অবৈধ অভিবাসী ফেরত গেলে পাবেন ১০ হাজার পাউন্ড, প্রকল্প যুক্তরাজ্যে
· Prothom Alo

যুক্তরাজ্যে অবৈধ অভিবাসীরা নিজ নিজ দেশে স্বেচ্ছায় ফিরে গেলে পাবেন ব্যক্তিপ্রতি ১০ হাজার পাউন্ড এবং পরিবারপ্রতি সর্বোচ্চ ৪০ হাজার পাউন্ড। অবৈধ অভিবাসীদের বোঝা কমাতে এই পাইলট পরিকল্পনা নিয়েছে দেশটির সরকার। যুক্তরাজ্যের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাবানা মাহমুদ বলেছেন, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে এই প্রণোদনা গ্রহণ না করলে সংশ্লিষ্ট পরিবারগুলোকে জোর করে বহিষ্কারের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
Visit forestarrow.help for more information.
গতকাল বৃহস্পতিবার লন্ডনে একটি অনুষ্ঠানে বক্তৃতায় এই পরিকল্পনার ঘোষণা করেন শাবানা মাহমুদ। এই পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রতি ব্যক্তিকে সর্বোচ্চ ১০ হাজার পাউন্ড পর্যন্ত দেওয়া হবে এবং একটি পরিবারে সর্বোচ্চ চারজন সদস্য পর্যন্ত এই সুবিধা নিতে পারবেন; অর্থাৎ একটি পরিবার সর্বোচ্চ ৪০ হাজার পাউন্ড পেতে পারে। বাংলাদেশি মুদ্রায় এই অর্থের পরিমাণ ৬৫ লাখ ৩৬ হাজার টাকা।
পাইলট প্রকল্পের আওতায় আনা হচ্ছে করদাতাদের অর্থে পরিচালিত আশ্রয় আবাসনে থাকা প্রায় ১৫০টি পরিবারকে। সরকার মনে করছে, পরিকল্পনাটি সফল হলে বছরে প্রায় ২ কোটি পাউন্ড পর্যন্ত অর্থ সাশ্রয় করা সম্ভব হবে।
আশ্রয়প্রার্থীদের আবাসনের জন্য সরকারের উচ্চ ব্যয়ের দিকটি দেখিয়ে শাবানা মাহমুদ উদাহরণ দিয়ে বলেন, তিন সদস্যের একটি পরিবারকে রাখতে বছরে প্রায় ১ লাখ ৫৮ হাজার পাউন্ড পর্যন্ত খরচ হয়। সেই তুলনায় এককালীন আর্থিক প্রণোদনা দিয়ে তাদের স্বেচ্ছায় দেশে ফেরাতে পারলে করদাতাদের অর্থ সাশ্রয় হবে।
সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালে যুক্তরাজ্যে ৮২ হাজার ১০০টি আশ্রয় প্রার্থনার আবেদন জমা পড়ে। এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মানুষের সংখ্যা ১ লাখ ৬০০–এর মতো। এর মধ্যে প্রায় ৫৮ শতাংশ আবেদন প্রত্যাখ্যাত হয়। একই বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত ১২ মাসে ২৮ হাজার ৪ জন স্বেচ্ছায় নিজ দেশে ফিরে গেছেন, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৫ শতাংশ বেশি।
আবেদনকারী ও প্রত্যাখ্যাতদের মধ্যে কত সংখ্যক বাংলাদেশি রয়েছেন, সেই তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে ২০২৪-২৫ বছরের হিসাব অনুযায়ী, যুক্তরাজ্যে আশ্রয়প্রার্থীদের নাগরিকত্বের পরিচয় বিচারে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল চতুর্থ। ওই সময়ে বাংলাদেশিদের আশ্রয়ের আবেদন ছিল ৭ হাজার ২২৫টি, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৪২ শতাংশ বেশি। তার মধ্যে প্রায় ১ হাজার ৩০০ জনের আবেদন অনুমোদন পায়। প্রত্যাখ্যাত হয় ৫ হাজার ৯০০ জনের আবেদন।
যুক্তরাজ্যের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাবানা মাহমুদবর্তমানে যুক্তরাজ্যে স্বেচ্ছায় প্রত্যাবর্তনের একটি কর্মসূচি চালু রয়েছে, যার আওতায় দেশে ফিরতে রাজি হলে একজন আশ্রয়প্রার্থী সর্বোচ্চ ৩ হাজার পাউন্ড পর্যন্ত সহায়তা পান। নতুন পরিকল্পনায় সেই অর্থের পরিমাণ কয়েক গুণ বাড়ছে।
তবে এই প্রকল্প নিয়েও রাজনৈতিক অঙ্গনে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। বিরোধী দল কনজারভেটিভ পার্টি ও ডানপন্থী দল রিফর্ম ইউকে বলেছে, এ ধরনের অর্থ প্রদান মানুষকে অবৈধভাবে যুক্তরাজ্যে আসতে উৎসাহিত করতে পারে।
কনজারভেটিভ পার্টির ছায়া স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ক্রিস ফিলিপ তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় বলেছেন, অবৈধভাবে দেশে প্রবেশকারীদের অর্থ দেওয়া ব্রিটিশ করদাতাদের প্রতি অপমান। তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় রিফর্ম ইউকের স্বরাষ্ট্রবিষয়ক মুখপাত্র জিয়া ইউসুফ বলেন, ৪০ হাজার পাউন্ড দেওয়া ‘অবিশ্বাস্য’ এবং এটি অবৈধভাবে প্রবেশকারীদের জন্য যেন পুরস্কার।
তবে সরকার মনে করছে তার বিপরীত। সরকারি একটি সূত্র বলেছে, এই অর্থ মানুষকে অবৈধভাবে যুক্তরাজ্যে আসতে উৎসাহিত করবে না। কারণ, মানব পাচারকারীরা একজন অভিবাসীকে যুক্তরাজ্যে আনতে ১৫ হাজার থেকে ৩৫ হাজার পাউন্ড পর্যন্ত নেয়। ফলে শুধু অর্থ পাওয়ার আশায় কেউ অবৈধভাবে এখানে আসবেন, এমন ধারণা বাস্তবসম্মত নয়।
অন্যদিকে অভিবাসী অধিকার নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন সংগঠনও এই পরিকল্পনা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। প্রায় ১০০টি সংগঠনের জোট রেফিউজি অ্যান্ড মাইগ্র্যান্ট চিলড্রেনস কনসোর্টিয়াম এক বিবৃতিতে বলেছে, পরিবারগুলোকে মাত্র এক সপ্তাহের মধ্যে জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করা হবে, অথচ আইনি পরামর্শ নেওয়ার মতো পর্যাপ্ত সময় থাকবে না।
সংগঠনটি আরও আশঙ্কা প্রকাশ করেছে যে আশ্রয়প্রার্থীদের জন্য সহায়তা কমিয়ে দিলে শিশুদের গৃহহীন হয়ে পড়ার ঝুঁকি বাড়তে পারে।
যুক্তরাজ্যের ইমিগ্রেশন ও মানবাধিকার আইনে বিশেষজ্ঞ ব্যারিস্টার মনোয়ার হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, নতুন যে নীতি নেওয়া হয়েছে, তা মূলত ব্যয় কমানো ও দ্রুত প্রত্যাবাসন বাড়ানোর উদ্দেশ্যে নেওয়া হয়েছে। অর্থ দিয়ে মানুষকে দেশ ছাড়তে উৎসাহিত করা নৈতিক ও মানবিক প্রশ্নও তৈরি করে। বিশেষ করে শিশুসহ পরিবারগুলোর ক্ষেত্রে এ ধরনের নীতি মানবাধিকার ও সামাজিক দায়বদ্ধতার দৃষ্টিকোণ থেকে সতর্কতার সঙ্গে বিবেচনা করা দরকার।
কার্যকর অভিবাসন ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি মানবিক মূল্যবোধ রক্ষা করাও সরকারের জন্য সমান গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ, বলেন মনোয়ার হোসেন।