। পরে আবার অন্য কোনোভাবে চেষ্টা করতে হবে। হঠাৎ মনে হলো, গাছটার একটা নাম দেওয়া দরকার। নতুন প্রজাতি হলে নতুন নাম চাই। শুধু নতুন প্রজাতি নয়, হয়তো এটা একটা নতুন ফাইলাম বা পর্ব। ফাইলামের নাম কী দেওয়া যায়? ইলেক্ট্রা? নাকি ইলেক্ট্রোফায়? ধুর, জুতসই হচ্ছে না। হঠাৎ আমার মাথার ভেতর কে যেন বলে উঠল, ‘লিনো’। চারপাশে তাকালাম। কেউ নেই। কে কথা বলল তাহলে? গাছটা? ‘আমার নাম লিনো,’ আবার শুনলাম সেই একই স্বর। তাহলে কি গাছটাই কথা বলছে, টেলিপ্যাথির মাধ্যমে!

এ রকম একটা প্রবন্ধ পড়েছিলাম বেশ কিছুদিন আগে, যদিও বিজ্ঞান জার্নালে নয়, ম্যাগাজিনে। নাকি স্রেফ আমার হ্যালুসিনেশন? ব্যাপারটা পরীক্ষার জন্য মনে মনে ভাবলাম, ‘লিনো তুমি রেলিংয়ে ওঠো।’ গাছটা তখন রেলিংয়ে চড়ে বসল। আবার ভাবলাম, ‘এবার টবে ফিরে এসো।’ গাছটা তাই করল। আমার বিখ্যাত হওয়া ঠেকায় কে! মনে মনে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘কে তুমি? কোথা থেকে এসেছ?’ লিনো কোনো উত্তর দিল না। আবার জিজ্ঞাসা করলাম। এবার মনে মনে নয়, শব্দ করে। এবারও কোনো উত্তর নেই। তাহলে কি সবটাই আমার মনের ভুল? তখন মনে পড়ল, আজ আমি আবার চিকিৎসকের অ্যাপয়েন্টমেন্ট মিস করেছি।

আত্মঘাত
হঠাৎ মনে হলো, গাছটার একটা নাম দেওয়া দরকার। নতুন প্রজাতি হলে নতুন নাম চাই। শুধু নতুন প্রজাতি নয়, হয়তো এটা একটা নতুন ফাইলাম বা পর্ব।

২৫ নভেম্বর

গত পরশু যা ঘটেছে, তারপর আর ডায়েরি লেখার মতো অবস্থা ছিল না। আজকেও আমার মনের অবস্থা বিশেষ ভালো নয়। কিন্তু দেরি করলে খুঁটিনাটি অনেক কিছু বাদ পড়ে যেতে পারে, এ কারণে অনেকটা নিজের সঙ্গে যুদ্ধ করে আজ লিখতে বসলাম।

পরশু সারা দিন চেষ্টা করেও লিনোর সঙ্গে কোনো কথা বলতে পারিনি। রাতে ঘুমাতে গেলাম। বিছানায় এপাশ-ওপাশ করা ছাড়া আর কোনো উপকার হলো না। কদিন ধরেই এমন হচ্ছে। ঘুমের ওষুধ কোনো কাজে দিচ্ছে না। চিকিৎসকের কাছে না গেলেই নয়। অগত্যা বারান্দায় পায়চারি করছিলাম। একটু ক্লান্ত হলে যদি ঘুম পায়, এই আশায়। ঘুরেফিরে গাছটার কথা মনে আসছিল। গাছের নাম লিনো। আমি কি পাগল হয়ে যাচ্ছি? বরং অন্য কিছু ভাবি। আবহাওয়াটা ভালোই। শীত অন্যদিনের চেয়ে কম।

হঠাৎ শুনলাম, ‘লিনো বলছি। তুমি কি ঘুমাচ্ছ?’

চারপাশে কাউকে দেখলাম না। লিনো তো অন্যপাশের বারান্দায়। সে কি রেলিং বেয়ে এখানে চলে এসেছে? তারপর মনে হলো, টেলিপ্যাথিতে সম্ভবত, দূরত্ব কোনো বাধা নয়। বললাম, ‘আমি অন্য বারান্দায়। ঘুম আসছে না। কিন্তু তুমি যদি আমার মন পড়তে পারো, তাহলে ঘুমাচ্ছি কি না, তা বুঝতে পারছ না কেন?’

‘তোমার মস্তিষ্কের তরঙ্গ বলছে তুমি গভীর ঘুমে আছ, অথচ তুমি বলছ যে তুমি জেগে আছ।’ লিনোর এই উত্তর শুনে আমি বুঝতে পারলাম কেন আমার ঘুমের ওষুধ কাজ করছে না। সম্ভবত রেম পর্যায়ের ঘুমের ভারসাম্যহীনতা ঘটেছে। চিকিৎসক দেখিয়ে ঘুমের ওষুধ পাল্টাতে হবে। কিন্তু লিনো গাছ হয়ে মস্তিষ্কের তরঙ্গ সম্পর্কে জানল কীভাবে? মনে এত প্রশ্ন জমা হয়েছে, কোনটা রেখে কোনটা করি!

মনে মনে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘আজ সারা দিন তুমি চুপ করে ছিলে কেন?’

লিনো এবার কোনো জবাব দিল না। পাল্টা প্রশ্ন করল, ‘আচ্ছা তোমার নাম কী?’

নাম বললাম (নাকি ভাবলাম)। কিন্তু সে যদি আমার মন পড়তে পারে, তাহলে আমার নাম জানবে না কেন?

‘তোমার নামটা তো বেশ অদ্ভুত।’

আমার সরল সোজা সাদাসিধে নামটা ওর কাছে কেন অদ্ভুত লাগল, সেটা ঠিক বুঝতে পারলাম না। বোকার মতো বললাম, ‘হয়তোবা!’

লিনো বলল, ‘আমি শুধু সেই কথাটা জানতে পারি, যেটা তুমি সক্রিয়ভাবে চিন্তা করো।’

‘ও ও ও...’

ভয়েস ডিটেক্টর
পরশু সারা দিন চেষ্টা করেও লিনোর সঙ্গে কোনো কথা বলতে পারিনি। রাতে ঘুমাতে গেলাম। বিছানায় এপাশ-ওপাশ করা ছাড়া আর কোনো উপকার হলো না। কদিন ধরেই এমন হচ্ছে।

লিনো বলতে লাগল, ‘তুমি জানতে চেয়েছিলে আমি কে? কোথা থেকে এসেছি? তাই না? তখন কিছু বলিনি বলে দুঃখিত। সূর্যের আলো থাকলে আমার কথা বলতে কষ্ট হয়। শুধু কথা বলা না, যেকোনো কাজ করতেই কষ্ট হয় আমার। সূর্যের আলো আমি একদমই সহ্য করতে পারি না।’

‘তোমার তো মাটিতে গেঁথে থাকার দরকার নেই, তাই না? তাহলে নিজেই উঠে গিয়ে ছায়ায় বসে থাক না কেন?’

‘একটানা বেশিক্ষণ মাটি ছাড়া থাকতে পারি না। আমাদের শরীরের বিপাক ক্রিয়ায় যে অতিরিক্ত বৈদ্যুতিক বিভব সৃষ্টি হয়, সেটাকে মাটি বা ওরকম কোনো মাধ্যমে ছেড়ে দিতে হয়। অনেকটা তোমাদের বৈদ্যুতিক যন্ত্রের আর্থিংয়ের মতো।’

ঠিক করলাম লিনোকে সরিয়ে অন্য কোথাও রাখব। সূর্যের আলো যেখানে পৌঁছায় না। আর ধারেকাছে কোনো প্লাগ পয়েন্টও থাকবে সেখানে।

‘আমার ওরকম একটা জায়গা খুব দরকার ছিল’, কথাটা শুনে চমকে উঠলাম। কারণ, আমার মনে ছিল না লিনো আমার মনের কথা বুঝতে পারে।

আবার আগের প্রসঙ্গে ফিরে যাওয়ার জন্য বললাম, ‘কী যেন বলছিলে, তুমি কে, কোথা থেকে যেন এসেছ...’

‘আমি তোমাদের গ্রহের নই। আমাদের ভাষায় আমাদের গ্রহের যে নাম, তা তোমরা উচ্চারণ করতে পারবে না। অবশ্য তোমরা তোমাদের ভাষায় গ্রহটার একটা নাম দিয়েছ—জি.আই-৫৮১সি। এখান থেকে ২০.৩ আলোকবর্ষ দূরে। তোমাদের গ্রহটা যেমন তোমাদের সূর্য থেকে দূরত্বের হিসাবে ৩ নম্বর, আমাদের গ্রহটাও তেমনি আমাদের সূর্য থেকে ৩ নম্বর।’

‘তাহলে তোমরা সেই সূর্যের তাপ সহ্য করো কীভাবে?’

‘সূর্যের তাপে তো আমাদের সমস্যা হয় না, আলোটাই সমস্যা। তাপটা বরং দরকার। আমাদের সূর্যের অতিবেগুনি আলো তোমাদেরটার থেকে অনেক কম। ও রকম সূর্যকে তোমরা বলো—লাল বামন।’

‘জ্যোতির্বিজ্ঞানে আমার জ্ঞান অনেক কম, লিনো। আমি ওসব বুঝব না। শুধু বলো, কেন এসেছ?’

‘প্রজাতি হিসেবে আমরা তোমাদের থেকে অকল্পনীয়ভাবে প্রাচীন এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে আমাদের অবস্থান তোমাদের বোধগম্যতার বাইরে। তোমাদের হিসেবে প্রায় এক ট্রিলিয়ন বছর আগেই আমাদের সভ্যতা কার্ডাশেভ স্কেলের চতুর্থ মাত্রা অর্জন করেছে। ইচ্ছে করলে পুরো মহাবিশ্ব নিয়ে আমরা খেয়াল–খুশিমতো খেলতে পারি। তবে ভয় পেয়ো না। আমরা কারও ক্ষতি করতে আসিনি। আমরা এসেছি...’

অন্য পৃথিবীর গল্প
‘সূর্যের তাপে তো আমাদের সমস্যা হয় না, আলোটাই সমস্যা। তাপটা বরং দরকার। আমাদের সূর্যের অতিবেগুনি আলো তোমাদেরটার থেকে অনেক কম। ও রকম সূর্যকে তোমরা বলো—লাল বামন।’

লিনোকে বাক্যটা শেষ করতে দিলাম না, বললাম, ‘তাহলে তোমরা সূর্যের আলো সহ্য করার ক্ষমতা অর্জন করোনি কেন?’

‘করেছি তো! এখন পৃথিবীতে যত উদ্ভিদ আছে, তারা সবাই আমাদের বংশধর। আমাদের সভ্যতার একপর্যায়ে আমরা দেখলাম আমাদের নতুন কিছু করার নেই, পাওয়ার নেই, হারানোর নেই। তখন আমরা পুরো মহাবিশ্বে ছড়িয়ে পড়লাম। তোমাদের গ্রহে আমাদের পূর্বপুরুষেরা এসেছিলেন এখন থেকে সাড়ে তিন হাজার মিলিয়ন বছর আগে। তারপর পাঁচ শ মিলিয়ন বছর ধরে বিবর্তিত হয়ে তারা সূর্যের আলো সহ্য করা শিখলেন। শুধু তা–ই নয়, সূর্যের আলোকে শক্তির উৎস হিসেবে ব্যবহার করাও তাদের রপ্ত হলো। কিন্তু এখন আমরা আসছি সরাসরি জি.আই-৫৮১সি থেকে। ওখানকার প্রকৃতিকে আমরা যেহেতু নিয়ন্ত্রণ করি, তাই সেখানে আমাদের ওপর প্রাকৃতিক নির্বাচন আর কাজ করে না। তাই আমাদের এখনো সূর্যের আলোতে, বিশেষ করে তোমাদের নক্ষত্রের বর্ণালিতে সমস্যা হয়।’

‘কিন্তু তোমরা তো সূর্যের আলো থেকে কৃত্রিম প্রতিরক্ষাব্যবস্থা নিয়ে আসতে পারতে, স্পেস-স্যুটের মতো।’

‘আমরা কৃত্রিম প্রযুক্তি ব্যবহার বন্ধ করে দিয়েছি আড়াই ট্রিলিয়ন বছর আগে। কারণ, তা কেবল ধ্বংসই ডেকে আনে। মহাবিশ্বের শত শত উন্নত সভ্যতার সঙ্গে আমাদের যোগাযোগ হয়েছে। তারা কেউই কৃত্রিম প্রযুক্তি ব্যবহার করে না। আমরাও আমাদের গ্রহের প্রকৃতিকে নিয়ন্ত্রণ করি সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক উপায়ে।’

রিকারশন ট্র্যাজেডি
'পৃথিবীতে যত উদ্ভিদ আছে, তারা সবাই আমাদের বংশধর। আমাদের সভ্যতার একপর্যায়ে আমরা দেখলাম আমাদের নতুন কিছু করার নেই, পাওয়ার নেই, হারানোর নেই।'

আমি আবার প্রসঙ্গে ফিরে আসার জন্য বললাম, ‘হ্যাঁ, কেন এসেছ বলছিলে...’

‘আমাদের পূর্বপুরুষেরা তোমাদের গ্রহে প্রাণের বিকাশের জন্য অসীম ত্যাগ স্বীকার করেছিলেন। তাঁরা চাইলে যেকোনো সময় নিজের গ্রহের ভাবনাচিন্তাহীন জীবনে ফিরে যেতে পারতেন। তাঁরা তা করেননি। মহাবিশ্বে জীববৈচিত্র্য ছড়িয়ে দেওয়ার পবিত্র দায়িত্ব নিয়ে তারা ঘর ছেড়েছেন। এই গ্রহের বৈরী প্রকৃতিকে সহ্য করে তাঁরা প্রাকৃতিক নির্বাচনের সামনে নিজেদের উৎসর্গ করেছেন। তাঁদের আত্মত্যাগের জন্যই এই গ্রহে তিন হাজার মিলিয়ন বছর আগে কার্বন ড্রাই-অক্সাইড কমে গিয়ে অক্সিজেন বাড়তে শুরু করে। ফলে প্রাণের অপরিসীম বৈচিত্র্যের উদ্ভব ঘটা সম্ভব হয়, যাকে তোমাদের ভাষায় বলে ‘ক্যাম্ব্রীয় বিস্ফোরণ’। সেটা এখন থেকে পাঁচ শ মিলিয়ন বছর আগের কথা। ক্যাম্ব্রীয় বিস্ফোরণের আগেও তোমাদের এই গ্রহে প্রাণ ছিল, তবে তা অতি সরল। তারপরই কেবল উন্নত ও জটিল গঠনের প্রাণীর বিবর্তন সম্ভব হয়। আমরা না এলে তোমাদের হয়তো কখনো জন্মই হতো না। আর তোমরা এখন আমাদেরই ধ্বংস করছ। যারা তোমাদের জন্য এত কষ্ট করল, তাদেরই তোমরা মেরে ফেলছ নির্বিচারে।’

এটুকু বলে থামল লিনো। আমি বললাম, ‘তোমার কথা আমি অবিশ্বাস করছি না, লিনো। তুমি বলে যাও।’

সময়ের ফাঁদ
‘আমাদের পূর্বপুরুষেরা তোমাদের গ্রহে প্রাণের বিকাশের জন্য অসীম ত্যাগ স্বীকার করেছিলেন। তাঁরা চাইলে যেকোনো সময় নিজের গ্রহের ভাবনাচিন্তাহীন জীবনে ফিরে যেতে পারতেন। তাঁরা তা করেননি।'

আবার শুরু করল সে, ‘প্রতি ১২২ বছর পরপর, মানে তোমাদের হিসাবে ১২২ বছর পরপর আমরা এসে দেখে যাই কী পরিবর্তন হলো। সারা মহাবিশ্বের যেসব গ্রহ-উপগ্রহে আমাদের পূর্বপুরুষেরা থেকে গেছেন, তাদের বংশধরদের খোঁজখবর নিয়ে ফিরি আমরা। আমি এই গ্রহে নামার পর একজন মানুষ আমাকে তোমার কাছে পাঠিয়ে দেয়। আমি তখনো আমার মিশনের কাজগুলো শেষ করতে পারিনি। তথ্য সংগ্রহ করার কাজ ঢের বাকি। তাই প্রথমটায় এতে বিরক্ত হয়েছিলাম। পরে দেখলাম, আসলে ভালোই হয়েছে। আজ তোমাকে যে কথাগুলো বললাম সেগুলো আমরা বহুবার বহুভাবে বলার চেষ্টা করেছি তোমাদের অনেককে। কেউ বিশ্বাস করেনি। তুমি আমার কথা বিশ্বাস করেছ—এ জন্য আমি কৃতজ্ঞ। একটা ছায়াঘেরা অন্ধকারমতো জায়গায় নেমেছিলাম যাতে রোদ গায়ে না লাগে। কিন্তু ওই মানুষের হাতে পড়ার পর থেকে এই কয়দিন সূর্যের আলোয় বেশ কষ্ট হয়েছে। আর কিছুদিন এ রকম চললে হয়তো মারাই যেতাম।’

আমি জিজ্ঞাসা করলাম, ‘যাচ্ছ কবে?’

উত্তর এল, ‘আজই। আর আধঘণ্টার মধ্যেই আমার সঙ্গীরা আমাকে নিতে আসবে।’

‘পৃথিবী সম্পর্কে তোমার মন্তব্য কী, লিনো? মানুষ সম্পর্কে?’

‘মানুষেরা কথা শুনতে চায় না, শুধু বলতে চায়। অন্যেরও যে কিছু বলার থাকতে পারে, সেটা না বোঝা পর্যন্ত কোনো সভ্যতা উন্নত হতে পারে না। তুমি মনোযোগ দিয়ে আমার কথা শুনেছ। এ জন্য তোমাকে আমার খুব ভালো লেগেছে। কিন্তু আমার কিছুই করার নেই। যেতে আমাকে হবেই।’

কিছুক্ষণ কোনো কথা চলল না আমাদের মধ্যে।

ট্যাক্সি ড্রাইভার
আমি দৌড়ে ঘরে গেলাম। উজ্জ্বল চোখ ধাঁধানো আলোয় ভরে আছে সারা ঘর। উৎসটা যে কী, তা বুঝতে পারছি না। জানালা দিয়ে দেখি ওপাশের বারান্দায় যেখানে লিনোকে রেখেছিলাম, সেখানটা ফাঁকা।

একটু পরে অনুভব করলাম বারান্দার আলো-আঁধারিতে কারা যেন আমাকে ঘিরে দাঁড়িয়েছে। অনেকগুলো গাছের মতো অবয়ব। তারা সবাই যেন আমার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে। আমার একটা অস্বস্তিকর অনুভূতি হতে লাগল। লিনোর কথা আবার শুনতে পেলাম আমি, ‘তোমাকে ছেড়ে যেতে কষ্ট হচ্ছে। আমি আবার যখন আসব, তখন তোমার বংশধরকে একবার দেখে যাব। তাকে বলব তোমার কথা। তোমার জন্য ভালোবাসার একটা ছোট্ট উপহার রেখে গেলাম। তোমার ঘরে পাবে ওটা। তোমার গ্রহের সবাইকে বলো, তারা যেন আমাদের ভালোবাসে। আমরা আর কিছুই চাই না। বিদায় বন্ধু। বিদায়।’

আমি দৌড়ে ঘরে গেলাম। উজ্জ্বল চোখ ধাঁধানো আলোয় ভরে আছে সারা ঘর। উৎসটা যে কী, তা বুঝতে পারছি না। জানালা দিয়ে দেখি ওপাশের বারান্দায় যেখানে লিনোকে রেখেছিলাম, সেখানটা ফাঁকা। আলোর উজ্জ্বলতা অনেকখানি বেড়ে গেল। চোখ খুলে রাখতে কষ্ট হচ্ছে আমার। হঠাৎ আলোটা দপ করে নিভে গেল। ঘরময় ঘুটঘুটে অন্ধকার। আলো জ্বালালাম। দেখি, মেঝেতে পড়ে আছে একটা ফুল। স্বচ্ছ পাপড়ি তার।

*লেখাটি ২০২২ সালে বিজ্ঞানচিন্তায় অক্টোবর সংখ্যায় প্রকাশিতউড়ান

Read full story at source