পাহাড়শীর্ষে রনবীকে ঘিরে এক রাত

· Prothom Alo

চট্টগ্রামের ফিনলে পাহাড়ের শীর্ষে এক নীরব বাংলো। চারদিকে নিবিড় গাছপালা, ঈদের বাজারে চারদিকে যানজট, কোলাহল আর ভিড়ের ভেতর বন্দর নগরের কেন্দ্রে এ যেন এক নিঝুম দ্বীপ। প্রকৃতির ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্যে রাতের বাতাসে মিশে আছে পাহাড়ি শীতলতা। এমন একটা শান্ত আবহে ৪ মার্চ মঙ্গলবার রাতে পাহাড়ের সেই বাড়িটিতে বসেছিল এক ব্যতিক্রমী শিল্প-আসর। আসরের মধ্যমণি ছিলেন বাংলাদেশের বরেণ্য শিল্পী, ‘রনবী’ নামে সমধিক পরিচিত রফিকুন নবী। রনবীর সৃষ্ট কার্টুন চরিত্র টোকাই দশকের পর দশক ধরে কেবল আনন্দ–বিনোদনের খোরাক জোগায়নি, একই সঙ্গে সমাজ-রাজনীতিকে দেখার এক নতুন দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করেছে। সত্তর দশকের প্রজন্মের কাছে টোকাই ছিল প্রতিবাদের এক নিরীহ অথচ তীক্ষ্ণ ভাষা।

এই আয়োজনের সুবাদে আমরা কয়েকজন শিল্পীর সান্নিধ্যে কাটালাম স্মরণীয় একটি সন্ধ্যা। আয়োজক চট্টগ্রামের বিশিষ্ট শিল্প-সমঝদার ও পৃষ্ঠপোষক তারিকুল ইসলাম। প্রতিবছরই দেশের কোনো বরেণ্য শিল্পীকে তাঁর পাহাড়চূড়ার বাসভবনে আমন্ত্রণ জানান। কিছুদিনের জন্য শিল্পী প্রাকৃতিক সেই নিবিড় পরিবেশে আঁকেন, ভাবেন ও সময় কাটান। আসরে শিল্পী রফিকুন নবীকে ‘গেস্ট অব দ্য লাইফ টাইম’ ঘোষণা করা হয়। সাংগঠনিক কোনো আনুষ্ঠানিকতা নয়, এ সম্মাননা ছিল বাণিজ্য নগরীর একটি সমঝদার পরিবারের পক্ষ থেকে দেশের একজন বিশিষ্ট শিল্পীর প্রতি ভালোবাসা ও শ্রদ্ধার অনাড়ম্বর প্রকাশ।

Visit milkshakeslot.com for more information.

বাতাসে মিশে আছে পাহাড়ি শীতলতা এমন শান্ত আবহে ৪ মার্চ মঙ্গলবার রাতে পাহাড়ের সেই বাড়িটিতে বসেছিল এক ব্যতিক্রমী শিল্প-আসর। আসরের মধ্যমণি ছিলেন বাংলাদেশের বরেণ্য শিল্পী, ‘রনবী’ নামে সমধিক পরিচিত রফিকুন নবী।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের ড্রয়িং অ্যান্ড পেইন্টিং বিভাগের ইমিরেটাস অধ্যাপক ও একুশে পদকপ্রাপ্ত শিল্পী রফিকুন নবীকেও স্পর্শ করেছে আয়োজনের উষ্ণ অভ্যর্থনা। নিঃস্বার্থ ভালোবাসাটুকু টের পেয়েই সায় দিয়েছেন ৩ থেকে ৬ মার্চ—এই চার দিনের আতিথ্য গ্রহণে।

শিল্পী রফিকুন নবীর কথায় উঠে আসে শিল্প-সংস্কৃতির নানা অধ্যায়। চট্টগ্রামের সর্বজনশ্রদ্ধেয় শিল্পী ও বুদ্ধিজীবীদের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কথা। শিল্পী মুর্তজা বশীর, ভাস্কর আবদুল্লাহ খালিদ, ভাস্কর অলক রায়, শিল্পী আবুল মনসুর, কবি আবুল মোমেনসহ আরও অনেকের স্মৃতিচারণায় মুখর হয়ে ওঠে পাহাড়চূড়ার এই শিল্প-আসর। করেছেন চট্টগ্রামের সঙ্গে তাঁর গভীর সম্পর্কে গড়ে ওঠার গল্প। ১৯৬০ সালে যখন সবে এসএসসি পাস করেছেন, তখন থেকেই চট্টগ্রামে নিয়মিত আসা-যাওয়া শুরু। জানালেন, সে সময় প্রথম তিনি উড়োজাহাজে চড়ে চট্টগ্রাম আসেন। তখন ঢাকা-চট্টগ্রাম বিমানভাড়া ছিল মাত্র ২৪ টাকা। তারপর চট্টগ্রাম থেকে একটি জীর্ণ বাসে চড়ে যান কক্সবাজারে। প্রথম চট্টগ্রাম সফরের স্মৃতি আজও তাঁর কণ্ঠে জীবন্ত। পরে তিনি বহুবার চট্টগ্রামে এসেছেন, অধিকাংশ সময়ই পেশাগত প্রয়োজনে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগের শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষায় এবং অনার্স-মাস্টার্স পরীক্ষার পরীক্ষক হিসেবেও এসেছেন। পেশাগত কাজে চট্টগ্রামের চারুকলা কলেজেও এসেছেন বহুবার। বললেন, শিল্পী মুর্তজা বশীর, শিল্পী জিয়া হায়দার, নাট্যব্যক্তিত্ব মমতাজউদদীন আহমদের মতো গুণী শিল্পীদের সঙ্গে চট্টগ্রামের সংযোগের কথা, তাঁরা চট্টগ্রামের সাংস্কৃতিক জগৎকে সমৃদ্ধ করেছেন। চট্টগ্রামের আসার অন্যতম আকর্ষণ ছিল এই সব লোকের সান্নিধ্য পাওয়া বলেও জানান রনবী।

[বাঁ দিক থেকে] ওমর কায়সার, আবদুল্লাহ আল বশির, বিশ্বজিৎ গোস্বামী, বিশ্বজিৎ চৌধুরী, আশিক ইমরান, মোহাম্মদ ইকবাল, রফিকুন নবী এবং তারিকুল ইসলাম

যে পাহাড়শীর্ষে বসে এসব কথা শুনছিলাম, সেই পাহাড়ের ঠিক নিচে চট্টগ্রাম চারুকলা কলেজ। সরকারি এই প্রতিষ্ঠানটি পরবর্তী সময় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে চারুকলা ইনস্টিটিউটে পরিণত হয়। শিল্পী এই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে নিজের জড়িত থাকার স্মৃতিচারণা করে বললেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগকে ইনস্টিটিউটে পরিণত করে জোবরা ক্যাম্পাস থেকে নগরে স্থানান্তরিত করার জন্য একটা আন্দোলন হয়েছিল। আমরা সেই আন্দোলনকে সমর্থন করেছিলাম। ভেবেছিলাম, এ রকম একটি ইনস্টিটিউট হলে নগরের সাংস্কৃতিক জগতের বৈচিত্র্য বাড়বে। একটা আবহ তৈরি হবে। প্রগতিশীল কর্মকাণ্ড বেগবান হবে। সে কারণে এর পক্ষে তৈরি করা বিবৃতিতে স্বাক্ষর করেছিলাম। আন্দোলন সফল হলো, চারুকলা কলেজ হলো চারুকলা ইনস্টিটিউট।

রনবীর সৃষ্ট কার্টুন চরিত্র টোকাই দশকের পর দশক ধরে কেবল আনন্দ–বিনোদনের খোরাক জোগায়নি, একই সঙ্গে সমাজ-রাজনীতিকে দেখার এক নতুন দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করেছে। টোকাই ছিল প্রতিবাদের এক নিরীহ অথচ তীক্ষ্ণ ভাষা।

‘কিন্তু যে স্বপ্ন ছিল এটাকে ঘিরে, তার কিছুই হলো না। এই ইনস্টিটিউট এখানে তেমন কোনো প্রভাব রাখতে পারেনি। এর মধ্যে চারুকলা ইনস্টিটিউটকে আবার ক্যাম্পাসে ফিরিয়ে নেওয়ার আন্দোলন হলো। অচলাবস্থার সৃষ্টি হলো। ইনস্টিটিউট ফিরে গেল জোবরা ক্যাম্পাসে। মাঝখান থেকে চট্টগ্রাম শহরে একটা চারুকলা কলেজ ছিল, সেটা লুপ্ত হয়ে গেল। চট্টগ্রামের মতো একটা মেগা শহরে একটা চারুকলা কলেজ থাকবে না, এটা ভাবতে ভালো লাগছে না।’

আমাদের আড্ডা বিষয় থেকে বিষয়ান্তরে যাচ্ছিল। কথায় কথায় উঠে এল শিল্পীর যৌবনের, শৈশবের-কৈশোরের নানা কথা, ব্যক্তিগত সুখ–দুঃখের বিবরণ। ১৯৬০ সাল যে বছর প্রথম চট্টগ্রাম এসেছিলেন, সেই থেকে একেবারে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত জীবনের শ্রেষ্ঠ সময় কাটিয়েছিলেন বলে তিনি মনে করেন। কারণ হিসেবে এ সময় বাংলার সাহিত্য-শিল্প, রাজনীতিসহ যাবতীয় সৃজনশীল ও মননশীল কর্মকাণ্ডের বিকাশের সময় ছিল বলে তিনি উল্লেখ করেন। বলেন, ওটা ছিল এক নবজাগরণের সময়। বিরুদ্ধ সময় ছিল বলেই হয়তো ওটা ছিল সৃজনেরও শ্রেষ্ঠ সময়।

রফিকুন নবী কথা বলেন মৃদু স্বরে। দুঃখ, আনন্দ, হতাশা, ক্ষোভের কথা বয়ান করেন শান্তভাবে। কথা বলতে বলতে কখনো বর্তমান, কখনো অতীতে সাবলীলভাবে বিচরণ করেছেন। আমরা যখন কথা বলছিলাম তখন মাথার ওপরে বিশাল আকাশে ছিল ফাল্গুনের পূর্ণিমার অনন্য রক্তিম চাঁদ। সন্ধ্যার দিকে চন্দ্রগ্রহণ ছিল, চট্টগ্রাম বিমানবন্দর থেকে নতুন ফ্লাইওভার দিয়ে যানজটহীন ঝামেলাবিহীন যাত্রার সময় তিনি চন্দ্রগ্রহণের দৃশ্য দেখেছেন। দু-একবার উল্লেখ করলেন সেই অভিজ্ঞতার। ভাবি, বঙ্গোপসাগরের তীর ধরে আসতে আসতে আকাশে চন্দ্রগ্রহণের যে ছবি শিল্পীর মনে গেঁথে গেছে, সেটা হয়তো কোনো একদিন আমরা তারই ক্যানভাসে দেখতে পাব! কথা বলতে বলতে একসময় একটু থামলেন। তারপর বললেন, অনেক তো কথা হলো এবার একটু গান হোক। প্রস্তুত ছিলেন গায়ক ইয়াসিন মাবুদ। খোলা ও দরাজ গলায় তিনি গজলের সুর তুললেন। শান্ত সন্ধ্যায় পূর্ণিমার চাঁদের নিচে সেই সুর তৈরি করে এক অপার্থিব আবেশের। শিল্পীসহ আমরা সবাই মগ্ন হলাম তাতে।

Read full story at source