বিভিন্ন সংস্কৃতিতে দাফন ও দাহ: বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রে মানুষদের ও পোষা প্রাণীদের সৎকার
· Prothom Alo

আজ আমরা যে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করব সেটি মৃত্যু-সংক্রান্ত আচার অনুষ্ঠান, যা একটি সমাজের গভীরতম ধর্মীয় বিশ্বাস, সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ, আবেগগত সম্পর্ক ও পরিবেশ-সচেতনতার প্রতিফলনমাত্র। দাফন ও দাহ কেবল মৃতদেহ ব্যবস্থাপনার পদ্ধতি নয়; এগুলো মর্যাদা, বিশ্বাস, সহাবস্থান ও স্মৃতির ধারণাকে প্রকাশ করে।
এই প্রবন্ধে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রে বিভিন্ন ধর্মাবলম্বী মানুষের মৃত্যুচর্চার তুলনামূলক বিশ্লেষণ উপস্থাপন করছি। এতে মানুষের দাফন ও দাহ, পোষা ও গৃহপালিত প্রাণীর মৃত্যু-পরবর্তী ব্যবস্থাপনা, পরিবেশগত প্রভাব এবং একই অর্থ প্রকাশে আমরা যে দুটি শব্দ ব্যবহার করে থাকি—অর্থাৎ কবরস্থান (গ্রেভইয়ার্ড) ও সমাধিক্ষেত্র (সেমেট্রি)-এর পার্থক্য তুলে ধরছি।
Visit solvita.blog for more information.
কবরস্থান ও সমাধিক্ষেত্র: ধারণাগত পার্থক্য
কবরস্থান (গ্রেভইয়ার্ড) ও সমাধিক্ষেত্র (সেমেট্রি) শব্দ দুটি প্রায়ই একই অর্থে ব্যবহৃত হলেও, বাস্তবে এদের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। কবরস্থান সাধারণত কোনো ধর্মীয় বা সম্প্রদায়ভিত্তিক প্রতিষ্ঠান যেমন মসজিদ-মাদ্রাসা বা চার্চ–সংলগ্ন। মোটা দাগে কবরস্থান হলো—
• বৃহৎ পরিসরে জনসাধারণের কবরস্থান, যা একটি এলাকা বা শহরের বহু মানুষকে সেবা দেয়।
• পারিবারিক কবরস্থান, যা পরিবার কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত ওয়াক্ফ (ধর্মীয় দান) হিসেবে পরিচালিত হয়
এ ধরনের কবরস্থান আকারে বড়, কাঠামোগতভাবে সুসংগঠিত ও আইনগতভাবে স্বীকৃত হতে পারে সব কবরস্থান যে ছোট বা অনানুষ্ঠানিক, তা কিন্তু নয়।
অন্যদিকে সমাধিক্ষেত্র হলো এমন একটি স্বতন্ত্র দাফন ভূমি, যা সরাসরি কোনো উপাসনালয়ের সঙ্গে যুক্ত নয়। এগুলো সাধারণত পরিকল্পিত ও নকশাবদ্ধ, পৌরসভা, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বা সংস্থা দ্বারা পরিচালিত আইনি ও প্রশাসনিকভাবে নিয়ন্ত্রিত সিটি কপরোরেশন বা পৌর কর্তৃপক্ষের তত্ত্বাবধানে থাকা কবরস্থান, যেখানে রক্ষণাবেক্ষণ ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা হয়।
যুক্তরাষ্ট্রে অধিকাংশ দাফন কার্যক্রম সমাধিক্ষেত্রেই সম্পন্ন হয়, আর বাংলাদেশে দাফন মূলত কবরস্থানকেন্দ্রিক, যেখানে ধর্মীয়, পারিবারিক ও পৌর ব্যবস্থাপনা একসঙ্গে কাজ করে।
বাংলাদেশে দাফন প্রথা: ধর্ম, কাঠামো ও পৃথককরণ
মুসলিম দাফন
বাংলাদেশে মুসলমানরা সংখ্যাগরিষ্ঠ এবং তাদের মধ্যে জানাজা শেষে দাফনই প্রধান পদ্ধতি। ইসলামি দাফনের মূল বৈশিষ্ট্যগুলো— দ্রুত দাফন, সাধারণত ২৪ ঘণ্টার মধ্যে, সরলতা ও মৃত্যুর ক্ষেত্রে সমতা, মুসলিম কবরস্থানে দাফন, যা হতে পারে বড় কমিউনিটি কবরস্থান, পারিবারিক ওয়াক্ফ কবরস্থান অথবা সিটি করপোরেশন তত্ত্বাবধানে পরিচালিত কবরস্থানে। এই বৈচিত্র্য জনসংখ্যার চাপ, ভূমির প্রাপ্যতা ও ঐতিহাসিক বসতির বাস্তবতাকে প্রতিফলিত করে, তবে ধর্মীয় বিধান অক্ষুণ্ন থাকে।
খ্রিষ্টান দাফন
বাংলাদেশের খ্রিষ্টান সম্প্রদায় গির্জা-নির্দেশিত শেষকৃত্য ও প্রার্থনার মাধ্যমে দাফন সম্পন্ন হয়ে থাকে।
খ্রিষ্টান কবরস্থানে, যা সাধারণত গির্জা বা মিশনারি প্রতিষ্ঠানের অধীনে পরিচালিত। বাংলাদেশে মুসলিম ও খ্রিষ্টানদের কবরস্থান পৃথক। এটি ধর্মীয় বিধান, প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাপনা ও দীর্ঘদিনের সামাজিক রীতিনীতির ফল, যদিও দৈনন্দিন জীবনে পারস্পরিক সহাবস্থান শান্তিপূর্ণ।
বাংলাদেশে দাহ প্রথা: হিন্দুধর্মীয় চর্চা
বাংলাদেশে দাহ প্রথা মূলত হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ, যা হতে হয় খোলা আকাশের নিচে শ্মশানঘাটে দাহ, কাঠের চিতা ব্যবহার, ভস্ম নদীতে বিসর্জন ও পুরোহিত দ্বারা পরিচালিত ধর্মীয় আচার।
এই প্রথা ধর্মীয়ভাবে তাৎপর্যপূর্ণ হলেও, এতে কাঠ ব্যবহার, বায়ুদূষণ ও পরিবেশগত চাপ সৃষ্টি হয়।
বাংলাদেশে পোষা ও গৃহপালিত প্রাণীর মৃত্যু ব্যবস্থাপনা
বাংলাদেশে পোষা ও গৃহপালিত প্রাণীর মৃত্যু-পরবর্তী ব্যবস্থাপনা এখনো অনানুষ্ঠানিক ও অপরিকল্পিত।
অনেক ক্ষেত্রে প্রাণীর মরদেহ ব্যক্তিগতভাবে মাটিচাপা দেওয়া হয় এবং পোষা প্রাণীর কবরস্থান বা দাহকেন্দ্র প্রায় নেই বললেই চলে। ফলে বাস্তবে দেখা যায়, পোষা ও গৃহপালিত প্রাণীর মৃতদেহ প্রায়ই নদী, খাল, ডোবা, খোলা মাঠ বা আবর্জনার স্তূপে ফেলে দেওয়া হয়, যা মারাত্মক পরিবেশগত ও জনস্বাস্থ্যগত ঝুঁকি সৃষ্টি করে। এর মধ্যে রয়েছে—পানি ও ভূগর্ভস্থ জলের দূষণ, রোগজীবাণু ছড়ানোর আশঙ্কা, জলজ প্রতিবেশব্যবস্থার ক্ষতি, নগর স্যানিটেশন ব্যবস্থার অবনতি। এই পরিস্থিতি স্বভাবতই প্রাণিকল্যাণ ও পরিবেশ ব্যবস্থাপনায় একটি গুরুতর নীতি এবং অবকাঠামোগত ঘাটতির দিক নির্দেশ করে।
যুক্তরাষ্ট্রে দাফন ও দাহ: পছন্দ, নিয়ন্ত্রণ ও ব্যক্তিকরণ
মানব দাফন
যুক্তরাষ্ট্রে দাফন এখনো প্রচলিত, যদিও দাহের হার ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। দাফন হয় লাইসেন্সপ্রাপ্ত সমাধিক্ষেত্রে, ধর্মীয় ও অ-ধর্মীয় উভয় ধরনের সমাধিক্ষেত্রে, অ-ধর্মীয় সমাধিক্ষেত্রে বিভিন্ন ধর্মাবলম্বীর দাফন সম্ভব, সাধারণত পৃথক অংশে। আসলে ব্যবস্থাটি আইন, পরিকল্পনা ও ব্যক্তিগত পছন্দের ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত। এই আর্টিক্যালটি লিখতে গিয়ে আমি বিমোহিত হয়েছি কারণ, যুক্তরাষ্ট্রে আইনের এত পুঙ্খানুপুঙ্খ ব্যাখ্যা ও তার যথাযথ ব্যবহার দেখে।
মানব দাহ
দাহ যুক্তরাষ্ট্রে সব ধর্ম ও ধর্মনিরপেক্ষ গোষ্ঠীর মধ্যেই গ্রহণযোগ্য। তবে তা হতে হবে লাইসেন্সপ্রাপ্ত ক্রিমেটোরিয়ামে সম্পন্ন, পরিবেশ ও আইনগত মানদণ্ড দ্বারা নিয়ন্ত্রিত, দেহভস্ম পরিবারকে ফেরত দেওয়া হয়, যা দাফন, সংরক্ষণ বা স্মৃতিচিহ্নে ব্যবহৃত হতে পারে। একইভাবে সেবাপদ্ধতি অত্যন্ত ব্যক্তিকেন্দ্রিক ও নমনীয়।
পোষা প্রাণীকে পরিবার-সদস্য হিসেবে বিবেচনা করা হয় যুক্তরাষ্ট্রে। এখানে উল্লেখ্য যে যুক্তরাষ্ট্রে পোষা প্রাণীর মৃত্যুব্যবস্থাপনাটি একটি সুসংগঠিত খাত। অনেক ক্ষেত্রে এদের জন্যে রয়েছে নির্দিষ্ট পোষা প্রাণীর সমাধিক্ষেত্র, যা ব্যক্তিগত বা সম্মিলিত দাহ বা পশুচিকিৎসা কেন্দ্রের সহায়তায় হয়ে থাকে এবং পরবর্তী সময়ে স্মারক, কলস সংরক্ষণ বা স্মৃতিচিহ্নে ব্যবহৃত হতে পারে। পরিবেশগত ও নৈতিক দিকটি বাংলাদেশে বিবেচিত হয় না, এর ফলে কার্যত খোলা দাহে বায়ুদূষণ ও বনসম্পদের ক্ষয়, প্রাণীর মৃতদেহের অনিয়ন্ত্রিত নিষ্পত্তিতে পরিবেশ দূষণ এমনকি জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি বৃদ্ধি পরিলক্ষিত হয়।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রে দাফন ও দাহ পরিবেশগত মানদণ্ডে নিয়ন্ত্রিত, গ্রিন বেরিয়াল ও বিকল্প দাহপদ্ধতির বিকাশ, প্রাণীর মৃতদেহ ব্যবস্থাপনা স্বাস্থ্যবিধি অনুযায়ী পরিচালিত হয়।
পোষা প্রাণী নিয়ে দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন
দুটি দেশের মধ্যে একটি স্পষ্ট পার্থক্য হলো পোষা প্রাণীর সামাজিক অবস্থান।
• যুক্তরাষ্ট্রে পোষা প্রাণী পরিবারের অবিচ্ছেদ্য অংশ
• বাংলাদেশে শহরকেন্দ্রিক মধ্যবিত্ত সমাজে এই দৃষ্টিভঙ্গি ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হচ্ছে
কিন্তু সেই পরিবর্তনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ অবকাঠামো ও নীতি এখনো অনুপস্থিত। মোদ্দাকথা, বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রে মুসলমান ও খ্রিষ্টানদের দাফন ও দাহ প্রথা ভিন্ন সামাজিক, ধর্মীয় ও পরিবেশগত বাস্তবতার প্রতিফলন। বাংলাদেশে ধর্মভিত্তিক প্রথা, কবরস্থানের পারিবারিক ও পৌর ব্যবস্থাপনা এবং হিন্দুদের ঐতিহ্যগত দাহ অনুসারে পরিবেশ ও প্রাণিকল্যাণে চ্যালেঞ্জ রয়েছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ন্ত্রিত, পছন্দভিত্তিক ও মানবিক ব্যবস্থাপনা গড়ে উঠেছে মানুষ ও পোষা প্রাণী উভয়ের জন্যই। মৃত্যুতেও মর্যাদা নিশ্চিত করা, পরিবেশ রক্ষা করা এবং পোষা প্রাণীর জন্য মানবিক সমাধান তৈরি করা এই তিনটি বিষয়ই একটি সমাজের পরিপক্বতার প্রকৃত মানদণ্ড। ক্যাথলিক চার্চ পূর্বে দাহ প্রথা অনুমোদন করত না। তবে ১৯৬৩ সালের পর থেকে দাহ অনুমোদিত হয়েছে, কিন্তু গির্জা এখনো সমাধিস্থ করাকে বেশি গুরুত্ব দেয়, কারণ এটি দেহের পুনরুত্থানের বিশ্বাসের প্রতীক। দাহ করার পর অস্থি (ashes) গির্জার নির্ধারিত পবিত্র স্থানে সংরক্ষণ বা সমাধিস্থ করতে হয়। দাহ করার পর অস্থি (ashes) ঘরে রাখা বা ছড়িয়ে দেওয়া সাধারণত নিরুৎসাহিত করা হয়।
বেশির ভাগ প্রোটেস্ট্যান্ট সম্প্রদায়ে দাহ অনুমোদিত। যেমন:
• Baptist Churches
• Methodist Church
• Lutheran Church
• Anglican Communion
তাদের মতে, বাইবেলে দাহ স্পষ্টভাবে নিষিদ্ধ করা হয়নি। তাই এটি ব্যক্তিগত বা পারিবারিক সিদ্ধান্ত হিসেবে বিবেচিত হয়।
নাগরিক ও সরকারের যৌথ দায়িত্ব: আমেরিকার তুষারঢাকা সকালের শিক্ষাইহুদিদের মধ্যে দাহ প্রথা কেমন
সাধারণভাবে বলতে গেলে, ইহুদি ধর্মে দাহ প্রথা ঐতিহ্যগতভাবে নিরুৎসাহিত, এবং অধিকাংশ ধারায় সমাধিস্থ করাই ধর্মীয়ভাবে সঠিক বলে বিবেচিত। Orthodox Judaism দাহ প্রথা কঠোরভাবে নিরুৎসাহিত বা নিষিদ্ধ করে। ধর্মীয় ভিত্তি হলো—তওরাতে সরাসরি দাহের নির্দেশ নেই, ঐতিহ্যগতভাবে সমাধিস্থ করাই ইহুদি আইনের (Halakha) অংশ হিসেবে বিবেচিত এবং মৃতদেহ দ্রুত (সাধারণত ২৪ ঘণ্টার মধ্যে) সমাধিস্থ করার প্রথা রয়েছে।
এর কারণসমূহ হলো তওরাতে (Torah) সমাধিস্থ করার উদাহরণ রয়েছে, মানবদেহকে ঈশ্বরপ্রদত্ত পবিত্র সৃষ্টিরূপে দেখা হয়, ‘ধূলি হতে সৃষ্টি, ধূলিতেই প্রত্যাবর্তন’—এই বিশ্বাস burial-এর সঙ্গে সম্পর্কিত, ঐতিহাসিকভাবে হলোকস্টে (Holocaust) নাৎসিদের দ্বারা দাহের স্মৃতি ইহুদি সমাজে মানসিকভাবে সংবেদনশীল বিষয়।
Conservative Judaism সাধারণত সমাধিস্থকেই সমর্থন করে। দাহ নিরুৎসাহিত করা হয় তবে কিছু ক্ষেত্রে পরিবার চাইলে রাব্বিরা অংশ নিতে পারেন। অন্যদিকে, Reform Judaism তুলনামূলকভাবে উদারপন্থী। এই বিশ্বাসীরা দাহকে সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ করে না, ব্যক্তিগত ও পারিবারিক সিদ্ধান্তকে গুরুত্ব দেয় অনেক ক্ষেত্রে, দাহের পর অস্থি ইহুদি কবরস্থানে সংরক্ষণ করা হয়।
হিন্দুধর্মে দাহ প্রথা
হিন্দুধর্মে দাহ–ই প্রধান ও প্রাচীন অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া পদ্ধতি। অধিকাংশ হিন্দু মৃত্যুর পর দেহকে অগ্নিতে সমর্পণ করেন—এটি আত্মার মুক্তি (মোক্ষ) ও পুনর্জন্মের চক্রের সঙ্গে সম্পর্কিত ধর্মীয় বিশ্বাসের অংশ।
হিন্দু দাহ-অনুষ্ঠানকে অন্ত্যেষ্টি বা শেষ সংস্কার বলা হয়।
• সাধারণত চিতায় অগ্নিদাহ করা হয়।
• জ্যেষ্ঠ পুত্র বা নিকটাত্মীয় অগ্নি প্রজ্বালন করেন।
• মন্ত্রপাঠ ও ধর্মীয় আচার পালিত হয়।
• অস্থি সংগ্রহ করে পবিত্র নদীতে বিসর্জন দেওয়া হয়।
অনেক ক্ষেত্রে গঙ্গা নদীতে অস্থি বিসর্জন দেওয়া হয়, বিশেষত Varanasi-তে, যা হিন্দুদের কাছে অত্যন্ত পবিত্র স্থান।
ধর্মীয় ভিত্তি
হিন্দু দর্শনে দেহকে ক্ষণস্থায়ী ও আত্মাকে (আত্মা/আত্মন) চিরন্তন মনে করা হয়।
• ভগবদ্গীতায় বলা হয়েছে, আত্মা অবিনশ্বর; দেহ পরিবর্তিত হয় মাত্র।
• আগুন (অগ্নি) পবিত্র; এটি আত্মাকে শুদ্ধ করে পরবর্তী যাত্রায় সহায়তা করে বলে বিশ্বাস করা হয়।
তবে সব ক্ষেত্রে দাহ করা হয় না। যেমন—শিশু (বিশেষত অল্পবয়সী শিশু, সন্ন্যাসী বা সাধু, কিছু বিশেষ সম্প্রদায়, এদের ক্ষেত্রে কখনো কখনো সমাধিস্থ করা হয়।
আসুন একনজরে দেখা যাক ধর্মভিত্তিক দাফন ও দাহ প্রথার তুলনামূলক আলোচনা:
• হিন্দুধর্ম: প্রধান পদ্ধতি: দাহ (Cremation)
• ধর্মীয় আচার: অন্ত্যেষ্টি (Antyesti)
• ধর্মীয় ভিত্তি: আত্মা অমর, দেহ নশ্বর
• শাস্ত্রীয় উল্লেখ: ভগবদ্গীতা
• অস্থি বিসর্জন: গঙ্গাসহ পবিত্র নদীতে
ইহুদিধর্ম অনুসারে:
• প্রধান পদ্ধতি: সমাধিস্থ (Burial)
• দ্রুত দাফনের প্রথা (সাধারণত ২৪ ঘণ্টার মধ্যে)
• ধর্মীয় ভিত্তি: মানবদেহ ঈশ্বরপ্রদত্ত পবিত্র সৃষ্টিরূপে বিবেচিত
• কঠোর অবস্থান: Orthodox Judaism দাহ অনুমোদন করে না
• উদারপন্থী অবস্থান: Reform Judaism দাহকে ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখে
• ঐতিহাসিক কারণে (হলোকাস্টের স্মৃতি) দাহ ইহুদি সমাজে সংবেদনশীল বিষয়।
খ্রিষ্টধর্ম অনুসারে:
• ঐতিহ্যগত পদ্ধতি: সমাধিস্থ
• আধুনিক সময়ে: দাহও গ্রহণযোগ্য (অনেক সম্প্রদায়ে)
• এদের অনেকেই মনে করেন দেহের পুনরুত্থান (Resurrection)
• ভিন্ন মতাবলম্বীরা হলেন:
• Catholic Church: দাহ অনুমোদিত, তবে সমাধিস্থ অগ্রাধিকার
• Eastern Orthodox Church: সাধারণত দাহ নিরুৎসাহিত
• অধিকাংশ প্রোটেস্ট্যান্ট: দাহ অনুমোদিত। খ্রিষ্টধর্মে ঐতিহ্যগতভাবে সমাধিস্থ হলেও আধুনিক সময়ে দাহ গ্রহণযোগ্য হয়েছে (সম্প্রদায়ভেদে)।
ইসলাম ধর্ম অনুসারে একমাত্র পদ্ধতি হলো: সমাধিস্থ(Burial), দাহ সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ, ধর্মীয় ভিত্তি: কুরআন ও হাদিস, দ্রুত দাফন (সাধারণত ২৪ ঘণ্টার মধ্যে), জানাজার মাধ্যমে সমষ্টিগত দোয়া এবং দেহকে সম্মান ও মর্যাদার সঙ্গে মাটিতে সমাহিত করা হয়।
অন্যদিকে হিন্দুধর্মে দাহ ধর্মীয়ভাবে নির্ধারিত ও প্রধান প্রথা।
একটি ব্যাপারে মুসলমান ও ইহুদিরা একমত—ইসলাম ও ঐতিহ্যগত ইহুদিধর্মে দাহ নিষিদ্ধ।
বাংলাদেশে ধর্মীয় ঐতিহ্য ও সামাজিক রীতিই প্রধান নিয়ামক। অপরদিকে যুক্তরাষ্ট্রে ধর্মীয় বিশ্বাসের পাশাপাশি আইন, পরিবেশ নীতি, অর্থনৈতিক বিবেচনা ও ব্যক্তিগত পছন্দ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ধর্মীয় বিধান একই থাকলেও বাস্তব প্রয়োগ দেশভেদে ভিন্ন রূপ নেয়—এটাই মূল পার্থক্য।
দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই–মেইল: [email protected]