গোমতী নদীর তীরে সূর্যমুখীর স্বর্গরাজ্যে যেতে চাইলে যা জানতে হবে

· Prothom Alo

বলা হয়, কুমিল্লার দুঃখ গোমতী। সেই গোমতীর চরে আনন্দ নিয়ে এসেছে শত শত সূর্যমুখী। যিনিই গোমতী নদীর পাড় ধরে যাচ্ছেন, ফুল দেখে মুগ্ধ হচ্ছেন, ছবি তুলছেন, ভিডিও করছেন আর ফেসবুকে পোস্ট করছেন। আর তাতেই ভাইরাল এই সূর্যমুখী ফুলের বাগান। কেন এই বাগান দেখতে যাবেন, কীভাবে যাবেন—সব থাকছে এ লেখায়।

Visit catcrossgame.com for more information.

গোমতী চরের সূর্যমুখীর হলুদ সাম্রাজ্য

২১ ফেব্রুয়ারি সকালে আমারও সেদিকে পা বাড়ানোর সুযোগ হলো। কুমিল্লা শহরের শাসনগাছা বাসস্ট্যান্ড থেকে বুড়িং রোডে মাত্র ১০ টাকা অটোরিকশা ভাড়ায় চলে এলাম পালপাড়া গোমতী সেতুর গোড়ায়।

সেতু থেকেই পুব দিকে চাইতে না চাইতেই চোখ চলে যায় গোমতী চরের সূর্যমুখীর হলুদ সাম্রাজ্যে; যেন হাতছানি দিয়ে ডাকছে। আর সেই ডাকে সাড়া দিয়ে প্রতিদিনই ভিড় করছেন শত শত দর্শনার্থী।

কেউ তুলছেন মুগ্ধতা ছড়ানো ফুলের ছবি; ফুলে ফুলে উড়ে বেড়ানো মৌমাছি, প্রিয়জনের ছবিও বাদ যাচ্ছে না। কেউ তুলছেন সেলফি, কেউ বানাচ্ছেন রিল, কেউবা আবার যান্ত্রিক পাখি ড্রোন উড়িয়ে ভিডিও তৈরিতে ব্যস্ত। বিকেল থেকে সন্ধ্যা—সূর্যমুখীর খেত ঘিরে গোমতীর চর হয়ে ওঠে যেন পিকনিকের সরগরম স্পট।

আগত দর্শনার্থীদের কাছে হাওয়াই মিঠাই বিক্রি করে ছোট্ট ইমরান

কুমিল্লা ইপিজেড এলাকা থেকে এক বাহনে পুরো পরিবার এসেছে সূর্যমুখীর বাগান দেখতে। তাদের পিছু নিয়ে আমিও নামি গোমতীর চরে। প্রথমে ৩০ টাকার ‘অদৃশ্য’ এক টিকিট কেটে সামনে পা বাড়াই। সঙ্গে ভ্রমণ গাইড হিসেবে পুরো বাগান ঘুরিয়ে দেখার দায়িত্ব নিলেন ফুলচাষি সাব্বির মিয়ার নিকটাত্মীয় আল আমিন। সঙ্গে যোগ দিল ছোট্ট ইমরান। আগত দর্শনার্থীদের কাছে হাওয়াই মিঠাই বিক্রি করে কিছু টাকা আয় করে সে।

ফুল নাকি পোকামাকড়

সতর্কবাণী—ফুল ছিঁড়লে ৫০০ টাকা জরিমানা আর ছবি তুললে ৩০ টাকা

খেতের শুরুতেই বাঁশের মাথায় ঝুলছে সতর্কবাণী—ফুল ছিঁড়লে ৫০০ টাকা জরিমানা আর ছবি তুললে ৩০ টাকা। পাশেই আরেকটি সাইনবোর্ডের তথ্য বলছে, ২০২৫ সালের ১৬ নভেম্বর এখানকার ৩৩ শতাংশ জমিতে বোনা হয় ‘আরডিএস ২৭৫’ জাতের সূর্যমুখীর বীজ।

সেই ফুলের টানে মধু সংগ্রহে নেমেছে মৌমাছি, নীল ভোমরার দল। মৌমাছি আর নীল ভোমরা একপ্রকার প্রতিযোগিতা করে উড়ে বেড়াচ্ছে ফুলে ফুলে। ভেবে কূল পাই না, ফুল নাকি নাকি এই পোকামাকড়ের রূপ দেখব!

ভোমরার মাথা আবার হলুদ রঙে ঢাকা, যেন রোদ থেকে বাঁচতে হলুদ ক্যাপ পরে উড়ছে ফুলে ফুলে

কালো-হলুদ ডোরাকাটা মৌমাছি। নীল পাখা আর কুচকুচে কালো রঙের নীল ভোমরা। কোনো ভোমরার মাথা আবার হলুদ রঙে ঢাকা, যেন রোদ থেকে বাঁচতে হলুদ ক্যাপ পরে উড়ছে ফুলে ফুলে।

ছবি আর ভিডিও ফুটেজ নিতে ওদের পিছু ছুটতে ছুটতে হয়রান হওয়ার দশা! এতটাই চঞ্চল যে চোখের পলকেই এক ফুল থেকে উড়ে গিয়ে অন্য ফুলে ল্যান্ড করে!

ছোট ফুল বড় ফুল

সবচেয়ে বড় যে ফুলটা নজরে এল, তার ব্যাস প্রায় এক ফুট

ছোট–বড় অনেক ফুলের মধ্যে সবচেয়ে বড় যে ফুলটা নজরে এল, তার ব্যাস প্রায় এক ফুট! ইমরান এসে ফুলের পাশে দাঁড়ালে তার মাথার চেয়ে দেখি ফুলটাই বেশ বড়! আবার ঘুরতে ঘুরতে এমন ছোট ফুলও সামনে পেলাম, যা ইমরানের হাতের তালুতে এঁটে যায়।

সূর্যমুখী ফুল স্বভাবতই সূর্যের দিকে মুখ করে হেসে ওঠে। তবে ফুল যত বড় হতে থাকে, পাপড়ি মলিন হয়ে আসে, মাঝের বৃত্তাকার অংশে সারি সারি কালচে ধূসর রঙের বীজের উপস্থিতি দৃশ্যমান হতে থাকে।

আর তখন বীজের ভারেই ফুল ক্রমশ নুইয়ে পড়তে থাকে। তত দিন গাছটাও যথেষ্ট মোটা হয়ে সেই ভার বহন করার উপযোগী হয়ে ওঠে।

একই গাছে বিভিন্ন দিকে বিভিন্ন ডাল বের হয়ে আগে-পিছে সেসব ডালেও ফুল আসতে থাকে। একেবারে মাটি ছুঁই ছুঁই ডালেও ফুল এসে মাটির সঙ্গে গড়াগড়ি খায়।

পাপেটের মুখের মতো সূর্যমুখী

স্বাভাবিক আকৃতির ফুলের পাশাপাশি কিছু ব্যতিক্রম ফুলের দেখাও পেলাম। কোনো ফুল যেন ঠোঁট বাঁকিয়ে ফুটেছে কিংবা পাপেটের মুখ। কোনটা আবার কুচকানো ‘লাভ’ চিহ্নের মতো, কোনটার আবার অর্ধেক ফুটেছে তো বাকিটা ফোটেনি। সব গাছই সারি সারি দাঁড়িয়ে ফুল ফোটালেও কেউ কেউ আবার দলছুট হয়ে পাশের শর্ষেখেতে গিয়ে ফুল ফুটিয়েছে। হয়তো বীজ বপনের সময় একটা বীজ ছিটকে গিয়ে দূরে পড়েছিল, তাই সে দলছুট!

গাছের নিরাপত্তায়

আল আমিন আমাদের ঘুরে ঘুরে দেখাচ্ছিলেন পুরো বাগান

আল আমিন আমাদের ঘুরে ঘুরে দেখাচ্ছিলেন পুরো বাগান। সূর্যমুখীর কলি থেকে শুরু করে বিভিন্ন ধাপে একেবারে পাকা ফুল ও বীজ হওয়া পর্যন্ত যত ধাপ আছে, তিনি একে একে দেখাতে লাগলেন।

এখানে পাশাপাশি তিনটা সূর্যমুখীখেত। একটিতে নির্দিষ্ট দূরত্ব মেনে সারি সারি করে বীজ বপন করা হয়। পাশাপাশি দুটি গাছের মধ্যে যথেষ্ট জায়গা থাকায় গাছগুলো বেশ মোটাসোটা হয়ে উঠেছে। ডালপালা মেলে ফুলে ফুলে পরিপূর্ণ চারপাশ।

দুটি খেতে ছিটিয়ে বীজ বোনা হয়েছে বলে গাছগুলো খুব ঘন হয়ে উঠেছে

অন্য দুটি খেতে ছিটিয়ে বীজ বোনা হয়েছে বলে গাছগুলো খুব ঘন হয়ে উঠেছে। উচ্চতায় আমাদের ছাড়িয়েছে, ফুল নেই—এমন গাছগুলোকে দূর থেকে দেখলে মনে হয় যেন ঢ্যাঁড়সগাছ!

ধাপে ধাপে একসময় সব গাছেই ফুল আসতে থাকবে। ফুল শেষে যখন বীজ পরিপক্ব হতে শুরু করবে, তখন আবার আরেক দুশ্চিন্তা ভর করবে চাষির মাথায়, সেটা হলো পাখির যন্ত্রণা! সূর্যমুখীর বীজ টিয়া পাখির খুব পছন্দ।

তাই টিয়া পাখির হাত থেকে বীজ বাঁচাতে নিতে হবে বিশেষ নিরাপত্তাব্যবস্থা। জানা গেল, লোক রেখে পাখি তাড়ানোর ব্যবস্থা করবেন চাষিরা। অবস্থা আরও বেগতিক দেখলে পুরো সূর্যমুখীর খেতই ঢেকে দেবেন জাল দিয়ে।

যে কারণে এই বাগান

সূর্যমুখীর বীজ টিয়া পাখির খুব পছন্দ

কথা হলো কুমিল্লা আদর্শ উপজেলার উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা আবদুল কাদেরের সঙ্গে। তিনি জানান, নদীতে মাটি কাটা বন্ধ করার লক্ষ্যে চরের জায়গা সব চাষের আওতায় আনা হচ্ছে।

ফলে সরকারি বিভিন্ন প্রকল্পের আওতায় প্রতিবছরই এই গোমতীর চরে চাষাবাদ হয়ে আসছে গোল আলু, মিষ্টি আলু, মিষ্টিকুমড়া, ভুট্টা, গম, শর্ষে, মসুর, মাষকলাই, ক্যাপসিকামসহ নানা রকম মৌসুমি শাকসবজি।

কুমিল্লায় টেকসই কৃষি উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় এবারই প্রথমবারের মতো যোগ হলো সূর্যমুখীর চাষাবাদ। তেল উৎপাদনের লক্ষ্য নিয়ে এবার পাঁচটি প্রদর্শনী প্রকল্প আছে কুমিল্লার পালপাড়া, আমতলাসহ গোমতীর চরের পাঁচটি অংশজুড়ে।

কুমিল্লার পালপাড়া ব্রিজের পাশে আবাদ করেছেন জান্নাতুল ফেরদৌস নামের এক নারী কৃষি উদ্যোক্তা। চাষাবাদ থেকে শুরু করে সার্বিক দেখাশোনা করছেন তাঁর স্বামী সাব্বির মিয়া।

আবদুল কাদের, উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা, কুমিল্লা আদর্শ উপজেলাশুরুতে সূর্যমুখীর নতুন এই চাষাবাদ নিয়ে আগ্রহ না থাকলেও আমরা বোঝাতে সক্ষম হই যে হলুদ শর্ষের পাশাপাশি সূর্যমুখী চাষ এই জায়গাকে পিকনিক স্পটের মতো বানিয়ে ফেলবে। ফলে মানুষজন টিকিট কেটে পর্যন্ত ঘুরতে আসবে এখানে। বাস্তবে হলোও ঠিক তা-ই। ৩০ টাকা টিকিট কেটেই ফুলের সৌন্দর্য উপভোগ করতে প্রতিদিনই ভিড় করছেন শত শত দর্শনার্থী। দুপুর গড়িয়ে বিকেল বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ে দর্শনার্থী সংখ্যাও।

ভবিষ্যতের বাগান

সূর্যমুখী চাষে উৎসাহ দেখাচ্ছেন চাষিরা

আবদুল কাদের আরও জানান, এভাবে একজনের দেখাদেখি অন্যজনও সূর্যমুখী চাষে উৎসাহিত হবে। তেল উৎপাদনের ক্ষেত্রে শর্ষের পাশাপাশি সূর্যমুখী চাষে কৃষকের আগ্রহ বাড়বে।

চাষি সাব্বির মিয়া বলেন, ‘শুরুতে তো আমরা রাজি ছিলাম না। তবে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার উৎসাহে উদ্যোগী হই। একটা আত্মবিশ্বাস ছিল যে নতুন চাষাবাদ হলেও কৃষকের শ্রম আর সেবায় সব ফসলই ফলানো সম্ভব। সেটা সম্ভবও হয়েছে। প্রতিদিন মানুষজন দেখতে আসছে, যেটা আমাদের উৎসাহ আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।’

বন্যার ক্ষতি পুষিয়ে লাভের মুখ দেখার আশা দিচ্ছে এই বাগান

তবে একটা সমস্যার কথাও বললেন সাব্বির, ‘ঘুরতে এসে মানুষজন খেতের ক্ষয়ক্ষতি করছেন। তাই বাধ্য হয়ে টিকিটের ব্যবস্থা করতে হয়েছে। এখানে সূর্যমুখীর পাশাপাশি মিষ্টি আলু, সরিষা ও ভুট্টার আবাদও করেছি। কিছু বীজ সারি বেঁধে বুনেছি আর কিছু বীজ ছিটিয়ে বুনেছি। এখন দেখার পালা কোন ফসলে কেমন সাড়া পাই।’

সাব্বির মিয়া জানান, গেল বর্ষার বন্যায় বেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন তিনি। চরের যে জমিতে এখন সূর্যমুখীর হাসি, সেই জমি ছিল বন্যার পানির নিচে। বন্যার পানিতে নিজেদের ফল-ফসল, কলাবাগান—সবই হারিয়ে গিয়েছিল তখন। এখন আবার নতুন করে, নতুন উদ্যমে শুরু করেছেন। বন্যার ক্ষতি পুষিয়ে লাভের মুখ দেখার আশা তাঁর মনে।

যেভাবে যাবেন

যেদিক থেকেই আসুন, প্রথমে কুমিল্লা শহরের শাসনগাছা বাসস্ট্যান্ডে যান। সেখান থেকে অটোরিকশা বা সিএনজিচালিত অটোরিকশায় করে জনপ্রতি মাত্র ১০ টাকা ভাড়া দিয়ে চলে আসুন গোমতী নদীর পালপাড়া সেতুর গোড়ায়।

সেতু থেকে ডান দিকে চোখ রাখলেই পেয়ে যাবেন সূর্যমুখীর স্বর্গরাজ্যের দেখা

সেতু থেকে ডান দিকে চোখ রাখলেই পেয়ে যাবেন সূর্যমুখীর স্বর্গরাজ্যের দেখা। যেহেতু একটি জমি ফুলে পরিপূর্ণ হলেও আরও দুটি জমিতে ফুল আসতে শুরু করেছে মাত্র, তাই বেড়ানোর জন্য হাতে লম্বা সময় পাবেন। ঈদের ছুটিতেও ঘুরে আসার পরিকল্পনা করতে পারেন।

তিব্বত ভ্রমণের পরিকল্পনা করছেন? আপনার জন্য ১১ তথ্য

Read full story at source